ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ চৈত্রের মৃদু ছোঁয়া

৫ম পর্ব

লেখক: আফরিনা আক্তার সুইটি

গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া

লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি

পর্বঃ ০৫

🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫

এই মুহূর্তে সবাই ডাইনিং টেবিলে বসে খাচ্ছে। শুধু এখনো আইলিন আসেনি। কেউ অফিসে যাবে, কেউ আবার ভার্সিটিতে। নিশি ও নিভান—দুজনেই ভার্সিটির শিক্ষার্থী। নিশি নিভান তৃতীয় বর্ষে পড়ে আর আইলিন প্রথম বর্ষের ছাত্রী।

সবাই খেতে ব্যস্ত, এমন সময় আইলিন এসে উপস্থিত হলো। সে সোজা তিশা বেগমের কাছে গিয়ে বলল—

— “মা, আমি এখন কিছু খাবো না। ভার্সিটির ক্যানটিনে খেয়ে নেব। এখন আমি আসি।”

তিশা বেগম হাতের বাটিটা নামিয়ে রেখে অবাক কণ্ঠে বললেন—

— “এ কী আইলিন মা! এভাবে না খেয়ে যেতে পারবে না। দেখো, সবাই খাচ্ছে। তুমিও বসে পড়ো।”

নাহিদ মির্জা খেতে খেতেই হালকা হাসি দিয়ে বললেন—

— “আইলিন মা, তোমার কি আমাদের সাথে ভালো লাগছে না? তাই খেতে চাচ্ছো না?”

আইলিন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—

— “না না বাবা, তেমন কিছু না।”

ঠিক তখন মুনিরা বেগম আইলিনের কাছে এসে বললেন—

— “নিশি আর নিভানও তো ভার্সিটিতে যাবে। তোমরা তো একই ভার্সিটিতে পড়ো, একসাথেই যাবে। তাছাড়া ত্রিয়াশও তো সেই ভার্সিটির লেকচারার। এখন বসে খেতে শুরু করো।”

কি আর করার! ইচ্ছে না থাকলেও আইলিনকে বসতেই হলো।

কিন্তু তার মাথার ভেতর তখন অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কী করে সবাইকে বোঝাবে—পৃথা তার জন্য অপেক্ষা করছে! এমনিতেই পৃথা এখনো জানে না যে আইলিনের বিয়ে হয়ে গেছে। যদি একবার জানতে পারে, তাহলে এই মেয়েটা হাজার প্রশ্ন করে করে মেরে ফেলবে। নানা রকম দুশ্চিন্তায় আইলিনের মন ভার হয়ে আছে।

হঠাৎ কারো কথায় আইলিনের হুঁশ ফিরল—

— “বড় খালাম্মা, এটা বুঝি আপনেগো বাড়ির ছোট বউ? মাশাআল্লাহ, খুব সুন্দর।”

আইলিন পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে—একটা মেয়ে, বয়স খুব বেশি না, প্রায় নিয়তির বয়সী। আইলিনের দিকে তাকিয়ে মেয়েটা হাসিমুখে বলল—

— “ছোট ভাবি, আমি জরিনা। এই বাড়িতে কাজ করি। ছুটিতে গেছিলাম, তাই আপনাগো বিয়াতে থাকতে পারি নাই।”

আইলিন মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। জরিনা আরও কিছু বলতে যাবে—ঠিক তখনই নিভান বলে উঠল—

— “জরিনা, তুমি চুপ করো। তোমার ভাঙা রেডিও পরে চালু করো। এখন আমরা সবাই ভার্সিটিতে যাবো, শোনার সময় নেই।”

নিভানের কথা শুনে সবাই হালকা হেসে উঠল। সবাই জানে—এই জরিনা একবার কথা শুরু করলে থামার নামই নেয় না। কথা শেষ করতে না পেরে জরিনা মুখ কাচুমাচু করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

খাওয়া শেষ করে ত্রিয়াশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল—

— “তোরা তাড়াতাড়ি আয়। আমি গাড়িতে ওয়েট করছি।”

কোনো রকমে খাওয়া শেষ করে আইলিন প্রায় দৌড়েই বেরিয়ে পড়ল। তার সাথে ছিল নিশি, নিভান আর নিয়তি। নিয়তিকে অবশ্য তার কলেজের সামনে নামিয়ে দেওয়া হবে। যেহেতু সবার পথ একই, তাই তারা একসাথেই বের হয়।

সবাই গাড়িতে উঠে বসেছে—শুধু আইলিন ছাড়া।

আইলিন এখনো গাড়িতে উঠছে না দেখে ত্রিয়াশের ভেতরে ভেতরে বিরক্তি জমতে থাকে। পরিস্থিতি টের পেয়ে নিয়তি জানালা দিয়ে মুখ বের করে আইলিনকে বলল—

— “কি হলো ভাবি? উঠে আসো, নইলে আবার দেরি হয়ে যাবে।”

আইলিন শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

— “তোমরা চলে যাও। আমি একাই যেতে পারবো।”

