ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ চৈত্রের মৃদু ছোঁয়া

১০ম পর্ব

লেখক: আফরিনা আক্তার সুইটি

গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া

লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি

পর্বঃ ১০

🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫

বাবার বাড়িতে এসে একটু শান্তিতে ঘুমিয়ে ছিল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে আইলিন, এরপর পৃথাকে নিয়ে, সাড়ে আটটার মধ্যে ভার্সিটির পথ ধরল। ক্লাসে পৌঁছে বসার পরেই তার মনে ধুকপুক করছে—আজ তাদের ক্লাস পরীক্ষা আছে, ত্রিয়াশের বিষয়।

আইলিনের একটুও মনে করতে পারেনি যে আজ পরীক্ষা। গতকাল ক্লাসে ত্রিয়াশ বলেছিল, “আজ পরীক্ষা নেওয়া হবে, যা পড়ানো হয়েছে, তা-ই বিষয়।” কিন্তু আইলিন একটুও প্রস্তুত নয়। কী লিখবে, কীভাবে শুরু করবে, সবই অজানা। তার মনে হচ্ছে, আজ ভার্সিটিতে আসাই যেন ভুল হয়েছে ।

ঠিক সেই সময় ত্রিয়াশ হাতের খাতা ও প্রশ্নপত্র নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করল। একবার ক্লাসের সবাইকে ঘেঁটে দেখে, সে একে একে সবাইকে আলাদা আলাদা স্থানে বসাল। আইলিন এবং পৃথা আলাদা হলে আইলিনের ভয় আরও বাড়ল। যদি পৃথার পাশে বসে থাকত, অন্তত দু’জনে একে অপরকে দেখাদেখি করতে পারত। এখন সে একাকী, প্রশ্নপত্রের সামনে, নিজের অজান্তেই আতঙ্কে ঢেকে গেছে।

প্রত্যেকটি মুহূর্ত যেন আইলিনের হৃদয়ে আরও ভয় এবং দুশ্চিন্তার ছায়া ফেলছে। আজ যদি পরীক্ষায় না পারে তাহলে ত্রিয়াশ কি ভাববে নাকি বাড়ি গেলে বকবে। আইলিন আর দুশ্চিন্তা না করে যা পারছে তাই লিখতে শুরু করলো।

যেহেতু এটা ফুল মার্কসের পরীক্ষা নয়, এক ঘন্টার মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেছে। সকলকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে আজই রেজাল্ট দেওয়া হবে। ক্লাসরুমে এখন এক ধরনের নিস্তব্ধ উত্তেজনা—সকলে নিজের খাতার রেজাল্ট শোনার জন্য অপেক্ষা করছে।

ত্রিয়াশ একে একে শিক্ষার্থীদের খাতা দেখে ডেকে ডেকে দিচ্ছে, তারপর হাতে তুলে দিচ্ছে। পঞ্চাশের মধ্যে কেউ পেয়েছে বিশ, কেউ ত্রিশ, কেউ আবার আটাশ।

পৃথা খাতা পেয়ে দেখল, সে পেয়েছে বিশ। চুপচাপ খাতা ধরে রাখল, মনে অল্প হতাশার ঢেউ।

আইলিনের নাম এখনও ডাকেনি ত্রিয়াশ। বেঞ্চে বসে আইলিন ভয়ে উড়নার কোণা ধরে খেলছে—আঙুলে পেঁচাচ্ছে, কখনও ছাড়াচ্ছে। সে বারবার নিজের নিঃশ্বাস গিলছে, জানে সবাই কমবেশি ভালোই পেয়েছে পঞ্চাশের মধ্যে , কিন্তু সে এখন শুধু জানতে চায়, নিজে কত পেয়েছে।

আইলিন মনে মনে দোয়া করছে যেন পাশ নাম্বার পায় এর মধ্যে পুরুষালি গম্ভীর কণ্ঠে ভেসে আসে।

“মিসেস মির্জা, কাম হিয়ার।”

আইলিন চমকিত হয়ে সামনে তাকায়। পুরো ক্লাসে সোরগোল শুরু হয়ে যায় ত্রিয়াশ স্যার আইলিন কে কেন মিসেস মির্জা বলছে। তাহলে স্যারের কি কাছের কেউ।

