প্রণয়তিথি
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৫৪.
হতাশায় ডুবে থাকা বেহজাদ নিজের ভাগ্য মেনে নিয়েছে ইদানিং। কখন সকাল হয় এবং কখন রাত হয় সে-সব দিকে তার বিশেষ হুশ থাকে না। সে সবসময় অন্য একটা ভুবনে ডুবে থাকে। যে-ই ভুবনটার নাম অনুতাপ। এই অনুতাপ তাকে কেমন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। তার সবসময় মনে হয়, মৃত্যু হলে হোক। শাস্তি হলে হোক। কোন কিছুতেই আর তার কোনো যায় আসে না। তার মতো মূর্খ ব্যক্তির বাদশাহ হওয়া তো দূর, বেঁচে থাকাই উচিত না। নিজের জীবন এবং অস্তিত্বটাকে এর পূর্বে কখনো এতটা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয় নি বেহজাদের। পৃথিবীর বুকে সবথেকে অপ্রয়োজনীয় কিছু থেকে থাকলে সেটা হলো কেবল তার এ-ই বেঁচে থাকাটা।
দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজে রাখা বেহজাদ কপালে হঠাৎই কারো আলতো স্পর্শ অনুভব করলো। সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকাতেই, আলো আঁধারে ভর্তি এই কামরাটায় নিজের সামনে হাঁটু গেড়ে এক অপ্সরীকে বসে থাকতে দেখলো সে। অপ্সরীটা আর কেউ নয় বরং এই রাজ্যের প্রিন্সেস। মায়া মায়া চোখ দুটো মেলে বেহজাদকে দেখছে। বেহজাদ কিছু অনুভব করলো কি-না স্পষ্ট বুঝা গেলো না। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সে কিছুটা সোজা হয়ে বসে বলে উঠে,
“ এখানে কি কাজ তোমার? “
নাওমি উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে,
“ কদিন ধরে হাত পা বাধা তোমার? “
প্রশ্ন করতে করতে নাওমি বেহজাদের হাতের বাধন খুলতে উদ্যোত হলো। বেহজাদ সুযোগ দিলো না। উল্টো বলে উঠে,
“ এখান থেকে যাও। “
নাওমি বিরক্তি নিয়ে তেজ দেখায়,
“ একদম আমাকে আদেশ করবে না। ভুলে যেও না আমি একজন প্রিন্সেস। তুমি আমার রাজ্যে অবস্থান করছো। “
নাওমির তেজ দেখে নিশ্চুপ রয় বেহজাদ। তবে নিজের হাত কিংবা পায়ের বাধন খোলার সুযোগ দেয় না। নাওমি বিরক্তি নিয়ে আশেপাশে তাকায়। প্রশ্ন করে,
“ আব্দুল কোথায়? “
নাওমি আসার কিছুক্ষণ পূর্বেই আব্দুল একজন সৈন্যের সঙ্গে শৌচাগারে গিয়েছে। এই অপ্রয়োজনীয় কথাটা নাওমিকে বলার রুচি হলো না বেহজাদের। তাই সে কেবল জবাব দেয়,
“ এসে পড়বে এক্ষুণি। “
নাওমি এ-ই সময়ে শার্টের উপর দিয়েই আলতো করে বেহজাদের হাতের বাহুর জখমটা ছুঁয়ে দিয়ে সার্বিক অবস্থা বুঝার চেষ্টা করে। বেহজাদ টু শব্দও করে না। নাওমি কপালে ভাজ নিয়ে প্রশ্ন করে,
“ ব্যথা আছে এখনো? “
ব্যথা নেই মানে? আলবাত ব্যথা আছে। হাতের বাহুর মাংসপেশির জায়গাটা ঠিকঠাক নিয়মিত চিকিৎসা না পাওয়ায়, মনে হচ্ছে পুরো পচে গিয়েছে। কি মারাত্মক চিনচিনে ব্যথা করছে! তবে সে-ই ব্যথা বেহজাদকে কেনো যেন ছুঁতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ-ই ব্যথাটুকুকেও শাস্তির অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছে সে।
নাওমির প্রশ্নের জবাবে বেহজাদ মাথা দু-পাশে সামান্য নেড়ে না বোধক উত্তর দেয়। নাওমি বোধহয় এতে সন্তুষ্ট হলো না। সে এবার অস্থির স্বরে বলে,
“ হাতে সময় নেই। কেভ যেকোনো সময় চলে আসবে। তোমার এবং আব্দুলের পালানোর একমাত্র সুযোগ এটা। “
বেহজাদের দৃষ্টি তখন নাওমির গলায় ঝুলন্ত নিজের দেওয়া হারটার দিকে। মূর্তির মতো শক্ত হয়ে কিছুক্ষণ সেই পানে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। সরাসরি নাওমির চোখে চোখ রেখে বলে,
“ তোমার ভাই খুন করে নি। আমি প্রমাণ পেয়েছি। আমি এবং আমার বোন অপরাধী। “
নাওমি থমকায়। তার ভাই কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট যে খুন করে নি এই দৃঢ় বিশ্বাস নাওমির আগে থেকেই ছিলো। তাই এটা শুনে সে খুব একটা অবাক হয় নি। তবে বেহজাদ কিভাবে প্রমাণ পেয়ে নিশ্চিত হলো, সেটা কিঞ্চিৎ ভাবাচ্ছে তাকে। নিজের ভাবনাকে একপাশে রেখে বেহজাদের বলা শেষ বাক্যটার প্রেক্ষিতে সে বলে উঠে,
“ তোমার বোন একজন কাউন্টকে হত্যাচেষ্টা করেছে। সেটার কোনো ক্ষমা নেই। তোমার অপরাধ হলো আমাকে অপহরণ করা। আমি তোমাকে ক্ষমা করে এই দায় থেকে মুক্ত করলাম। তোমার নিজ রাজ্যে ফিরে যেতে কোনো বাঁধা নেই। “
বেহজাদ দেখে নাওমির সরলতা। এ-ই মেয়ে যে-ই ভালোবাসার খাতিরে তাকে ক্ষমা করলো, সে-ই ভালোবাসাটাই তো কেবল ছলনা। বেহজাদের চিৎকার করে এ-ই সত্যিটা নাওমিকে জানাতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু সে জানাতে পারলো না। সত্যটা জানলে বোধহয় এই মেয়ে আরো কষ্ট পাবে। এ-ই কষ্টটুকু বরং না-ই দিলো বেহজাদ। সে কেবল থমথমে গলায় আওড়ায়,
“ তোমাকে অপহরণ করাটা আমার একমাত্র অপরাধ নয়। তোমার অজানা অনেক কিছু আছে। তুমি জানো না এমন অপরাধও আমি করেছি। আমি এখনো অপরাধী। তুমি না জানলেও, নিজের বিবেকের আদালতে আমি মস্তো বড়ো এক অপরাধী। “
নাওমি কেবল নীরবে তাকিয়ে থাকে বেহজাদের দিকে। ঠিক সে-ই মুহূর্তেই কামরার দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে আব্দুল এবং একজন প্রহরী। প্রহরীটা নাওমির আগমন সম্পর্কে অবগত ছিল না। সে বিস্মিত ভঙ্গিতে দ্রুত সম্মান প্রদর্শন করে বলে উঠে,
“ প্রিন্সেস! “
নাওমি সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠে তেজ নিয়ে প্রহরীকে আদেশ দেয়,
“ তুমি যেতে পারো। “
প্রহরীটা বলতে নেয়,
“ কিন্তু প্রধান সেনাপতি তো… “
নাওমি গর্জে উঠে,
“ প্রধান সেনাপতি আমার থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো কবে থেকে? “
প্রহরীর সাহস মিইয়ে যায়। সে মাথা নুইয়ে প্রস্থান করার পূর্বে বলে,
“ দুঃখিত প্রিন্সেস। বেয়াদবি মার্জনা করবেন। “
প্রহরী চলে যেতেই বেহজাদকে এবার গম্ভীর দেখায়। সে সরাসরি নাওমিকে বলে,
“ সাহায্য করতে চাও? তাহলে একটা সাহায্য করো কেবল। আব্দুলকে এখান থেকে মুক্ত করে তুরস্কে ফিরে যেতে সাহায্য করো। ও নিরপরাধ। ও শাস্তি পেলে সেটার জন্য আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না। “
দরজার নিকট দাঁড়িয়ে থাকা আব্দুল সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে,
“ কক্ষনো না। আমি আপনাদের ফেলে যেতে পারি না। এরকম কিছু বলবেন না যু… “
বেহজাদের চোখ রাঙানিতে থেমে যায় আব্দুল। কিন্তু নাওমি কথা বলে উঠে,
“ তোমরা দু’জনই যাবে আমার সঙ্গে। কোনো কথা শুনতে চাইছি না। উঠো… “
বেহজাদ এবার কিছুটা দৃঢ় স্বরে ধমকে উঠে,
“ তুমি শুনো আমার কথা। আমার বোন এখানেই আছে। আমি জানি ও এখন আর রাজ্যে ফিরতে চাইবে না। আমিও ওকে ফেলে কোথাও যাবো না। তাছাড়া আমি নিজের ভাগ্য এবং আসন্ন যেকোনো শাস্তি মেনে নিয়েছি। তুমি মূর্খদের মতো সহানুভূতি দেখানো বন্ধ করো। সম্ভব হলে আব্দুলকে সাহায্য করো। আর না-হয় চলে যাও এখান থেকে। “
বেহজাদের বলা মূর্খ শব্দটা নাওমির আত্মসম্মানে আঘাত করলো। আসলেই তো! সে মূর্খই তো! মূর্খ না হলে কি এই যুবকের প্রতি সে এখনো মায়া দেখায়? নাওমি নীরবে উঠে দাঁড়ায়। এক পল বেহজাদকে দেখে নিয়ে অতঃপর কামরা থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে আব্দুলের উদ্দেশ্যে বলে,
“ আমি বাড়ির বাহিরে অপেক্ষা করছি আব্দুল। তোমাকে সাহায্য করতে আমার কোনো আপত্তি নেই। নিজ রাজ্যে ফিরতে চাইলে নিচে চলে এসো। “
__________
প্রিন্সেস নাওমি কামরা থেকে বেরিয়ে যেতেই আব্দুল ঘাড়ত্যাড়ার মতো কক্ষের এককোণে মেঝেতে বসে পড়ে। চোখেমুখে তার গোয়ার্তমির ভাব। অর্থাৎ সে কোথাও যাবে না। বেহজাদ কিছুটা রাগ নিয়ে ডাকে,
“ আব্দুল! “
আব্দুল এ-ই প্রথম যুবরাজের ডাকে সাড়া দেয় না। সে ভালো করেই জানে যুবরাজ কি বলতে পারে। আব্দুল মোটেও আজকে যুবরাজের কোনো আদেশ মানবে না। বেহজাদ আবারো ডাকে,
“ আব্দুল, বেয়াদবি করবে না। চুপচাপ আমার কথা শুনো। রাজ্যে ফিরে যাও। “
“ আপনাদের রেখে কোথাও যাবো না। বিশ্বাসঘাতক নই আমি। ক্ষমা পেলে তিনজন একসঙ্গে পাবো, শাস্তি ভোগ করার হলেও একসঙ্গে করবো। “
বেহজাদ এবার সামান্য হেসে বলে,
“ বিশ্বাসঘাতক নও, অথচ বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে শাস্তি ভোগ করতে চাইছো! “
আব্দুল এবার অসহায় চোখে যুবরাজের পানে তাকিয়ে বলে,
“ আপনাদের সঙ্গেও প্রতারণা হয়েছে! “
আব্দুল হুট করেই অবুঝের মতো আচরণ করছে। দু'দিন আগেও সে ন্যায় অন্যায় সম্পর্কে কতো বুলি আওড়ালো। কিন্তু এ-ই মুহূর্তে যেনো যুবরাজ এবং রাজকুমারীর সঙ্গে হওয়া অন্যায়টাই তার কাছে মূখ্য হয়ে গিয়েছে। বেহজাদ এবার শান্ত গলায় বলে,
“ আমার এবং জেইলানের অপরাধবোধের বোঝা আর ভারী করো না আব্দুল। ফিরে যাও রাজ্যে। গিয়ে তোমাদের সম্মানীয় বাদশাহ বেগমকে জানাবে তার ছেলে মারা গিয়েছে। সঙ্গে এটাও জানাবে যে মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও আমি উনাকে ক্ষমা করি নি। উনাকে এই কথাটুকু জানানোর জন্য হলেও তোমাকে ফিরে যেতে হবে। আমার কথাটুকু রাখো। ও-ই মেয়েটা নিচে অপেক্ষা করছে। “
আব্দুলের মুখটা আরো অসহায় দেখাচ্ছে। সে বলে উঠে,
“ আপনাদের কি মৃত্যুদণ্ড হবে? “
দৈহিক মৃত্যু না হলে কি হবে? প্রতারণার অনলে আত্মিক মৃত্যু তো হয়েছে বেহজাদের। পৃথিবীর সবথেকে নিষ্ঠুরতম আঘাতটা আপনজনের কাছ থেকে পেলে, সেটার থেকে বেশি যন্ত্রণা আর কীসে হয়? বেহজাদ আব্দুলের প্রশ্নের জবাব দেয় না। কেবল বলে,
“ মেয়েটা অপেক্ষা করছে। দ্রুত যাও আব্দুল। ওকে অপেক্ষা করিও না। “
নিজের কথাটুকু শেষ করেই বেহজাদ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। আব্দুল বেশ কিছুক্ষণ অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে বেহজাদের পানে। অতঃপর একটা পর্যায়ে সে নিজের হাত বাধা অবস্থায়ই উঠে দাঁড়ায়। শেষ বারের মতো যুবরাজকে সালাম দিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে যায়। আব্দুল বেরিয়ে যেতেই খালি কামরাটায় বেহজাদ চোখ বুজে স্বস্তির হাসি হেসে বিড়বিড়িয়ে উঠে,
“ ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতাহু৷ “
__________
রাত্রির প্রহর চলছে। গুদাম ঘরের মতো কামরাটার মেঝেতে নিথর ভঙ্গিতে বসে আছে এক নারী। তার সামনেই মেঝেতে একটা থালায় না ছোঁয়া অখাদ্য পড়ে আছে। নারীটা এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছে। তবে তার ভাবনার গণ্ডি অন্য কোথাও সীমাবদ্ধ।
গলার মসৃণ ত্বকটায় দড়ির চাপের লাল দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে। এইতো, ঘন্টা কয়েক আগে ঠিক এ-ই জায়গাটাতে দাঁড়িয়েই সে মরতে বসেছিলো। তার গলায় প্যাচানো ছিলো ওই সাপের মতো দেখতে দঁড়িটা। প্রাণ প্রদীপটা প্রায় নিভু নিভু হয়ে এসেছিলো। চোখ মুখে সব অন্ধকার দেখতে শুরু করেছিল সে। হাজার চেষ্টা করেও সামান্য নিঃশ্বাস নিতে ব্যর্থ হয়ে যখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল সে, ঠিক সে-ই মুহূর্তেই ইয়ান তার উপর সদয় হয়। হাত আলগা করে ছেড়ে দেয় দঁড়ির প্যাঁচ। সঙ্গে সঙ্গে জেইলান গলা ধরে কাশতে কাশতে মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ে।
না চাইতেও পানির জন্য ছটফট করছিলো জেইলান। থাকতে না পেরে অস্ফুটে বলেও ছিলো তাকে সামান্য পানি দেওয়ার জন্য। ইয়ান শুনেও ছিল সেই আকুতি। তবে সে সামান্য অগ্রাহ্যও না করে জেইলানের চুলের মুঠি চেপে ধরে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গা হীম করা ভঙ্গিতে হিসহিসিয়ে বলে,
“ তুমি স্বেচ্ছায় আমার হাতে খুন হতে চাইছো। নিজের পরিণতি আমার হাতে সঁপে দিয়েছো। অথচ মানুষ স্বেচ্ছায় যেটা চায় সেটা কখনো শাস্তি হয় না। স্বেচ্ছায় পাওয়া জিনিসটা মানুষের কাছে উপভোগ্য হয়, উপহার তূল্য হয়…
ইয়ান থেমে কিছুটা নিঃশ্বাস নিয়ে ফের বলতে শুরু করে,
“ কি ভেবেছো? ক্ষমা করে দিয়েছি? একই ভুল আবারও করবো ভাবছো? তোমার দূর্ভাগ্য মাহশা। পুরো জীবন তুমি পস্তাবে যে আজকের এই দিনটায়, ঠিক এই জায়গাটায় আমি কেন তোমার প্রাণ নিলাম না। তোমার প্রাণ ভিক্ষা দিচ্ছি আমি। এই মুহূর্তে যদি আমি তোমার প্রাণ নিতাম তবে তুমি মুক্তি পেয়ে যেতে। কিন্তু আমি চাই তোমার শাস্তি দীর্ঘস্থায়ী হোক। এটাই তোমার জন্য আমার দেওয়া সবথেকে বড়ো শাস্তি। পুরো জীবন অনুতাপে পুড়বে তুমি। না স্বস্তি নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে, না স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে গ্রহণ করতে পারবে। “
জেইলান নীরবে শুনে সবটা। সামান্য হাসেও সে। তার পিছনে উপস্থিত এই ব্যক্তিটা বোকা এন্ড্রু নয়। এ যেনো নতুন এক ব্যক্তি। কাউন্ট ইয়ান আলবার্ট! যার সিদ্ধান্তে কোনো দূর্বলতার ছোঁয়া নেই। শক্ত ইমারতের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ঘৃণার পিছনে নিজের দূর্বলতাকে ঢাকা দিয়েছে কাউন্ট৷
জেইলান প্রতিবাদ করে না সামান্য। এটা সত্য যে সে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডই চাচ্ছিলো। কিন্তু ইয়ানের কথাও মিথ্যা নয়। মৃত্যুটা আসলে কোনো শাস্তি নয় বরং অনেকটা মুক্তির মাধ্যম তার জন্য। বেশি কষ্টকর তো পুরো জীবন এই আত্মগ্লানি টেনে বেঁচে থাকা। তবে শাস্তি ভোগ করার জন্য জেইলান ইয়ানের সিদ্ধান্তটা মেনে নিলো৷ কেবল মৃদু স্বরে বলে,
“ আমি জেইলান, মাহশা নই। “
ইয়ান শুনে, তবে কোনো প্রতুত্তর করে না। সে নীরবে জেইলানের চুলের মুঠি ছেড়ে দেয়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দু কদম পিছিয়ে যেতেই সে অনুভব করে পেটের সেলাইয়ের জায়গাটা খুব ব্যথা করছে। বোধহয় এখনো জায়গাটা কাঁচা রয়ে যাওয়ায় অল্পতেই ব্যথা করছে। প্রাসাদে ফিরে চিকিৎসকে তলব করতে হবে একবার।
জেইলান নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করে ইয়ানের দিকে ঘুরে তাকাতেই ইয়ান বলে,
“ রাজ্যে ফিরে যাবে তুমি। আমি প্রধান সেনাপতিকে বলে দিচ্ছি। কালকেই তোমার ফেরার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। “
জেইলানকে কিছুটা বিস্মিত দেখালো। সে ভেবেছিলো ইয়ানের দেওয়া প্রাণ ভিক্ষার অর্থ বোধহয় পুরো জীবন জীবিত তবে বন্দী থাকা। কিন্তু ইয়ান যে তাকে নিজ রাজ্যে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিবে এটা জেইলানের কল্পনাতিত ছিলো। জেইলান বিস্মিত স্বরেই বলে,
“ সত্যি? “
ইয়ান রাগী স্বরে বলে,
“ তোমার সঙ্গে আমার ঠাট্টার সম্পর্ক নেই। “
জেইলানের এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। সে নিজের রাজ্যে ফিরে যেতে পারবে? তার পিতাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাবে সে? নিজের মাতৃভূমিতে ফিরতে পারার সৌভাগ্য হলো তার? জেইলানের না চাইতেও ঠোঁটের কোণে মিহি হাসি ফুটে উঠে। ইয়ান লক্ষ্য করে তা। হাহ! রাজ্যে ফিরতে পারার খুশিতে, বোকা মেয়েটা উপলব্ধি করতে পারছে না যে এটা কোনো খুশির বিষয় নয়। বরং জেইলানের সবথেকে বড়ো বদনসিবই হতে চলেছে এটা।
__________
জঙ্গলের পথ ধরে ঘোড়ার পিঠে করে বাসকোভ প্রাসাদের দিকে এগোচ্ছে প্রধান সেনাপতি। তার সঙ্গে আরেকটা ঘোড়ায় ক্যামেলিয়াও রয়েছে। এতো রাতে করে ক্যামেলিয়া প্রাসাদে ফিরতে চায় বলার পর, কাউন্টই কেভকে আদেশ দিয়েছে যেনো ক্যামেলিয়াকে নিরাপদে পৌঁছে দিয়ে আসে। সেই আদেশ পালন করতে এবং নিজ ইচ্ছাতেই কেভ ক্যামেলিয়ার সঙ্গে এসেছে।
পুরোটা পথ দু'জন নীরবেই কাটিয়েছে। কিন্তু কেভের এই নীরবতা অসহ্যকর লাগছে। প্রাসাদের অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছাতেই কেভ ঘোড়ার লাগাম ধরে টেনে ঘোড়াকে থামায়। ক্যামেলিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। কেভ ঘোড়া ছেড়ে নেমে বলে,
“ কাছাকাছি এসে পড়েছি। অসুবিধা না হলে, বাকিটা পথ হেঁটে যেতে পারি। “
ক্যামেলিয়া কিছুক্ষণ দেখে কেভকে। সে অসম্মতি জানায় না। নিজেও নীরবে ঘোড়া থামিয়ে নেমে পড়ে। ঘোড়ার লাগাম এক হাতে ধরে রেখে দু'জনেই পাশাপাশি নীরবে হেঁটে চলেছে। মৃদুমন্দ বাতাস বৈছে চারিপাশে। নীরবতা ভেঙে কেভই প্রথমে বলে,
“ আমি মিছেমিছি চুমু খাই নি। “
ক্যামেলিয়া হাঁটতে হাঁটতে সরু চোখে কেভের পানে তাকিয়ে বলে,
“ তাহলে? “
“ সত্যি, সত্যিই খেয়েছি। “
ক্যামেলিয়া হাই তুলতে তুলতে ছোট্ট করে বলে,
“ ওহ! “
কেভের এই উপেক্ষা সহ্য হয় না। সে আবারও বলে,
“ তুমি কিছু বলবে না? “
ক্যামেলিয়া না বুঝার ভান করে বলে,
“ আমার কি কিছু বলার কথা আছে নাকি? “
কেভ বুঝতে পারে ক্যামেলিয়া ইচ্ছাকৃত ভাবেই তার সঙ্গে এমন আচরণ করছে। হয়তো কেভ নিজ থেকে স্পষ্ট কোনো স্বীকারোক্তি দেক, এটাই সে চায়। কেভ তাই আর দেরি না করে ক্যামেলিয়ার এক হাত ধরে তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে,
“ তোমাকে দেখলে আমার গলা শুকিয়ে যায়, মাথা ঘুরায়। মাঝেমধ্যে কথায়ও তালগোল পাকিয়ে যায়। কিন্তু এসব কিছু আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই হয়। “
ক্যামেলিয়া ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ কেভের পানে তাকিয়ে থাকে। এরকম অদ্ভুৎ স্বীকারোক্তি সে কক্ষনো শুনে নি। না চাইতেও সে হাসিতে ফেটে পড়ে। কেভ বুঝে উঠতে পারে না ক্যামেলিয়া এভাবে হাসছে কেন? সে তো নিজের মনের কথাটাই বললো। হাসতে হাসতে ক্যামেলিয়া কেভের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে নেয়। ঠিক এমন সময়ই তার চোখ গিয়ে স্থির হয় কেভের পিছনে কিছুটা দূরে থাকা বাসকোভ প্রাসাদের দিকে। কেমন অদ্ভুৎ আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে প্রাসাদ থেকে। ঘটনা কি? কীসের আলো এটা? কী হচ্ছে প্রাসাদে?
ক্যামেলিয়া কি যেনো একটা ভাবে। সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আতংকিত দেখায়৷ কেভের প্রেম নিবেদনের জবাব দেওয়ার ফুরসত নেই তার হাতে। সে ঝড়ের বেগে ছুটে প্রাসাদের দিকে যায়। কেভ চমকে ক্যামেলিয়াকে অনুসরণ করে পিছনে ফিরে তাকায়। হালকা লাল রঙের বিচ্ছুরিত আলো দেখে সে-ও অবাক হয়। এসব কি হচ্ছে? ঠিক সে-ই মুহূর্তেই প্রকৃতি ধীরে ধীরে আঁধারে তলিয়ে যায়। আকাশের মস্তো বড়ো চাঁদটা আড়াল হয়ে যায় মেঘেদের পিছনে। চন্দ্রগ্রহণের মাহেন্দ্রক্ষণ শুরু হওয়ার পূর্বেই যেনো চাঁদ নিজেকে লুকিয়ে নিলো।
__________
একটা দীর্ঘ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে প্রাসাদে ফিরে এসেছে নাওমি। বেশ রাত হয়ে গিয়েছে। প্রাসাদের সকলে বোধহয় ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। তবে নাওমি জানে এভাবে না বলে কয়ে প্রাসাদের বাহিরে যাওয়ার দায়ে আগামীকাল তাকে সবার সম্মুখীন হতে হবে। তবে কালকের ঝামেলা কাল মেটানো যাবে। আজ রাতটা না-হয় একটু বিশ্রাম নেওয়া যাক।
নিঃশব্দে নিজ কামরায় প্রবেশ করে পায়ের জুতা জোড়া খুলতে নিয়েই চমকে যায় নাওমি। ভূত দেখার মতো এক প্রকার চমকে উঠে সে। তার কক্ষের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষালি অবয়বটা যে তার ভাইয়ের সেটা চিনতে খুব একটা অসুবিধা হয় না তার। নাওমি বিস্মিত হয়। ভাই তো সাধারণত তার কক্ষে আসে না কখনো। তাহলে আজ এতো রাতে?
নাওমি কিছুটা রয়েসয়ে ডাকে,
“ ভাই? “
ইয়ান নাওমির দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে ছিল। নাওমির ডাক শুনেও সে পিছনে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন মনে করে না। জানালার বাহিরের দিকে
দৃষ্টি স্থির রেখেই থমথমে স্বরে প্রশ্ন করে,
“ তোমার পরিচয় কি? “
নাওমিকে অপ্রস্তুত দেখায়। এটা কি ধরনের প্রশ্ন? ভাই হঠাৎ এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো কেনো? নাওমি বলে,
“ তুমি কি মজা করতে এসেছো, ভাই? “
“ কাউন্ট ইয়ান আলবার্টের বোন তুমি। এ-ই রাজ্যের প্রিন্সেস। অথচ নিজের সম্মান নিলামে তুলে একজন কয়েদীর সঙ্গে গোপনে দেখা করতে যাওয়াটা কি শোভা পায় তোমার সঙ্গে? “
এবার নাওমি বুঝতে পারে আসল ঘটনা। নিশ্চিত ওই প্রহরীগুলোকে কেভকে এ-ই ব্যাপারে জানিয়েছে। কেভও দৌড়ে এসে কাউন্টের কানে অভিযোগ তুলে দিয়েছে। অসহ্যকর একটা! নাওমি লুকানোর চেষ্টা না করে সরাসরি বলে,
“ ওহ, তাহলে তোমার কাছে খবর পৌঁছে গিয়েছে! “
ইয়ান এবার ঘুরে নাওমির দিকে তাকায়। ক্ষিপ্র তার দৃষ্টি। নাওমি কিছুটা ভড়কায়। ইয়ান বলে উঠে,
“ তোমার সামনে তোমার ভাই দাঁড়িয়ে নেই। এ-ই রাজ্যের কাউন্ট হিসেবে প্রশ্ন করছি। নিজের এই কাজের কৈফিয়ত দাও এ-ই মুহূর্তে! “
বেহজাদের প্রতি মনে পুষে রাখা নাওমির চাপা রাগটা এই মুহূর্তে বেরিয়ে এলো। সে কিছুটা তেজ নিয়ে বলে,
“ কয়েদীর সঙ্গে তো তুমিও দেখা করে এসেছো ভাই। আমি রাজমাতার কাছে এখন নালিশ করি? তুমি বরং উনার কাছে কৈফিয়ত দিও। “
ইয়ানের রাগ হুরহুর করে বেড়ে যায়। সে ত্রস্ত পায়ে নাওমির দিকে এগিয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠে,
“ আমি কাউকে কোনো ধরনের কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই। “
“ তাহলে একজন প্রিন্সেস হিসেবে আমিও কাউকে নিজের কাজের কৈফিয়ত দিতে আগ্রহী নই। “
“ তুমি একটা পুরুষের সঙ্গে একা কক্ষে বসে কি আলাপ করছিলে তা অবশ্যই আমার জানতে হবে। ওই লোকটা একজন প্রতারক। মাহশার ভাই হয় ও। “
“ আমি জানি, ও ও-ই ছলনাময়ীর ভাই। আমি এটাও জানি ও-ই মেয়েটার আসল নাম জেইলান। তুরস্কের রাজকুমারী সে এবং বেহজাদ হলো যুবরাজ। “
ইয়ান এ-ই পর্যায়ে অবাক না হয়ে পারলো না। সে প্রশ্ন করে,
“ তুই কীভাবে জানিস? “
“ আমি কীভাবে জানি সেটা তো গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, তোমার এবং ও-ই মেয়ের মাঝে কি চলছে? কেন গিয়েছিলে তুমি ওখানে? ও-ই মেয়ে জাদু জানে নিশ্চিত। জাদু করে তোমাকে বশ করে আবার তোমার পিঠে ছুরি চালাবে। “
ইয়ান গর্জে জবাব দেয়,
“ একদম বাজে বকবি না। ওর এবং আমার মাঝে কিচ্ছু নেই। কিচ্ছু না। ওকে আর সুযোগ দিবো না আমি। নিজের রাজ্যে ফিরে যাচ্ছে ও আগামীকাল। “
ইয়ানের কথা শুনে নাওমি যেনো আকাশ থেকে পড়ে। সে অবিশ্বাস্য স্বরে প্রশ্ন করে,
“ তুমি ও-ই মেয়েটাকে ক্ষমা করে দিয়েছো? কিভাবে পারলে, ভাই? ও তোমাকে খুন করার চেষ্টা করেছে! তোমার উচিত ওর ভাইকে যেতে দিয়ে ওকে বন্দী করে রাখা। মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ওর। “
ইয়ান প্রশ্ন করে,
“ ওর ভাইকে যেতে দিয়ে ওকে বন্দী করে রাখবো কেন? “
নাওমি যেনো নিজেই নিজের কথাতে ফেঁসে যায়। সে তাড়াতাড়ি ব্যাখ্যা করে বলে,
“ ওর ভাই হত্যাচেষ্টা করে নি। ওর ভাই ওর মতো নিষ্ঠুরও নয়। তুষ দূর্গে যখন জেইলান আমাকে আঘাত করেছিল, তখন ওর ভাই আমার প্রতি সদয় আচরণ করেছে। “
ইয়ান কপালে ভাজ নিয়ে তাকিয়ে থাকে নাওমির পানে। কিছু একটা আন্দাজ করতে পারে সে। মুহূর্তেই তার রাগের পারদ এক লাফে বেড়ে যায়। সকল কিছু বিবেচনা করে তৎক্ষণাৎ সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। নাওমিকে আর কিচ্ছু না বলে সে চোখের পলকে কামরা থেকে প্রস্থান করে। নাওমি বোকার মতো আপন জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে সে। কি করবে? ভাইয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে চুপ থাকবে? নাকি রাজমাতাকে গিয়ে ভাইয়ের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানাবে? নাওমি চায় জেইলানের সাজা হোক। কিন্তু সে-ই সাজার ব্যবস্থা করতে গিয়ে যদি বেহজাদকে নিজের প্রাণ হারাতে হয়? মনের সঙ্গে দীর্ঘ বাকবিতন্ডার শেষে নাওমি সিদ্ধান্ত নেয় সে কাউকে কিচ্ছু বলবে না। ও-ই মেয়ের প্রাণ ভিক্ষা পাওয়ার উছিলায় যদি বেহজাদ নিজের রাজ্যে ফেরার সুযোগ পায়, তবে তা-ই সই।
চলবে…