ফন্ট সাইজ:
থিম:
মনের রঙে তুমি

১৫তম পর্ব

লেখক: সুমনা সাথী

#মনের_রঙে_তুমি

#সুমনা_সাথী

[১৫]

সারারাতের দীর্ঘ যাত্রা শেষে বেশ ভোর ভোরই নুহা পৌঁছালো রসুলপুরে। রসুলপুরের ফায়েজ ওয়ালীদের নাম সবার মুখে মুখে। পুর্বপুরুষরা ছিলেন জমিদার। যদিও সেই ঐশ্বর্য এখন আর নেই। তবে দণ্ডায়মান সেই বিশাল তিন তলা বাড়ির গৌরব এখনো চোখে লাগে।বৃহৎ লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে প্রশস্ত উঠোন, যার চারপাশ ঘিরে মূল বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। সময়ের সাথে সাথে পুরনো স্থাপত্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। আশারাফ সাহেবের সাথে ভেতরে ঢুকলেও, নুহা বুঝতে পারল তাকে দেকে কারো মুখে বিশেষ উচ্ছ্বাস নেই। এরই মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে নওয়াজকে নামতে দেখে নুহার চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এই বাড়িতে চাচ্চুর পর যার স্নেহে সে সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে, সে-ই বড়ভাই নওয়াজ।নুহা এগিয়ে গিয়ে হাসিমুখে বলল,

" ভাইয়া, কেমন আছো?"

কথা শেষ হবার আগেই আচমকা একটা তীক্ষ্ণ চড় পড়ল নুহার গালে। মুহূর্তেই সারা ঘর স্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই হতভম্ব হয়ে এগিয়ে এল। কেউ বিশ্বাস করতে পারছেনা কি হলো এটা। নওয়াজ যে খুব সহজে নুহার গায়ে হাত তুলবেনা এটা তো সিউর। নওয়াজ গর্জে উঠল,

"খবরদার, যদি আমাকে ভাই বলে ডাকিস! কেমন আছি জিজ্ঞেস করছিস, তুই কি আমাকে ভালো থাকতে দিয়েছিস? তোর থেকে এটা আশা করিনি, নুহা।"

চোখের কোণ ভিজে ঝাপসা হয়ে এল নুহার দৃষ্টি। কাঁপা গলায় বলল,

"তুমি এসব কি বলছো ভাইয়া? আমি কী করেছি?"

নওয়াজ বিদ্রূপে হাসল,

"তুই কী করেছিস সেটা তুই নিজেই জানিস, বেয়াদপ! তুই কি পড়াশোনা করার জন্য ঢাকা গিয়েছিলি? না কি রাস্তার ছেলেদের সাথে প্রেম করে বেড়ানোর জন্য? তুই ভেবেছিস আমি কিছু জানি না? তুই রাস্তায় ঘুরে বেড়াস, প্রেম করিস! আমাদের বংশের মান-সম্মান একবারও মনে পড়েনি তোর? নিলজ্জ মেয়ে! ইচ্ছে করছে..."

নওয়াজ আবারও হাত তুলতে গেলে, আশারাফ সাহেব ঝট করে আটকালেন।

"কি করছিস নওয়াজ? বোনের গায়ে হাত তুলছিস! তোর কি বুদ্ধি সব হারিয়ে ফেলেছিস? ছোট মানুষ ভুল করেছে, ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। নুহা, তুই উপরে নিজের ঘরে যা।"

নওয়াজ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

"ওকে আর লাই দিও না, চাচ্চু। কিছুটা দোষ কিন্তু তোমারও আছে। আমি বলেছিলাম, ওকে আর পড়ানোর দরকার নেই, বিয়ে দিয়ে দাও। ও কি জানে না, তুষারের সাথে ওর বিয়ে ঠিক করা আছে? তারপরও ওয়ালী বংশের মেয়ে হয়ে এমন লজ্জাজনক কাজ করতে ওর বিবেগে বাধলো না!"

আশারাফ নওয়াজের হাত চেপে ধরে শান্ত গলায় বললেন,

"আহ নওয়াজ, শান্ত হ। তুই কি চাস বিষয়টা সবার সামনে জানাজানি করতে? বললাম তো, ছোট মানুষ ভুল করে ফেলেছে। আসলেই ভুলটা আমার আমি হয়তো ওকে ঠিকভাবে সামলাতে পারিনি। তবে ভুল শোধরানোর সময় এসেছে। তার ওপর তিন-চার দিনের মধ্যেই তো বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান, এই সময় অশান্তি ভালো নয়।আজ থেকে লোকজন আসতে শুরু করবে। "

তারপর নুহার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,

"নুহা, তুই ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম নে মা।ভাইয়ার উপর রাগ করিস না। বুঝতে তো পারছিস, ভাইয়া রেগে আছে মাথা ঠিক নেই।"

নুহা কিছু না বলে মাথা নিচু করল। বুকের ভেতরটা যেন পাথরের মতো ভার হয়ে আছে। এক মুহূর্তও আর দাঁড়াল না, দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে গেল।

তুষার আশারাফ সাহেবের ছেলে। বহু বছর আগে থেকেই ঠিক হয়ে আছে নুহা আর তুষারের বিয়ে। বিষয়টা নুহা সবসময়ই জানত। তুষারের প্রতি তার না আছে তীব্র ভালোলাগা, না তীব্র আছে অপছন্দ শুধু একরকম নির্লিপ্ত স্বীকৃতি। সে ভেবেছিল, যখন সময় আসবে হয়তো তখন ভালোলাগাটাও ধীরে ধীরে চলে আসবে।এই এক কারণে এতদিন ধরে অসংখ্য ভালো প্রস্তাব পাওয়ার পরও নুহা কখনো সাহস করে কিছু গ্রহণ করেনি। কিন্তু আহিরের বেলায় সেই দৃঢ়তা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। কেন হারাল? এ প্রশ্নই তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে আহিরের মুখ। নুহা চেষ্টা করেছিল নিজেকে দূরে সরাতে, কিন্তু পারল না। কেন পারল না? বাড়ির লোক সব জেনে তাকে নিয়ে এসেছে মানে তার আর কি ফেরা হবে? হঠাৎ মনে হলো, ওই মানুষটার সাথে কি আর কখনো দেখা হবে না? বুকের ভেতর শূন্যতা নেমে এল। এক অচেনা ভয় ধীরে ধীরে জমাট বাঁধছে ভেতরে। নুহাকে উদাসীন ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখে চাচাতো বোন রিমি চমকে উঠল।বলল,

"আপু, তুমি কখন এলে? আর তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেনো?"

নুহা থমকে দাঁড়িয়ে বলল,

"সকালে এসেছি। আচ্ছা, বাড়িতে কার বিয়ে হচ্ছে? ভাইয়ার?"

রিমি প্রথমে চোখ বড় করে চাইল, তারপর ঠোঁটে টিপে হাসলো। অবাক হওয়া ভঙ্গিতে বলল,

"হাই আল্লাহ! তুমি জানো না? যার বিয়ে, সে-ই আবার খবর রাখে না! পাড়া-প্রতিবেশী সবাই জানে তিনদিন পর তুষার ভাইয়ার সাথে তোমার শুভ পরিনয়। আর তুমি নিজের বিয়ের কথাই ভুলে বসে আছো!"

এক মুহূর্তের জন্য নুহার ভেতরটা যেন হাওয়াশূন্য হয়ে গেল। কান পর্যন্ত রিমির হাসির শব্দ পৌঁছালেও বুকের ভিতর তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলো সে। নিজের বিয়ে... এভাবে শুনতে হবে, সে কল্পনাও করেনি। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে উঠল আহিরের মুখ। নুহা মাথা নিচু করে রিমিকে পাশ কাটিয়ে ছুটে চলে গেল। নিজের ঘরে ঢুকেই দরজাটা ভেজিয়ে দিল সে। দেয়ালের সাথে হেলে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বিছানায় বসে পড়ল।গালটা এখনো জ্বলছে, কিন্তু সেই জ্বালার থেকে বুকের জ্বালার তীব্রতা যেন বেশি মনে হচ্ছে। মনে পড়ল ঢাকা থেকে আসার আগে আহিরের ঘরে শেষ দেখা। চোখের পানি আটকে রাখতে পারল না নুহা। ঠোঁট কামড়ে চেষ্টা করল যেন কোনো শব্দ না বের হয়, কিন্তু বুকের ভেতরের চাপা কান্না হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ল। কণ্ঠরোধ করে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

