ফন্ট সাইজ:
থিম:
মনের রঙে তুমি

১৪তম পর্ব

লেখক: সুমনা সাথী

#মনের_রঙে_তুমি

#সুমনা_সাথী

[১৪]

নুহা তাকাল আহিরের দিকে। নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে চাপা দিতে ঠোঁটে টেনে আনল একটুকরো হাসি।

' এত নাটকের দরকার নেই, ডাক্তার। আর একবার ভেবে দেখতে পারেন? আমি কিন্তু খুবই বিরক্তিকর বউ হবো।'

আহির মৃদু হেসে বলল,

' আর আমি খুব জেদি স্বামী হবো।'

ঠিক তখনই ভেতর রাহেলা বেগমের কণ্ঠ ভেসে এল।সন্ধ্যা হয়ে আসচ্ছে। তিনি পুকুর পাড় না থেকে বাড়ির ভিতরে যেতে বলছেন। নুহা ধীরে আহিরের কাঁধ থেকে মাথা সরাল।মৃদু স্বরে বলল,

' চলুন, দাদি ডাকছেন। আজকের রাতটা… গ্রামে আমাদের শেষ রাত হবে।'

দূরের মসজিদ থেকে আযানের সুর ভেসে আসছে। নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে কমলা রঙের আলো মাটিতে ছড়িয়ে আছে। বাতাসে শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ। উঠতে গিয়েই থমকে গেল নুহা। আহির হাত চেপে ধরে রেখেছে।

নুহা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আহির চোখ সরিয়ে নিলো। পুকুরের স্থির জলে তাকিয়ে বলল,

' রাত হয়ে আসছে।'

নুহা একটু অবাক হয়ে বলল,

' হুম… সন্ধ্যার পরে তো রাতই হয়, না?'

' চলো, এখনই বিয়েটা করে ফেলি?'

নুহা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। আহিরের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি।

কোনো কথা না বলে নুহা উঠে দাঁড়াল। পুকুরের ধারে হেলে থাকা কলস থেকে হাত ভিজিয়ে এক ঝাপটা পানি ছুঁড়ে দিল আহিরের দিকে।

' স্বপ্ন থেকে বাস্তবে আসুন, ডাক্তার।'

পানি ঝরে পড়ল আহিরের শার্টে। চারপাশে ব্যাঙের ডাক ভেসে এলো। নুহা হালকা হাসি মুখে দৌড়ে চলে গেল বাড়ির ভিতর। পায়ের নূপুরের টুংটাং শব্দ ধীরে মিলিয়ে গেল সন্ধ্যার গাঢ় নীলের ভেতরে।

__________

পরের দিন সকালবেলা, রাহেলা আর মতিনকে বিদায় দিয়ে নুহা আর আহির ঢাকার পথে রওনা দিল। ঢাকায় পৌঁছাতেই আহিরকে ঘিরে সবাই যেন প্রাণ ফিরে পেল।

তারপরের দিন, ক্লাস শেষে নুহা যখন ভার্সিটির গেট পেরিয়ে বাইরে এল, হঠাৎই থমকে গেল। রাস্তার ধারে, কালো বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আহির। হাতে হেলমেট। মুখে হাসি। নুহা এগিয়ে গিয়ে অবাক গলায় বলল,

' আপনি এখানে কি করছেন?'

আহির হেলমেট মাথায় তুলে দিয়ে বাইকে বসতে ইশারা করল,

' আপাতত বেকার, তাই ভাবলাম এই সুযোগে একটু প্রেমট্রেম করা যাক। উঠে পড়ো, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি।'

নুহা বিরক্ত গলায় বলল,

' আপনি আসলে হাসপাতালে যাবেন না ঠিক করেছেন ? আমি তো বলেছি আপনালে বললাম, আপনি ...'

আহির তার কথা শেষ হতে দিল না। হালকা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

' প্লিজ, নুহা... একই কথা বারবার শুনতে ভালো লাগছে না।'

মুহূর্তের মধ্যে নুহার বুকের ভেতরটা কেমন ভারি হয়ে গেল। রাগ, অভিমান, আর অদ্ভুত কষ্ট একসাথে এসে গলা আটকে দিল। তবুও কিছু বলল না। আহিরের গম্ভীরতা দেখে হঠাৎই চুপ হয়ে গেল সে। ধীরে বাইকে উঠে বসল।

