ফন্ট সাইজ:
থিম:
অধিনায়ক সাদমান শেখ

৫ম পর্ব

লেখক: আরিভা
পর্ব : ০৫
দুপুরের রোদের তেজ যখন চড়তে শুরু করেছে, তখন মাহমুদ শেখ নিবাসের চারপাশটায় এক অন্যরকম ব্যস্ততা। সচরাচর এই প্রাচীন বাড়িতে এত মানুষের ভিড় দেখা যায় না। কিন্তু আজ ঈদের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই বাড়িটা যেন মেহমানদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে। সাদমানের দুই ফুফু, ফুফা, আর খালা সিতারা পারভীন—সবাই মিলে বাড়িটাকে জমজমাট করে রেখেছেন। বড়রা সবাই নিচতলার প্রশস্ত ঘরগুলোতে অবস্থান করছেন, আর কাজিনরা সব দখল করে নিয়েছে সাদমানের ঘরের পাশের রুমগুলো।
নিচতলার ডাইনিং টেবিলে মহিমা বেগম আর বাড়ির দুই সাহায্যকারী মিলে খাবার সাজানোর এলাহি কাণ্ড করছেন। একে একে সবাই এসে টেবিলে আসন গ্রহণ করলেন। কিন্তু সাদমানের আসার কথা সবার আগে, সেই সাদমানের টিকিটিরও দেখা নেই। মহিমা বেগম একাধিকবার ওপরের তলায় ডেকে পাঠিয়েছেন, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই।
পরিবারের পুরোনো ও কঠোর নিয়ম মেনে খাইরুল সাহেব বাড়িতে উপস্থিত সবাইকে নিয়ে একসুরে, একসাথে খাবার খাওয়ার অভ্যাস বজায় রেখেছেন। সাদমান যথারীতি দেরি করায় তাঁর কপালে সুক্ষ্ম বিরক্তির রেখা ফুটে উঠল। গম্ভীর গলায় তিনি বলে উঠলেন, — "ছেলেটার স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হলো না! একটা কাজের দিনেও তাকে সময়মতো পাওয়া যায় না।"
ঠিক সেই মুহূর্তেই রাজকীয় সিঁড়ি দিয়ে মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে এলোমেলোভাবে ঠিক করতে করতে নিচে নেমে এল সাদমান। সোজা গিয়ে বসল সুনেহরার ঠিক পাশের খালি চেয়ারটায়। খাইরুল সাহেব আর কোনো কথা বাড়ালেন না, বিসমিল্লাহ বলে সবাই খাওয়া শুরু করে দিলেন।
এদিকে সাদমানকে নিজের এত কাছে এসে বসতে দেখে সুনেহরার বুকটা হঠাৎ কেমন যেন দুলে উঠল। সকালের সেই আকস্মিক ঘটনার লজ্জা যেন আষ্টেপস্টে ধরেছে তাকে। দৃষ্টি নামিয়ে সে প্লেটের ভাত-মাংস চামচ দিয়ে শুধু অকারণে নাড়তে লাগল, মুখে টু শব্দটিও নেই।
সাদমান বাঁকা চোখে তার দিকে তাকিয়ে আলতো করে তার মাথায় একটা মৃদু টোকা দিল, — "এই, প্লেটের খাবার এভাবে নষ্ট করছিস কেন রে? কোন ধ্যানে ডুবে আছিস? তাড়াতাড়ি খা।" খুব ছোট ও আমতা আমতা গলায় সুনেহরা শুধু বলল, — "খাচ্ছি তো!"
খাওয়া চলাকালীন হঠাৎ করেই সুনেহরা ও রবিনের বাবা লিয়াকত সাহেব টেবিলের পরিবেশ হালকা করে বলে উঠলেন, — "ভাইজান, আমরা কাল সকালেই বাড়ির পথে রওনা দেব ভাবছি।"
চমকে উঠে খাইরুল সাহেব বললেন, — "সে কী! এত তাড়াহুড়ো করছ কেন? এলে তো মাত্র দুদিন হলো, আরও কিছুদিন থেকে যাও না!" — "না ভাইজান, কোম্পানিতে বেশ কিছু জরুরি ঝামেলা তৈরি হয়েছে। নিজে গিয়ে সামলাতে না পারলে বড় লস হয়ে যাবে।" খাইরুল সাহেব আর জোরাজুরি করলেন না, শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, — "আরেকটা দিন থাকলে বেশ ভালো লাগত।"
লিয়াকত সাহেবের কথা শেষ হতে না হতেই ইকবালের বাবা হোসাইন সাহেবও যোগ করলেন, — "ভাইজান, আমার অবস্থাও একই। ডিফেন্সে চাকরি করি তো, চাইলেই কি আর লম্বা ছুটি মেলে? অনেক কষ্টে এই কদিনের ছুটি ম্যানেজ করে এসেছি।" চারপাশের সবার কথা শুনে খাইরুল সাহেব মৃদু হেসে বললেন, — "একি ব্যাপার! আজ দেখছি সবারই বাড়ি ফেরার হিড়িক পড়ে গেছে!"
তখনই ইকবাল বলে উঠল, — "বাবা, তোমরা যাও! আমি আরও কিছুদিন এখানে থাকব।" হোসাইন সাহেব অনুমতি দিয়ে বললেন, — "আচ্ছা, থাকিস সমস্যা নেই। তবে বেশি দিন আয়েশ করিস না, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস; তোর আম্মু আর ছোট ভাইবোন বাড়িতে একা থাকবে।"
লিয়াকত সাহেব এবার পাশ ফিরে সুনেহরার দিকে তাকালেন, — "সুনেহরা মা, তুমি কি আমাদের সাথেই ফিরছ, নাকি এখানে থেকে যাবে?"
বাবার এই হঠাৎ প্রশ্নে যেন হুশ ফিরল সুনেহরার। চমকে উঠে সে বলল, — "হ্যাঁ আব্বু? কী বলছ? বুঝতে পারিনি।" — "মনটা কোথায় উড়ে গেছে তোমার? বলছিলাম, আমাদের সাথে বাড়ি যাবে নাকি এখানেই থেকে যাওয়ার ইচ্ছে?" বিনা বাক্যব্যয়ে সুনেহরা মুখ ফুলিয়ে বলে বসল, — "না, আমি যাব না! আমার আসল বাড়ি তো এটাই, আমি এখানেই থাকব। কোথাও যাচ্ছি না।"
লিয়াকত সাহেব হেসে ফেলে বললেন, — "কেন রে মা? বাড়ির ওপর এত রাগ কিসের?" অভিমানের সুর চড়িয়ে সুনেহরা বলল, — "বাড়িতে থাকলে কি তোমরা কেউ আমাদের সাথে দুটো কথা বলার সময় পাও? সারাক্ষণ তুমি অফিসে পড়ে থাকো আর আম্মু স্কুলের ঝামেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। একা একা আমার ভীষণ বোরিং লাগে, তাই আমি যাচ্ছি না।"
মেয়ের কথা শুনে খাইরুল সাহেব উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন, — "একদম খাঁটি কথা বলেছে মামুনি! এটাও তো তোরই বাড়ি, তুই এখানেই আমাদের সাথে থাকবি। সারাক্ষণ মামির সাথে গল্প করবি, আর পাহারা দেওয়ার জন্য তো তোর ভাই সাদমান আছেই!" — "হ্যাঁ মামা, আমি কোথাও নড়ছি না, এখানেই থাকব!"—দৃঢ় গলায় ঘোষণা দিল সুনেহরা।
রবিনও সুযোগ বুঝে বলে উঠল, — "বাবা, ইকবাল যখন থাকছে, আমিও কিছুদিন থেকে যাই। সব কাজিনরা মিলে একসঙ্গে বেশ ভালোই তো কাটছে সময়টা।"
রবিন ও সুনেহরার মা জোসনা বেগম তখন একটু বাঁকা হাসি হেসে বললেন, — "তোরা পোলাপান কি কোনো গোপন চুরির ফন্দি আঁটছিস নাকি রে? আসার পর থেকেই খেয়াল করছি তোদের সবার চেহারায় কী এক রহস্যময় গাম্ভীর্য!" খাইরুল সাহেব তাদের আশ্বস্ত করে বললেন, — "আরে জোসনা, ওরা তো সবে রক্ত গরমের পোলাপান। সমবয়সী একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, একসঙ্গে আড্ডা দেবে—এটাই তো স্বাভাবিক।"
দুপুরের ভারী খাওয়া শেষে সবাই যে যার রুমে বিশ্রাম নিতে চলে গেল। পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘড়ির কাঁটায় ঠিক বিকেল চারটা বাজতেই সবাই এসে হাজির হলো সাদমানের ঘরে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! সাদমান তখনো বিছানায় শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দুপুরে খেয়ে আসার পর রাতের সেই ধকলের কারণে তার আর চোখেই পলক পড়েনি।
তিতলি বিরক্তিতে নাক সিঁটকে বলে উঠল, — "সবাইকে একদম চারটায় রেডি থাকতে বলে রাজা বাহাদুর নিজে এখন ঘুমাচ্ছে!" সুনেহরা রাগ দেখিয়ে ফোঁড়ন কাটল, — "শয়তানদের ঘুম একটু বেশিই হয় জানিসনা তিতলি?"
বলেই সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করল না। সোজা গিয়ে সাদমানের বিছানার কিনারায় বসল এবং তার প্রশস্ত বুকে হাত রেখে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ডাকতে লাগল, — "সাদমান! এই সাদমান, ওঠ বলছি!" — "হু..."—ঘুমজড়ানো ভারী গলায় অস্পষ্ট স্বরে সাড়া দিল সে। — "চারটা বেজে গেছে! ভুলে গেছ প্রফেসরের কাছে যেতে হবে? তাড়াতাড়ি ওঠ বলছি!"
'প্রফেসর' শব্দটা কানে যাওয়া মাত্রই যেন বিদ্যুতের শক খেলো সাদমান। এক লাফে বিছানা ছেড়ে একদম সোজা হয়ে বসে পড়ল সে। — "বলিস কী! চারটা বেজে গেছে? উফ, বুঝতেই পারিনি একটু শুয়েছিলাম আর অমনি কেমন যেন ঘুম এসে গেল! তোরা একটু দাঁড়া, আমি বাথরুমে গিয়ে মুখটা ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসছি। আর শুন সুনেহরা, আলমারি থেকে আমার একটা প্যান্ট আর শার্ট বের করে দে তো!"
কথাটা শেষ করেই সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে তাড়াহুড়ো করে বাথরুমের দিকে ছুটে গেল। সুনেহরা এগিয়ে গেল সাদমানের বিশাল  আলমারির দিকে। সাদমানের স্বভাব সে খুব ভালো করেই জানে—তার ঘরের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার চেয়ে ছড়ানোর হাতটাই বেশি পাকা। আলমারি খুলে সে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে মনে মনে ভাবতে লাগল—আজ কোন পোশাকে তাকে সবচেয়ে বেশি ভাল লাগবে? 'কালো প্যান্ট আর সাদা শার্ট—ব্যস, এর চেয়ে পারফেক্ট আর কিছু হতে পারে না!' বিড়বিড় করে নিজের পছন্দমতো একটি ঝকঝকে সাদা কলারের শার্ট ও কালো গ্যাবার্ডিন প্যান্ট বের করে সে বিছানার ওপর সুন্দর করে রাখল।
কিছুক্ষণ পর বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে সাদমান সুনেহরার বের করে দেওয়া সেই পোশাকটিই পরে নিল। এরপর আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সবাই মিলে গাড়িতে চেপে বসল প্রফেসরের সেই পুরোনো ঠিকানার উদ্দেশ্যে।
পুরোনো খামে ঠিকানাটা দেওয়া ছিল হাটহাজারী উপজেলার জবরা অঞ্চলের একটি নিরিবিলি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টের সামনে। গাড়ি এসে গন্তব্যে থামতেই সবাই একে একে নেমে পড়ল। সাদমান এগিয়ে গিয়ে গেটের সামনে দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ডকে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল, — "আঙ্কেল, এখানে কি প্রফেসর ফয়েজ আব্বাস সাহেব থাকেন?" — "হ্যাঁ বাবা, উনি  এখানেই থাকেন। তোমরা কারা বলো তো?" — "আমরা ফয়েজ সাহেবের এক পুরোনো বন্ধুর নাতি-নাতনি। ওনার সাথে কি একটু দেখা করা যাবে?" — "হুম, দেখা তো করতে পারবে, তবে ওনার শরীর খুব একটা ভালো নেই। অনেক বছর ধরে তিনি ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না, হুইলচেয়ারেই কাটে দিন।" ইকবাল এগিয়ে এসে বলল, — "কোনো সমস্যা নেই আঙ্কেল, আমরা শুধু ওনার সাথে একটু জরুরি কথা বলেই চলে আসব।" — "আচ্ছা, এসো আমার সাথে। উনি চারতলায় থাকেন, রাস্তা তো তোমরা চিনবে না।"
সিকিউরিটি গার্ডের পেছনে পেছনে সিঁড়ি বেয়ে তারা উঠে গেল চারতলার সেই নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের সামনে। গার্ড সাহেব তাদের পৌঁছে দিয়ে নিজের ডিউটিতে ফিরে গেলেন। সুনেহরা একটু এগিয়ে গিয়ে কলিংবেলের সুইচ টিপল। দুবার মৃদু রিং হওয়ার পর ভেতর থেকে দরজা খোলার আওয়াজ এল। দরজা খুলে দিলেন বয়োবৃদ্ধ এক নারী। সবাই একসাথে শ্রদ্ধার সাথে তাদের সালাম জানাল। — "ওয়ালাইকুম আসসালাম! তোমরা কারা ? কাকে চাচ্ছ?" সুনেহরা মিষ্টি হেসে বলল, — "আমরা কি প্রফেসর ফয়েজ আব্বাস সাহেবের সাথে একটু দেখা করতে পারি?" — "হ্যাঁ, উনি ভেতরের ঘরেই আছেন। কিন্তু ঠিক চিনলাম না তো তোমাদের?" — "আমরা প্রফেসর সাহেবের বন্ধু মাহমুদ শেখের নাতি-নাতনি।"
বৃদ্ধা মহিলা কিছুটা সময় থমকে থেকে বললেন, — "মাহমুদ শেখ... নামটা বেশ চেনা চেনা মনে হচ্ছে, অথচ ঠিক মেলাতে পারছি না..." সুনেহরা একটু চোখের ইশারা করে মিষ্টি হেসে বলল, — "আপনি নিশ্চয়ই আমাদের দাদি হন, তাই না?" বৃদ্ধার মুখের জাদুকরী হাসিতে চারপাশটা যেন আলো হয়ে উঠল, — "হ্যাঁ রে! আমিই তো তোদের দাদি। বাইরে দাঁড়িয়ে রইলি কেন, আয় ভেতরে আয়।"
তিনি সবাইকে প্রশস্ত ড্রয়িংরুমে নিয়ে বসালেন। পুরো ফ্ল্যাটজুড়ে এক অদ্ভুত, গা ছমছমে নিস্তব্ধতা—যেন বাড়ির আর কোথাও কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। কিছুক্ষণ পর গৃহপরিচারিকা এক তরুণী মেয়ে সবার জন্য চায়ের ট্রে নিয়ে হাজির হলো। প্রফেসরের সহধর্মিণী রহিমা খাতুন।
চা খাওয়ার ফাঁকে রহিমা খাতুন আস্তে আস্তে ফয়েজ সাহেবের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। ঘরটি বেশ বড়সড় হলেও অসম্ভব রকমের পরিপাটি। দেয়ালজুড়ে পুরোনো বইয়ে ভরা কাঠের তাক, আর কয়েকটি ফ্রেমে বাঁধানো ঝাপসা পুরোনো ছবি। একটি সাদাকালো ফ্রেমে তরুণ বয়সের ফয়েজ আব্বাসের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় খোদ মাহমুদ শেখকে। জানালার পাশেই রাখা একটি পুরোনো কাঠের টেবিল, যার ওপর বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে ধুলোবালি জমা মোটা বই ও খসড়া গবেষণাপত্র।
জানালার ঠিক পাশেই হুইলচেয়ারে বসে আছেন প্রায় ৮০ বছর বয়সী  প্রফেসর ফয়েজ আব্বাস। বয়সের ভারে শরীর ন্যুব্জ, মাথার চুলগুলো বরফের মতো সাদা, চোখে মোটা ফ্রেমের রিডিং গ্লাস। শরীর বেশ দুর্বল হলেও তাঁর চোখের দুটো মনি এখনো অসম্ভব রকমের তীক্ষ্ণ ও জীবন্ত। রহিমা খাতুন কাছে গিয়ে নরম সুরে ডাকলেন, — "শুনছ? তোমার সাথে দেখা করতে কিছু ছেলেমেয়ে এসেছে।" ধীরে ধীরে মাথা তুললেন প্রবীণ প্রফেসর, — "কারা?" — "তোমার সেই পুরোনো বন্ধু মাহমুদ শেখের নাতি-নাতনিরা।"
'মাহমুদ শেখ' নামটি কান পর্যন্ত পৌঁছানোর সাথে সাথেই বৃদ্ধের ঝাপসা চোখে এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ খেলে গেল। বেশ কয়েক মুহূর্ত তিনি কোনো কথাই বললেন না, তারপর অত্যন্ত কাঁপা কাঁপা গলায় বিড়বিড় করে উঠলেন, — "মাহমুদ...?" রহিমা খাতুন মাথা নেড়ে সায় দিলেন, — "হ্যাঁ, ওরা সেটাই বলছে।"
ফয়েজ আব্বাস কিছুক্ষণ জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে অত্যন্ত ধীরেসুস্থে বললেন, — "তাহলে... এত বছর পর ওদেরর পরিবারের কেউ তবে আমার কাছে এসে পৌঁছাল!" অবাক হয়ে স্ত্রী বললেন, — "তুমি কি ওদের চিনতে পেরেছ?" বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন, — "ওদের হয়তো আমি আজ চিনব না। কিন্তু মাহমুদকে চিনতাম। খুব ভালো করেই চিনতাম।" হঠাৎ নিজের সামনের টেবিলের দিকে তাকিয়ে তিনি ফিসফিস করে বললেন, — "ওরা কি সেই বইটি সাথে এনেছে?" রহিমা খাতুন কিছুটা থমকে গেলেন, — "কোন বইয়ের কথা বলছ তুমি?"
ফয়েজ আব্বাস আর কোনো উত্তর দিলেন না, শুধু হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, — "যাও, আর দেরি কোরো না, ওদের ভেতরে নিয়ে এসো।"
ড্রয়িংরুমে ফিরে এসে রহিমা খাতুন সবার উদ্দেশ্যে স্নেহের সুরে বললেন, — "তোমরা সবাই চা খেয়েছ তো বাবা?" — "হ্যাঁ দাদি, খেয়েছি। দাদু কি এখন আমাদের সাথে দেখা করবেন?"—উৎসুভাবে জিজ্ঞেস করল তিতলি। — "হ্যাঁ, তোমাদের দাদুই তো ডাকছেন ভেতরে। আমার পেছনে পেছনে আসো।"
সবাই রহিমা খাতুনের পেছন পেছন হেঁটে ফয়েজ সাহেবের সেই নির্দিষ্ট কক্ষে প্রবেশ করল। ঘরের কোণায় জানালার পাশে হুইলচেয়ারে বসা প্রফেসর সাহেবকে দেখে সবাই সম্মান জানিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে গেল। ফয়েজ সাহেব হাত নেড়ে সবাইকে বসার ইশারা করলেন। রহিমা খাতুন পাশের রুম থেকে বেশ কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার এনে সবাইকে বসতে বললেন এবং নিজে গিয়ে খাটের কিনারায় বসলেন।
সবাই প্রবীণ প্রফেসরকে সালাম জানাল। — "ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছো তোমরা সবাই?" — "আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি দাদা।"
ফয়েজ সাহেব অত্যন্ত গভীরভাবে সবার মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে জানতে চাইলেন, — "তোমাদের মধ্যে মাহমুদ শেখের  বংশধর কে কে আছ?" সুনেহরা একটু এগিয়ে গিয়ে সাদমানকে হাত দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলল, — "দাদা,  এখানে শেখ বাড়ির একমাত্র রক্ত বা বংশধর হলো এই সাদমান শেখ। আর আমরা বাকিরা সবাই মাহমুদ নানার মেয়ের ঘরের নাতি-নাতনি।"
প্রফেসর ফয়েজ আব্বাস মৃদু হেসে দেওয়ালের দিকে আঙুল বাড়ালেন, — "সাদমান! দেয়ালে থাকা ছবিটা দেখেছ? ওটা ১৯৭০ সালের ছবি—আজ থেকে প্রায় ৫৪ বছর আগের। তোমার দাদু তখন আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছিল, তখনই আমরা একসাথে এই ছবি তুলি। তুমি অবিকল তোর দাদার মতো দেখতে হয়েছ। তবে হ্যাঁ, জমিদারের রক্ত বলে কথা, চোখের সেই তেজ আর দীপ্ততা ঠিকই দাদার মতো বজায় রেখেছ!"
কথাটা বলে তিনি একচিলতে মৃদু হাসলেন। এরপর তাঁর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সাদমানের হাতে থাকা সেই কালো কভারের প্রাচীন বইটির ওপর। অত্যন্ত তীক্ষ্ণ গলায় তিনি প্রশ্ন করলেন, — "কী ব্যাপার সাদমান, তোমরা কি সেই হারিয়ে যাওয়া 'হেরিফেলো'র রহস্য ভেদ করতে এসেছ, নাকি শুধুই তোমার দাদা মাহমুদ শেখের ফেলে আসা বর্ণাঢ্য অতীত জানতে এসেছ?"
সাদমান এক মুহূর্তের জন্যও প্রফেসরের চোখ থেকে নিজের দৃষ্টি সরাল না, অত্যন্ত দৃঢ় ও স্পষ্ট গলায় জবাব দিল, — "দুটোই, দাদা! কারণ হেরিফেলোর ইতিহাসের সাথে আমার দাদা মাহমুদ শেখের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যা না জানলে এই রহস্যের সমাপ্তি কখনো হবে না।"
[ চলবে......]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন