#শুধু_বলো_ভালোবাসি
#মুহসানাত_নুসাইবা
২৫.
"উজান ভাই আসবে না?"
হায়াত কৌতূহলী দৃষ্টিতে সুমাইয়াকে জিজ্ঞেস করলো।
সুমাইয়া ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বললো,
"না আপু, ভাইয়া তো আসতে পারবে না। কি সমস্যা হয়েছিলো জানেনই তো আপনি।"
হায়াতের মুখমণ্ডলে সাথে সাথেই হতাশার ছাপ ফুটে উঠলো। নিঃশ্বাস ফেলে সে বললো,
"ওহ আচ্ছা বুঝেছি। কিন্তু উজান এমন কাজ করতে গেলো কেনো? হঠাৎ এভাবে ওই ছেলেটাকে মারলো কেনো?"
সুমাইয়া নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকালো,
"সেটা তো আমি জানি না। ভাইয়া কাউকেই বলেনি এই ব্যাপারে। একমাত্র ভাইয়াই বলতে পারবে।"
ওইসময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন হামিদা। হায়াত খুশি হয়ে ডেকে উঠলো,
"আসসালামু আলাইকুম আন্টি। ভালো আছেন?"
হায়াতের ডাকে থেমে দাঁড়ালেন হামিদা। স্নিগ্ধ হাসি ছড়িয়ে জবাব দিলেন,
"ওয়া আলাইকুমুস সালাম মা। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?"
"জ্বী, ভালো আছি।"
"খেয়েছো তুমি?"
"হ্যাঁ আন্টি, খেয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে যাবো।"
অবাক হয়ে বললেন হামিদা,
"ওমা, এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে কেনো?"
হায়াত সামান্য হাসি দিয়ে জবাব দিলো,
"আসলে বাবার কিছু কাজ আছে, তাই তাড়াহুড়ো করতে হচ্ছে।"
হামিদা সস্নেহে মাথা নেড়ে বললেন,
"তাহলে তোমার বাবাকে বলো চলে যেতে। তুমি আমাদের সাথে থেকে যাও। আমাদের বাড়িতে চলো বেরিয়ে আসবে দুইদিন, কেমন?"
হায়াত ইতস্তত করে বললো,
"না আন্টি, বাবা থাকতে দেবেন না।"
হামিদা হেসে জোর দিলেন,
"আরেহ আমি আর তোমার আঙ্কেল বললে তোমার বাবা রাজি হয়ে যাবেন। তুমি এসো, ভালো লাগবে।"
বাহ্যিকভাবে হায়াত মাথা নেড়ে অস্বীকৃতি জানালেও ভেতরে ভেতরে আনন্দে ভরে উঠলো। অন্যদিকে সুমাইয়া মুখ ভার করে তাকিয়ে আছে হামিদার দিকে। মনে মনে বিড়বিড় করছে,
"ইনি তো দেখি সেধে সেধে নিজের ছেলের সংসারে আগুন ধরাতে চাইছেন!"
হামিদা চলে গেলে হায়াত আবার জানতে চাইলো,
"আচ্ছা, রুহানী কোথায়? ওকেও তো দেখছি না।"
সুমাইয়া যেনো এতোক্ষনে একটা মোক্ষম সুযোগ পেলো। ঠোঁটে শয়তানি হাসি টেনে বললো,
"রুহানীও আসেনি আপু। ওর স্বামী আসেনি বলে সেও আসেনি। স্বামী ভক্ত বউ কি না!"
হায়াত বিস্ময়ে চমকে উঠলো,
"কি বলো! রুহানীর বিয়ে হয়ে গেছে?"
সুমাইয়া অবাক হওয়ার ভান ধরলো,
"হ্যাঁ তো! কেনো, আপনি জানতেন না?"
"না, একেবারেই জানতাম না তো। ওর স্বামী কি করে? আজ আসেনি কেনো?"
সুমাইয়া এবার কথাটা ঘুরিয়ে বললো, সে হায়াতের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য মরিয়া হয়ে আছে।
"আপনি ওর স্বামীকে ভালো করেই চেনেন।"
হায়াতের বিস্ময় দ্বিগুণ হয়ে গেলো,
"কি বলো! আমি ওর হাজবেন্ডকে চিনি? কে সে?"
সুমাইয়া এবার হেসে বললো,
"আরেহ, ওর স্বামী তো উজান ভাই। ওদের প্রেমের বিয়ে হয়েছে।"
মুহূর্তেই হায়াতের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। চারপাশ যেনো কেঁপে উঠলো। স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো সুমাইয়ার দিকে। বিশ্বাস করতে পারছিলো না সে। সুমাইয়া মনে মনে দম ফাটা হেসে নিলো। বেচারা হায়াত।
হায়াত কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
"তুমি মজা করছো, তাই না?"
সুমাইয়া ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিলো,
"মজা করবো কেনো? ওদের বিয়ে হয়েছে প্রায় সাত মাস হলো।"
হায়াতের বুকের ভেতর যেনো বজ্রাঘাত হলো। ভেঙে পড়লো তার ভেতরের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা। সে জানতো না উজান বিবাহিত। পরক্ষণে আবার ভাবলো, সো হোয়াট?
____
রাত প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। এমন সময় নিচে গাড়ির শব্দে টের পাওয়া গেলো, বউ নিয়ে সকলে এসে গেছে। গাড়ির আওয়াজ কানে যেতেই রুহানী তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা উজানকে ডেকে উঠলো,
"উজান ভাই?"
উজান রুহানীর গলার কাছে মুখ গুঁজে আছে। আমোদে রুহানী গলায় নাক ঘষে নরম গলায় ডাকে সাড়া দিয়ে শুধু অস্পষ্ট একটা আওয়াজ করলো,
"হুম।"
রুহানী কুকরে উঠলো। ফিসফিস করে বললো,
"সবাই চলে এসেছে।"
গলায় মুখ রেখেই উজান আবারো অস্পষ্ট স্বরে উত্তর দিলো,
"হুম।"
রুহানী তাড়াহুড়ো করে বললো,
"ছাড়েন, নিচে যেতে হবে।"
"না।"
চমকে গিয়ে রুহানী কপাল কুঁচকালো,
"আরে কি বলেন এগুলো! ছাড়েন উজান ভাই, উঠবো আমি।"
হঠাৎ করেই উজান রুহানীর উপর শরীরটা চাপিয়ে দিলো। এক হাত দিয়ে রুহানীর মুখ শক্ত করে চেপে ধরলো। হিসহিসে বলে উঠলো,
"আরেকবার ভাই ডাকলে দাঁত ভেঙে দিবো।"
মুখ চেপে ধরে থাকায় রুহানী কিছুই বলতে পারলো না। তার বুকের উপর পুরোটা ভর ছেড়ে পরে আছে উজান। সে নড়াচড়াও করতে পারছে না। চোখ বড়ো করে তাকিয়ে রইলো।
উজানের দৃষ্টি এবার গিয়ে আটকালো রুহানীর ফুলে ওঠা ঠোঁটে। মুখ চাপা থাকার কারণে ঠোঁটগুলো আরও লালচে, আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। উজান বাঁকা হাসলো। তারপর কোনো সতর্কতা ছাড়াই রুহানীর ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে দিলো।
রুহানী অবাক হয়ে ছটফট করতে লাগলো। উজানের হাত তার খোলা কোমরে শক্ত করে আটকে আছে। একফোঁটাও সরতে পারছে না। কিছুক্ষণ পর উজান ঠোঁট ছাড়লো, তারপর গভীর দৃষ্টিতে তাকালো রুহানীর চোখে। রুহানীর ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো উজানের দিকে।
উজান ভ্রু নাচিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তারপর ধীরে ঝুঁকে এসে এবার আলতো করে ঠোঁটে চুমু খেলো। এক মুহূর্ত পর আবারো ঠোঁট ছেড়ে তাকালো রুহানীর দিকে।
রুহানী কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই উজান আবারো ঝুঁকে তার ঠোঁট দখল করে নিলো। এবার আর ছাড়লো না। দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখলো সেই চুমু। রুহানীর বুক ওঠা-নামা শুরু হলো, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসতে লাগলো। দম বন্ধ হয়ে আসতেই সে ছটফট করে উঠলো। তখন উজান ঠোঁট ছেড়ে দিলো।
ছাড়া পেয়ে রুহানী হাঁপাতে হাঁপাতে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। মুখ লালচে হয়ে উঠেছে, চোখে পানি জমে গেছে। ঠিক তখনই উজান আবার ঝুঁকে আসতে চাইলো। কিন্তু রুহানী দ্রুত দুই ঠোঁট চেপে ধরলো, একটার উপর একটা রেখে শক্ত করে বন্ধ করে রাখলো।
তার এই কান্ডে উজান হো হো করে হেসে উঠলো। হাসির শব্দে ঘর ভরে গেলো। রুহানী অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। উজানের হাসি দেখা মানেই যেন আকাশ থেকে চাঁদ নামিয়ে হাতে পাওয়া।
এদিকে নিচে ইতিমধ্যে হইচই শুরু হয়ে গেছে। রুহানী এবার জোরে ধমক দিয়ে বললো,
"আরেহ বাবা! ছাড়েন না । সবাই চলে এসেছে। ওখানে না গেলে সবাই কি ভাববে?"
উজান কিছুক্ষণ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। তারপর ছেড়ে দিলো। রুহানী ছাড়া পেতেই দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। জামাকাপড় ঠিক করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে দিলো রুহানী। উজানের ঘর থেকেও বের হওয়া নিষেধ। কিছুদিন কারো সামনে যাওয়া নিষেধ। যেহেতু বাড়িতে মেহেমানে ভরা তাই তার ঘর থেকেও বের হওয়া নিষেধ। আগামীকাল সব অতিথিরা চলে যাবে ততক্ষণ ঘরেই থাকতে হবে তার।
____
নিচে নেমে হায়াতকে এ বাড়িতে দেখে রুহানীর অবাক হলো। সুমাইয়ার থেকে সব শুনে তার শাশুড়ীর উপরে রাগ হলো।
আয়েশাকে রুমে দেওয়া হয়েছে। যে যার ঘরে চলে গিয়েছে। হায়াতকে গেস্ট রুমে থাকতে দেওয়া হলো। হামিদা আসার সময় রুহানী আর উজানের জন্য খাবার নিয়ে এসেছিলো। রুহানী সব খাবার গুছিয়ে ঘরে নিয়ে আসলো। উজানের সামনে একে একে সব খাবার সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলো। রোস্ট, কোরমা, বিফ কাবাব, চিংড়ি ভুনা আরো কিছু পদ আছে। রুহানী উজানের সামনে বসেছে। প্রথমে উজানে প্লেটে ভাত উঠিয়ে দিলো। তরকারি দিতে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"প্রথমে কি খাবেন?"
"তোকে..."
রুহানী বড়ো বড়ো চোখ করে তাকালো।
উজান ভ্রু কুঁচকে। দাঁতেদাঁত চেপে বললো,
"তোকে দিতে বলেছি আমি? নিজের কাজ নিজে কর। আমি আমারটা নিয়ে নিতে পারবো।"
রুহানী নিজের প্লেটে মনোযোগ দিলো। সে কি ভুল শুনেছে? নাকি পুরোটুকু না শুনেই বেশি ভাবছে।
হঠাৎ রুহানী বললো,
"উজান ভাই, আপনি না কেমন যেনো হয়ে গিয়েছেন।"
উজান তাকালো তার দিকে।
"কেমন হয়ে গিয়েছি?"
"কেমন জানি। ঠোঁট কাটা টাইপের। আগে তো এমন ছিলেন না। আগে তো চোখ তুলেও তাকাতেন না।"
"আগে আমার বউ ছিলি তুই?"
রুহানী বলদের মতো দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে বললো,
"না।"
"তাহলে? বলদি বউ আর বোনের ভেতরে পার্থক্য আছে না?"
রুহানী আবার উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।
___
অভ্র ঘরে পা রাখতেই যেনো এক প্রশান্তির ঢেউ বয়ে গেলো সারা দেহে। ফুলে ভরা বিছানার মাঝে আয়েশা বড়ো ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। এটা তার বউ! প্রানের বউ! সখের বউ!
বুকের ভেতর অজানা কাঁপন ছড়িয়ে যাচ্ছিলো।
সে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগোতে লাগলো। প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হচ্ছিলো, সে যেনো কোনো এক অজানা, জাদুমাখা জগতে প্রবেশ করছে। আয়েশার দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই ঠোঁট থেকে সুর ভেসে এলো,
"এসেছি তোর মনেরই দেশে, আমি এক মুসাফির বেশে।
দে না ঠাঁই একটু হেঁসে, ভালোবেসে..."
সুরে ভেসে ওঠা সেই কথাগুলো যেনো ঘরের চারদেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। আয়েশা ঘোমটার আড়ালে সামান্য কেঁপে উঠলো।
অভ্র কাছে গিয়ে বিছানায় বসল। আয়েশার আঙুলগুলো কাঁপতে কাঁপতে আঁচল মুঠোয় চেপে আছে।
অভ্র সেদিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে উঠলো,
"আজ তোমাকে কে বাঁচাবে, সুন্দরী?"
চলবে....