________

আহির সত্যিই হাসপাতালের কাজ পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছে। কিছুদিন হলো, রোশনের অফিসে ছোটখাটো একটা চাকরি নিয়েছে। রোশন, তার বাবার ব্যবসা এখন পুরোপুরি সামলায়। আহিরকে এই কাজটা দিতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। এমন ছোটখাট একটা চাকরি করবে আহির এটা মানতেই চাইছিলো না। কিন্তু শেষমেশ আহির জোরাজোরি করে রাজি করিয়েছে। আহির নিজের পক্ষে সব সময় খুশি থাকার ভান করলেও, নুহা এবং বাড়ির সবাই জানে তার ভিতর কতটা কষ্ট লুকিয়ে আছে। আজকাল আহিরকে একটু বেশি বিদ্ধস্ত মনে হয়। সবসময় নিজেকে ব্যস্ত দেখাতে চায়, যেন কেউ তার সত্যিকারের অবস্থা টের না পায়।

নুহার সঙ্গে দেখা হলে সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু দেখা পাওয়াটাই যেন এখন বড়ই কঠিন হয়ে উঠেছে। অফিস থেকে ফেরার পর আহির বাড়ির দরজায় প্রবেশ করতেই দেখল আরিফা বেগম গম্ভীর মুখে বসে আছেন। এখন প্রায় রোজই মা-ছেলের ছোটখাট ঝগড়া লাগে। আজও এমনটাই হবে আহির ভেবেছিলো। সাথে অনেক কিছু বলার মন ছিল আরিফার, কিন্তু আহিরের ক্লান্ত মুখ দেখেই চুপ করে রইলেন।আহিরও বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন না। দ্রুত পা গুটিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়লো। হাতে থাকা কোর্টটা রেখে, গলায় বাঁধা টাই খুলল। শার্টের বোতামের দিকে হাত বাড়াতেই। ইতিমধ্যে নুহা আলমারি খুলে বেরিয়ে এলো। তাড়াহুড়ো করে বলল,

' ওয়েট, ওয়েট। প্লিজ!'

আহির হাসিটুকু অবাক চোখে দিকে তাকালো।মুখটা গম্ভীর। নুহা খেয়াল করলো আহিরকে যেন আজ একটু বেশিই গম্ভীর লাগছে। নুহার মুখে লাজবোধ মিশ্রিত একটা হাসি ফুটে উঠল। কোনো কথা না বলে চুপচাপ বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু আহির হাত ধরে টেনে সামনের দিকে দাঁড় করালো। আচমকা এমন করাই নুহা ঘাবড়ে গেল। তার থেকে বেশি চমকালো আহিরের রাগান্বিত মুখ দেখে। এইটুকু ব্যাপারে যে আহির রাগ করবে না এইটুকু নুহা জানে তাহলে? নুহা ভাবনার মধ্যে আহির বলল,

' আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ব্লক করে দিয়ে চুপিচুপি আমার ঘরে আসছো? আগে বলো এসব করে কি প্রমান করতে চাও?কেনো করেছো,নুহা!'

নুহা যেন আকাশ থেকে পড়ে গেলো। কখন ব্লক করেছে। সেটা তো মনে করতে পারছেনা৷ আর ব্লকই বা করবে কেনো? উল্টো, আহিরের কথা মনে করেই তো সে এই ঘরে এসেছিল। কিন্তু আহিরের রাগ অস্থির করে তুলল নুহাকে। নুহা অস্পষ্ট ভাবে বলল,

' আ...আমি আপনাকে ব্লক করেছি?'

আহির পকেট থেকে ফোন বের করে নুহার সামনে ধরালো। নুহার চোখ বড় হয়ে গেল, সত্যিই ব্লক করা আছে। মনে পড়ল সকালের কথা, একটা কারন বসত সে আরোশকে ফোনটা দিয়েছিলো। হঠাৎ বুঝতে পারল, মানে আরোশ সব দেখেছে! আহিরের সাথে তার চ্যাটগুলো, কথাগুলো। ভাবতেই নুহার মুখ লাল হয়ে উঠল। নিজের উপর রাগ হল, কেন সে এতবড় বোকামি করলো। নুহার তো এসব খেয়ালই ছিলোনা৷ নুহাকে চুপ থাকতে দেখে আহির আরও জোরে বলল,

' কথা বলছো না কেন? আমি জিজ্ঞেস করছি, নুহা। আমি আর ভালো লাগছি না, মনটা উঠে গেছে তোমার। নতুন কোনো প্রোজাল পেয়েছ? তোমার...!

নুহার চোখ ছলছল করতে লাগলো। বলল,

' আরোশ করেছে!'

আহির অবাক হয়ে বলল,

'এর মধ্যে আরোশ কোথা থেকে আসলো। '

আচমকা পেছন থেকে আরোশের কণ্ঠ ভেসে এলো,

' ধরা পড়ে গেছ তোমরা।'

আহির চমকে নুহাকে ছেড়ে দিয়ে আরোশের দিকে তাকালো। আরোশ দরজায় দাঁড়িয়ে ভাবপূর্ণ ভঙ্গিতে বলল,

' মানছি, আমার ভাইয়া বেস্ট। কিন্তু ইউ ডিজার্ভ বেটার, নুহা।'

আহির অবাক হয়ে আরোশের দিকে তাকালো। নুহা হঠাৎ হেসে ফেলল। আহির ধমকে উঠলো,

' হাসছ কেন, ইডিয়ট? আর তুই, এদিকে আয় তোর বেটার আমি বের করছি।'

আরোশ একটু ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,

' দেখো ভাইয়া, আমায় কিছু করলে আমি আমার আম্মুকে সব বলব। যেটা বলতে এসেছিলাম। নুহার চাচ্চু এসেছে, ওকে নিচে ডেকছে। আর নুহা তোমার থেকে আমি এটা একদমই আশা করিনি। '

কথাগুলো বলে আরোশ স্বাভাবিক ভাবে চলে গেল। আহির নুহার দিকে ক্রুদ্ধ চোখে তাকাতেই, নুহা ও দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল। নুহা নিচে নামতেই দেখে আশারাফ সাহেব সোফায় বসে আছেন।নুহাকে দেখে হেসে বললেন,

' এই তো আমার মা।'

নুহা একটু হেসে জিজ্ঞেস করল,

' কেমন আছো, চাচ্চু?'

আশারাফ হাসিমুখে বললেন,

' ভালো। তুমি একটা কাজ করো, মা, তাড়াতাড়ি ব্যাগ গুছিয়ে ফেলো। আমাদের এক্ষুনি ফিরে যেতে হবে।'

আরিফা বেগম অবাক হয়ে বললেন,

' সেটা কী ভাইজান? এখন তো রাত! আপনি এক্ষুনি ফিরবেন? নুহা তো অবশ্যই বলেছিল বাড়ি ফিরবে। আজকে রাতে থেকে সকালে যাওয়া হবে নাহয়।'

আশারাফ বললেন,

' আসলে বাড়িতে একটা জরুরি অনুষ্ঠান আছে। আর ভাইজানের কড়া হুকুম মেয়েকে এক্ষুনি নিয়ে যেতে হবে। নুহা, তুই জানিস তো, তোর আব্বুকে দ্রুত রেডি হতে হবে।'

নুহা মাথা নেড়ে বলল,

' হুম।'

মনটা ভার হয়ে উঠল নুহার। ভিতরে ভিতরে অস্থিরতা ঘিরে ধরেছে তাকে। নিজের ঘরে না গিয়ে দ্রুত দৌড়ে গেল আহিরের ঘরে। আহির তখন ফোনে কথা বলছিলো, হাতে মোবাইল ধরে দাঁড়িয়ে। নুহা হঠাৎ দৌড়ে এসে আহিরকে জড়িয়ে ধরল। আহির কিছু বুঝে উঠতে পারেনি, থমকে গেল। ফোনটা হাতে ধরে থাকা থেকে ছেড়ে দিল। কাঁপা হাতটা নুহার মাথায় রেখে বলল,

' এটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে, মনে হয়। শুনেছি নিচে তোমার চাচ্চুও এসেছে। যদি এসে পড়ে, ভাবতে পারছো কতটা সারপ্রাইজ হবে?'

নুহা চোখের কোণ থেকে লুকানো এক টুকরো অশ্রু মুছে ফেলল। আহিরকে ছেড়ে দিয়ে তাকালো। একটু হাসি ফোটালো মুখে,

' আসলে আমি বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।'

আহির অবাক হয়ে বলল,

' কোনো সমস্যা? এমন ভাব করছো যেন শশুরবাড়ি যাচ্ছো! তোমার তো খুশি হওয়া উচিত, এতদিন পর তোমার বাবার বাড়ি যাচ্ছো।'

নুহা হেসে উঠল,

' আপনি প্লিজ, আর ঘর থেকে বের হবেন না, আমি চলে যাওয়ার পর বের হবেন।'

কথাটা বলে নুহা দ্রুত পায়ে ঘর ত্যাগ করলো। যাওয়ার আগে আরও একবার আহিরের দিকে ফিরে তাকালো। আহির ফোনটা তুলছে। নুহার কেনো যেন মনে হলো আর যদি এই মানুষটার সাথে দেখা নাহয়!

[কারেন থেকে শুরু করে মোবাইল সব আমার সাথে বেইমানি শুরু করছে। পুরো একটা পর্ব লিখে রাখছি আপলোড করবো এডিট করে। ওমা নোটে গিয়ে দেখি পর্ব নেই। এত কষ্ট লাগছে বলে বোঝাতে পারবো না। পরে তাড়াহুড়ো করে এই টুকু লিখে দিলাম। পেজ এর রিচ তলানিতে সবাই একটু রেসপন্স করবেন প্লিজ। রিচেক দিতে পারিনি 😑]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন