গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ০৭
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
সকালের সোনালি রোদ জানালার ফাঁক গলে এসে আইলিনের চোখে-মুখে পড়তেই সে চোখ কুঁচকে ফেলল। হালকা বিরক্তি নিয়ে রোদ থেকে আড়াল হওয়ার জন্য নিজের মুখটা ত্রিয়াশের বুকে লুকিয়ে নিল। শীতের সকালে এমন নরম উষ্ণতা ছেড়ে উঠতে তার মোটেও ইচ্ছে করছিল না। আজও ত্রিয়াশের ঘুম ভাঙেনি।
গত রাতে আইলিন ঘুমিয়ে পড়ার পর অনেক রাত পর্যন্ত অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল ত্রিয়াশ। দেরিতে ঘুমানোর কারণেই এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সে। এই শীতল সকালে আরাম করে ঘুমানোর লোভ সামলাতে না পেরে আইলিন ত্রিয়াশকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন এই মুহূর্তটা চিরকাল এমনই থাকুক।
ঘুমের মধ্যেই ত্রিয়াশের মনে হলো, তার বুকের ওপর ভারী কোনো কিছু রাখা হয়েছে। শ্বাস নিতে খানিকটা কষ্ট হওয়ায় ধীরে ধীরে তার ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে দেখে, আইলিন তার বুকে মাথা রেখে গভীর ঘুমে মগ্ন। টিশার্টের এক কোণা শক্ত করে মুঠো করে ধরে আছে সে। তার এলোমেলো চুলগুলো ত্রিয়াশের গাল আর গলায় ছড়িয়ে পড়েছে।
এই দৃশ্য দেখে ত্রিয়াশের বিরক্তি তো হলোই না, বরং কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল। ঘুমন্ত আইলিনকে ঠিক যেন আরও কোমল লাগছিল। খুব সাবধানে, যেন তার ঘুম না ভেঙে যায়, ত্রিয়াশ আইলিনের মাথাটা নিজের বুক থেকে সরিয়ে বালিশের ওপর শুইয়ে দিল।
এতক্ষণে ত্রিয়াশ বুঝে গেল, এখন আর তার ঘুম আসবে না। সে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। আজ তার ভার্সিটি নেই —অফডে । ঘরজুড়ে তখনো সকালের নরম আলো ছড়িয়ে পড়ছে। নিজেকে ফ্রেশ করার জন্য ত্রিয়াশ ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
ঝংকার তুলে ফোন বাজতেই আইলিনের গভীর ঘুম ভেঙে গেল। বিরক্তি নিয়ে ধরফর করে উঠে বালিশের পাশ থেকে ফোনটা হাতে নিল। চোখ আধখোলা রেখেই স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল— পৃথা কল করছে।
আইলিনের মনটা সঙ্গে সঙ্গেই খারাপ হয়ে গেল।
ফোনটা ধরতে তার একদমই ইচ্ছে করছিল না। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, এই মেয়ে কল ধরলেই শুরু করবে—একটার পর একটা প্রশ্ন শেষ নেই। আবার কল না ধরলে হাজার বার ফোন দিতেই থাকবে।
উপায় না দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলটা ধরল আইলিন।
আইলিন কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে পৃথা ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল—
— “ওই মাইয়া! ফোন তুলতে এত সময় লাগে? এই জামাইয়ের লগে রোমান্স করছিলি নাকি?”
আইলিন চোখ বন্ধ করে বুঝে গেল—আজ সে কতভাবে পচবে। জামাই নিয়ে এই, জামাই নিয়ে সেই।
আস্তে, নির্লিপ্ত স্বরে বলল—
— “ঘুমাচ্ছিলাম!”
পৃথা হেসে বলল—
— “হ, জানি জানি। এই শোন, তোর ত্রিয়াশ স্যারের সঙ্গে বিয়ে হলো কী করে? আমি তোর একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড, আমাকেও বললি না!”
আইলিন জানতই—এই কথাটাই আসবে।
গতকাল রেস্টুরেন্টে যা হয়েছে, সেটা আর না বললেই নয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল—
— “আমিই তো নিজে জানতাম না… তোকে কী করে বলি?”
পৃথা অবাক হয়ে ।
— “মানে?”
— “মানে-টানে বাদ দে। শোন, তুই আহান স্যারকে বিয়ে করে নে। স্যার তোকে ভালো রাখবে।”
ওপাশ থেকে পৃথার গলা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল—
— “আমি না বললেই কি আর হ্যাঁ বললেই কি। আগামী শুক্রবার আমাদের বিয়ে। বাবার শেষ কথা।”
আইলিন চিৎকার করে উঠল—
— “সত্যি?!”
ঠিক সেই সময় ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এল ত্রিয়াশ।
দেখল আইলিন বিছানায় বসে কারো সঙ্গে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে কথা বলছে।
দু-একটা কথা শুনেই বুঝে ফেলল—পৃথার সঙ্গে কথা হচ্ছে।
ত্রিয়াশ কিছু না বলে নিজের কাজে মন দিল।
আইলিন তখনও ফোনে ব্যস্ত। আনন্দিত কণ্ঠে বলল—
— “তোর বিয়ের কথা শুনে আমার খুব খুশি খুশি লাগছে।”
পৃথা কপাল কুঁচকে বলল—
— “কেন?”
আইলিন মুখ চেপে হাসল—
— “এই শীতে সকালে গোসল করার দিন আসছে তোর?”
ওপাশ থেকে প্রতিবাদ।
— “তুইও তো করিস! হু!”
আইলিন একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
— “শোন, তোকে একটা গান শোনাই।”
পৃথাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চোখ বন্ধ করে গুনগুনিয়ে গান ধরল—
“খুশি খুশি লাগে আমার,
ও ও খুশি খুশি লাগে আমার।
জামাই কাছে আসে না, ভালোবাসে না,
এই শীতের সকালে গোসল করা লাগে না,
খুশি খুশি লাগে আমার!”
গান শেষ হতেই আইলিন চোখ খুলে দেখল—
ত্রিয়াশ ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে, ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
ফোনের ওপাশে পৃথার খিলখিল হাসি শোনা যাচ্ছে।
ত্রিয়াশ কিছু না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ত্রিয়াশ চলে যেতেই ঘরে ঢুকল জরিনা।
হালকা তাড়া দিয়ে বলল—
— “ছোট ভাবি, চলেন খাবার খাবেন। খালাম্মা ডাকছে।”
জরিনা বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে আইলিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল—
— “জরু আপু, উনি কই গেল? আজ তো অফডে।”
জরিনা হেসে উত্তর দিল—
— “ভাই সাহেবের কথা কইতাছেন? আজ বাড়িতেই মিটিং করবে।”
— “মানে?”
— “বড় বড় লোকজন আসবে। কিছু দিন পর পরই তো এমন মিটিং হয়। এই সময় ভাই সবাইকে কড়া নিষেধ করে মোবাইল বন্ধ রাখতে। কোনো টু শব্দও পছন্দ করে না।”
— “ওহ, আচ্ছা। তুমি যাও, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
জরিনা আর দাঁড়াল না। নিচে অনেক কাজ বাকি।
আইলিন তখন বিছানা ছাড়তে গিয়ে দেখল—ত্রিয়াশ ফোনটা রেখে গেছে।
কৌতূহল থেকে ফোনটা হাতে নিল।
দেখে অবাক হলো—লক করা নেই!
দুষ্টু মনে ইচ্ছে মতো ঘাঁটাঘাঁটি করল।
কিন্তু বিশেষ কিছু পেল না।
মন খারাপ করে ফোনটা রাখতে যাবে—হঠাৎ যেন নতুন কিছু মনে পড়ল।
ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্ট হাসি ফুটে উঠল।
তারপর নিজের কাজ শেষ করে ফোনটা আগের জায়গায় রেখে ফ্রেশ হতে চলে গেল।
আইলিন সাদা রঙের একটি চুরিদারি পরে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে। ড্রয়িংরুমে তখন জমজমাট আড্ডা। নিশি, নিয়তি আর নিভান গল্প করতে করতে গরম গরম ভাপা পিঠা খাচ্ছে। আইলিনকে দেখতেই নিয়তি হেসে উঠে তাকে টেনে নিজের পাশে বসায়। আদর করে পিঠা খেতে বলে।
আইলিন পিঠা হাতে নিলেও খেতে মন চায় না। চারপাশে চোখ বুলিয়ে সে দেখে—আইরা শাশুড়িদের সঙ্গে রান্নাঘরে ব্যস্ত। আইলিন জানে, ভাপা পিঠা আইরার খুব প্রিয়। সে আর দেরি না করে একটি পিঠা নিয়ে আইরার কাছে যায় এবং নিজের হাতে তাকে খাইয়ে দেয়।
এই দৃশ্য দেখে ঘরের সবাই মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। কারও চোখে মুগ্ধতা, কারও মুখে মুচকি হাসি। বোনের প্রতি এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে সবার মন ছুঁয়ে যায়।
ঠিক সেই সময় ফোনে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে ত্রিয়াশ। কথা শেষ করে সে এসে নাহিদ মির্জার সামনে দাঁড়ায়।
ত্রিয়াশ জিজ্ঞেস করে,
— “বাবা, মিটিংয়ে কতজন অ্যাটেন্ড করবে?”
নাহিদ মির্জা শান্ত গলায় উত্তর দেন,
— “দশ থেকে বারো জন। সব ব্যবস্থা করা আছে, শুধু তোমার শুরু করার অপেক্ষা।”
ড্রয়িংরুমের পাশেই কাচ দিয়ে ঘেরা একটি মিটিং রুম। বাইরে থেকে ভেতরের উপস্থিতি বোঝা গেলেও, ভেতর থেকে বাইরে কিছুই দেখা যায় না। ত্রিয়াশ মিটিং রুমের দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ নাহিদ মির্জা আবার বলে ওঠেন—
— “শোনো, তোমার বিয়ের খবর সবাই জানে। তাই কেউ গিফট বা শুভেচ্ছা জানালে বিরক্ত হয়ো না।”
ত্রিয়াশ কোনো উত্তর দেয় না। গম্ভীর মুখে সে মিটিং রুমের দিকে এগিয়ে যায়। ভেতরে সবাই আগেই এসে বসে আছে, শুধু তার অপেক্ষা।
।
ত্রিয়াশ মিটিং শুরু করার আগেই কনফারেন্স রুমের দরজা বন্ধ করে দিল। ভারী পর্দা টানা জানালা, ঘন কার্পেট আর সাউন্ডপ্রুফ দেয়ালে বাইরের কোনো আওয়াজ ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই। অথচ ভেতরের প্রতিটি শব্দ পরিষ্কারভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। রুমের পরিবেশটা ছিল যথেষ্ট গম্ভীর, কিন্তু ত্রিয়াশ ঢুকতেই সবাই যেন একটু নরম হয়ে গেল।
কারণ আজকের ত্রিয়াশ আর আগের ত্রিয়াশ নয়—নতুন বিয়ে করা এক সদ্য বিবাহিত পুরুষ।
মিটিং শুরু হওয়ার আগেই একে একে সবাই তাকে অভিনন্দন জানাতে লাগল।
— “কনগ্র্যাচুলেশন, স্যার।”
— “নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা।”
— “দারুণ লাগছে আপনাকে আজ!”
ত্রিয়াশ একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। অফিস আর ব্যক্তিগত জীবন—এই দুটোকে সে সবসময় আলাদা রাখতে পছন্দ করে। তবু ভদ্রতা রক্ষা করে হালকা হাসি দিয়ে, মাথা নেড়ে সবার শুভেচ্ছা গ্রহণ করল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে আগের সেই চেনা কঠোর রূপে ফিরে এল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
“ঠিক আছে, সবাই মনোযোগ দিন। মিটিং শুরু করার আগে একটা কথা পরিষ্কার করে বলি—কারো মোবাইল যেন বেজে না ওঠে। সবাই ফোন সাইলেন্টে রাখবেন। মিটিংয়ের সময় কোনো রকম বিরক্তি আমি চাই না। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
ঘরে একসঙ্গে কয়েকটা মাথা নড়ল।
“ইয়েস, স্যার।”
সবাই দ্রুত নিজেদের ফোন সাইলেন্ট করে রাখল। পরিবেশ আবার নিঃশব্দ ও পেশাদার হয়ে উঠল। ত্রিয়াশ ফাইল খুলে মনোযোগ সহকারে মিটিং শুরু করল।
এই সময় ড্রয়িংরুমে বসে আইলিন সব শুনছিল।
ঘরের ভেতর থেকেও ত্রিয়াশের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট ভেসে আসছিল। আইলিন প্রথমে চুপচাপ ছিল, কিন্তু হঠাৎ তার মাথায় এক দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল।
সে নিঃশব্দে নিজের ফোন হাতে নিল। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ধীরে ধীরে ত্রিয়াশের নাম্বারটা ডায়াল করল।
পরমুহূর্তেই কনফারেন্স রুমের নিস্তব্ধতা চূর্ণ করে ত্রিয়াশের ফোনটা জোরে বেজে উঠল—একেবারে রোমান্টিক, একটু বেশি প্রাণবন্ত এক গান।
****** আমার মন মানে না
******যৌবন জ্বালা সহে না.....
এক সেকেন্ডের জন্য সবাই স্তব্ধ।তারপর শুরু হলো হুলস্থুল। একজন দ্রুত নিজের পকেট হাতড়ে দেখল।
আরেকজন ব্যাগ খুলে ফোন বের করল।
কেউ কেউ অবাক চোখে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল—কার ফোন?
ত্রিয়াশ নিজেও প্রথমে বিশ্বাস করতে পারল না। এত কড়া নির্দেশ দেওয়ার পরও কে এমন সাহস করল?
সে ধীরে ধীরে নিজের পকেট থেকে ফোন বের করল।
তারই ফোন বাজছে।
মুহূর্তেই তার মুখ রাগে টকটকে লাল হয়ে গেল। চোখে-মুখে এমন এক ভাব ফুটে উঠল যে কেউ আর কিছু বলার সাহস পেল না। গান তখনও বাজছে, যেন পরিস্থিতিকে আরও বিব্রতকর করে তুলতেই বদ্ধপরিকর। একটাও কথা না বলে সে ফোন কেটে দিল। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
ফাইল, প্রজেক্টর, সহকর্মী—কিছুই আর তার নজরে নেই। মিটিং না করেই হনহন করে কনফারেন্স রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল ত্রিয়াশ।
ভেতরে সবাই নিঃশব্দে বসে রইল। আর বাইরে ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে আইলিন তখন হাসি চেপে রাখতে ব্যস্ত—দুষ্টুমি যে আজ বেশ সফল হয়েছে। এই গানটা শুনে নিশি নিভান আর নিয়তি হেসে উঠলো। ত্রিয়াশ কে দেখে সকলে হাসি থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো। ত্রিয়াশ যাওয়ার আগে আইলিনের দিকে এমন ভাবে তাকালো যেন চোখ দিয়ে বুঝালো — একা সামনে পায় তখন মজা বুঝাবো।
চলবে.........
[ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই রেসপন্স করো। জানি আমার ফলোয়ার্স কম তবুও যারা দেখো তারা রিয়েক্ট করো পাশে থাকো প্লিজ। গল্প সম্পর্কে কিছু বলো।]