ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের অমল কাব্য (সিজন-২)

১২তম পর্ব

লেখক: DRM Shohag

সন্ধ্যার পর পর,

শুদ্ধ মাইরাকে মাইরার হোস্টেলে রেখে ফাইজদের বাড়িতে এসেছে।

ফাইজের মা শুদ্ধের সামনে বেশ কয়েক প্রকার নাস্তা রেখেছে। শুদ্ধ অল্প কিছু খেয়ে ডাইনিং-এর সোফায় বসে ফোনে ব্যস্ত। ফাইজ ভেতরে গিয়েছে।

ফারাহ্ গলায় ওড়না ঝুলিয়ে তার ঘর থেকে বের হতে গিয়েও শুদ্ধকে দেখে দ্রুত দরজার আড়ালে চলে যায়। দরজার ফাঁক দিয়ে শুদ্ধের দিকে তাকায়। শুদ্ধের পরনে সাদা শার্ট, ক্রিম কালার গ্যাবার্ডিন প্যান্ট। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করা। চুলগুলো খুব সুন্দর গুছানো। গায়ের রঙ কিছুটা চাপা। হাইট তার ভাইয়ের সমান মনে হয়, তার ভাই ৬ ফুট, তার মানে শুদ্ধ-ও ৬ ফুট। ফারাহ্ শুদ্ধের মাথা থেকে পা পর্যন্ত অবলোকন করে বিড়বিড় করল,

'কি সুন্দর!'

শুদ্ধ হঠাৎ মাথা উঁচু করে এদিক-ওদিক তাকালে তার নজরে আসে ফারাহের চোরা দৃষ্টি। শুদ্ধ সাথে সাথে ফারাহের থেকে চোখ সরিয়ে নেয়, যেন ফারাহ বুঝতে না পারে সে ফারাহকে দেখে ফেলেছে।

শুদ্ধ চোখ সরিয়ে নিয়ে মনে মনে হাসলো। ফারাহ তাকে এভাবে দেখায় শুদ্ধের মনে অদ্ভুত এক ভালো লাগায় ছেয়ে যায়। পছন্দের মানুষ তাকেই লুকিয়ে দেখছে, ব্যাপারটি ভাবলেই মনটা নেচে ওঠে। শুদ্ধের তো মনের সাথে সাথে নিজের-ও নাচতে ইচ্ছে করছে।

ফাইজকে আসতে দেখে শুদ্ধ সোফায় গা এলিয়ে দেয়। ফারাহ, ফাইজ দু'ভাইবোনকে একটু জ্বালাতে মনে মনে হেসে বলে,

'ফাইজ, তোর বোনের জন্য জামাই খুঁজে পেয়েছি।'

ফাইজ শুদ্ধের পাশে বসতে বসতে বলে,

'ডিটেইলস বল।'

শুদ্ধ মিটিমিটি হেসে গলা ঝেড়ে বেসুরা গলায় গায়,

'ছেলে কিন্তু বড্ড কালো, নাম যে তার কালুয়া!

কাজু বাদাম দিলে ভালো লাগে হালুয়া!

আর সরকারি চাকরি থাকলে যতই হোক না কালুয়া!'

এটুকু গেয়ে হাসতে হাসতে বলে,

'তোর বোনের মনের কথা বলে দিলাম। কি রে! ছেলে পছন্দ হলো? সরকারি চাকরি আছে কিন্তু।'

ফাইজ বিরক্ত চোখে তাকায় শুদ্ধের দিকে।

ফারাহ বিস্ময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে শুদ্ধের দিকে। প্রথমে ভেবেছিল, শুদ্ধ সত্যি সত্যিই হয়ত তার জন্য ছেলে দেখেছে। সীতাকুণ্ড থেকে ফেরার দিন শুদ্ধ বলেছিল, তার জন্য ছেলে দেখবে। এরপর আবার জিজ্ঞেস করল, ঘরজামাই থাকলে সে বিয়ে করবে কি-না! ফারাহ রাজি ছিল। এখন রাজি নয় তেমন নয়। কিন্তু তার কেন যেন সবসময় শুদ্ধকে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে। সীতাকুণ্ড যাওয়ার দিন থেকে এখন পর্যন্ত শুদ্ধকে মাথা থেকে বের-ই করতে পারছে না। শুদ্ধকে বিয়ে, কথাটা ভাবতেই ফারাহ নিজেই নিজের দু'গালে দু'টো থা'প্প'ড় দিল। একে তো শুদ্ধ তার স্যার, আরেকটা হলো শুদ্ধ তার ভাইয়ের বন্ধু। না না, এসব নিয়ে ভাবা যাবে না। আপাতত এসব ভাবনা চাপা দিল।

শুদ্ধের প্রথম কথা সিরিয়াস মনে হলেও, এখন বুঝেছে শুদ্ধ মজা করেছে। ফারাহর মাথায় একটা দু'ষ্টু বুদ্ধি এসেছে।

গ্রাম থেকে ফারাহর এক চাচাতো ছোট ভাই এসেছে। বয়স আট বছর। গুলতি নিয়ে ফারাহর বিছানার উপর বসে আছে ছেলেটি। ফারাহ এগিয়ে গিয়ে তার ভাইয়ের থেকে গুলতি সহ দু'টো পাথর নিয়ে দরজার সামনে গিয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়ায়। গ্রামে গেলে টুকটাক তার ভাইদের থেকে নিয়ে এই গুলতি ছুঁড়তো।

ফারাহ একবার ভাবলো শুদ্ধ তার স্যার, এই ভেবে একটু পিছিয়ে আসল, তবে নিজেকে বোঝালো, সে আড়াল থেকে কাজটি করবে। শুদ্ধ তো আর তাকে দেখবে না। অতঃপর আবার-ও এগিয়ে এসে ভালোভাবে নিজেকে আড়াল করে দাঁড়ায়।

শুদ্ধের দিকে গুলতি তাক করে খুব সূক্ষ্মভাবে দু'টো পাথর ছুড়ে মারলে। ফারাহর নিশানা অনুযায়ী পাথর দু'টো একদম শুদ্ধের বুকে গিয়ে লাগে।

শুদ্ধ বুকের পাশে হাত দিয়ে মৃদু চেঁচিয়ে ওঠে,

'আহ!'

শুদ্ধ সাথে সাথে ফারাহর দরজার দিকে তাকালে দেখল ফারাহ হাসছে। ফারাহ শুদ্ধকে তার দিকে তাকাতে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকায়।

চোখেমুখে ভীতি ভর করে। এক সেকেন্ড-ও সময় নষ্ট না করে ফারাহ ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দেয়। ফারাহর কান্ড দেখে শুদ্ধের ব্যথাতুর মুখে হাসি ফোটে।

পাশ থেকে ফাইজ শুদ্ধের দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে,

'কি হলো? চেঁচালি কেন?'

শুদ্ধ ফাইজের দিকে তাকায়। বুকের পাশে ডান হাতে বুলাতে বুলাতে বলে,

'মারাত্মক জায়গায় ব্যথা পেলাম ইয়ার! এই ব্যথা নিরাময়ের ঔষধ মনে হচ্ছে এক আ'গুন সুন্দরী ধানিলঙ্কা!'

ফাইজ চোখ ছোট ছোট করে বলে,

'মেয়েটি কে?'

শুদ্ধ সোজা হয়ে বসে, ফাইজের উদ্দেশ্যে সিরিয়াস হয়ে বলে,

'লিটল কুইন কে?'

ফাইজ থতমত খেয়ে তাকায়। শুদ্ধ মিটিমিটি হেসে ভ্রু নাচায়। ফাইজ মুখ ফিরিয়ে নেয়।

শুদ্ধ মৃদু হাসলো। সে সব জানে। তবুও এই ফাইজ এড়িয়ে যায়। অবশ্য তার ভালোই লাগে।

এখন তো ফাইজের বোন ছাড়া কিছুই ভালো লাগছে না। কথাটা ভেবে শুদ্ধ হতাশ হলো। এই মেয়ে তো মারাত্মক জ্বালায়! আবার-ও সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে মনে মনে আওড়ায়,

'সুন্দরী! এতো জ্বালিয়ো না। নইলে কিন্তু পস্তাতে হবে!'

পরদিন সকাল সকাল মাইরা ভার্সিটি এসেছে। গতকাল ইরফানদের বাড়ি থেকে ফেরার সময় শুদ্ধ তাকে বার্ডফ্লাওয়ারের ছয়টি চারা দিয়েছে। যদিও শুদ্ধ বলেছিল, এগুলো না-কি ইরফান নিজেই তাকে দিয়েছে। কিন্তু মাইরা এক কান দিয়ে ঢুকিয়েছে, আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছে। ইরফান তাকে একটি চারা-ই দিল না, আর ছয়টা দিবে? এটা সম্ভব? মাইরা নিজের চোখে দেখলেও বিশ্বাস করবে না। ইরফানের মতো খ'বি'শ লোক সে আর জীবনে দেখেনি। মাইরা ভেবেছে, শুদ্ধ ইরফান আর তার সম্পর্ক ঠিক করার জন্য নিজে তাকে এই চারাগুলো দিয়ে ইরফানের নাম দিয়েছে। মাইরা এসব ভাবনা বাদ দিল। সে নিজের জন্য তিনটে চারা রেখে বাকি তিনটে চারা মিলার জন্য এনেছে।

দূরে মিলাকে দেখতে পেয়ে মাইরা মিলার দিকে দৌড়ে মিলার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মিলা বিরক্ত হয়ে বলে,

'তুই কি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারিস না?'

মাইরা পাত্তা না দিয়ে তার হাতের তিনটে চারা মিলার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

'এগুলো নে। ছয়টা চারা পেয়েছিলাম। অর্ধেক তোর, অর্ধেক আমার।'

মিলা ভ্রু কুঁচকে বলে,

'কোথায় পেলি? আর এগুলো কিসের গাছ?'

'শুদ্ধ ভাইয়া দিয়েছে। এই গাছের ফুলের নাম বার্ডফ্লাওয়ার। ফুলগুলো অনেক সুন্দর হয়। দাঁড়া, দেখাচ্ছি।'

কথাটা বলে মাইরা তার ফোন বের করে গুগল থেকে বার্ডফ্লাওয়ারের পিক দেখায় মিলাকে। মিলা অবাক হয়ে বলে,

'সুন্দর তো!'

মাইরা হেসে বলে,

'হ্যাঁ, আমার-ও খুব ভালো লেগেছে। দেখতে একদম পাখির মতো।'

একটি ক্লাস শেষে মাইরা আর আছে। ভার্সিটির মাঠের কোণায় বসে

সীতাকুণ্ড যাওয়ার দেড় মাস আগে মাইরাদের ১ম সেমিস্টার পরীক্ষা হয়েছিল। আজ রেজাল্ট দিয়েছে। রেজাল্ট পেয়ে মাইরা মনমরা হয়ে বসে আছে। তার ইংলিশ সাবজেক্টে ফেইল এসেছে। মাইরা কিছুতেই বুঝতে পারছে না, সে যত-ই খারাপ পরীক্ষা দিক, তাই বলে ফেইল করবে? আবার রিটেক দিতে হবে তাকে। মাইরার কান্না পাচ্ছে। মিলার রেজাল্ট ভালো, মাইরার এক্সাম দিয়ে মনে হয়েছিল সে অনেক ভালো করবে। অথচ হয়েছে তার উল্টো। মিলা মাইরাকে ঠেলে বলে,

'মন খারাপ করছিস কেন? আবার রিটেক দিবি।'

মাইরা মিলার দিকে চেয়ে রেগে বলে,

'খারাপ পরীক্ষা দিলে রিটেক দিতাম। ভালো পরীক্ষা দিয়ে রিটেক দিব কেন?'

মিলা কোমরে হাত দিয়ে বলে,

'তো যা, ইরফান স্যারের কাছে গিয়ে বল, সে তোকে কেন ফেইল করিয়ে দিল!'

মিলার কথাটা শুনে মাইরার হঠাৎ মাথায় কিছু আসে। অতঃপর বলে,

'আমাদের ইংলিশ খাতা তো ইরফাইন্না স্যার দেখেছে তাই না রে?'

'ইংলিশের টিচার ইরফান স্যার, তো খাতা সে না দেখে কি মঙ্গল গ্রহের স্যার দেখবে?'

মাইরা মাথায় হাত দিয়ে বলে,

'আমার সাড়ে সর্বনাশ হয়ে গেল রে মিলা। আমি সিওর ইরফাইন্না স্যার ইচ্ছা করে আমাকে ফেইল করিয়ে দিয়েছে। কি খারাপ একবার ভাব!'

মিলা ভাবুক হয়ে বলল,

'তাই বলে তোকে ফেইল করিয়ে দিবে?'

মাইরা ব্যাগ নিয়ে মাঠ থেকে উঠে মিলাকে টানে ইরফানের অফিসরুমে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মিলাকে তুলতে পারলো না। ওমন রামধমক খাওয়ার শখ নেই। আরেকবার এক্সাম দিলে কি হবে?

মাইরার কথা সে কেন এক পরীক্ষা বার বার দিবে। যদি পরীক্ষা খারাপ হত, ফেইল হওয়ার মতো পরীক্ষা হত, তবুও মাইরা মানত। কিন্তু সে অনেক ভালো পরীক্ষা দিয়েছে। সেখানে ফেইল কিভাবে মানবে? কিছুতেই আবার পরীক্ষা দিবে না সে। এই ইরফাইন্না স্যারের একটা বিহীত করবে সে। মিলাকে রাজি করাতে না পেরে একাই পথ ধরল মাইরা।

ইরফানের অফিস রুমের সামনে এসে মাইরা দাঁড়িয়ে আছে। ভয় লাগছে ভেতরে যেতে। কয়টা যে ধমক খেতে হবে, নয়তো থা'প্প'ড়-ই খেতে হয়। এ পর্যন্ত অনেকগুলো থা'প্প'ড় খেয়ে ফেলেছে। খারাপ লোক একটা। এই ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়াই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। তার জীবনটা পুরো প্যারাময় করে দিয়েছে এই ইরফাইন্না স্যার।

আর আজ তাকে একেবারে ফেইল-ই করিয়ে দিয়েছে। কথাটা ভাবতেই মাইরার ইচ্ছে করল ইরফানকে টাক করিয়ে দিতে।

নিজেকে ঠান্ডা করে দরজা ঠেলে ভেতরে তাকিয়ে দেখল ইরফান দরজার দিকেই চেয়ে আছে। মাইরার সাথে সাথে চোখাচোখি হতেই মাইরা দ্রুত দরজা আটকে দেয়। বুকে থুতু দেয় মেয়েটা। এই লোকটার দৃষ্টি দেখলেই ভয় লাগে।

ইরফান দরজার দিকে চেয়ে বিরক্তি কণ্ঠে আওড়ালো,

'স্টুপিড!'

মাইরা অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো দরজার দিকে। যেভাবে দরজা আটকালো, ইরফান তাকে আবার কাঁচা-ই চিবিয়ে না খায়! নিজেকে সামলে বহুকষ্টে সাহস সঞ্চয় করে। এরপর আবার-ও দরজা ঠেলে মিনমিন করে বলে,

'স্যার, আসব?'

ইরফানের গম্ভীর স্বর ভেসে আসে,

'নো।'

মাইরা অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। পিছন থেকে শুদ্ধ মাইরাকে দেখে বলে,

'আরে মাইরা, তুমি এখানে কি করছ?

মাইরা শুদ্ধের গলা শুনে দ্রুত পিছু ফিরে তাকায়। বলে,

'ভাইয়া, আমি অনেক বড় বিপদে পড়েছি।'

শুদ্ধ চোখ ছোট ছোট করে বলে,

'বিপদটা কি ইরফান রিলেটেড?'

মাইরা মাথা উপর নিচ করে হ্যাঁ বোঝায়। শুদ্ধ মনে মনে হাসে। মাইরাকে ইরফানের কাছাকাছি আনার একটা সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করল না।

অতঃপর বলে,

'তোমার বিপদ তুমি-ই ইরফানকে বলো মাইরা। আমি এসবে নেই। যাও ভেতরে যাও।'

কথাটা বলে শুদ্ধ দরজা ঠেলে খুলে দেয়। মাইরা ঢোক গিলল। ইরফান যে তাকে ভেতরে যেতে নিষেধ করল। সে গেলে আবার কিছু বলবে না? শুদ্ধ বলে,

'মাইরা, ভেতরে যাও। আমি-ও তো তোমার স্যার। পারমিশন দিয়েছি। তুমি যাও।'

শুদ্ধের কথায় মাইরা রুমের ভেতরে প্রবেশ করে। পিছে শুদ্ধও ভেতরে আসে। শুদ্ধ ইরফানের সামনে একটি চেয়ার টেনে বসে। এরপর মাইরার দিকে চেয়ে বলে,

'মাইরা, তোমার প্রবলেম বলে ফেলো।'

ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকায় মাইরার দিকে। মাইরা ইরফানের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে মিনমিন করে বলে,

'স্যার, আমার ইংলিশে ফেইল এসেছে।'

ইরফান গম্ভীর গলায় বলে,

'আই নো।'

মাইরা চোখ ছোট ছোট করে বলে,

'আমি ভালো পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আমার ফেইল হবে না।'

এবার-ও ইরফানের গম্ভীর স্বর,

'আই নো।'

মাইরা অবাক হয়। মানে কি? সে জানে ফেইল করবে না, তাহলে তাকে ফেইল করিয়ে দিয়েছে কেন? কটমট দৃষ্টিতে তাকায় ইরফানের দিকে। ইরফান ততক্ষণে তার কাজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। মাইরা দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

'আপনি ইচ্ছে করে আমাকে ফেইল করিয়ে দিয়েছেন কেন স্যার?'

ইরফান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মাইরার পানে। শক্ত গলায় বলে,

'মাই উইশ!'

মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। কি পরিমাণ খারাপ লোক দেখ, তাকে ফেইল করিয়ে দিয়ে বলছে, মাই উইশ!

শুদ্ধ একবার ইরফানের দিকে তাকায়, আরেকবার মাইরার দিকে তাকায়। মাইরা শুদ্ধের কাছে বিচার দেয়,

'ভাইয়া, দেখুন তো, আপনার ভাই আমাকে পছন্দ করে না বলে ফেইল করিয়ে দিয়েছে, এটা কি ঠিক বলুন!'

শুদ্ধ অবাক হওয়ার ভান করে বলে,

'বর ফেইল করিয়ে দিয়েছে, বউ আমার কাছে বিচার দিচ্ছে! হাউ কিউট!'

শুদ্ধের বর-বউ বলায় মাইরা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। ইরফানের উপর তেমন প্রভাব পড়লো না। বরং সে শক্ত চোখে মাইরার দিকে চেয়ে আছে।

মাইরা নিজেকে সামলে ইরফানের দিকে চেয়ে বলতে নেয়,

'স্যার.....'

ইরফান কড়া ধমক দেয়,

'গেট আউট!'

মাইরার মুখ থমথমে হয়ে যায়। শুদ্ধ মাইরার দিকে চেয়ে বলে,

'গেট আউট শুনে তুমি মন খারাপ কর না মাইরা। ইরফান একদিন বলবে, মাইরা বেইবি কাম কাম। এইতো আমার কোল! আহা! সেদিন বলবে, মাইরা বেইবি কাম কাম। আমি চুটিয়ে ব্যান্ড বাজাবো। ব্যান্ডটা অবশ্যই তোমার বরের টাকায় কিনব।'

ইরফান বিরক্ত চোখে তাকায় শুদ্ধের দিকে। মাইরা ভীষণ লজ্জা পায়। সে আর এখানে দাঁড়ালো না। দ্রুতপায়ে বেরিয়ে যায় অফিসরুম থেকে।

এই শুদ্ধ ভাইয়াটা এতো অদ্ভুত কেন! সে আর ইরফানের সামনে দাঁড়াতেই পারবে না লজ্জায়, আরেকদিকে তার এতো রাগ লাগছে, লোকটা তাকে ইচ্ছে করে ফেইল করিয়ে দিয়েছে। আসলেই জন্তু একটা। আবার তাকে পরীক্ষা দিতে হবে, ভেবেই মাইরার কান্না পায়।

ভার্সিটি শেষে শুদ্ধ অফিসরুম থেকে বেরিয়ে মাঠে আসে। ভার্সিটির গেট দিয়ে বেরিয়ে যেতে গিয়ে ফারাহকে দেখে শুদ্ধর পা থেমে যায়। ফারাহ্ শুদ্ধকে দেখে দৌড় দিয়ে পালাতে চাইছিল, কিন্তু তার আগেই শুদ্ধ দেখে নিয়েছে। ফারাহ্ তবুও দাঁড়াল না। দ্রুত উল্টো ঘুরে দৌড় দিতে নিলে পিছন থেকে শুদ্ধ ডাকে,

ফারাহ্?

ফারাহর আর দৌড়ানো হয় না। আজ সে শেষ। গতকাল শুদ্ধর দিকে গুলতি দিয়ে পাথর মেরেছিল। ভেবেছিল শুদ্ধ তাকে দেখতে পাবে না। কিন্তু তার কপাল খারাপ। শুদ্ধ দেখে নিয়েছে। আজ ভার্সিটিতে এসে এত লুকিয়ে লুকিয়ে থেকেও লাভ হলো না। শেষমেশ শুদ্ধর সামনেই পড়ল। মেয়েটার মুখ কাঁদোকাঁদো হয়ে গিয়েছে।

শুদ্ধ ফারাহর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে,

পালাচ্ছিলে কেন?

ফারাহ্ মিনমিন করে বলে,

পালাচ্ছিলাম না তো স্যার।

শুদ্ধ মনে মনে হাসল। উপর থেকে গম্ভীর গলায় বলে,

গতকাল আমার সাথে বে'আদবি করেছ কেন? আমি যে তোমার স্যার, এটা ভুলে গিয়েছিলে তুমি?

ফারাহ্ ঢোক গিলল। শুদ্ধর দিকে চেয়ে ভীষণ অনুতপ্ত স্বরে বলে,

স্যরি স্যার!

শুদ্ধ গলা ঝেড়ে বলে,

স্যরি বললেই সব সমাধান হয়ে যায়? আমি যে বুকে ব্যথা পেলাম। এখন কী হবে?

শুদ্ধর কথায় ফারাহ্ বোকাচোখে তাকায়। শুদ্ধ আবারও বলে, 'বুকে মালিশ করতে হবে। কিন্তু আমার তো বউ নেই। তাই এই ব্যথা সারছে না। বুঝতে পারছ কত বড় কেলেঙ্কারি করেছ তুমি আমার?'

শুদ্ধের কথা ফারাহ'র মাথার ভেতর দিয়ে গেলেও, কথাগুলোর অর্থ বুঝতে বেগ পেতে হচ্ছে। শুদ্ধ আবারও বলে,

'তোমার জন্য আমি কঠিন পানিশমেন্ট রেডি করছি। ওয়েট!'

ফারাহ্ শুদ্ধের কথাটা শুনে ভীত চোখে তাকায়। অসহায় কণ্ঠে বলে, 'আর কখনো বেয়াদবি করব না স্যার। প্লিজ এবারের মতো ক্ষমা করে দিন। স্যরি স্যার!'

শুদ্ধ মনে মনে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কিন্তু উপরে স্বাভাবিক। গম্ভীর গলায় বলে, 'হবে না। বারবার ক্ষমা পেয়ে তোমার বেয়াদবি করার সাহস বেড়ে যাচ্ছে।'

কথাটা বলে শুদ্ধ উল্টো ঘুরে দ্রুতপায়ে তার গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।

ফারাহ্ অসহায় চোখে চেয়ে রইল। কি পানিশমেন্ট দিবে তাকে? ফারাহ্'র কান্না পাচ্ছে। কোন দুঃখে গতকাল একটু মজা করতে গিয়েছিল? কানে চিমটি দিল আর জীবনে এমন কিছু করবে না। মনে মনে আল্লাহকে ডাকলো, এবারের মতো যেন আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে দেয়।

এতোক্ষণ বহুকষ্টে হাসি আটকে রেখেছিল শুদ্ধ। এবার আর পারলো না।

শব্দহীন হাসতে হাসতে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসে। হঠাৎই শব্দ করে হেসে দেয়। মেয়েটাকে জ্বালিয়ে মারাত্মক শান্তি লাগে। হাসতে হাসতে এক পর্যায়ে শুদ্ধ থামে। সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বিড়বিড় করে, 'ফারাহ্ পাখি, খুব তাড়াতাড়ি আমার বউ হয়ে যাবে তুমি। আর অপেক্ষা সয় না।'

ভার্সিটিতে শুদ্ধ অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হওয়ার পর থেকে তৃণা বেগম শুদ্ধের সাথে শহরে থাকেন। তবে মা-ছেলে গ্রামে যান কিছুদিনের জন্য। দ্ধর ছুটি হলে বা সুযোগ পেলে দুই

পরদিন বিকালে,

শুদ্ধ মাইরাকে তার বাসায় আসতে বলেছে। ভাবলো বাড়িতে আসতে বললে তার মায়ের সাথে-ও দেখা হয়ে যাবে, সাথে ইরফানের সাথেও।

শুদ্ধ ফাইজকে তার বাড়িতে আসতে বলেছে, সাথে ইরফানকেও আসতে বলেছে।

ফাইজ আসার পর থেকে দেখছে শুদ্ধ খাওয়ায় ব্যস্ত। মনে হচ্ছে খাওয়া দেখাতে ডেকেছে। এক পর্যায়ে ফাইজ বিরক্ত হয়ে বলে, 'কেন ডেকেছিস? বল? নয়তো আমি গেলাম।'

শুদ্ধ ফাইজের সামনে রাখা নাস্তা খেতে খেতে বলে, 'আরেকটু দাঁড়া, খাওয়ার সময় এত ডিস্টার্ব করছিস কেন?'

ফাইজ বিরক্তি কণ্ঠে বলে,

'এগুলো তোর মা আমাকে খেতে দিল, সব তো তুই খেয়ে নিলি।'

শুদ্ধ পায়েশের বাটি থেকে লাস্ট চামুচ মুখে নিয়ে বলে,

'তুই খেয়ে আসিসনি?'

ফাইজ রেগে বলে,

'খা বেয়াদব। মেহমানকে আপ্যায়ণ করতেও জানে না।'

শুদ্ধ পাত্তা দিল না। তার মতো খেয়ে পানি খেয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিল। কয়েক মিনিট পর সোজা হয়ে বসে দু'হাতে শার্ট টেনে ঠিক করল। এরপর দু'হাত চুলের ভাঁজে দিয়ে একটু ফিটফাট হওয়ার চেষ্টা চালায়। ফাইজ ভ্রু কুঁচকে বলে,

'সাজছিস কেন?'

শুদ্ধ হেসে বলে,

'আরেকটা সম্মন্ধির সাথে কথা বলব। একটু সাজতে দে। হিংসুটে সম্মন্ধি।'

ফাইজ চোখ ছোট ছোট করে বলে,

'কে তোর সম্মন্ধি?'

শুদ্ধ হেসে বলে,

'তুই।'

'মানে?'

শুদ্ধ এবার সিরিয়াস হয়ে বলে,

'তোর বোনকে লাগবে।'

কথাটা শুনতেই ফাইজ বিস্ময় চোখে তাকায়। শুদ্ধের কথাটা তার ঠিক হজম হচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে রেগে বলে,

'মাথা খারাপ না-কি! দরকার হলে আমার বোনকে চিরকুমারী রাখবো, তাও তোকে দিব না।'

শুদ্ধ মেকি রেগে বলে,

'কেন দিবি না? আমার কি নেই?'

ফাইজ বিরক্ত হয়ে বলে,

'এক বন্ধু হয়ে-ই জ্বালায় বাঁচি না। আবার বোনজামাই হয়ে আমাকে আর আমার বোনটাকে জ্বালিয়ে মারবি?'

শুদ্ধ বিরক্ত হয়ে বলে,

'কিছু করার নেই। তোর বোনকেই লাগবে আমার।'

ফাইজ ভাবলেশহীনভাবে বলে,

'জেগে জেগে স্বপ্ন দেখ। আমি আমার বোনের বিয়ের জন্য পাত্র পেয়ে গেছি।'

শুদ্ধ ফাইজের দিকে কটমট চোখে তাকায়। তার ফারাহ্'কে লাগবে মানে ফারাহ'কেই লাগবে। এই বেয়াদব ইচ্ছে করে তার ভিলেন হচ্ছে। মনে মনে হেসে বিড়বিড় করল,

'আমাকে আরও কবে চিনবি সোনা? তুই তো আমার ফারাহ্ পাখিকে আমার হাতে তুলে দিবি-ই। তোর বাপও আমাকে বাপ বাপ করতে করতে ফারাহ্'কে আমার হাতে তুলে দিবে। শুধু দেখ কি হয়!'

অতঃপর শুদ্ধ সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ডান পা বা পায়ের উপর তুলল। এরপর ফাইজের দিকে চেয়ে হেসে বলে,

'আচ্ছা।'

ফাইজ অবাক হলো। এই ব্যাটা এত সহজে মেনে নিল? ভাবলো শুদ্ধ হয়তো মজা করেছে ফারাহ'কে নিয়ে। সে আর কিছু বলল না। শুদ্ধ ফাইজের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে। ফাইজ ভ্রু কুঁচকে বলে,

'কি প্রবলেম? হাসিস কেন?'

শুদ্ধ পা নাড়াতে নাড়াতে মিটিমিটি হেসে যায়,

'তোকে হেব্বি লাগছে রে!'

এরপর একটু থেমে বলে,

'তোকে বর সাজে দেখার সাধ আমার এ জনমে মিটবে না সোনা।'

ফাইজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো শুদ্ধের দিকে। তবে শুদ্ধের কথা পাত্তা দিল না। এ আজগুবি কথাবার্তা বলতে থাকুক। সে তার বোনকে এই বাঁদরের হাতে কিছুতেই দিবে না।

মাইরা মাত্র এসেছে শুদ্ধদের বাসায়। তৃণা বেগমকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'আম্মাজান কেমন আছো? অনেকদিন পর দেখলাম তোমায়।'

তৃণা বেগম মন খারাপ করে বলে,

'আমাকে তো ভুলে গিয়েছিস। ভার্সিটি শেষে শুদ্ধের সাথে মাঝে মাঝে আসতে পারিস না?'

মাইরা বলে,

'টিউশন থাকে আম্মাজান। সুযোগ পেলে তো আসি।'

তৃণা বেগম মৃদু হাসলো। মেয়েটি দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল। ভদ্রমহিলা মাইরাকে তার ঘরে যেতে বলে তিনি রান্নাঘরের দিকে যান।

মাইরা ঘরের দিকে যেতে নিলে কলিংবেল বেজে উঠে। মাইরা উল্টো ঘুরে এসে দরজা খুলে দেয়। সামনে ইরফানকে দেখে তার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। ইরফান ফোনে মগ্ন ছিল, হঠাৎ মাথা উঁচু করে আবারও মাথা নিচু করে, সামনে পরিচিত কিছু দেখেছে মনে হলো। তড়াক করে আবারও মাথা উঁচু করতেই সামনে ফাঁকা দেখল। ইরফান তীক্ষ্ণ চোখে আশেপাশে চোখ বুলায়। কেউ নেই। তাহলে সে কি ভুল দেখল?

রান্নাঘর থেকে তৃণা বেগম বেরিয়ে এসে দরজায় ইরফানকে দেখে বলেন,

'ইরফান আব্বু, ভেতরে এসো।'

ইরফান চিন্তিত মুখে ভেতরে প্রবেশ করল। মাইরা দরজায় চিপায় রাখা জুতোর রেকের কোণে লুকিয়েছে। বুক ধুকধুক করছে। ইরফান আসবে জানলে সে জীবনেও আসতো না। মাইরার কান্না পায়। তার কোথাও একটু শান্তি নেই, শুধুমাত্র এই লোকটার জন্য।

ইরফান ডাইনিং এর সোফায় বসল। মাইরা উঁকি দিয়ে ইরফানকে ডাইনিং-এ বসতে দেখে অসহায় মুখে তাকালো। সে এখন ঘরে যাবে কিভাবে? ইরফান তাকে দেখে নি না? সে ইরফানের সামনে পড়তে চায় না। লোকটা তাকে দেখলেই এমনভাবে তাকায়, যেন গিলে খাবে। আবার তাকে কারণ ছাড়া ধমকায়, তাকে ফেইল পর্যন্ত করে দিয়েছে। ইরফানকে দেখলেই মাইরার রাগ হয়।

তৃণা বেগম রান্নাঘরের দিকে গেলে মাইরা আবারও উঁকি দিয়ে ইরফানকে দেখল ইরফান কি করছে। ইরফানকে মাথা নিচু করে ফোনে মগ্ন দেখে মাইরা দরজার কোণা থেকে বেরিয়ে আসে।

পা টিপে টিপে শুদ্ধের মায়ের ঘরের দিকে যেতে নেয়, আবারও এক কাহিনী। ইরফান আশেপাশে তাকিয়ে মাথা নিচু করতেই মনে হলো কিছু দেখেছে, দ্রুত চোখ তুলে তাকালে আবারও ফাঁকা দেখে ইরফান হতাশ হলো। এসব কি হচ্ছে তার সাথে। রাগ হচ্ছে তার।

মাইরা ইরফানকে তাকাতে দেখে-ই ঠাস করে সোফায় কোণায় বসে পড়েছে। উঁকি দিয়ে ইরফানের চিন্তিত মুখ দেখে মাইরার হাসি পায়। ইরফানকে ভালোই জব্দ করা যাচ্ছে। ইরফান নিজেকে না আবার পাগল ভেবে বসে। কথাটা ভেবে মাইরা দু'হাতে মুখ চেপে শব্দহীন হাসলো।

ইরফান আশেপাশে তীক্ষ্ণ চোখ বুলায়। এই স্টুপিড গার্ল কোথায়, এটাই ভাবছে সে। সামনে পেলে থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত ফেলবে। দাঁতে দাঁতে চেপে বিড়বিড় করল,

'স্টুপিড গার্ল।'

তখন শুদ্ধ আর ফাইজ ঘর থেকে বেরিয়ে ইরফানকে দেখে শুদ্ধ বলে, 'তুই কখন আসলি?'

ইরফান আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখছে। শুদ্ধের উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বলে,

'ওই স্টুপিড গার্ল এখানে এসেছে তাইনা?'

ইরফানের কথা শুনে শুদ্ধ হেসে বলে,

'মাইরার গন্ধ পেয়ে বুঝে গিয়েছিস সোনা, তাইনা?'

এরপর সুর করে বলে,

'ওমাগো টুরু টান!'

ইরফান শুদ্ধের দিকে বিরক্ত চোখে তাকায়। দাঁত কিড়মিড় করে বলে, 'ওই স্টুপিড গার্ল কোথায়?'

ফাইজ ভ্রু কুঁচকে বলে,

'সেটা আবার কে?'

ইরফান কিছু বলল না। শুদ্ধ ইরফানের পাশে এসে বসে ইরফানের কানের কাছে মুখ নিয়ে মিটিমিটি হেসে বলে,

'বউকে খুব বেশি মনে পড়ছে সোনা?'

ইরফান রেগে বলে,

'সাটআপ। ওকে বের হতে বল।'

শুদ্ধ আশেপাশে তাকিয়ে আওয়াজ করে বলে,

'মাইরা কোথায় তুমি? এসো তো, কে যেন তোমার জন্য ছটফট করছে।'

ফাইজ, ইরফান আর শুদ্ধের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। অবুঝ শিশুর মতো চেয়ে আছে। এই মাইরাটা আবার কে?

তখনই তৃণা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সোফায় কোণায় মাইরাকে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে বলে,

'মাইরা তুই ওই কোণায় বসে কি করছিস?'

মাইরার মুখ কাঁদোকাঁদো হয়ে যায়। সব গেল রে! শুদ্ধের ডাক শুনেও ঘাপটি মেরে বসেছিল। এখন আর উপায় নেই। কিন্তু ইরফান এখন তাকে দেখলে আরও রেগে যাবে তো। সে যে ইরফানকে ঘোল খাওয়ালো দু'বার। এরচেয়ে তো প্রথমে ইরফানের সামনে পড়াই ভালো ছিল। আবারও তৃণা বেগমের ডাকে মাইরা উপায় না পেয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।

ইরফান রেগে তাকায় মাইরার দিকে। এই স্টুপিড তার সাথে বাঁদরামি করছিল! হঠাৎ বসা থেকে দাঁড়িয়ে এক পা এগোলে মাইরা চোখ বড় বড় এক দৌড়ে তৃণা বেগমের ঘরের দিকে যায় আর বলে,

'আম্মাজান বাঁচাও।'

ইরফান দাঁড়িয়ে যায়। শক্ত দৃষ্টি মাইরার পানে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

'স্টুপিড বাঁদর, থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত ফেলব তোমার।'

তৃণা বেগম আর ফাইজ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ইরফানের দিকে। ব্যাপারটা কি হলো? ইরফান মাইরাকে এভাবে বলছে কেন? ফাইজ মাইরাকে চেনে না। কিন্তু ইরফান একটি মেয়েকে এভাবে বলছে? সবচেয়ে বড় কথা কোনো মেয়ের সাথে কথা বলছে, এটাই তো অবাক করার বিষয়।

তৃণা বেগম ইরফানের কান্ডে ভীষণ অবাক হয়। ইরফান মাইরাকে চেনে না-কি? কিন্তু কিভাবে চেনে? ভদ্রমহিলা বুঝতে পারলেন না।

শুদ্ধ ফাইজ আর তার মায়ের অবস্থা দেখে হেসে বলে, 'আরেকটা এটা ইরফানের বউ।'

শুদ্ধের কথায় ইরফান ঝড়ের বেগে এসে শুদ্ধের কলার চেপে ধরে।

ওদিকে তৃণা বেগম আর ফাইজ একসাথে বিস্ময় কণ্ঠে বলে, 'মানে?'

ইরফান শুদ্ধকে টেনে সোফা থেকে দাঁড় করায়। রাগান্বিত স্বরে বলে, 'আইল কিল ইউ।'

শুদ্ধ জিভে কামড় দেয়। ভুল জায়গায় সঠিক কথা বলে ফেলেছে। তবে আপাতত এই ভাবনা রেখে ইরফানের দিকে চেয়ে মেকি হেসে ফিসফিসিয়ে বলে,

'বউটা চলে গেল বলে মন খারাপ করছিস? আহারে! কান্দিস না সোনা।

আমি আবার তোর বউকে দেখানোর ব্যবস্থা করব।'

ইরফান গলা নামিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, 'ওই স্টুপিড গার্ল আমার কেউ না। আন্ডারস্ট্যান্ড?'

কথাটা বলে ইরফান শুদ্ধের কলার ছেড়ে গটগট পায়ে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। ঠান্ডা মেজাজ পুরো গরম করে দিয়েছে স্টুপিডটা।

তৃণা বেগম পিছু ডাকলে ইরফান গম্ভীর গলায় বলে, 'কাজ আছে ফুপি।'

এবার ফাইজ আর তৃণা বেগম জহুরি চোখে তাকায় শুদ্ধের দিকে। শুদ্ধ দু'জনের দৃষ্টি দেখে ঢোক গিলল।

ফাইজ এগিয়ে এসে বলে, 'কি যেন বলছিলি? ক্লিয়ার কর।'

শুদ্ধ একবার ফাইজের দিকে তো আরেকবার তার মায়ের দিকে তাকায়।

অতঃপর মেকি হেসে বলে,

'আরেকটা মাইরা আমার একমাত্র বোন। ফাইজ তোকে বলেছিলাম তো মাইরার কথা। ওই যে আমাদের গ্রামের এক মেয়ে, আমার পাতানো বোন। সেই মেয়েই মাইরা। আর আমার বোন মাইরাকে আমার একমাত্র ভাই ইরফানের জন্য পছন্দ করেছি। ভবিষ্যতে ওরা বর-বউ হলে অনেক কিউট হবে না!'

শুদ্ধের কথা শুনে ফাইজ, তৃণা বেগম বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। তৃণা বেগম বেশি অবাক হয়। মাইরার সাথে ইরফানের বিয়ে, এটা শুদ্ধ কবে ভেবে রেখেছে? সে তো কিছু জানেনা।

ফাইজ শুদ্ধের দিকে চেয়ে রেগে বলে, 'জঘন্যতম বিশ্রী হবে।'

এরপর তৃণা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে,

'আন্টি, তোমার এই বাঁদর ছেলেকে থামতে বলো। এই মেয়ে তো মনে হলো তোমার বাঁদর ছেলের ডুবলিকেট। ইরফানকে তো তুমি চেনো। দুই বিপরীত মেরুর মানুষকে না-কি এ বিয়ে দেয়ার জন্য পছন্দ করেছে!'

তৃণা বেগম ফাইজের কথায় সায় দিয়ে বলে,

'শুদ্ধ, তুই এসব আজাইরা চিন্তাভাবনা কবে থেকে ভাবছিস! এসব আজগুবি ভাবনা বাদ দে। শুধু শুধু ইরফানকে রাগিয়ে দিলি!'

শুদ্ধ অসহায় মুখ করে চেয়ে আছে। বিড়বিড় করল,

'লে হালুয়া! বিয়ে তো ওরাই করে বসে আছে! আর এদিকে কথা শুনছি আমি! মাইরার ইরফাইন্না মাইরার উপর যদি ভুল করে-ও পিছলাস, তখন দেখবি এই শুদ্ধ ভিলেন কি কি করে! বে'দ্দ'প!'

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন