#মনের_রঙে_তুমি
#লেখনীতে:সুমনা সাথী
[১৯]
সকাল সকাল নুহার ঘুম ভাঙল আরিফা বেগমের ডাকাডাকিতে। আধো-ঘুম চোখ মেলে উঠে বসল সে। মাথাটা ভারী লাগছে। আরিফা বেগম পাশে বসে তার কপালে হাত রেখে জ্বর চেক করলেন। উদ্বিগ্ন মুখে বললেন,
' জ্বর তো বেশ। তুমি আস্তে আস্তে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি আহিরকে বলছি আমরা এখনই হাসপাতালে যাব।'
নুহা তাড়াতাড়ি থামিয়ে দিয়ে বলল,
' আন্টি, প্লিজ আপনি ব্যস্ত হবেন না। হাসপাতালে যাওয়ার দরকার নেই। আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।'
আরিফা বেগম আবার নুহার কপালে হাত রেখে বললেন,
' জ্বরটা বেশি। আর আন্টি কী? হ্যাঁ... আম্মু বলবে। আমি কিন্তু ভীষণ রাগ করব।'
নুহার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠল। ভেজা হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝাল সে। আরিফা বেগম উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,
' তা হলে তুমি ধীরে ধীরে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসো। আমি ডাক্তারকে ফোন করে জেনে নিচ্ছি কী ওষুধ দেওয়া যায়। কাউকে দিয়ে আনিয়েও নেব। আর একা নিচে নামতে কষ্ট হলে কাউকে ডাকবে। আজ তো শুক্রবার। সবাই ঘরেই আছে।
নুহা নীরবে মাথা নেড়ে দিল। আরিফা বেগম টানপা ফেলে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বিছানা থেকে নামতে গিয়েই হঠাৎ নুহার মনে পড়ল আহিরের কথা। চোখ সরল সোফার দিকে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক ফুঁড়ে। মনও ভার হয়ে গেল। সারারাত লেকটা সোফায় কাটিয়েছে। শুধু তার কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য। অথচ তার তো উচিত ছিল নুহার মাথাটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে শান্তিতে ঘুম পাড়ানো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নুহার যন্ত্রণায় ভরা মনটা একটু শান্ত করা। চোখ ভিজে উঠল নুহার। হ্যাঁ, ভুল হয়েছিল তার। তাই বলে এতটা ঘৃণা? একবারও জিজ্ঞেস করতে পারল না ‘তুমি কেমন আছো নুহা?’ ভালোবাসা কি এত দ্রুত শেষ হয়ে যায়?
ভাবতে ভাবতেই নুহা ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল।
দরজায় দাঁড়িয়ে আহির মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারপর শব্দ করে ভেতরে ঢুকতেই নুহা তাড়াহুড়ো করে চোখের পানি মুছে বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু দুর্বল শরীর নিয়ে বেশিদূর যাওয়া হলো না। আচমকাই মাথা ঘুরে পুরো শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাচ্ছিল সে। হঠাৎই একজোড়া শক্ত হাত তাকে আঁকড়ে ধরল। চোখ মেলে সামনের মুখটা দেখতেই বুক হাহাকার করে উঠল নুহার। আহির। চোখেমুখে তীব্র বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। নুহার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই লোকটার চোখে কেনো আজ বিরক্তি? কেনো নেই একটুও উদ্বেগ? নুহা কি সত্যিই তার কাছে এতটাই অপ্রিয় হয়ে গেছে? অভিমানী মন নিয়ে নুহা নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে চাইল কিন্তু শরীরটা আবারও দুলে উঠল। এবারও আহিরই তাকে আঁকড়ে ধরল। বিরক্তির সঙ্গে ভেতরে জমে থাকা অসহায়তা মিলেমিশে সে হঠাৎই গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সেই দীর্ঘশ্বাস কানে পৌঁছাতেই বুকটা হুহু করে উঠল নুহার।
কোনো কিছু না বলে আচমকা নুহাকে পাজাকোলা করে তুলে নিল আহির। বুকের ভিতরটা দ্রুত বেগে ধকধক করে উঠলো নুহার। তবুও স্তব্ধ হয়ে আহিরের কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। অথচ আহির একবারও চোখ ফেরাল না তার দিকে। ওয়াশরুম থেকে বের হতেই নুহা দেখল আহির এখনো দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। দরজাটা সে বন্ধ করেছিল বটে; কিন্তু আহির হাত রেখে দিয়েছিল যাতে পুরোপুরি লক না হয়। নুহা বুঝে থাকলেও কিছু বলেনি। আহির যে তার জন্য অপেক্ষা করছে এটাই তো বড় কিছু। তবে পুরোপুরি খুশি হতে পারলো না নুহা। আহির তো বলেছিল সে ডাক্তার। রোগীদের সাহায্য করা তার দায়িত্ব। নুহার জায়গায় অন্য কেউ হলও হয়তো এটাই করতো। নুহা বের হয়ে আসতেই আহির এগোতে চাইল। নুহা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। ধীরে ধীরে নিজেই পা টেনে বিছানায় এসে বসল। তারপর হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে পড়ল।আহির একবার অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। কিছু বলতে চেয়েও আবার গিলে ফেলল। হঠাৎই কণ্ঠে অকারণ রুক্ষতা এনে জোরে ডেকে উঠল,
' আরোশ! নিচ থেকে আমার জন্য এক কাপ কফি নিয়ে আয় তো। দ্রুত।'
কথাটা বলে আহির গিয়ে ধপ করে সোফায় বসল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরোশ এসে হাজির হলো। ট্রে হাতে কফির মগ টেবিলে রাখতেই আহিরের চোখ পড়ল।কণ্ঠে বিরক্তির নিয়ে বলল,
' কফি এভাবে ছড়ালো কী করে?'
আরোশ ভ্যাবাচেকা খাওয়া মুখে গম্ভীরভাবে বলল,
' তাড়াতাড়ি আসতে গিয়েই এমন হয়েছে।'
আচমকা আহির উঠে দাঁড়িয়ে ধমকে উঠল,
' একটা কাজও ঠিকমতো করতে পারিস না! কে তোকে বলেছে তাড়াহুড়ো করে আসতে? যদি পড়ে যেতিস? হাতে-পায়ে আঘাত পেতিস না? দিন দিন বেয়াদপ হয়ে যাচ্ছিস। এই পাকনামি আমার একদম পছন্দ না আরোশ!ফের যদি আমার চেয়ে বেশি বোঝার চেষ্টা করিস তো চড়িয়ে গাল লাল করে দেব। নয়তো উপরে তুলে এক আছাড় মারবো।'
কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে বিঁধল আরোশের মনে। মুখ চুপসে গেল। আহির সাধারণত তাকে এভাবে বকাঝকা করে না। এই তুচ্ছ ব্যাপারে এতটা ধমক সে কল্পনাই করেনি। চোখে পানি ভরে উঠতে চাইলো। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
' সরি ভাইয়া… আমি বুঝতে পারিনি।'
আহির কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বরটা একটু নরম করে বলল,
' ঠিক আছে যা। পরের বার খেয়াল রাখবি।'
কফির মগ হাতে তুলে নিয়ে আর কিছু না বলে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল আহির।পিছনে নুহা বিষণ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই চলে যাওয়া পায়ের শব্দের দিকে।
____________
বিকেলের দিকে নওয়াজ এল। সাথে নুহার দাদী লতিফা বেগম আর তার জা আনিকা বেগম। দু’জনের মধ্যে দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। প্রায়ই একসাথে চলাফেরা করেন তারা। সাথে রিমাও এসেছে। লতিফা বেগমের বয়স হয়েছে। একা চলাফেরায় অসুবিধা হয়। মূলত নাতনিকে দেখতেই তিনি এসেছেন। বসার ঘরে সবাই বসেছে। নুহাও পাশে আছে। শরীরটা এখন কিছুটা ভালো। জ্বরও অনেকটা কমে গেছে। গল্পের ফাঁকে আনিকা বেগম আহিরকে দেখতে চাইলেন। আরিফা বেগম সঙ্গে সঙ্গে আরোশকে বললেন আহির কে ডেকে আনতে। নুহার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। যদি আহির আসতে অস্বীকার করে বসে! বা রাগের বশে উল্টোপাল্টা কিছু বলে তাদের অপমান করে? এমনিতেই ওরা চিন্তিত। সে একদম চায় না নওয়াজ বা বাড়ির কেউ জানুক আহির কেমন ব্যবহার করছে তার সঙ্গে। কিন্তু নুহার আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হলো। আহির বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকল। সবাইকে সালাম করল। আর লতিফা বেগমের ডাকে তার পাশে গিয়ে বসলও। নুহা হালকা শ্বাস ছাড়ল।আনিকা বেগম খিলখিলিয়ে হেসে বললেন,
' আসলে বিয়ের দিন তোমাকে এক ঝলক দেখেছিলাম। কিন্তু আপা মানে তোমার দাদী শাশুড়ি দেখতে পারেননি। তখন তো তিনি বাড়ির ভেতরে ছিলেন। পরে যখন শুনলেন তখন অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। নুহাকে হাসপাতালে আনার পর থেকে আমরা অনেক ভয় আর চিন্তিত ছিলাম। যখন আপা জানলেন নওয়াজ নুহাকে তোমাদের বাড়িতে রেখে গেছে তখন তো আরও অস্থির হয়ে পড়লেন। তাই দেখা না করে থাকতে পারলেন না। আমাদের আসায় তোমাদের খারাপ লাগছে না তো?'
আরিফা বেগম মিষ্টি হেসে বললেন,
' সে কী কথা চাচি আম্মা! খারাপ লাগবে কেনো? এটা তো আপনাদের নাতনির শ্বশুরবাড়ি। মানে ওর নিজের বাড়ি। আপনারা যখন খুশি আসবেন। বরং এসেছেন বলে আমরা ভীষণ খুশি। নাতজামাই দেখতে চাইছিলেন এখন আপনারা নাতজামাইকেও দেখুন পছন্দ হয় কিনা।'
লতিফা বেগম চোখ কুঁচকে আহিরের দিকে তাকালেন।বললেন,
' তা নাতজামাই পড়াশোনা জানে তো?'
আহির খানিকটা অবাক হয়ে তাকালো। তারপর মাথা নাড়লো সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে। আনিকা বেগম বললেন,
' কতদূর পড়েছো বাবা? মেট্রিক পাশ করেছো তো? আমাদের নুহা কিন্তু অনেক দূর পড়ছে। তোমাদের বাড়িতে তো পড়াশোনার জন্যই যাতায়াত শুরু করেছিলো। মাঝখান থেকে তোমার সাথে। যাকগে এসব বাদ দাও। তুমি বলো পড়াশোনা কতদূর করেছো? অবশ্য যদি আংটি সোনার হয় তবে টেঁড়াতেও ক্ষতি কী!'
আহির চোখ তুলে মায়ের দিকে একবার করুণ ভঙ্গিতে তাকাল। পাশে বসা আরিফা বেগম আর আরোশ ঠোঁট টিপে হাসি চাপার চেষ্টা করছে। নওয়াজ আনিকা বেগমকে থামালো। বলল,
' আহ দাদি এসব কীসব প্রশ্ন করছো? ও ডাক্তারি পড়া শেষ করা একজন ডাক্তার।'
লতিফা বেগম চোখ কপালে তুলে বললেন,
ডাক্তার? আচ্ছা তাইলে তো অনেক লেখাপড়া করেছো বাছা! তাহলে তো তোমার বয়স?থাক বয়স-টয়স বাদ দাও। বলো তো তুমি কিসের ডাক্তার? মানে ডাক্তার তো অনেক রকম হয় শুনেছি। এই যেমন গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি আবার মানুষের ডাক্তার।'
নুহার ভীষণ হাসি পেল। তবু আহিরের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনোমতে মুখ শক্ত করে বসে রইল। মনে মনে ভয়ও হচ্ছিল আহির যদি রাগে কিছু বলে বসে! কিন্তু আহির রাগ না করে শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
' আমি আসলে ডাক্তারিটা একটা কারণে মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছি। এখন ছোটখাটো একটা চাকরি করছি। জানি আমি আপনাদের নাতনির যোগ্য নই। তাই…'
আনিকা বেগম সঙ্গে সঙ্গে কথার মাঝেই থামিয়ে দিলেন। মায়াভরা দৃষ্টিতে আহিরের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
' থামো তো বাবা এত কথা বলতে হবে না। নাত জামাই মাশাআল্লাহ সুন্দর আছে। নুহার সঙ্গে মানিয়েছেও দারুণ। কাজ-কর্ম ও তো করছে। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের নাতনীকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। ওরা সুখী হলে আমাদের ও সুখ। তুমি আমাদের কথায় কষ্ট পেয়ো না দাদু। ফায়েজের কথা মনে পুষে আমার নাতনিকে ও কষ্ট দিও না। মেয়েটা ছোটবেলা থেকে মায়ের আদর পায়নি। বাবার আদরও না। অথচ বাবার প্রতি তার ভালোবাসা অফুরন্ত। বাবা বললে জান দিতে প্রস্তুত। তুমি ওর খেয়াল রেখো দাদু।'
আহির মৃদু হেসে মাথা নেড়ে নিশ্চুপ রইল।সন্ধ্যার দিকে ওরা বিদায় নিল। আরিফা বেগম বারবার আটকালেও নওয়াজ থাকতে রাজি হলো না। ওনারা এসেছিলো ফায়েজ ওয়ালীর সঙ্গে মনোমালিন্যের মাঝেই। থেকে গেলে তার রাগ হয়তো আরও বাড়ত তাই দ্রুত ফিরে গেল।
__________
রাতের খাবার শেষ হতেই আহির নিজের ঘরে চলে গেল। বসার ঘরে রয়ে গেল নুহা। সোফায় বসা আরিফা বেগমের কোলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে সে। পাশে বসা আরোশ টিভির দিকে তাকিয়ে ছিলো বিরস মুখে। মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দুঃখভরা চোখে নুহাকে দেখছে।
আরিফা বেগম অনেক বুঝানোর চেষ্টা করলেন তবুও কোনো ফল হলো না। খাবার টেবিলে আহিরের বলা কিছু কথা যেন নুহার বুকটা ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে বারংবার।
তখন টেবিলে বসে আরিফা বেগম যখন হাসিমুখে রউফ মীরের সঙ্গে নুহার দাদিদের কথা বলছিলেন ওরা না থাকার আক্ষেপ করছিলেন। তখন হঠাৎ আহির বলল,
' তাদের তো যাওয়ারই ছিল আম্মু। আমাদের মতো ছোটলোকের বাড়িতে তারা কি থাকতে পারে? কিন্তু আমি একটাই বুঝলাম না তারা নিজেদের দামী রত্ন মানে নাতনীকে কেন রেখে গেল? কার ভরসায়? আমি তো স্পষ্ট বলেই দিয়েছি এই বিয়ে আমি সারাজীবন বয়ে বেড়াতে পারব না। সময় হলে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দেব। আর আমার সিদ্ধান্ত একই আছে। তোমার অসুস্থ মেহমানকে তো এখন বেশ সুস্থই মনে হচ্ছে। তাহলে ওনাকে তার জমিদার বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলে না কেনো?যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে পাঠিয়ে দিও। '
কথাগুলো যেন নুহার বুকের গভীর থেকে সদ্য ফুটতে শুরু করা হাসিটাকেই কেড়ে নিল। কোথাও না কোথাও তার মনে হচ্ছিল আহির হয়তো কেবল অভিমান করছে। সময় হলে তা কাটবেই। কিন্তু সব ভাবনাই মুহূর্তেই মিথ্যে প্রমাণিত হলো। নির্বিকার ভঙ্গিতে উঠে চলে গেল আহির। নুহার জন্য রেখে গেল একরাশ বুকভরা ক্ষত। আরিফা বেগম নুহার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
' দেখো মা সম্পর্কে মান-অভিমান থাকেই। একজন বেঁকে বসলে আরেকজনকে নরম হতে হয়। তুমি যদি একটু ইগো ছাড়ো। দেখবে ধীরে ধীরে মনোমালিন্য মিটে যাবে। কিন্তু দূরে থাকলে দূরত্ব কেবল বাড়বে। তুমি আহিরকে ভালোবাসো তাই না? আমার ছেলেও তোমাকে ভালোবাসে। আর এখন তো তোমরা স্বামী-স্ত্রী। সে মুখে যতই বলুক বিয়ে ভাঙবে। আমি বিশ্বাস করি আহির বিয়েটা ভাঙবে না। ঘরে যাও অনেক রাত হয়েছে।তুমি ও অসুস্থ ঘুমটা জরুরি মা। '
কথাগুলো বলে তিনি আরোশকে জোর করে নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। রয়ে গেল নুহা একা। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর ধীরে ধীরে গিয়ে ঘরে ঢুকল নুহা। ঘরের আলো নিভানো। হালকা ড্রিমলাইটের আলোয় দেখা গেল আহির বিছানায় ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে। মনে হলো ঘুমিয়ে পড়েছে। নুহা মাথা উচিয়ে দেখলো আহির ঘুমিয়ে। নুহা আস্তে করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। কাঁপা হাতে আহিরকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার পিঠে মাথা ঠেকিয়ে ফুফিয়ে কেঁদে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেকে সামলে উঠে পড়ল। ধীর পায়ে গিয়ে সোফায় শুয়ে পড়লো।
পুরোটাই আহির অনুভব করছিল চোখ বন্ধ রেখেই। আহির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকের ভেতরটা অকারণ ভারী হয়ে আসচ্ছে। অতীতের দগদগে ক্ষত। বিশ্বাস ভাঙার কষ্ট। আর অদৃশ্য ভয় তাকে পাথরের মতো করে রেখেছে। তবুও নুহার প্রতি তার মমতা। দুর্বলতা। টান সবকিছু দিন দিন আরও বেড়েই চলেছে। কিছুতেই ঘৃণা আসচ্ছে না।কিছুক্ষণ নীরবে এভাবেই শুয়ে রইল আহির। যতক্ষণ না নুহার কাঁপা কাঁপা নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল। সোফায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা নুহা অবশেষে ঘুমিয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল আহির। নিঃশব্দে হাঁটল সোফার কাছে। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। ম্লান আলোয় নুহার মুখটা দেখে বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল তার। আস্তে করে নিচু হয়ে নুহাকে কোলে তুলে নিল। নুহার মাথা গড়িয়ে এলো আহিরের বুকে। ধীরে ধীরে তাকে খাটের একপাশে শুইয়ে দিল। বিছানার কোণটা ঠিক করে দিয়ে চুপচাপ তার পাশে বসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এরপর ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ল আহির। কিন্তু ঘুম বোধহয় অভিমান করে আসল না তার চোখে।কে জানে আসবে কি না।