প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৫১.
অন্ধকার কক্ষটাকে মৃদু আলোকিত করে রেখেছে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা দুটো মোমবাতি। সে-ই মোমবাতির আলোতেই আব্দুল দু চোখ মেলে দেখছে কক্ষের এককোণে মেঝেতে হাত পা বাধা অবস্থায় বসে থাকা যুবরাজকে। যুবরাজ বেহজাদ! তুরস্কের ভবিষ্যৎ সম্রাট! হাহ! একজন ভবিষ্যৎ সম্রাট যে এরকম উদ্ভ্রান্তের মতো মেঝেতে বসে থাকবে এ-ই দৃশ্যটা বেশ দূর্লভ বটে।
বেহজাদের মস্তিষ্ক জুড়ে আলোড়ন চলছে। এইতো কিছুক্ষণ আগেই প্রধান সেনাপতি কেরেমকে নিয়ে কক্ষে এসে উপস্থিত হয়েছিল। অতঃপর কেরেম স্বীকার করে এতদিন ধরে লুকিয়ে রাখা ভয়ংকর সত্যগুলো। বাকি সব সত্য বেহজাদকে যতটা না আঘাত করেছে, তার থেকে বেশি আঘাত করেছে তার নিজের মা'য়ের সত্যিটা। ভাইজানের খুনে বেহজাদের মা শামিল। বেহজাদের সিংহাসনের পথ শিথিল করতে দেনিজকে খুন করা হয়েছে। বেহজাদ একজন খুনির সন্তান। এর থেকে নির্মম সত্য আর কি-ই বা হতে পারে?
বেহজাদের মনে হচ্ছে দেনিজ খুন হওয়ার পিছনে অন্যতম একটা কারণ হচ্ছে সে নিজেই। তার জন্যই তো তার মা এতো নোংরা এবং জঘন্য একটা অপরাধ করতে পেরেছে। দেনিজের আজকে না থাকার পিছনে কিছুটা হলেও বেহজাদ দায়ী। অদ্ভুৎ এই অপরাধবোধ বেহজাদকে সম্পূর্ণ আষ্টেপৃষ্টে ধরে।
কি বোকা সে! কি মূর্খ সে! কি সহজে তাকে বোকা বানালো সবাই! এরকম মূর্খতা নিয়ে কি-না সে সিংহাসনের উত্তরাধিকার হবে! এরকম অবিবেচক এক যুবরাজ যদি রাজ্যের বাদশাহ হয় তবে সে-ই রাজ্য এবং রাজ্যের প্রজারা তো সকলেই ডুববে।
বেহজাদ এসব ভাবতে ভাবতে নিজের উপরই হেসে উঠে। অদ্ভুৎ সে-ই হাসির ভঙ্গিমা। আব্দুলকে আতংকিত দেখায়। তার কাছে মনে হয় তার সামনে কোনো পুরুষ নয় বরং কোনো অশরীরী বসে আছে। সুন্দর দেখতে কোনো পুরুষ মানুষের হাসি এতটা গা হীম এবং ভয়ংকর দেখতে হয়?
বেহজাদ হাসতে হাসতেই হুট করে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাগের চোটে সে দেয়ালের সঙ্গে নিজের মাথাটা জোরে জোরে ঠুকতে শুরু করে। আব্দুলের ইচ্ছে হয় ছুটে গিয়ে যুবরাজকে বাধা দিতে। কিন্তু সে ছুটে যেতে পারে না, না পারে কিছু বলতে। যাওয়ার আগে প্রধান সেনাপতি তার মুখটাও বেধে দিয়ে গিয়েছে। কারণটা বোধহয় তার বলা অতিরিক্ত কথা। আব্দুল অসহায় ভঙ্গিতে কেবল তাকিয়ে দেখে সম্পূর্ণ দৃশ্যটা।
বেহজাদ জানে না তার এই দাবানল সম ক্ষোভ কার জন্য। নিজের জন্য? নিজের মা'য়ের জন্য? নাকি গ্রীকদের জন্য? বেহজাদের মস্তিষ্ক এখন স্থির অবস্থায় কিছু ভাবার পরিস্থিতিতে নেই। তার চোখের সামনে কেবল বারবার ভাইজানের মুখটা ভেসে উঠছে? মা কি করে পারলো ভাইজানকে খুন করতে? দেনিজ তো কখনো কাউকে অসম্মান করে নি কিংবা সামান্যতম বেয়াদবি করে নি। ওরকম ভালো একটা ছেলেকে মারার পূর্বে কি বাদশাহ বেগমের একবারও বুক কাপে নি? এতটা পাষণ্ড হয়ে গিয়েছেন তিনি? নাকি তিনি আগে থেকেই পাষণ্ড ছিলো? বোধহয় বেহজাদই কখনো তা লক্ষ্য করে নি।
দেয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে একটা সময় বেহজাদ ক্লান্ত হয়ে থেমে যায়। মাথাটা পিছনের দিকে এলিয়ে দিয়ে দু চোখ বুজে নেয়। ভেতরটা পুড়ে আঙ্গার হয়ে গেলেও দু চোখ দিয়ে সামান্যতম জল নামে না তার। নিষ্ঠুর মা'য়ের গর্ভজাত সন্তান কি-না! এজন্যই বোধহয় কোনো পরিস্থিতিই তাকে কাঁদাতে পারে না।
বেহজাদের বদ্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠে আরো একটা মুখ। প্রিন্সেস নাওমির। নাওমির সে কি দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে তার ভাই নির্দোষ। আজ নাওমির সে-ই দৃঢ় বিশ্বাসের সামনে বেহজাদের মূর্খতার হার হয়েছে। বেহজাদ পরাজিত হয়েছে ও-ই জেদী মেয়ের একরোখা বিশ্বাসের সামনে।
রাত গভীর হয়। অপরাধবোধ, প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি এবং ক্ষোভ সবকিছুতে ডুবে থাকা যুবকের দু চোখেও ঘুম নামে। কষ্টটুকুকে কিছু ঘন্টার জন্য মুক্তি দিয়ে শক্ত মেঝেটাতেই ঘুম দেয় তুরস্কের যুবরাজ।
__________
সকাল হয়েছে বেশ অনেকক্ষণ হলো। কাউন্ট ইয়ান আলবার্টের জ্ঞান দিনের এ-ই প্রথম প্রহরেই ফিরলো। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতেই সবার প্রথমে দেখতে পায় নিজের মা'কে। আনাস্তাসিয়া দিন-রাত ছেলের শিয়রেই বসে ছিলো গত দু'দিন ধরে। এমনকি তিন বেলার খাবারটাও ইয়ানের কক্ষে বসেই খেয়েছে সে। তা-ই ছেলের জ্ঞান ফিরেছে এই ব্যাপারটা সবার আগে সে-ই লক্ষ্য করলো।
আনাস্তাসিয়া প্রাণোচ্ছল হেসে নিজের গলার ক্রুশের হারটাতে একটা চুমু খেয়ে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়৷ মমতা ভরা স্বরে বলে উঠে,
“ বাবা আমার! “
ইয়ান মা'য়ের পানে তাকিয়ে মলিন হাসে। আনাস্তাসিয়া ছেলের কপালে একটা চুমু খেয়ে প্রহরীদের চিকিৎসককে ডেকে আনার জন্য বলতে বেরিয়ে যায়। ইয়ান সঙ্গে সঙ্গে ব্যথায় চোখ মুখ কুচকে বড়ো করে একটা নিঃশ্বাস নেয়। হাত পা সামান্য নাড়ানোর চেষ্টা করে সে। মনে হচ্ছে কয় জনম ধরে সে বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলো! তবে হাত নাড়ানোর ফলে শরীরের উপরিভাগটাও সামান্য নড়ে উঠে। যার ফলে তাজা জখম গুলো মুহুর্তেই ব্যথায় কামড়ে ধরে। ইয়ান মৃদু স্বরে ‘আহ’ উচ্চারণ করে চোখ বুজে নেয়।
ঠিক সে-ই মুহূর্তে প্রধান সেনাপতি কেভ কামরায় প্রবেশ করে। রাজমাতার মুখে খবর শুনেই সে সঙ্গে সঙ্গে এসে উপস্থিত হয়েছে। কাউন্টকে এভাবে আর্তনাদ করতে দেখে সে ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে আসে,
“ কাউন্ট! অবশেষে আপনার জ্ঞান ফিরলো! বেশি অসুবিধা হচ্ছে? ব্যথা হচ্ছে? একটু অপেক্ষা করুন। আমি এক্ষুনি চিকিৎসককে নিয়ে আসছি। “
কেভ বেরিয়ে যেতে উদ্যোত হতেই ইয়ান পিছুডাকে,
“ দাঁড়াও। “
কেভ আদেশ মেনে দ্রুত স্থির হয়ে কাউন্টের শিয়রে এসে দাঁড়ায়। ইয়ান এবার ব্যথাটুকু হজম করে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নিয়ে প্রশ্ন করে,
“ কোথায়? ছলনাময়ীটা কোথায়? মাহশা কোথায়? “
কেভ যেনো বিপাকে পড়ে গেলো। জ্ঞান ফিরতেই কাউন্ট সর্বপ্রথম ও-ই মেয়েটার কথা জিজ্ঞেস করছে। এটা কি ভালো লক্ষ্মণ নাকি খারাপ লক্ষ্মণ? কাউন্টের মুখ দেখেও বুঝা যাচ্ছে না উনার অনুভূতি সম্পর্কে। এতো কিছুর পরও যদি কাউন্ট ও-ই মেয়েটার কথা চিন্তা করে তবে কেভ খুবই মনক্ষুণ্ণ হবে। কেভের থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে ইয়ান আবারও বলে উঠে,
“ আমার প্রশ্নের জবাব দাও, কেভ। “
কেভ দ্বিধাহীন গলায় বলে,
“ রাজমাতা ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন। “
ইয়ান মোটেও প্রতিক্রিয়া দেখায় না। বরং স্বাভাবিক স্বরে বলে,
“ তারপর? “
“ তারপর গতকাল উনাদের ফাঁসি হওয়ার কথা ছিলো। “
এবার আগের থেকেও শীতল স্বরে কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট প্রশ্ন করে,
“ ফাঁসি সম্পন্ন হয়েছে? “
“ না। ফাঁসির মঞ্চে তোলার পূর্বেই আমি উনাদের প্রাসাদ থেকে সরিয়ে গোপন এক জায়গায় আটকে রেখেছি। বর্তমানে সকল সৈন্যরা উনাদের খোঁজ করছে। কেউ জানে না যে এ-ই ঘটনায় আমি জড়িত। আপনাকেই আমি প্রথম জানালাম। এরকম দুঃসাহসের জন্য ক্ষমা করবেন কাউন্ট। কিন্তু এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়া উচিত বলে আমার মনে হচ্ছিলো। তাই কেবল আপনি সুস্থ হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত আমি উনাদের শাস্তি স্থগিত রাখতে এই পদক্ষেপ নিয়েছি। আমি কোনো অন্যায় করে থাকলে আপনার নির্ধারিত যেকোনো শাস্তি আমি মাথা পেতে নিবো। “
ইয়ান কিছুক্ষণ নীরব রয়। অতঃপর সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করতে করতে বলে উঠে,
“ ভুল কিছু করো নি। প্রতারণা, হত্যাচেষ্টা, অপহরণ। এতগুলো অপরাধের শাস্তি কেবল ফাঁসি হতে পারে না। আমার জ্ঞান ফেরার পূর্বেই ওর ফাঁসি হয়ে গেলে আমি কখনো শান্তি পেতাম না। সবসময় অতৃপ্ত এবং অসন্তুষ্ট রয়ে যেতাম। “
কেভ এগিয়ে গিয়ে কাউন্টকে উঠে বালিশে কিছুটা হেলান দিয়ে বসতে সাহায্য করে। ইয়ানের শরীর ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। তবে নিজ সেনাপতির সামনে ওভাবে শুয়ে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিল না বলেই সে উঠে বসেছে। ব্যথাটুকুও দম খিচে গিলে নিচ্ছে সে। কেভ বলে,
“ আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আপনাকে জানানোর ছিল, কাউন্ট। “
“ কি? “
“ আপনি আদেশ দিয়েছিলেন কেরেম নামক ও-ই লোকটাকে খুঁজে বের করতে। আপনার বিশ্বাস ছিলো ও-ই লোকটা কিছু না কিছু অবশ্যই জানে। আপনার বিশ্বাস ভুল ছিলো না। রাজ্য ছেড়ে পালানোর সময় লোকটাকে আটক করি আমরা। ওর থেকে সত্য কথাও আদায় করা হয়েছে। আমাদের ধারণা ঠিকই ছিলো। নোংরা একটা ষড়যন্ত্রে আপনার নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে। যুবরাজ দেনিজ অর্থাৎ রাজকুমারী জেইলানের ভাইয়ের আসল খুনী হচ্ছে তার সৎ মা এবং গ্রীক… “
কেভ সম্পূর্ণ সত্যটুকু ইয়ানকে বুঝিয়ে বলে। সে-ই সঙ্গে এ-ও জানায় যে জেইলানের চোখ থেকে মিথ্যার পর্দা সরানো হয়েছে। ইয়ান সম্পূর্ণ ব্যাপারটা নিয়ে ভাবার সুযোগ পায় না। তার আগেই কেভ তাকে আরো একটা সত্যি জানায়। সেটা হলো, কয়েদীদের মধ্যে বেহজাদ নামক যুবকটি হলো জেইলানের সৎ ভাই এবং তুরস্ক সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ বাদশাহ। তাকেও সম্পূর্ণ সত্যটা জানানো হয়েছে। ইয়ান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ পেলো না। তার আগেই রাজমাতা আনাস্তাসিয়া এবং দু'জন চিকিৎসক কামরায় প্রবেশ করে। চিকিৎসকরা দ্রুত কাউন্ট ইয়ানের পরিস্থিতি পরীক্ষণে ব্যস্ত হয়ে যায়। ইয়ান আর টু শব্দও করে না। তার মনে এ-ই মুহূর্তে কি চলছ সেটা কেবল সে-ই জানে।
__________
ইয়ানের জ্ঞান ফিরেছে এবং তার পরিস্থিতি এখন আগের তুলনায় ভালো খবরটা পেতেই পরিবারের সকল সদস্য একে একে এসে কাউন্টের সঙ্গে দেখা করে যাচ্ছে। ম্যাথিউ এসে ভাতিজাকে বুঝিয়ে বলে গিয়েছে রাজ্য কিংবা সভা নিয়ে যেনো আপাতত কোনো চিন্তা না করে। সে-সব সামলানোর জন্য রাজমাতা, ম্যাথিউ এবং প্রধান সেনাপতি আছে। মন্ত্রীরাও নিজেদের কাউন্টের অনুপস্থিতিতে বেশ সহয়তা করছে। এদিক দিয়ে ইয়ান কিছুটা নিশ্চিত। এক সপ্তাহ সময় নিয়ে অন্তত কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠার মতো ফুরসত পেলো সে।
আনাস্তাসিয়াও একান্তে ছেলের সঙ্গে মাহশা নামক মেয়েটাকে নিয়ে কথা বলে। জানায় যে ওই প্রতারক মেয়েটা এবং তার সঙ্গীদের দ্রুত সময়ের মধ্যে খুঁজে বের করা হবে। অতঃপর তাদের যথাযথ শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে সকলের জন্য একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হবে। আনাস্তাসিয়া এ-ও জানায় যে সে নিজে কাউন্টের জন্য চমৎকার সব পাত্রীর তালিকা তৈরী করছে। একবার এ-ই ঝামেলা মিটতেই এবং ইয়ান সুস্থ হতেই রাজ্যের জন্য উপযুক্ত কাউন্টেস নির্বাচন করা হবে। ইয়ান এ-ই ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখায় না। নীরবতাকে সম্মতির লক্ষ্য ভেবে আনাস্তাসিয়া বেশ খুশি হয়।
আনাস্তাসিয়া বেরিয়ে যেতেই ক্যামেলিয়া এবং নাওমি ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসে। কেদেকেটে মুখ লাল করে ফেলা নাওমি ভাইকে সুস্থ অবস্থায় বসে থাকতে দেখেই আবেগী হয়ে ছুটে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরে। অকস্মাৎ আলিঙ্গনে ইয়ান চাপা আর্তনাদ করে উঠে। নাওমি ভয় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পিছনে সরে যায়। ক্যামেলিয়া পিছন থেকে এসে নাওমির উদ্দেশ্যে বলে,
“ বোকা! কাউন্টের বুকে জখম না? একটু তো খেয়াল করবি! “
নাওমি অপরাধীর ন্যায় বলে,
“ দুঃখিত। আমার খেয়াল ছিলো না। বেশি ব্যথা করছে? আমি চিকিৎসক ডেকে আনবো? আমি আসলেই বুঝতে… “
ইয়ান মৃদু হেসে বলে,
“ থাম! কিচ্ছু হয় নি আমার। বুকে ছুরি চালানোর মতো অপরাধ করিস নি কোনো। কত মানুষ তো ছুরি চালিয়েও অনুতপ্ত হয় না। তুই আঘাত করিস নি আমাকে। “
নাওমির মন আরেকটু খারাপ হয়ে যায়। ভাইয়ের কথার অর্থ এবং ইঙ্গিত দুটোই সে বুঝতে পারে। সে বলে উঠে,
“ ও-ই মেয়েটাকে ভুলে যাও ভাই। অসভ্য একটা মেয়ে। আমি ওকে কক্ষনো ক্ষমা করবো না। সামনে পেলে ওর চুলের মুঠি ধরে ওর পেটে ছুরি চালাতাম। বর্বর মেয়ে কোথাকার! “
ইয়ান অন্যমনস্ক হয়ে বলে বসে,
“ ভুলতে পারবো না। কিছু মানুষকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে রাখতে হয়। তাদের দেওয়া জখম গুলো আজীবন শিক্ষা হিসেবে জীবনে রয়ে যায়৷ “
এ-ই পর্যায়ে নাওমিকেও ভাবুক দেখালো। সে-ও অন্যমনস্ক হয়ে যায়। চোখের পাতায় ভেসে উঠে একটা অপহরণকারীর মুখ। আনমনে প্রিন্সেস বলে উঠে,
“ কখনো কখনো সে-সব শিক্ষা গুলোও সবথেকে গভীর জখম হয়ে রয়ে যায়। খঞ্জর, তীর, তলোয়ার এসব কিছুর থেকেও ধাঁরালো হলো প্রতারণা এবং ছলনার ধার। কিছু মানুষ জেনে বুঝে প্রতারিত হয়ে নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করে। “
ইয়ানের কথার আর্থিক অংশ বোধগম্য হলেও, নাওমির কথার কোনো অর্থ বুঝে উঠতে পারে না ক্যামেলিয়া। সে বিরক্ত হয়। ইয়ানের নীরব প্রণয়ের আগুনে কি নাওমিও জ্বলছে না-কি কে জানে। তবে ক্যামেলিয়ার একটুও মায়া অনুভব হয় না। সে কঠোর স্বরে বলে,
“ ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে চলা উচিত। অথচ আমাদের কাউন্ট কি না এখনো সে-ই একই জায়গায় আটকে আছে। অপরদিকে মাননীয়া প্রিন্সেসও নিজের ভাইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারী ভারী বুলি আওড়াচ্ছে। “
ইয়ান এবং নাওমি দু'জনই নীরব রয়। ক্যামেলিয়ার কথার কোনো প্রতুত্তর করে না তারা। ঠিক এমন সময়ই কক্ষের দরজায় করাঘাতের শব্দ হয়। ইয়ান অনুমতি দিতেই প্রধান সেনাপতি কক্ষে প্রবেশ করে। তবে কক্ষে প্রিন্সেস এবং লুনাকে দেখে সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,
“ আপনারা ব্যস্ত হলে আমি পরে আসছি কাউন্ট। “
ইয়ান কিছু বলতে নিবে তার আগেই ক্যামেলিয়া কিছুটা বিদ্রুপ করে বলে,
“ আপনার এ-ই অবস্থার জন্য কেবলমাত্র ও-ই কয়েদী মেয়েটাকে কেন দায়ী করা হচ্ছে কাউন্ট? দায় তো তাদেরও যারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব এমন অযোগ্য কারো হাতে থাকাটা কি আদৌ সমীচীন? “
ক্যামেলিয়ার কথার তীর কার দিকে ছুটেছে তা কক্ষে উপস্থিত কারোই বুঝতে অসুবিধা হয় নি। কেভ থমথমে মুখ নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। ইয়ান কুচকে রাখা দৃষ্টি মেলে ক্যামেলিয়ার পানে তাকায়। ক্যামেলিয়া সে-ই দৃষ্টি দেখে সঙ্গে সঙ্গে বলে,
“ ভুল কিছু বলেছি? “
ইয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ক্যামেলিয়া এবং কেভের দ্বন্দ্ব নিয়ে সে খুব একটা মাথা ঘামালো না। তাদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের মাঝে হস্তক্ষেপ করার কোনো মানে হয় না।
চলবে…