নিভান ভয়ভীতু গলায় যোগ করল—

— “ভাবি, তাড়াতাড়ি উঠে পড়েন। ভাইয়া রেগে যাচ্ছে।”

কিন্তু আইলিন যেন কারো কথাই কানে তুলল না। আগের মতোই গম্ভীর স্বরে আবার বলল—

— “আপনারা চলে যান। পৃথা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি পৃথার সাথেই যাবো।”

আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ত্রিয়াশ গাড়ির স্টার্ট দিল। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটা সামনে এগিয়ে গেল।

গাড়ির পেছনে তাকিয়ে আইলিন মুখটা একটু মোচড়াল। চোখে-মুখে জমে থাকা অস্বস্তি আর অভিমান একসাথে প্রকাশ পেল।

কিছুটা সামনে এগোতেই সে একটি রিকশা থামাল এবং উঠে পড়ল।

আজ আর রিকশা থেকে নামতে হলো না শিফু কাকার টং দোকানের সামনে। সেখান থেকেই পৃথাকে তুলে দুজনে একসাথে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

কিছু সময়ের ব্যবধানে আইলিন আর পৃথা দুজনেই ভার্সিটিতে এসে পৌঁছাল। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে দুজনে পাশাপাশি হেঁটে ক্লাসের দিকে এগোতে লাগল। চারপাশে পরিচিত ক্যাম্পাসের কোলাহল—ছাত্রছাত্রীদের হাসি, কারও তাড়াহুড়ো, কারও আবার নির্লিপ্ত হাঁটা। এমন পরিবেশের মাঝেই হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ পৃথা কথা বলে উঠল।

—“মনে আছে তো, আজ আহান স্যারের সাথে দেখা করতে যেতে হবে।”

আইলিন একটু থমকে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা দুলিয়ে উত্তর দিল,

—“হুম, মনে আছে।”

কিন্তু তার গলায় একটা অস্বস্তি লুকিয়ে ছিল, যা পৃথার চোখ এড়াল না। পৃথা হঠাৎ করে আইলিনের হাত চেপে ধরে দৃঢ় স্বরে বলল,

—“তুইও কিন্তু আমার সাথে যাবি।”

এই কথাটা শুনে আইলিন যেন আরও অস্বস্তিতে পড়ে গেল। কী বলবে, কীভাবে বলবে—কিছুই ঠিক করে উঠতে পারছিল না। আগের মতো হলে কোনো সমস্যাই ছিল না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা। সে এখন বিবাহিত, তার ওপর তার স্বামী এই ভার্সিটিরই একজন লেকচারার অন্য কেউ না,গোমড়া মুখো নাভিয়ান ত্রিয়াশ মির্জা । এসব কথা পৃথা কিছুই জানে না।

আইলিন চুপ করে আছে দেখে পৃথা আবার জিজ্ঞেস করল,

— “কি হলো? এমন চুপ করে আছিস কেন?”

পৃথার কথায় আইলিন যেন বাস্তবে ফিরে এল। হালকা হাসির চেষ্টা করে সে বলল,

—“আমি গিয়ে কী করব বল তো? তোকে তো পার্সোনালি ডেকেছে। আমি সেখানে গিয়ে কাবাবের হাড্ডি হয়ে কী লাভ?”

আইলিন ভেবেছিল হয়তো এতে পৃথা একটু ভেবে দেখবে। কিন্তু পৃথা কোনো কথাই শুনতে রাজি নয়। সে গম্ভীর মুখে প্রায় আদেশের সুরে বলল,

— “আমি লাভ-লস বুঝি না। তুই আমার সাথে যাচ্ছিস, ব্যাস।”

আর কোনো কথা না বাড়িয়ে পৃথা হনহন করে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল। আইলিন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মনে ভেতর হাজারো প্রশ্ন, দ্বিধা আর অজানা ভয়। তবুও কিছু বলার সাহস পেল না। শেষমেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে-ও পৃথার পিছু পিছু ক্লাসরুমের দিকে হাঁটা ধরল।

পৃথা আর আইলিন আজও ক্লাসরুমের পেছনের সারিতে, তবে এক সিট সামনে বসেছে। এখনো স্যার আসেননি, তাই পুরো ক্লাসজুড়ে যার যার মতো গল্প আর হাসি-ঠাট্টা চলছে। চারপাশের কথাবার্তার বেশিরভাগই ঘুরে ফিরে ত্রিয়াশ স্যারকে নিয়েই।

কেউ বলছে, স্যার নাকি দেখতে খুব স্মার্ট, কারও মতে তার চোখ-মুখে আলাদা একটা আকর্ষণ আছে।কেউ বলছে তার নাকের ডগায় একটা তিল আছে সেখানে চুমু দিতে চায়। এসব কথা শুনে আইলিনের ভেতরটা ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে। অকারণ এই আলোচনা তার একদম সহ্য হচ্ছে না। মনে মনে রাগে ফুঁসতে থাকে সে, কিন্তু মুখে কিছু বলে না।

হঠাৎ করেই ত্রিয়াশ স্যার ক্লাসরুমে ঢুকে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে সব কথাবার্তা থেমে যায়। মেয়েগুলো চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। ত্রিয়াশ স্যার কাউকে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে নিজের কাজে মন দেয় এবং পড়ানো শুরু করে।

কিন্তু পেছনের বেঞ্চে বসে আইলিন আর পৃথা এখনো ফিসফিস করে কথা বলছে। বিষয়টা ত্রিয়াশ স্যারের চোখ এড়ায় না। তিনি হঠাৎ গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠেন

—“মিস পৃথা, আপনি এবং আপনার বান্ধবী দু’জনেই দাঁড়িয়ে থাকবেন। এটা ক্লাসরুম, কোনো পার্ক নয়। ক্লাস ভালো না লাগলে বাইরে চলে যেতে পারেন, কিন্তু ডিস্টার্ব করবেন না। গট ইট?”

পৃথা আর আইলিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ে। ক্লাসের বাকিরা তাদের দিকে তাকিয়ে চাপা হাসি হাসছে। সেই হাসির শব্দ কানে যেতেই ত্রিয়াশ স্যার সবার দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধমক দেন। সঙ্গে সঙ্গে পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ হয়ে যায়।

এরপর আবার পড়ানো শুরু করেন তিনি। কিছুক্ষণ পর পড়ানোর মাঝেই ত্রিয়াশ স্যার আইলিনের কাছে এসে একটি প্রশ্ন করেন। কিন্তু আইলিন উত্তর দিতে পারে না। এতে ত্রিয়াশ স্যারের রাগ চরমে পৌঁছায়। তিনি কড়া গলায় বলেন—

—“ক্লাসে মনোযোগ না দিলে এমনটাই হবে। কাল থেকে পড়া তৈরি করে তবেই আমার ক্লাসে আসবেন। লিভ দ্য ক্লাসরুম নাউ।”

ত্রিয়াশ স্যারের ধমকে আইলিনের চোখে পানি টলমল করে ওঠে। তবু সে নিজেকে সামলে নেয়। কোনো কথা না বলে চুপচাপ ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে যায়। তার পেছন পেছন পৃথাও বেরিয়ে আসে।

পৃথা আর আইলিন মাঠের মধ্যে চলে আসে। পৃথা বলল।

—“ চল, আহান স্যারের সাথে দেখা করে আসি। উনি হয়তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ”

আইলিন এখন মানা করলো না পৃথার সাথে যাওয়ার জন্য রাজি হলো। দুজনের মেঘছোঁয়া নামে একটা ক্যাপেতে যাওয়ার জন্য হাটা ধরলো।

ত্রিয়াশ ক্লাস রুমে থেকে দেখলো আইলিন চলে যাচ্ছে — কোথায় যাচ্ছে সে জানে না।

আইলিন আর পৃথা ক্লাসরুম ছেড়ে চলে গেছে প্রায় দশ মিনিট হয়ে গেছে— সোজা গেটের বাইরে চলে গেছে। ক্লাসের পড়া চললেও ত্রিয়াশের মন আর সেখানে বসে নেই। বোর্ডে লেখা শব্দগুলো চোখে পড়ছে না, মাথার ভেতর বারবার একটা প্রশ্নই ঘুরছ—আইলিন কোথায় গেল?

শেষমেশ ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ত্রিয়াশ ক্লাস শেষ করে দেয়। অন্য শিক্ষার্থীরা যে যার মতো বেরিয়ে যেতে থাকে, কিন্তু ত্রিয়াশ আর দেরি করে না। ক্লাস বাদ দিয়েই সে বেরিয়ে পড়ে আইলিনকে খুঁজতে।

প্রায় আধঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর সে এসে দাঁড়ায় একটি পরিচিত ক্যাফের সামনে। ক্যাফেটার নাম “মেঘছোঁয়া”। ত্রিয়াশ ক্যাফের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। ভেতরে তাকাতেই তার চোখ আটকে যায় এক জায়গায়।

আইলিন সেখানে বসে আছে।

ত্রিয়াশের চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে ওঠে। দৃষ্টিতে জমে ওঠে রাগ, বিরক্তি আর অজানা এক অস্থিরতা। তার হাত দুটো মুঠো হয়ে যায়, নখগুলো তালুর ভেতর গেঁথে যায়। বুকের ভেতরটা রাগে ফুঁসতে থাকে, শ্বাস ভারী হয়ে আসে।

ক্যাফের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে একদৃষ্টিতে আইলিনের দিকেই তাকিয়ে থাকে—

এই প্রথম তার রাগের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে অদ্ভুত এক অস্বস্তি, যা সে নিজেও ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারে না।

চলবে..........

(ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে। সকলে সাপোর্ট করো রেসপন্স করো। গল্প কেমন হয় সেটাও বলো প্লিজ। তোমরা যদি রেসপন্স না করো তারমানে কি আমার গল্প আমিই পড়বো, তোমরা পড়তে চাও না। )

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন