#মনের_রঙে_তুমি
#সুমনা_সাথী
[১৬]
সন্ধ্যার দিকে আহির বাড়িতে ঢুকতেই দেখল আরোশ সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কিরে, তোর আবার কি হয়েছে?"
আরোশ মাথা না তুলে বলল,
"হয়েছে তোমার… সর্বনাশ হয়ে গেছে।"
আহির ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
"কি বলছিস ঠিক করে বল?"
ঠিক তখনই পেছন থেকে আরিফা বেগমের কণ্ঠ,
"তুই নুহাকে ভালোবাসিস, আহির?"
আচমকা প্রশ্নে আহির থমকে গেল। চোখে-মুখে স্পষ্ট বিস্ময়। সে কেবল স্থির হয়ে আরোশের দিকে তাকাল। আরিফা বেগম আবারও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,
"আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি আহির। উত্তর দে। নুহার তিনদিন পর বিয়ে সেটা জানিস তুই?"
বিয়ের খবর শুনে আহির হতবাক হয়ে গেল। অবিশ্বাসের গলায় বলল,
"এসব… তোমাকে কে বলেছে?"
আরিফা বেগম হাতের কাগজটা সামনে ধরলেন।
"বিয়ের কার্ড দিয়ে গেছে একজন। ওর কোনো চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে। প্রথমে আমি বেশ খুশি হয়েছিলাম, কিন্তু পরে আরোশ বলল তুই আর নুহা নাকি একে অপরকে ভালোবাসিস। এটা তুই আমার কাছ থেকে লুকালি কেনো? আমি নুহার বাবার সাথে কথা বলতে পারতাম। আর নুহা কেনো বিয়েতে রাজি হয়েছে? আমি কয়েকবার ওকে ফোন করেও পাইনি। এখন কি করব বলতো?"
আহির আর কোনো কথা বলল না। সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠতে ওঠতে নিচু গলায় বলল,
"রেডি হয়ে নাও, আম্মু। আমরা বিয়ে খেতে যাব।"
__________
তুষারের অনবরত ডাকাডাকি আর দরজা ধাক্কানোতে বিরক্ত হয়ে অবশেষে নুহা দরজা খুলল। তাকে একবার চোখ বুলিয়ে তুষার বিরক্ত স্বরে বলল,
"কয়টা বাজে সেই খেয়াল আছে তোর? সবাই নাস্তার টেবিলে বসে আছে। তুই একা ঘরে বসে আছিস। চল।"
নুহা শান্ত গলায় বলল,
"আমার খেতে ইচ্ছে করছে না। পরে খেয়ে নেব।"
তুষার চোখ কুঁচকে তাকালো। বলল,
"না খেতে ইচ্ছে করলেও খেতে হবে।"
হাত বাড়িয়ে নুহার হাত ধরতে গেলেই নুহা সরে দাঁড়াল। তুষার হাত ফিরিয়ে নিলো। মুখ শক্ত করে চলে যেতে নিলেই। পেছন থেকে নুহার কন্ঠ শোনা গেল,
"তুষার ভাই…!"
তুষার থেমে গেল। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালো। নুহা কিছুটা ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,
"আমি আহিরকে ভালোবাসি। ওনাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। আমি তোমার কাছে রিকুয়েস্ট করছি, প্লিজ এই বিয়েটা ভেঙে দাও। আমি ওনাকে ভুলতে পারব না, বিশ্বাস করো।"
তুষারের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
"আচ্ছা বলতো, কতদিন ধরে ভালোবাসিস ওকে? এক মাস? দুই মাস? হয়তো ছয় মাস? এত অল্প সময়েই তুই বলছিস ও ছাড়া বাঁচবি না? জানিস আমি তোকে কতদিন ধরে ভালোবাসি? যেদিন থেকে বুঝেছি বিয়ে কী, ভালোবাসা কী সেদিন থেকে শুধু তোকে ভালোবাসি। তাহলে আমি তোকে ছাড়া কীভাবে বাঁচবো?"
নুহা মাথা নাড়ল।
"কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি না। তোমার ভালোবাসা একপাক্ষিক।"
তুষারের চোখ দুটো ক্ষোভে জ্বলজ্বল করে উঠলো। একটানে নুহার বাহু ধরে কাছে আনলো।
"তুই ভালোবাসবি… একটু একটু করে তুইও আমাকে ভালোবাসতে শিখবি। আমি শেখাবো তোকে।"
নুহা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলল,
"কখনোই না! তোমার এই স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থাকবে।"
তুষার ঠোঁট চেপে বলল,
"চ্যালেঞ্জ করছি, তোর এই ছয় মাসের ভালোবাসা আমি ছয় দিনেই ভুলিয়ে দেব।"
নুহা কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ নিচ থেকে ভেসে এলো একটা পরিচিত ডাক। আহিরের গলা। বেশ জোরে জোরেই নুহাকে ডাকছে। এক মুহূর্তে নুহার চোখ চকচক করে উঠল। বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। সব ভুলে ছুটতে চাইলো নিচে। কিন্তু ঠিক তখনই তুষার তার হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরল। গম্ভীর চোখে তাকিয়ে বলল,
"তুই কিছু ভুলে যাচ্ছিস, নুহা।"
__________
আহিরের হাকডাকে ওয়ালী পরিবার সবাই ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হলো। সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছেন ফায়েজ ওয়ালী। চারপাশে নীরবতা।রউফ মীর ধীর কণ্ঠে আশ্বস্ত করে বললেন,
"দেখুন, ওরা দুজন একে অপরকে ভালোবাসে। যদি বিয়ে করে সুখে থাকতে পারে তাহলে সমস্যা কোথায়?"
আশারাফ সাহেব তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে উঠে বললেন,
"সমস্যা কোথায় বলছেন? ভুলটা আসলে আমার শেয়ালের কাছে মুরগি রেখে দিয়েছিলাম। আপনাদের দায়িত্বে নুহাকে রেখে ছিলাম। অথচ আপনারাই আমার আমানতে খিয়ানত করেছেন। রউফ, তোর থেকে এটা আশা করিনি। নুহা ছোট, আর তুই তার সরলতার সুযোগ নিয়ে নিজের ছেলের হাতে তুলে দিতে চাইছিস?"
আহির উত্তেজিত হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু রউফ মীর দ্রুত তার হাত চেপে ধরে থামালেন। শান্ত গলায় বললেন,
"সুযোগ নেওয়া বলতে আপনি আসলে কী বোঝাচ্ছিস তুই আশারাফ?"
ফায়েজ ওয়ালী গলা খাঁকারি দিয়ে আশারাফকে থামিয়ে দিলেন। বললেন,
"দেখুন রউফ সাহেব, নুহা আমার একমাত্র মেয়ে। তার বাবা আমি, ফায়েজ ওয়ালী। দশ গ্রামের লেক এক নামে চেনে ওয়ালীদের। আমি চায়না আমার একমাত্র মেয়ে আমার থেকে দূরে যাক। আর কথায় বলে আত্মীয়তা সমানে সমানে হলে ভালো হয়। আপনারা সেদিক থেকে অনেক পিছিয়ে বুঝতে তো পারছেন। তুষার আমার ভাইয়ের ছেলে।ছোটবেলা থেকেই তাদের বিয়ে ঠিক করেছি। তার থেকে যোগ্য পাত্র আমার মেয়ের জন্য আর কী হতে পারে?"
একটু থেমে তিনি চোখ কুঁচকে আহিরের দিকে তাকালেন।
" তাও যদি নুহা এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলে সে আপনার ছেলেকেই বিয়ে করতে চায়। তার এই বিয়েতে মত নেই তাহলে আমি ভেবে দেখব। কেউ নুহাকে ডাকো।"
নুহার সাথে তুষারও এলো। আরিফা, রউফ মীরকে দেখে নুহা জোর করে একটা হাসি দিয়ে বলল,
"কেমন আছেন আন্টি? আংকেল, আপনি কেমন আছেন?"
বলেই থেমে গেল। হঠাৎ চোখে চোখ পড়ে গেল আহিরের সাথে। বুকটা ধক করে উঠলো নুহার। সর্বনাশা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে। যেটার সামনে দাঁড়ানোর সাহস নুহার নেই। চোখ নামিয়ে নিলো নিচের দিকে। ফায়েজ মীর ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বললেন,
"এই তো নুহা, তোমাকে যে জন্য ডেকেছি। এরা বলছে তুমি নাকি ওদের ছেলেকে ভালোবাসো। এই বিয়েতে তোমার নাকি মত নেই। আমি বারবারই বলেছি, এই বিয়েতে তোমার মত নিয়েই হচ্ছে। তাও এরা তোমার মুখ থেকে শুনতে চাইছে। বলো, এদের বলো।"
নুহার বুকের ভেতর হাহাকার করে উঠলো। গলা রুদ্ধ হয়ে আসছে। শব্দগুলো মুখে আটকে যাচ্ছে। ফায়েজ মীর আবারও চাপ দিলেন,
"কী হলো? বলছো না কেনো? তোমার কি এই বিয়েতে মত নেই?"
অবশেষে অনেক কষ্টে, তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে অতন্ত্য অপ্রিয় কথাটা উচ্চারণ করলো নুহা,
"আমার মত আছে।"
আহির বসা থেকে দাঁড়িয়ে উঠলো। চোখ দুটো রক্তবর্ণ ধারন করেছে। সোজা নুহার দিকে এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো।
"হোয়াট দ্য হেল ইস দিস, নুহা! তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? কিসের প্রতিশোধ নিচ্ছো আমার থেকে?"
"আ.. আমি.. আপনি…"
আহির নুহার বাহু শক্ত করে ধরে নিজের দিকে টেনে আনলো। প্রলয়ংকরী কণ্ঠে চিৎকার করলো,
"আমি-আপনি বাদ দাও! মজা করছো আমার সাথে? বিয়েতে মত আছে মানে কী নুহা?"
তুষার ঝাঁপিয়ে পড়ে আহিরের কলার ধরে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো। চোখ রাগে জ্বলছে তার। ক্ষোভ ভরা কন্ঠে বলল,
"আপনাদের ছেলেকে সামলান! দ্বিতীয়বার যদি এই দুঃসাহস করে, তাহলে ফল ভয়ংকর হবে!"
কিন্তু আহির মধ্যে কোনো ভাব গতিক লক্ষ করা গেলনা। ফের এগিয়ে এসে নুহাকে ধরলো। আলতো একটা ঝাঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কেউ বাধ্য করছে তোমায়? কেউ চাপ দিয়েছে? শুধু একবার বলো, তোমার এই বিয়েতে মত নেই আমি পুরো দুনিয়ার সাথে যুদ্ধ করবো তবুও তোমাকে নিয়ে যাব। কেউ আসবে না আমাদের মাঝে। বলো, নুহা! আনসার মি! তুমি আমাকে ভালোবাসো না?"
কথা শেষ করার আগেই ধপ করে একটা ঘুষি পড়লো আহিরের মুখে। সে টলে গেল। আঁতকে উঠলো সবাই।
নুহা তড়িঘড়ি তুষারের হাত চেপে ধরলো,
"তুষার ভাই, প্লিজ! শান্ত হও। আমি বলছি তো কেউ আমাকে জোর করছে না। আমি নিজে থেকে এই বিয়েতে রাজি হয়েছি।"
আরিফা বেগম অবাক হয়ে বললেন,
"নুহা… তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি। কেউ যদি তোমাকে জোর করে..."
কথা শেষ হওয়ার আগেই আহির দাঁত চেপে বলল,
"আম্মু, অনেক হয়েছে। চল এখান থেকে।"
"আহির!"
"আমি বললাম চল!"
কয়েক পা হেঁটে হঠাৎ থেমে গেল আহির। ফিরে তাকালো।এগিয়ে এসে ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো নুহার সামনে। কাঁপা হাতে নুহার কোমর জড়িয়ে ধরে মাথা ঠেকালো নুহার উদরে। কেঁপে উঠলো নুহা। তুষার এগিয়ে আসতেই নুহা চোখ তুলে তাকালো। একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে দিলো তুষারের দিকে। তুষার মুহূর্তেই থেমে গেল।
আহির বিদ্ধস্ত কন্ঠে বলল,
" আই লাভ ইউ, নুহা… আমি সত্যিই তোমাকে প্রচন্ড ভালোবাসি। প্লিজ, আমাকে ফিরিয়ে দিও না। তুমি ছাড়া আমি বাঁচব না… আমি ভীষণ অসহায় হয়ে গেছি। আমি জানি তুমি বাধ্য হয়ে এই কথাগুলো বলছো। কিন্তু বিয়ে কোনো খেলা নয়। যদি তুমি আমাকে ভালো না বাসতে আমি সরে যেতাম। কিন্তু এখন পারছি না। আমি শুধু তোমাকেই চাই।শুধু আজকের জন্য নয় সারাজীবনের জন্য। প্রতিটি সকালে ঘুম ভাঙার পর তোমার হাসিমুখ দেখতে চাই। তোমার সাথে ঝগড়া করতে চাই। আবার রাগ ভাঙাতে চাই। তোমার অভিমান মুছে দিতে চাই। তুমি ছাড়া আমার পৃথিবী কল্পনাও করতে পারছি না। প্লিজ আমাকে একা কোরো না। আমাকে এত বড় শাস্তি দিও না। আজ তুমি যদি আমাকে ফিরিয়ে দাও মনে রেখো আহির আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। আজ আমি আহির ইবনানা মীর, আমার অহংকার ভেঙে মাথা সর্বোচ্চ নত করে তোমার পায়ের কাছে এসেছি। এখন বলো তুমি আর কী চাইছো?"
নুহা এক শুকনো ঢোক গিললো। চোখের কোনে জমে থাকা অশ্রুটা হাতের পিঠে মুছে নিলো। গলার ভেতর ব্যথার পাথরটা সামলে নিয়ে বলল,
"আহির… প্লিজ। আপনি ভুল করছেন। আমি আপনাকে ভালোবাসি এটা আপনার ভুল ধারণা। ক’দিন ঠিকভাবে কথা বলেছি বলেই ভালোবাসা হয়ে যায় না। আমি… আমি আপনাকে কখনোই ভালোবাসিনি। আমার এই বিয়েতে সম্পূর্ণ মত আছে। দয়া করে ফিরে যান।"
আহিরের মুখ তুলে তাকালো নুহার দিকে। ভাঙাকন্ঠে বলল,
"এই কথাটা আর একবার বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসোনা। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে না সোজাসাপ্টা উত্তর চাই আমার।"
নুহার অনুভব করলো বুকের ভেতরের তীব্র জ্বালাপোড়া। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখ নামিয়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে ঠোঁট শক্ত করে বলল,
"ভালোবাসি না। আমি আপনাকে ভালোবাসি না।"
আহির সামান্য হাসলো। তারপর কোনো কথা না বলে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো। দ্রুত পদক্ষেপে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। সবাই নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো।আহির একবারও পেছন ফিরে তাকালো না। নুহা এ দৌড়ে নিজের সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে গেল।ঘরে ঢুকেই দরজাটা ধপ করে বন্ধ করে দিল । হঠাৎ ভেতরে জমে থাকা সব আবেগ আগুনের মতো জ্বলসে দিতে লাগলো নুহার ভিতর থেকে। টেবিলের উপর রাখা গ্লাসটা ছুড়ে ভেঙে ফেলল। চেয়ারে লাথি মেরে ফেলে দিল কোণে। বুকশেলফ থেকে বইগুলো একের পর এক মেঝেতে ছুড়ে মারতে লাগল।
একসময়ে নিজেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। এলোমেলো চুল। কাঁপতে থাকা শরীরে উন্মাদের মতো চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
"আমি আপনাকে ভালোবাসি, আহির… আমি ও আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি! বিশ্বাস করুন ভালোবাসি আমি। তাহলে কেন আমি আপনাকে পাব না? কেনো পৃথিবীতে আমার জীবনে শুধু কষ্টই জমা হলো? কেনো আমার জীবনে এত অভিশাপ! আমি কেনো সুখী হতে পারব না। কেনো?! আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচব না আহির… আপনি শুনতে পাচ্ছেন না, তাই না? আমি আপনাকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসতে পারব না। সেই যেই হোক, যতই অধিকার নিয়ে আসুক। আমি পারব না…"