________

গোধূলির আলোয় বাড়ি জমজমাট। উঠানে টাঙানো হচ্ছে রঙিন বাতি, ফুলের মালা, অতিথির কোলাহল শুরু হয়ে গেছে। নুহা নিজের ঘরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, চোখ দূরে কোথাও আটকে। তার ভেতর দ্বন্দ্ব ‘শেষমেষ কি এই বিয়েটা মেনে নিতে হবে?’এমন সময় হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল “বেকার ডাক্তার”। বুকটা ধক করে উঠল নুহার। অস্থিরতা যেন তীব্র হয়ে উঠল। হঠাৎ মনে হলো কান্না চলে আসছে। ফোন ধরার আগেই কল কেটে গেল, আবার বাজল।

কাঁপা হাতে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আহিরের কণ্ঠ,

"কি ব্যাপার বলোতো? খুব ব্যস্ত নাকি? গিয়ে অব্দি একটা ফোন, টেক্সট কিছুই নেই!"

নুহা নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল,

"আপনি কে বলুনতো, যে আপনাকে বলা লাগবে?"

আহির দীর্ঘশ্বাস ফেলল,

"তাইতো... কিন্তু জানো, আমার এখন একটা বিষয়ে ভীষণ আফসোস হচ্ছে।"

"কোন বিষয়ে?"

"সেদিন তুমি বলার সাথে সাথেই তোমাকে বিয়ে না করার জন্য। আচ্ছা তুমি কি রেগে আছো?"

"না তো.."

"তোমার কণ্ঠ কেমন লাগছে... তখনকার আচরণের জন্য আমি খুব দুঃখিত। মাথা ঠিক ছিল না। এমনিতে মাথা গরম ছিলো, তার উপর মাথা ঠান্ডা করার জন্য তোমাকে ফোন দিতে গিয়ে উল্টো ব্লক দেখে আরো গরম হয়ে গেল। জানো কিনা কি ভাবনা আমার মাথায় ঘুরতেছিলো। যাই করো না কেনো তোমাকে ছাড়ছি না। একবার হ্যাঁ,বলেছো মানে সারাজীবন ফেঁসে গেছো। এখন এই সামন্য ভুল-ত্রুটি মার্জনা করো।'

নুহা হেসে ফেলল,

"আমি মোটেও আপনার উপর..."

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ ফোনটা তার হাত থেকে কেউ কেড়ে নিল। চমকে পেছন ফিরে দেখল ‘তুষার।’

তুষার ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে মিউট করল। ঠাণ্ডা গলায় বলল,

"এটা কে, নুহা?"

বুকটা ধক করে উঠল, নুহার । নুহা ছোটবেলা থেকেই তুষারকে ভয় পায় রাগী, নিয়ন্ত্রণপরায়ণ, আর শাসন করার এক অদ্ভুত অভ্যাসের কারনে। একবার স্কুলে এক ছেলে তাকে গোলাপ দিয়েছিল, তুষার তার হাত ভেঙে দিয়েছিল। পরে বিচারও বসেছিল। নুহাকে চুপ থাকতে দেখে তুষার ধমকে উঠলো,

"আমি জিজ্ঞেস করছি, এটা কে? আসল নাম বল!"

নুহার গলা শুকিয়ে এলো, তবুও কাঁপা কণ্ঠে বলল,

"আহির।"

শোনামাত্র তুষার ফোনটা প্রচণ্ড জোরে দেয়ালে ছুড়ে মারল। ফোনটা ভেঙে মেঝেতে পড়ল। তুষার রাগের চোটে ঘামছে রিতিমত। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, জোরে একটা ঘুসি বসালো দেয়ালে। নুহা আতঙ্কে উঠলো। তুষার নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাতটা পকেটে ঢুকিয়ে, স্বাভাবিক হয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,

"শোন নুহা, একবার ভুল করেছিস মাপ করে দিয়েছি। কিন্তু এক ভুল বারবার আমি বরদাস্ত করবো না। তিনদিন পর তুই আমার বউ হবি। বিয়ে মানে আনন্দ, নাচগান তুই কি চাস, তার আগে এই ছেলেটার হঠাৎ মা রা যাওয়ার খবর শুনে শোক পালন করতে? চুপচাপ রেডি হয়ে নিচে আয়, আমরা শপিংয়ে যাব।"

এই বলে তুষার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নুহা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন