#মনের_রঙে_তুমি
#লেখনীতে:সুমনা সাথী
[১২]
রাতে শোয়ার ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হলো ঝামেলা। রাহেলা আর মতিনের একটাই ঘর। তবে তারা সে ঘরে থাকে না।তারা থাকেন ঘরের পাশের বারান্দার মাথায় বানানো ছোট্ট কামরাটিতে। তাদের একমাত্র মেয়ে ফুলি বিয়ের পর স্বামীর সংসারে। সে যখন আসে তখন ঘরে থাকে। আগে ঘরটি ফাঁকা ছিল এ ক’দিন ধরে আহির থাকছে। নুহা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাহেলাকে অনুরোধ করলো যেহেতু তাদের ঝগড়া চলছে, তাই সে আহিরের সঙ্গে থাকতে চাইনা। কিন্তু রাহেলা মানলেন না। তারমতে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হলে আলাদা থাকাটা সমাধান না বরং দূরত্ব বাড়ায়। স্বামীর মন জেতারও কিছু উপায় ও নুহাকে তিনি বললেন। নুহা মাথা নিচু করে তাঁর কথা শুনলো। কেন শুনলো নিজেই জানে না। ঘরে ফিরে খাটে আধশোয়া হয়ে বসে ফোনটা হাতে নিলো সে। রাত তখন ঠিক দশটা। কিন্তু গ্রামে এ সময়টা মানে গভীর রাত। বিদ্যুৎ থাকলেও ইন্টারনেট নেই । ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করে শেষমেশ হাল ছেড়ে দিলো নুহা। ভাবতে শুরু করলো আহিরের সঙ্গে রাহেলা এবং মতিনের কি সম্পর্ক। এরা যদি আহিরের এত আপনজন হয়, তবে আহিরের দাদার মৃ'ত্যুর সময় আসেনি কেন? এর মাঝে নুহার চিন্তার গভীর তাকে চেপে বসে হেনার মুখটা। মেয়েটি সুন্দর, স্বীকার করতেই হয়। কিন্তু কেন যেন এই সৌন্দর্যই এখন নুহার কাছে অস্বস্তির লাগছে । মনে মনে নিজেকে ধমক দেয় সে। সুন্দর হওয়া কি দোষের? এইসব ভাবনায় ডুবে থাকার মাঝেই হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ে। নুহা চমকে ওঠে। মাথা ঘুরিয়ে দেখে আহির ভিতরে ঢুকছে। নুহার মনে পড়লো তাদের এক ঘরে থাকতে হবে। একটাই তো খাট। সে থাকলে আহির কোথায় থাকবে? মুহূর্তেই মাথায় ঘুরপাক খায় সম্ভাব্য দৃশ্যগুলো। তবে আহির কোনো দ্বিধা ছাড়াই একপাশে মাদুর পেতে নিচে শুতে শুরু করলো। নুহা খানিকটা স্বস্তি পেল। আচমকা আহির নুহার কাছাকাছি এসে তার দিকে ঝুঁকতেই, নুহা হকচকিয়ে দূরে সরে গেল। বলল,
' কি সমস্যা আপনার?!'
আহির বিরক্ত মুখে তাকালো। নুহার পাশ থেকে একটা বালিশ তুলে নিয়ে একবার নুহার সামনে ধরে আবার নিচে রেখে দিলো।কিছুক্ষণ নীরবতা। নুহার মনে মনে অনেক প্রশ্ন ঘুরছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে ও আত্মসম্মানে বাধঁছে তার। শেষমেশ সবকিছু একপাশে রেখে নুহা বলল,
' বলছিলাম, কেউ কি ঘুমিয়ে পড়েছেন? আমার কিছু জানার ছিলো।'
আহির কোনো সাড়া দিলো না। নুহা মুখ বাঁকিয়ে নিজের মনে কি যেন বকতে শুরু করলো। নিচে শুয়ে থাকা আহির চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
' ঘুমিয়ে গেলে জবাব দিতে পারতাম না। কিন্তু ঘুমোতে দিচ্ছে কে। '
নুহা চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল,
' বলছিলাম… আপনি এদের কীভাবে চেনেন? এনারা আপনার কী হয়? আর সবকিছু ছেড়েছুড়ে হঠাৎ এখানে এই গ্রামে আসার ইচ্ছে হলো কেনো?'
আহির কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেল। জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
' আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তখন আমি ইন্টার্নশিপ করছি। ডাক্তারি শেখা শুরু মাত্র। মেডিকেল ক্যাম্পিংয়ের জন্য এই গ্রামে এসেছিলাম। এনারা দাদু-দাদি তখন আমাদের অনেক সাহায্য করেছিলেন। খুব যত্ন করে রেখেছিলেন। এমন আন্তরিক মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। পরে, ডাক্তার হয়ে যাওয়ার পর আবারও এসেছিলাম ক্যাম্পিংয়ে। তখন এই গ্রামে ভয়াবহ বন্যা চলছিল। সেই সময়টাতে দাদু-দাদির সাথে আমার একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই সময়টাতে আমার নিজের ভেতরটা খুব এলোমেলো ছিল। মাথা কাজ করছিল না। মনে হচ্ছিল, পালিয়ে যাই…তখনই হঠাৎ এই শান্ত, সাদামাটা গ্রামের কথা মনে পড়ে। এই নির্ভার পরিবেশটা বেশ মনে ধরেছিলো। শুধু রোশন জানতো আমি এখানে আছি। ওকেও বলেছিলাম কাউকে না জানাতে। কিন্তু শালা বিশ্বাসঘতক। '
নুহা গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল,
' আপনি জানেন, এইসব জানার জন্য আমাকে কত কিছু করতে হয়েছে? অনেক ট্রিক্স খাটাতে হয়েছে। তারপর না কিছু জানতে পেরেছি। আচ্ছা, আর একটা কথা বলবো?'
আহির চোখ মেলে তাকালো,
' কী এমন ট্রিক্স... নিশ্চয়ই ভুলভাল কিছুই। আমি আর কিছু জানতে আগ্রহী না। আমাকে শান্তিতে ঘুমাতে দেওয়া হোক। '
নুহা একটু চুপ থেকে বলল,
' দেখুন, পৃথিবীটা নশ্বর। মানুষ মরনশীল। জন্ম নিলে মরতেই হবে এটাই নিয়ম। ভবিতব্য। আল্লাহ না চাইলে কেউ কাউকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারে না।আপনার দাদুর মৃত্যুতে আপনি নিজেকে দোষ দিচ্ছেন, এটা কি ঠিক? বলুন? আংকেল হয়তো রাগের মাথায় কিছু বলে ফেলেছিলেন, কিন্তু উনি অনুতপ্ত। আমি দেখেছি সেটা।
আপনি ডাক্তার, ঠিক আছে। আপনি চেষ্টা করেন, কিন্তু জীবন-মৃত্যুর মালিক আপনি নন। সবই আল্লাহর হাতে। এটা ভুলে গেলে চলে?'
আহির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
' দাদুর সার্জারিটা আমার জীবনের ষষ্ঠ হার্ট সার্জারি ছিলো। এখনো অব্দি সবগুলোই সফল ছিল।এইটা বাদে।
দাদুর অবস্থা তখন খুবই ক্রিটিকাল। আব্বু ভয় পাচ্ছিলেন যদি সার্জারি হলে দাদু মারা যান। তবে দাদুর যন্ত্রণা, তা সহ্য করা যাচ্ছিল না। উনি নিজেই আমাকে সাহস দিচ্ছিলেন… বলছিলেন, তুই পারবি। আমি নিজেও কনফিডেন্ট ছিলাম। যেহেতু আগেও তো করেছি। বুঝিনি আমি এতটা ইউসলেস। হয়তো ওভার কনফিডেন্ট ছিলাম। জেদ করে দাদুর কথায় ভরসা করে অপারেশনে গেলাম। সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু জানি না কোথায় ভুল হলো… কেন…!'
আহিরের গলা আটকে এলো। বাকিটা আর বলতে পারলো না। চোখের কোণ থেকে পানিটা গড়িয়ে পড়ল। তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে মুছে নিলো। নুহা সব দেখলো, কিন্তু কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চাইল নুহা। অনেকটা কৃত্রিম স্বাভাবিকতায় বলল,
' দেখুন ডাক্তার, এখানে আপনার কোনো দোষ নেই। তাই এই বিষয় কে কেন্দ্র করে ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে এই গ্রামে চাষাবাদ করে বাকি জীবন কাটানোর কোনো মানে দেখছি না। তাছাড়া এই গ্রামে সারাজীবন থাকলে কি আপনার চলবে বলুন? আপনার তো পরিবার আছে ওরা ও অপেক্ষা করছে।এখানে কি পাবেন আপনি? আচ্ছা একটা কথা বলবো?'
আহির কাঁধ ঘুরিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। নিচু গলায় বলল,
"এবার চুপচাপ ঘুমানো হোক। আর আমাকে ও ঘুমাতে দেওয়া হোক। সকাল সাতটাই ট্রেন।'
__________
ভোরের আলো ঘিরে ধরেছে চারপাশে। আকাশের কোণায় নরম কমলা আভা। মেঠো পথের গায়ে শিশির জমে চকচক করছে। ঘাসের ডগায় ছোট ছোট পানিকণা জড়িয়ে আছে মুক্তোর মতো। হালকা কুয়াশার চাদর পেছন থেকে সূর্যটাকে ঢেকে রেখেছে। কেউ কেউ কাঁথা জড়িয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁপছে হালকা কাঁপুনিতে, আবার কেউ হয়তো পুকুর ঘাটে নেমে পড়েছে হাতমুখ ধুতে। শীত সবে সবে পড়ছে তাই ঠান্ডাটা কানের পাশে নিঃশব্দে কাঁপুনি ধরায়। গাছের পাতাগুলো স্থির। দূরে কোথাও এক-আধটা মোরগ ডেকে উঠছে। জানান দিচ্ছে নতুন দিনের সূচনা। নুহার ঘুম ভাঙলো ফোনের এল্যার্মে। ধোঁয়াটে চোখে ফোনটা খুঁজে পেল। বন্ধ করতেই দেখল সময় ছয়টা বাজে। অবাক হলো নুহার মনে আছে সে এল্যার্ম সেট করেনি। কে করল তাহলে? আধা ঘুম-আধা জাগা অবস্থায় উঠে বসতেই কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো বুঝতে সে কোথায় আছে। পাশ ফিরে নিচে তাকাল আহির নেই। ঘরের দরজাটা খোলা। নুহা ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এলো। উঠোন একদম নিস্তব্ধ। রান্নাঘরের চুলা থেকে হালকা ধোঁয়া বেরোচ্ছে, মানে রাহেলা রান্নায় ব্যস্ত। হঠাৎ চোখে পড়লো উঠোনের এক প্রান্তে পুকুরপাড়ে বসে থাকা একজন পুরুষ, নুহার দিকে পিঠ করে। নিঃসন্দেহে আহির। নুহা শব্দহীন পায়ে এগিয়ে গিয়ে তার পেছনে দাঁড়াল। আহির টের পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠ বলল,
' সাতটার ট্রেন। স্টেশন এখান থেকে অনেক দূরে, যেতে সময় লাগবে।'
আহির পা বাড়াতেই নুহা পেছন থেকে ডাক দিল,
' শুনুন না...'
ডাকটার যেন আহিরের স্নায়ু ধরে টান দিল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়ালো। নুহা সরল গলায় প্রশ্ন করল,
' আপনি ও যাবেন তো আমার সাথে?'
' না!'
'কেনো?'
' দেখো ভালো হয় তুমি আমার বা আমার পরিবারের কাউকে নিয়ে না ভাবো। এমনিতে তোমার এখানে আসাটা একদম ঠিক হয়নি। তাও আবার কত মিথ্যা। আমি এমনিতে ঠিক নেই। ভীষন ক্লান্ত আমি। এবার আমাকে মুক্তি দাও, নুহা। তোমাকে সহ্য করা এখন আমার পক্ষে অসম্ভব।'
আহির ফের পা বাড়ালো। নুহা এগিয়ে এসে পথ রোধ করল।
' একটা কথা স্পষ্ট করে বলুন। আপনার এই রূঢ় ব্যবহার, এই বিরক্তি সবকিছুর কারণ কী? আপনি আমার সঙ্গে এমন করছেন কেনো?'
আহির হঠাৎ নুহার বাহু চেপে ধরে, খানিকটা কাছে টেনে নেয়। কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা।
' তুমি জানো না কেন? সিরিয়াসলি, নুহা?'
নুহা চোখ নামায় না। সোজা তাকিয়ে থাকে।
' হেনাকে ভালোবাসেন আপনি? বিয়ে করবেন তাঁকে? এই গ্রামেই থেকে যাবেন?'
আহির মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। নিজেকে সামলে বলে,
' হ্যাঁ, যদি তা-ই হয়েও থাকে, তাতে তোমার কী? আমার অনুভব থাকবে না? কাউকে ভালোবাসার, বিয়ে করার অধিকার নেই আমার?'
নুহার চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। গলা ভারি হয়ে আসে।
' অবশ্যই আছে। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি আপনার পছন্দ কত সহজে বদলে যায়।'
আহির গলা চড়াও হলো,
' তুমি কী ভেবেছিলে? তুমি আমাকে রিজেক্ট করবে, আমি তোমার জন্য আজীবন অপেক্ষা করব? আমি আহির ইবনান মীর! আমি চাইলে তোমার মতো হাজারটা অপশন আসবে! তুমি ছাদে না এসে প্রমাণ করে দিয়েছো তুমি আমাকে চাও না। তোমার প্রতি দুর্বল ছিলাম বলে ভাবলে আমি তোমার আঙুলের ডগায় নাচব?কি ভাবোটা কি তুমি নিজেকে?'
হঠাৎ নুহার মেজাজ খারাপ হলো। সে একহাতে আহিরের শার্টের কলার চেপে ধরলো।
' আমি রিজেক্ট করেছিলাম আপনাকে? কখন বলেছি সেটা? একবারও কি জানতে চেয়েছেন আমি কী চাই? আমি তো শুধু চুপ ছিলাম। সময় নিচ্ছিলাম।এসব কি এতটাই সহজ হ্যাঁ। আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন? আমার সাথে গত ক’দিন যা ব্যবহার করেছেন, একবারও ভেবেছেন আমার কেমন লাগে? আমি কতটা কষ্ট পাই?' ধারণা আছে আপনার এই ক’দিন আপনি হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ায় আমি কেমন পুড়েছি ভিতরে ভিতরে? কেনো আমি ঢাকা থেকে এতদূর ছুটে এসেছি? আমি আপনাকে হ্যাঁ বলিনি ঠিক, কিন্তু না-ও তো বলিনি। আপনি একবারও জানতে চাননি আমার উত্তরটা কী হতে পারতো। অপেক্ষা করতে পারতেন... কিন্তু না! আপনি তো আহির ইবনান মীর, আপনার জন্য তো অপশনের অভাব নেই সেখানে আমি কে? এত সহজে অন্য কারো প্রতি আপনার অনুভব তৈরি হচ্ছে? যদি অনুভব থাকে, তাহলে করুন বিয়ে। ভালো থাকুন। আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু শুনুন, আজকে আমি সেই উত্তরটাই দিচ্ছি যেটা সেদিন ছাদে বলা উচিত ছিল। আমি চাই না এমন একজন স্বার্থপর মানুষকে। আমি চাইনা আপনাকে। রিজেক্ট করছি আপনাকে। ভালোবাসি বললেই না ভালোবাসা হয়ে যায় না। আপনি আমার বিশ্বাস ভেঙেছেন। আমি আজকে এই মুহুর্তে এখান থেকে চলে যাব। '
বলতে বলতে নুহা আহিরের ছেঁড়ে দিলো। আহির নুহার হাতটা ছেড়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,
' তুমি যাবেনা!'
নুহা কিছুটা সরে এসে বলল,
'আমি অবশ্যই যাব।'
নুহা দৌঁড়ে ঘরের দিকে চলে গেলো। আহির থমকে দাঁড়িয়ে থাকলো। কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে যেন। সবকিছু কেমন ভ্রম মনে হচ্ছে তার কাছে। তবে ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোনো একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠলো।
_________
রাহেলা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখলেন নুহা হঠাৎ দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে উল্টো দিক থেকে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল আহির। তিনি একটু দুশ্চিন্তার কণ্ঠে কয়েকবার আহিরকে ডাকলেন৷ আহির কোনো জবাব দিল না। পেছনে না তাকিয়েই দূরে হেঁটে গেল।রাহেলা কিছুক্ষণ হতবাক দাঁড়িয়ে রইলেন।
ঘড়ির কাঁটা তখন বেলাবেলি। দিনের আলো ততক্ষণে রোদের উত্তাপে কিছুটা ঝলকে উঠেছে। বেলা করে বাড়ি ফিরলো আহির। চোখে-মুখে গভীর চিন্তার ছাপ। বাড়ির উঠোনে রাহেলা তখনো কাপড় মেলছেন। তিনি কিছু বলার আগে আহির গা ঝাড়া দিয়ে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর। দরজায় হাত রাখতেই দরজাটা ধাক্কায় খুলে গেল। আর সেখানেই আহির থমকে গেল। ঘরের দেয়ালে লাগানো ছোট আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নুহা। ভেজা চুল থেকে পানির ফোঁটা টুপটাপ করে ঝরছে। শরীরে ছাপা একটা হালকা সুতি শাড়ি। কাঁধের ওপর শাড়ির আঁচলটা ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছে আয়নায় তাকিয়ে। সেই মুহূর্তে নুহার চোখে আয়নায় ধরা পড়ে একজোড়া চেনা চোখ। নুহা চমকে পেছনে তাকানোর আগেই আহির একটু হকচকিয়ে কিছুটা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
' সরি... প্লিজ কন্টিনিউ।'
ফিরতে গিয়েও আহির দাঁড়িয়ে পড়লো দড়িতে টান খাওয়া পুতুলের মতো। চোখ ফেরাতে পারলো না সে। কী এক অদ্ভুত সংবেদন পায়ে চেপে বসেছে তার।বুকের মধ্যে হঠাৎ করে তীব্র এক শব্দ উঠলো।আহিরের নিঃশ্বাস আটকে গেল।চোখ আটকে গেল নুহার আঙুলের হালকা টানানো আঁচলে। গালের পাশে গড়িয়ে পড়া পানির ফোঁটায়। নুহা পেছনে ফিরে তাকাতে পারলো না। বুঝতে পারলো আহির দাঁড়িয়ে আছে। আহির দৃষ্টি সরিয়ে নিলো অপ্রস্তুত মুখে।দ্রুত পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। নুহা পিছন ফিরে তাকালো না। শুধু চলে যাওয়ার শব্দটা শুনে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
বাহিরে এসে আহির বারান্দার এককোনে ধপ করে বসে পড়লো। জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। দম বন্ধ লাগছে তার। রাহেলা অবাক চোখে আহিররে দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
' কি হয়ছে দাদু, ওমন করো কেনো? শরীর খারাপ লাগেনি?'
আহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
' বুকটা কেমন ধকধক করছে আমার মনে হয় অ্যাটাক-ফ্যাটাক হয়ে যাবে। একগ্লাস পানি দাও তো জলদি। '