#মনের_রঙে_তুমি
#লেখনীতে_সুমনা_সাথী
[২২]
নুহা ধীরে ধীরে চোখ মেললো। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দুগুলো গড়িয়ে পড়তে পড়তে চিবুকে এসে থামলো। পরমুহূর্তেই নিজের করা কাজটা উপলব্ধি করে চমকে উঠলো সে। বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি বেড়ে গেল। আচমকা দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আহির স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। বিস্ময় আর অবিশ্বাস মাখা চোখে নুহার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ঘরে ঢুকে ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো নুহা। ঠোঁটে হাত রেখে শিউরে উঠলো ‘কি করে ফেললাম আমি? আমি কি সত্যিই এমনটা করলাম?’মুহূর্তেই শরীরের প্রতিটি লোম খাড়া হয়ে উঠলো তার। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী নুহার দিকে চেয়ে আছে। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শীতলতা জমে উঠছে।
সময় যেন কচ্ছপের মতো ধীরে ধীরে কাটতে লাগলো। অথচ আহির ঘরে এলো না। নুহার মনে ভয়ের শিহরণ ছড়িয়ে পড়লো। যদি অতিরিক্ত রেগে গিয়ে আর না আসে? নাকি এত বড় ধাক্কা সামলাতে না পেরে মুর্ছা গেছে? এই চিন্তায় আরও অস্থির হয়ে উঠলো।অবশেষে দ্বিধাভরা মন নিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল নুহা। ঠিক তখনই ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো আহির। হৃদস্পন্দন যেন মুহূর্তেই দ্বিগুণ হয়ে উঠলো নুহার। তাড়াহুড়ো করে আবার শুয়ে পড়লো সে। চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো। বুকের ভিতরে এক অদ্ভুত কাঁপন। চোখে চোখ পড়লেই সব ফাঁস হয়ে যাবে। ভয়ের থেকে বেশি লজ্জাটাই গ্রাস করছে ক্রমশো।
চোখ বন্ধ করেও নুহা টের পেলো আহির ধীর পদক্ষেপে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। প্রতিটি পদক্ষেপ তার কানে ধ্বনিত হচ্ছে। প্রতিটি ধ্বনি নুহার বুকের ভেতরের কাঁপন আরও গভীর করে তুলছে। আহির নুহার পাশ থেকে একটা বালিশ তুলে নিয়ে সোফায় চলে গেল। নুহা মাথা উঁচু করে দেখলো আহির সোফায় শোবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হঠাৎ করেই নুহা উঠে গিয়ে আহিরের হাত থেকে বালিশটা টেনে নিলো এবং ধপ করে সোফায় বসে পড়লো। আহির ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই নুহা মুখ ঘুরিয়ে হালকা রাগী সুরে বলল,
"কি এমনভাবে তাকাচ্ছেন কেনো? আমি আপনার স্ত্রী, কোনো বাঘ-ভালুক নই যে আমার সাথে এক বিছানায় থাকলে আপনাকে টুপ করে গিলে ফেলবো। তাছাড়া বিছানাটা তো আপনারই তাহলে সমস্যা কোথায়?"
আহির শান্ত গলায় বলল, "সমস্যা একটাই। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই না। এটা আর কতবার বলতে হবে? রাতের বেলা শুধু শুধু ঝামেলা বন্ধ করে আমাকে শান্তিতে থাকতে দাও। হাতজোর করছি তোমার কাছে, প্লিজ।"
নুহা নিরীহ মুখ করে বলল, "তাহলে ব্যাপারটা সহজ। হয় আপনি আমার সাথে বিছানায় থাকবেন নয়তো একদমই শান্তিতে থাকতে পারবেন না।"
আহির ভ্রু কুঁচকে তাকালো, "মানে?"
নুহা একটু ভাবুক ভঙ্গিতে বলল, "মানে আমি আন্টিকে ফোন করে বলে দেব আপনি আমাকে একা পেয়ে অত্যাচার করেছেন। আমার সাথে খারাপ আচারন করেছেন। আমাকে কষ্ট দিয়েছেন।আমাকে...."
নুহা বাকি কথা শেষ করার আগে আহির নুহার হাত থেকে বালিশটা নিয়ে নিলো। অযথা কথা বাড়াতে ইচ্ছে করলো না তার। নয়তো এই মেয়ে কি করে বসবে কে জানে।
আহির হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল, "কে কাকে অত্যাচার করছে সেটা আল্লাহ ভালো জানে। ঠিক আছে বিছানায় শোবো। তবে শর্ত একটাই খবরদার আমাকে কোনো ভাবেই ছুঁবে না।"
নুহা মুখ টিপে হাসলো। বলল, "আপনি তো একদম বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মতো কথা বলছেন ‘খবরদার ছোঁবেন না! আমাকে ছেড়ে দে শ'য়'তান, আমার দেহ পাবি কিন্তু মন পাবি না!’এই টাইপ কথা। যেন আমি ছুঁলেই আপনার ইজ্জত চলে যাবে।আপনার আর বিয়েই হবে না। অবশ্য প্রথম বউ মানে আমি বেঁচে থাকতে আপনার আর বিয়ে করা ও হবে না৷"
আহির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ নীরবতা কাটার পর নুহা ও আহিরের পাশে শুয়ে পড়লো।একটু পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহিরের বুকে মাথা রাখলো। হালকা জড়িয়ে ধরতেই আহির কড়া চোখে তাকালো।
নুহা নিরীহ মুখ করে বলল, "এভাবে কড়া চোখে তাকাবেন না তো… যেন এখনই খেয়ে ফেলবেন আমাকে। শুনুন একমাত্র বরের বুক থাকতে আমি কেন বালিশ জড়িয়ে ঘুমাবো? আমার পুরো অধিকার আছে। আপনি না চাইলেও কিছু করার নেই। এবার চুপচাপ ঘুমান। আমার প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। আপনার জ্বালাতনে আমি ভুলেই গেছি আমি যে অসুস্থ।"
__________
সকালের মোলায়েম আলো জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকেছে। ধীরে ধীরে চোখ মেলতেই নুহা অবাক হয়ে আবিষ্কার করল সে আহিরের বাহুর ভেতর আবদ্ধ আছে। সাথে সাথেই গত রাতের কথা মনে পড়তেই ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। চোখ ফিরিয়ে দেখল আহির এখনো গভীর নিদ্রায় তলিয়ে আছে। নিশ্চয়ই ঘুমের ঘোরেই ওকে এভাবে বুকে টেনে নিয়েছে। নুহা কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আহিরের ঘুমন্ত মুখের দিকে। কী শান্ত, কী স্নিগ্ধ লাগছে মানুষটাকে! একদম শিশুদের মতো নিশ্চিন্ত ঘুম। এলোমেলো চুলগুলো কপালে ছড়িয়ে আছে। নুহা ধীরে আঙুল বাড়িয়ে তা সরিয়ে দিলো। আহিরের থুতনিতে একটা ছোট কালো তিল আছে। নুহার ইচ্ছে করলো ওই তিল টাতে কড়া একটা চুমু খেতে। নিজের ভাবনায় নিজেই লজ্জা পেল নুহা। মনে মনে নিজেকে খুব করে শাঁসালো তার নির্লজ্জ ভাবনার জন্য। হঠাৎ নুহার ফোন বাজতেই আহিরও অস্থির হয়ে নড়েচড়ে উঠল। নুহা উঠতে চাইলে আহির আধো ঘুমে চোখ খুলে তার মুখের দিকে তাকাল। নুহা বিরক্তির ভান করে বলল,
"অদ্ভুত মানুষতো আপনি। কালকে তো ছুঁতেও চাইছিলেন না আর আজ ছাড়তে চাইছেন না।"
আহির কিছু না বলে হালকা ধাক্কা দিয়ে নুহাকে সরিয়ে উঠে বসল। নুহা আহিরের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ফোনটা রিসিভ করল। ফোনের ওপাশ থেকে আরিফা বেগমের গলা ভেসে এলো,
"নুহা কোথায় তোমরা? এখনো বাড়ির গেট বন্ধ। আমরা তো পৌঁছে গেছি। দরজাটা খোলো মা।"
নুহা ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো প্রায় দশটা বাজে। এতক্ষণ ধরে শুয়েছিল ভাবতেই নুহা অবাক হলো। আহির কেনো তাকে ডাকলো না। বরং তার সাথে শুয়ে ছিলো। আহিরের তো তাড়াতাড়ি উঠার অভ্যাস কে জানে এই লোকের কি হয়েছে। নুহার ভাবনার মাঝে আহিরের বিরক্তি মাখা মুখের দিকে চোখ পড়তেই বলল,
"আবারও এই ভাবে দেখছেন? সকাল সকাল কোথায় প্রেম প্রেম চোখে বউয়ের দিকে তাকাবেন৷ একটু রোমান্টিক হবেন। তা না করে এমন ভাবে তাকিয়ে আছেন যেন কাল রাতে আপনার সাথে খুব খারাপ কিছু হয়েছে। আপনার মতো আনরোমান্টিক, রাক্ষস লোক আমার স্বামী হলো কীভাবে! আপনার বউয়ের কপাল কি খারাপ। আচ্ছা আপনার কি কোনো সমস্যা আছে।"
কথাগুলো এক নাগাড়ে বলছিল নুহা। হঠাৎ আহিরের চোখে চোখ পড়তেই হালকা ধাক্কা খেল নুহা। একটা শুকনো ঢোক গিলল। আহিরের কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পরের মুহূর্তে কিছু বোঝার আগেই আহির নুহাকে একটানে টেনে নিয়ে বিছানায় ফেলে দিল। তার শক্ত বাহুর চাপে নুহা দেয়ালের মতো শক্ত বুকে আটকে গেল। চোখ দুটো নিজের অজান্তেই বন্ধ হয়ে গেল তার। ভয়, লজ্জা আর বুকের ভিতরের অজানা এক কম্পন আচ্ছন্ন করে ফেলল নুহাকে।কিছুক্ষণ পরে সাহস করে নুহা চোখ মেলতেই দেখল আহিরের মুখ একদম তার মুখের উপর। এতটা কাছে যে আহিরের প্রতিটি শ্বাস সে অনুভব করতে পারছে নিজের গালে,ঠোঁটে। আহিরের উষ্ণ নিঃশ্বাসে গা শিউরে উঠছে নুহার। আহির ধীরে মাথা আর একটু নামিয়ে আনলো। ফুঁ দিয়ে নুহার মুখে-চোখে পড়ে থাকা কয়েকটি চুল সরিয়ে দিল। গাঢ় কন্ঠে বলল,
"কি যেন বলছিলে? বলো আমি শুনছি। এখন হঠাৎ থেমে গেলে কেনো?"
আহিরের আরো একটু ঘনিষ্ট হতেই নুহার বুকের ভেতরটা প্রচণ্ড শব্দে ধকধক করতে লাগলো। এত জোরে বুক ধুকপুক করছে যে মনে হচ্ছে চারপাশ সবাই শুনে ফেলবে। হাত দুটো অজান্তেই কাঁপতে শুরু করল। আঙুলগুলো আঁকড়ে ধরলো বিছানা চাঁদর। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। নুহা কাঁপা গলায় কোনোমতে বলে উঠল,
"আ...আন্টি নিচে অপেক্ষা করছে। আমাকে যেতে হবে..."
আহির তখনো ভ্রু কুঁচকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখে কিছুটা বিরক্তি। নুহাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে বসলো। একমুহুর্ত দেরি না করে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল। বলল,
"পরের বার আর এমন দুঃসাহস করবে না। আমি অনেক সহ্য করেছি তোমাকে আর না৷ আর আমাকে উস্কিও না ভোগান্তি তোমারই হবে।"
___________
রাতে বাড়িতে ছোটখাটো এক আয়োজন করেছিলেন রউফ মীর। ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে।উদ্দেশ্য নুহাকে সবার সাথে পরিচয় করানো এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আহিরের বিয়ের কথা ঘোষণা করা।
আয়োজনের আগে থেকেই ব্যস্ত ছিলেন আরিফা বেগম। নুহার জন্য রেখে গেছেন মেরুন রঙের ওপর সোনালি সুতোয় কাজ করা একটি শাড়ি। একটু পর নিজেই নুহাকে শাড়িটা পরিয়ে দিয়ে গেলেন। নাকে হালকা ঝলমলে ডায়মন্ডের নাকফুল। গলায় পাথরের সরু নেকলেস। কানে মিলিয়ে দুল আর দুহাত ভর্তি চুড়ি। সব মিলিয়ে অপূর্ব সুন্দর লাগছে নুহাকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নুহা নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো এ যে অন্য কেউ! নিজেকেই যেন চিনতে পারছিল না।
ধীরে ধীরে পা ফেলে নিচে নামতেই দেখলো চারপাশে অতিথিদের কোলাহল। হাসি-আড্ডার শব্দ কানে এলো। নুহা প্রথমেই আহিরকে খুঁজতে শুরু করলো। চোখে পড়লো একটু দূরে আহির তার বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে। বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে তাকে। অথচ কিছুক্ষণ আগেও তো আরিফা বেগমের সঙ্গে অনুষ্ঠান নিয়ে তুমুল ঝগড়া করছিল! মানে বিষয়টা এমন যে আমি কলা খাব না কিন্তু ছিলে দিলে চুপচাপ খেয়ে ফেলবো। নুহার মনে খটকা লাগলো। বিরক্তিও হলো। আর সেই বিরক্তি যেন হঠাৎ বেড়ে গেল তিনগুণ যখন আহিরের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ে নুহার নজরে পড়লো। মেয়েটাকে চিনতে নুহার বেশি সময় লাগলো না। মেয়েটি বেশ প্রাণবন্ত ভঙ্গিতে হাসছে আর আহিরও অনায়াসে কথায়-হাসিতে সাড়া দিচ্ছে। নুহার বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত কেমন একটা চাপা আগুন দপদপ করে উঠলো।