#গোধূলির_রক্তিম_শিখা
#লেখনীতে_পরিনিতা
ফুল জড়বস্তুর ন্যায় এক ধ্যানে তাকিয়েই রইলো। সমস্ত জগৎ যেনো তার কাছে তুচ্ছতাচ্ছিল্য লাগছে।
আহসান পাটোয়ারী তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটির হাত ধরে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। জামেলা বেগম (আহসানের মা) মেয়েটার ঘোমটা তুললেন। সাথে সাথে নিশির হাসোজ্জল মুখটা প্রকট হলো।
লাল রঙা শাড়িতে নতুন বউয়ের মতো লজ্জা পাচ্ছে সে।
ফুল দেখলো সবটা। ইতিমধ্যে মেহেরুন (বড় ভাবি) ও এসে দাঁড়ালো হতভম্ব হয়ে। তিনি পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন সিড়ির ওপাশটায় দাড়ানো ফুলের দিকে।
সুরেশ আজ এ বাড়িতেই ছিলো, তার মা ও ছিলো সাথে। মিলাদের পর তারা যায়নি এ বাড়ি থেকে, ক'দিন বেড়াবে তারা।
ফুলের মাথার উপর থেকে ঘোমটাটা কখন সরে গেলো ফুল টের ও পেলো না।
মেহেরুন আলতো কন্ঠে উচ্চারণ করলো,
" ফুল"
মেহেরুন দৃষ্টিকে অনুসরণ করে সবাই তাকালো সেদিকে। এদিকে, ফুল শুধু দেখলো আহসান পাটোয়ারীকে, যিনি কি না ফুলের উপস্থিতি টের পেয়ে আরও শক্ত করে নিশির হাতটা ধরে রেখেছেন।
ফুল সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। আজ প্রকাশ্যে সবার নজরে এলো ফুল। মুখে নেই তার আজ কোন ঘোমটা।
সুরেশ অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে উপরের সিড়িঁর দিকে,
এ যেনো আসমানের চাঁদ জমিনে নামছে তার মনে হচ্ছে।
চুলের গোছা দেখে যেনো মনে হচ্ছে কোন এক শান্ত নদীতে কি সুনিপুণভাবে ঢেউ খেলছে।
খয়েরী রঙা শাড়ি মেয়েটার পড়নে। দুধে-আলতা গায়ের রঙ একেবারে।
সুরেশের মা আড়চোখে তাকালেন ছেলের দিকে, দেখলেন তার ছেলে হা করে তাকিয়ে আছে এ মেয়ে মানুষটার দিকে। তিনি বেশ বিরক্ত ছেলের এসব কাজে। বিড়বিড় করে ছেলেকে বললেন,
" সুরেশ? কি হচ্ছে টা কি?"
মায়ের কথায় সুরেশের ধ্যান ভাঙলো। কিন্তু নজর সরালো না।
আহসান পাটোয়ারীর দিকে একবার তাকিয়ে আবারও ফুলের দিকে তাকিয়ে সুরেশ মনে মনে বললো,
" এই আসমানের চাঁদেরে ও কেউ ঠকায়? আহসান ভাইয়া হিরার খনি রেখে কেমনে কয়লার কাছে গেলো?"
ফুল সিড়ি বেয়ে নেমে মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো আহসান পাটোয়ারীর। আড়চোখে দেখলো আহসান পাটোয়ারীর ধরে রাখা নিশির হাতের দিকে। ফুলের বুকে এক অদৃশ্য ব্যাথা হাসফাস করতে লাগলো। মনে হচ্ছে কেউ তার গলা চেপে ধরেছে কথা আসতেই চাচ্ছে না তার ভেতর থেকে।
প্রায় মিনিট তিনেক পর ফুল আহসান পাটোয়ারীর দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো,
" বিয়ে করেছেন আপনি? "
আহসান পাটোয়ারী সাথে সাথে ই উত্তর দিলো,
" করেছি।"
ফুল দু কদম পিছিয়ে গিয়ে বললো,
" কি সহজসরল স্বীকারোক্তি আপনার। আমি তো আপনার ঘরের বউ ছিলাম, আমার মাঝে কি এমন কমতি ছিলো যা আপনার দ্বিতীয় বিবাহ করতে হলো?"
আহসান পাটোয়ারী কেমন করে কন্ঠে ঘৃণার সহিত বললেন,
" তুই আমার ঘরের কামের বেডি হওয়ার ও যোগ্য না।"
ফুল: আমি তো যোগ্য হতে চাই ও নি। আপনি জোর করে আনলেন আমাকে। তাহলে আজ কেনো ঘরে অন্য নারী আনলেন? প্রথম স্ত্রী'র সম্মতি না থাকলে পরের বিয়ে বাতিল হইয়া যায় আপনে কি জানেন না?
ফুলের কথার মাঝেই নিশি আহসানকে বললো,
" আমি ঘরে সতীন চাই না। নাহলে এক টাকা ও পাবে না তুমি আহসান।"
ফুল নিশিকে উদ্দেশ্য করে বললো,
" আমি ওনার বউ, সতীন হইয়া তো তুমি আইছো।"
নিশি তেতে উঠে বললো,
" তুমি বেহায়া মেয়ে মানুষ চুপ কইরা থাহো। কোন মুখে তুমি বউ বউ কইরা চিল্লাও? ভালোবাসার? তোমার জামাই যদি তোমারে ভালো ই বাসতো তাইলে দ্বিতীয় বিয়ে করতো না। সে আমারে ভালোবাসে।"
ফুল যেনো একেবারে ই চুপ হয়ে গেলো। মোটকথা তার কথা ফুরিয়েছে। কি অসহায়ত্ব আজ তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। চুপচাপ তাকিয়ে রইলো আহসান পাটোয়ারীর দিকে।
জামেলা বেগম মিষ্টি এনে, ছেলেকে আর নিশিকে খাওয়ালেন। সুরেশ আর তার মা'কে ও দিলেন। সবাই বেশ খুশি ই আহসানের দ্বিতীয় বিয়ে করায়। খুশি হওয়ার ই কথা। নিশির বাবার ধনসম্পদের অভাব নেই। রূপ ধুয়ে কি পানি খাবে নাকি?
জামেলা বেগম নিশির হাত ধরে বললেন,
" চলো ঘরে চলো বউ।"
কিন্তু নিশি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। এরপর আহসান পাটোয়ারীর দিকে তাকিয়ে বললো,
" আমি কোন সতীনের ঘর করতে পারুম না। আমার থেকে কিছু পাইতে হইলে তোমার বউরে ত্যাগ করতে হবে। আমি নাহলে পিছন ফিরে ই এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যামু।"
ফুল আহসান পাটোয়ারীর সামনে এগিয়ে এসে ওর হাত ধরে বললো,
" আমি আপনার সংসারের এক কোণায় পড়ে থাকতে......"
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই আহসান পাটোয়ারী বললো,
" তালাক।"
ফুল আহসানের হাতটা ছেড়ে দিলো। এবার আর চোখের পানি পড়লো না। ফুল তাকালো আহসান পাটোয়ারীর চোখের দিকে।
আহসান পাটোয়ারী ও ফুলের দিকে তাকিয়ে ই বললো,
" আমি আহসান পাটোয়ারী সজ্ঞানে ফুলকে তাকাল দিলাম।
তালাক
তালাক
তালাক।"
নিশি মিটমিট করে হাসছে।
ফুল নিঃশব্দে হাসলো। কেমন যেনো দেখালো এ হাসিটা। মেহেরুন এসে ফুলের হাত ধরলো। ফুল মেহেরুন দিকে তাকিয়ে আবারও তেমন করে হাসলো।
আহসান পাটোয়ারী বুক ফুলিয়ে বীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
এ বাড়ির বউয়ের একটা ঐতিহ্যবাহী আংটি ছিলো। যা চার পুরুষ ধরে চলমান। সে আংটিটা ফুলের হাতে ছিলো মেহেরুন নিজে ফুলকে সেটা পড়িয়ে দিয়েছিলেন। নিশি এগিয়ে এসে এক টানে সে আংটিটা ফুলের ডান হাতের অনামিকা থেকে নিয়ে নিলো। নিজেই নিজের হাতে পড়ে নিলো।
ফুলকে উদ্দেশ্য করে বললো,
" তুমি এখন এ বাড়ির কেউ না। কিছুতেই তোমার আর অধিকার নেই। একটা সুতাতেও অধিকার নেই তোমার। "
ফুল আড়চোখে তাকালো আহসান পাটোয়ারীর দিকে। এতে ফুল নিজের উপর ই যেনো নিজে বিরক্ত। যে পুরুষ তাকে ত্যাগ করে দিলো অন্য কারোর জন্য তার উপর কি আশা রাখছে সে?
এসব ভাবনার মাঝেই নিশি ফুলের আঁচল টেনে ধরলো। মেহেরুন এসে নিশির সে হাতের উপর হাত রেখে বললো ,
"কেমন তরা মাইয়া মানুষ তুমি? মাইয়া হইয়া আরেক মাইয়ার আঁচল ধরো?"
নিশি সে কথায় না দিয়ে বললো,,
" এ শাড়ি আমার জামাইর টাকায় কেনা। এ ফকি*ন্নির বাচ্চার কোন অধিকার নেই তা পরিধান করার।"
বলেই আবার আঁচল টান দিতেই ফুল আহসান পাটোয়ারীর দিকে তাকিয়েই নিশির হাত থেকে নিজের আঁচল টা সরালো।
ধাক্কা দিয়ে নিশিকে ফেলে দিলো। আহসান পাটোয়ারী তাড়াহুড়ো করে এসে নিশিকে টেনে তুললো। এরপর দাঁত মুখ খিচিয়ে ফুলকে তেড়ে আসতে নিলেই,,
"ঠাসসসসসসস....."
আহসান পাটোয়ারী গালে হাত দিয়ে তাকালো তার সামনে থাকা নারীটির দিকে। এ নারীটিকে সে এত সময় কোমল, স্নিগ্ধ, বেশ শান্তশিষ্ট হিসেবে ই দেখেছে। যে মেয়েকে হাজার মারলেও টু শব্দটাও করতো না কখনও। আজ সে মেয়েই কি না তার গায়ে হাত তুললো? আবার দিব্যি চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে।
ফুল একদলা থুতু ছুড়লো আহসান পাটোয়ারীর দিকে। আহসান পাটোয়ারীর বুক বরাবর সে থুতু পড়লো।
ফুল আজ তার কোমল কন্ঠে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
" আমার সামনে কেউ আমার আঁচল ধরে টানলো। আপনি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তা দেখলেন। অথচ দু'দিন আগেও আমার ঘরে অন্য কেউ গিয়া আমারে দেখছিলো কি না তা নিয়ে কত সর্তকতা আপনের। আরে পরনারীর ও তো কেউ না কেউ ইজ্জত রক্ষা করতে আগাইা যায় আর সে জায়গায় আপনে তো আমারে নিয়া এতদিন সংসার ও করছেন। উল্টে তার হয়ে আমাকে মারতে আসলেন? এ কেমন বিচার জমিদার সাহেব। লানত এমন বিচারের উপর। আপনি একজন কাপুরুষের চেয়েও অধম। চিহ।"
ফুল কিছুক্ষণ দম নিয়ে আবারও বললো,
" আপনার সুখের জন্য আমারে ছাড়লেন তো? যান আপনার সুখ যেনো চিরস্থায়ী হোক দোয়া রইলো আমার। কারণ আমাদের সম্পর্কে এমনিতেও কোনদিন ভালোবাসা বলতে কিছু ছিলো না। চোখের ভালো লাগার লোলুপে আমি এতদিন এ সংসারে ছিলাম। আমি অভিশাপ দেবো না, যান সুখে থাকেন। কিন্তু প্রকৃতি কিন্তু নিজের প্রতিশোধ নিজে নিয়ে নেয় মনে রাখবেন।"
আহসান পাটোয়ারী দাঁত মুখ খিচিয়ে ফুলের চুলের মুঠি ধরে বললো,
" ফকি*ন্নির জাত চটাংচটাং করছ, এত সাহস কোত্থেকে এলো?"
ফুলের চুলের মুঠি আহসানের থেকে ছাড়িয়ে ফের ওর গালে আরেকটা থাপ্পড় দিয়ে বললো,
" আমি কোনকালেই অবুঝ ছিলাম না। আপনি স্বামী বলে সব সহ্য করে নিতাম। কারণ, শরিয়তে স্বামীর অধিকার রয়েছে শাসন করার, আমি ভাবতাম শাসন ই তো করছেন এ আর এমন কি। একদম আমার উপর অধিকার খাটাতে আসবেন না আর। আপনি আমার জন্য এখন হারাম। হারাম জিনিসে আমার আবার আপনার মতো রুচি আসে না।"
ফুল ঘাড় ঘুরিয়ে মেহেরুনের দিকে তাকিয়ে বললো,
" দু গ্রাম পেরিয়ে বড়খালের মাঠের শেষে আমার বাড়ি, তোমার জন্য আমার ঘরের দরজা সবসময় খোলা ভাবি। এসো কোনদিন। ভালো থেকো।"
মেহেরুন আটকালো না ফুলকে। এ যন্ত্রণা থেকে মেয়েটা যে নিস্তার পেয়েছে তাতে কেনো যেনো তার ভালো লাগাও কাজ করলো।
ফুল খোঁপা করে নিলো। ঘোমটা মাথায় তুললো আবার। ভোরের আলো চারেদিকে ফুটেছে। বের হলো এ বাড়ি থেকে। পেছন ফিরে তাকালো না একটি বারের জন্য ও।
সুরেশ ফুলের পেছন পেছন যেতে নিলেই ওর মা ওর হাত ধরে বললো,
" অনেক কষ্টে এ আপদ ঘাড় থেকে সরাইছে আবার তুই এত উতলা হচ্ছিস ক্যান?"
_______
ফারবিন বেগম নামাজ পড়ে উঠান ঝাড়ু দিচ্ছিলেন। হাড়িতে ভাত চাপাবেন এখন। করিম আলী খেয়ে বের হবেন কাজে ফয়সাল ও।
ফারবিন ঝাড়ু দিতে দিতে দেখছেন, কেউ একজন আইল বেয়ে হেঁটে হেঁটে এদিকটায় আসছে। দূর থেকে ই দেখা যাচ্ছে।
বাড়ির সামনের মাঠটা বেশ বড় চারগ্রাম মিলিয়েও এতবড় মাঠ নেই।
ফারবিন বেগম (ফুলের মা) ঝাড়ু হাতে নিয়েই তাকিয়েই রইলেন সেদিকে। কেনো জানি চেনা চেনা মনে হলো তার। কিন্তু নিজের মনের ভুল ধারণা মনে করে আবারও কাজে মন দিলেন ভদ্রমহিলা। এবার খুব কাছ থেকে দেখতে পেলেন তিনি। এক দৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে রইলো।
বাড়ির চারপাশটায় বাশের বেড়া দেওয়া।
ইতিমধ্যে ফুল এসে দাঁড়ালো সে বেড়ার মুখের সামনে যেদিকে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।
ফারবিন বেগমের হাত থেকে ঝাড়ু পড়ে গেলো। ভদ্রমহিলা যেনো মিনিট দুয়েকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
ফুল মায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
" আম্মা।"
ফারবিন বেগম মেয়ের ডাকে ধ্যান থেকে বের হয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে চিৎকার করে বললো,
" ও ফুলের বাপ। আম্নের ফুলে আইছে। দেইখা যান। ও ফুলের বাপ।"
বলেই ফারবিন বেগম মেয়েরে আগলে ধরলেন। ভদ্রমহিলা হাউমাউ কাঁদলেন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। বসে গেলেন মাটিতেই মেয়েকে নিয়ে। যেনো বুকের মধ্যে মেয়েকে নিয়ে নিবেন। বহুবছর পর আদরের নারী ছেঁড়া ধনকে জড়িয়ে ধরেছেন তিনি। ফুল ও যেনো লুকিয়ে থাকতে চাইলো। যেমন করে ছোট বাচ্চা ভুতের ভয়ে তার মা'য়ের কাছে এসে লুকিয়ে থাকে তেমন করে।
করিম আলী এলেন দৌড়ে স্ত্রীর আওয়াজ শুনে। এসে দেখলেন ফারবিন বেগম শাড়ি পড়া কাউকে জড়িয়ে ধরে বসে কাঁদছেন।
করিম আলী হতভম্ব হয়ে বসলেন পাশেই। ফারবিন বেগমের চোখের দিকে তাকালো ফারবিন বেগম ইশারায় স্বায় দিলেন।
ফারবিন বেগমের থেকে ফুলকে করিম আলী নিজের দিকে ফেরালেন।
ফয়সাল ও পাশে এসে দাড়িয়েছে। তার আপুকে সে-ও দেখলো।
ফুলের ঠোঁটের দিকটায় কেটে রক্ত শুকিয়ে রয়েছে। হাতে রক্ত জমানো সারা অংশ জুড়ে যতটুকু দৃশ্যমান। ধপধপে সাদা চামড়ায় কি ভয়ংকর লাগছে এ দাগগুলো।
করিম আলী মেয়ের চোখের দিকে তাকালো। চোখের নিচতায় কালি পড়ে গিয়েছে যেনো কতশত রাত ঘুমায় নি।
করিম আলী মেয়ের হাতগুলো ধরে ঝরঝর করে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললো,
" আম্মা ও আমার আম্মা। তোমারে মারছে আবার আম্মা? কি করছে রে আমার আম্মারে, আল্লাহ কেমনে পারলা এইডা হইতে দিতে। আম্মা ও আম্মা।"
ফুলের চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। ফুল একহাতে তার আম্মার হাতটা নিয়ে আরেক হাতে তার আব্বার হাত একসাথে করে বললো,
" আমারে তোমগো কাছে ঠাঁই দিবা? জানো আমারে ওরা ছুঁড়ে ফালাইয়া দিলো তাগো ঘরে নতুন বউ ও উঠলো। আমার জায়গা নাই আর। দিবা ঠাঁই আব্বা?(করিম আলীর দিকে তাকিয়ে বললো ফুল)
করিম আলী সাথে সাথে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে মেয়েকে আগলে নিয়ে বললো,
" আল্লাহ এইডা কি কইলো রে আমার আম্মায়। আমার আম্মার লাইগা তো আমার জানটাও হাজির। কি রে কইলো। ঠাঁই দিতাম না মানে? তোমারে কলিজায় ভিত্তে রাখমু আম্মা। "
ফয়সাল দূরে দাঁড়িয়ে কাদঁছিলো। ফুল হাত দিয়ে ইশারা করতেই ফয়সাল তার আব্বার পাশে বসে আলতো হাতে তার আপুকে জড়িয়ে ধরলো। আর বললো,
" আপু মেলা দিন হইছ একলগে বইয়া ভাত খাই না। খাইবা আপু?"
এ কথায় যেনো ফুল আরও হুহু করে কেঁদে উঠলো,,
________
এদিকে,,
প্রেমা আজ সকালে স্কুলে গিয়েছিলো। অনিক ঘুম থেকে উঠে বেশ দেরি করে। প্রায় নয়টার দিকে। উঠানের এ পাশে বসে সে রোদ পোহাচ্ছিলো। শীত পড়া শুরু হয়েছে একটু একটু করে।
অনিক হটাৎ খেয়াল করলো প্রেমা বাড়িতে ঢুকছে। তা-ও আবার চোখে হাত দিয়ে। অনিক আরও একটু খেয়াল করতেই দেখলো প্রেমা কাঁদছে। অনিক উঠে হেঁটে গেলো প্রেমাদের ঘরের দিকে।
প্রেমার রুমের দরজা বন্ধ। অনিক কয়বার ধাক্কা দেওয়ার পর ও দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। প্রেমার মা ফাইমা বেগম থালাবাসন ধোঁয়ার জন্য পুকুরে গিয়েছেন তাই দেখতে পেলেন না এসব কিছু ই। পুকুরটা বাড়ির পেছন দিকে। ওখানে তেমন আওয়াজ শোনা যায় হা।
অনিক শেষ একবার জোরে ধাক্কা দিয়ে বললো,
" তুই দরজা খুলবি নাকি আমি দরজা ভাঙ্গবো? "
অনিকের ধমক শুনে প্রেমা দরজা খুলে দিলো। মেয়েটার চোখ লাল হয়ে আছে।
অনিক ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
" কি হয়েছে?"
প্রেমা চুপ করে রইলো মাথানিচু করে। আর কাঁদতে লাগলো।
অনিক আরেকটা ধমক দিয়ে বললো,
"বলবি কি না?"
প্রেমা অনিকের দিকে তাকিয়ে,
" মেম্বারের পোলায় হাসেম আছে না? ক'দিন ধরেই আমাকে বিরক্ত করছিলো। আজ আমি একাই মিরা বাড়ির বাগানের পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম।আজ ওখানে হাসেম আমাকে প্রেম নিবেদন করায় আমি প্রত্যাখ্যান করাতে আমার ওড়না ধরে টেনেছে। রাস্তার সবাই দেখেছে। ওর সাথে থাক ছেলেরা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ ও করেছে।"
অনিক দাঁত মুখ খিচিয়ে প্রেমাকে বললো,
" চল।"
প্রেমা অনিকের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
অনিক প্রেমার সম্মতির অপেক্ষা না করেই হাত ধরে টানতে টানতে প্রেমাকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেলো।
চলবে....