আইলিন ভয়ে ভয়ে ত্রিয়াশের সামনে এসে দাঁড়ায়। বুকের ভেতর ধকধক করতে থাকে তার হৃদয়। মাথা নিচু করে রাখা চোখ দুটো ধীরে ধীরে তুলে ধরে নিজের খাতার দিকে।

পরের মুহূর্তেই তার সমস্ত শরীর যেন শক্ত হয়ে যায়।

চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়, ঠোঁট কেঁপে উঠে।

লাল কালি দিয়ে, নিষ্ঠুরভাবে, বড় বড় অক্ষরে লেখা—পঞ্চাশের মধ্যে দুই।মাত্র দুই নাম্বার!

এত কম নাম্বার পাওয়ার কথা তো কোনোভাবেই না।

তাহলে কেন?সে কি এতটাই খারাপ লিখেছে?নাকি… ত্রিয়াশ স্যার ইচ্ছা করেই নাম্বার কেটে দিয়েছেন?

এই সব প্রশ্ন একের পর এক আছড়ে পড়তে থাকে আইলিনের মনে।ঠিক তখনই, নিস্তব্ধ ক্লাসরুমে ত্রিয়াশের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে—

“ইডিয়ট মেয়ে!আরেকবার এমন করলে ফল ভালো হবে না, মনে রেখো।”

ত্রিয়াশ স্যার হনহনিয়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজার বাইরে তাঁর পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই ক্লাসরুমের ভেতরের পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। বেঞ্চে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের গুমোট নীরবতা ভেঙে হঠাৎ করেই চারদিক সরগরম হয়ে উঠল। কেউ হাসছে, কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে, আবার কেউ জোর গলায় নিজের মতামত জানাচ্ছে।

এই কোলাহলের মাঝখানে আইলিন নিজের খাতাটা শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে ক্লাসরুমের মাঝখানেই থমকে দাঁড়িয়ে রইল। যেন চারপাশের শব্দগুলো তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। চোখে-মুখে এক ধরনের অদ্ভুত ভাব—চিন্তা, অস্বস্তি আর অনিশ্চয়তার মিশ্রণ।

এদিকে ত্রিয়াশ স্যার ক্লাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষার্থীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন তিনি নিজেই। কারও কথায় স্যারের কড়া স্বভাব, কারও কথায় তাঁর ন্যায্যতা, আবার কারও আলোচনায় আইলিনের নাম জড়িয়ে যাচ্ছে অজান্তেই। একেক জনের কথায় একেক রকম গল্প, কিন্তু প্রায় প্রত্যেক আলোচনার ভেতরেই ঘুরেফিরে আসছে দুটি নাম—আইলিন আর ত্রিয়াশ স্যার।

আইলিন নিজের খাতাটি হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে তার বেঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে মিলি নামের একটি মেয়ে হঠাৎ করে আইলিনের হাত থেকে খাতাটি ছিনিয়ে নেয়। খাতার ভেতরের পাতায় লেখা “দুই নাম্বার” দেখে মিলি জোরে জোরে হাসতে শুরু করে। সে শুধু নিজেই হাসে না, বরং আশেপাশের অন্য শিক্ষার্থীদেরও খাতাটি দেখাতে থাকে।

মিলির এমন আচরণ দেখে অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও আইলিনকে নিয়ে হাসাহাসি ও ঠাট্টা করতে শুরু করে। সবাই মিলে মজা করতে থাকায় আইলিন খুবই অপমানিত ও বিরক্ত বোধ করে। তার মন খারাপ হয়ে যায়, কিন্তু সে নিজেকে সামলে রাখে।

শেষ পর্যন্ত আইলিন বিরক্ত মুখ করে মিলির হাত থেকে নিজের খাতাটি ফিরিয়ে নেয় এবং চুপচাপ নিজের বেঞ্চে ফিরে যায়।হঠাৎ মিলি বলে উঠে।

“ ত্রিয়াশ স্যার তোকে মিসেস মির্জা বলল কেন?”

মিলির কথা শুনে সকলে চুপ হয়ে গেল। তারাও শুনতে চায় মিসেস মির্জা কেন বলল? কে হয় আইলিন? আইলিন যেন এদের উত্তর দিতে বাধ্য নয়। আইলিন উত্তর দিচ্ছে না দেখে মিলি আইলিনের বেঞ্চের কাছে এসে — আইলিনের হাত শক্ত করে ধরে বলে।

“ যদি না চাস সিনিয়র দের দিয়ে তোকে র‍্যাগিং করাই, চুপচাপ ভালোই ভালোই বল। ”

আইলিনের এবার প্রচুর রাগ হচ্ছে। আইলিনের অবস্থা দেখে পৃথা কিছু বলতে মুখ খুলবে ঠিক তখনই আইলিন দাঁড়িয়ে পড়ে একটু চেচিয়ে বলে উঠে।

“আই অ্যাম দ্য ওয়াইফ অব ন্যাভিয়ান ত্রিয়াশ মির্জা। শুনেছিস!”

এক ঝটকায় মিলির থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। নিজের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাইরে চলে গেল —বাকি ক্লাস করার আর ইচ্ছে নেই, সাথে সাথে পৃথাও চলে গেল। আইলিন ত্রিয়াশ স্যারে বউ এটা শুনে কেউ কেউ যেন হিংসায় জ্বলতে থাকে। কেউ কেউ তো মুখ মোচড়ালো।আবার অনেকের এতে যায় আসে না। আবার কেউ বলল।

“ আইলিনের মতো চাপা গায়ের রঙের মেয়েকে স্যার কি দেখে বিয়ে করলো।”

কিছু মানুষের এমন কথা শুনে শিরিন নামের একটা মেয়ে বলে উঠে।

"বিশেষ কিছু আছে তার মধ্যে—যা মানুষকে ছুঁয়ে যায়, কিন্তু চোখে দেখা যায় না। হয়তো এই নিঃশব্দ গভীরতার জন্যই স্যার তাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আর আইলিন, এতটাও চাপা রঙের নয়—মেয়েটা সত্যিই মাশাআল্লাহ সুন্দর। তোমাদের মন পরিষ্কার করো তাহলে দেখবে সকলকে সুন্দর লাগবে। ”

শিরিন মেয়েটা চলে গেল। কিছু কিছু মানুষের সাথে তর্ক না করাই ভালো।

~~~

বিকেল তিনটা বাজে। আইলিন পৃথার থেকে বিদায় নিয়ে সরাসরি নিজের শ্বশুরবাড়ির পথে চলে আসে। ভার্সিটি থেকে একটার দিকে বের হওয়া সত্ত্বেও, এতক্ষণে বাসায় পৌঁছেছে। আজ পৃথার সঙ্গে আলাদা কিছু সময় কাটিয়েছে—সম্ভবত পৃথার বিয়ের পর এমন মুহূর্ত আর খুব কমই হবে। তাই আজ, মনের মতোই, সময়টা পুরোটা উপভোগ করেছে।

ত্রিয়াশ তাকে দুই নাম্বার দেওয়ায় মনটা একটু খিটখিট করছে। রাগটা মনে লুকিয়ে রাখলেও দুই নাম্বারের কথা ভাবলেই রাগ হচ্ছে । বাইরে থেকে সরাসরি ড্রয়িংরুমে ঢুকে সে শান্ত স্বরে শাশুড়ীকে ডাকতে থাকে, যেন রাগ আর ভালোবাসা একসাথে মিশে আছে।

“ মা... ও মা কোথায় গেলেন তাড়াতাড়ি আসেন। ”

আইলিনের এমন ডাক শুনে বাড়ির সবাই ড্রয়িংরুমে ছুটে আসে। বাপের বাড়ি থেকে এসেছে, আইলিনকে দেখে সবাই আনন্দে মুখ ঝলসে ওঠে।

আইলিনের শ্বশুর, নাহিদ মির্জা, এগিয়ে এসে আদরে ভরা স্বরে বলে—

“কি হয়েছে মা, এমন করে ডাকছো কেন?”

আইলিন একটু রেগে, কিন্তু নালিশের সুরে উত্তর দেয়

“আপনার ছেলের ভার্সিটিতে পড়বো না।”

নাহিদ মির্জা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন।

“কিন্তু কেন?”

“আপনার ছেলে আমাকে পরীক্ষায় মাত্র দুই নাম্বার দিয়েছে।”

এই কথায় তিশা বেগম এগিয়ে এসে কৌতুহলভরে জিজ্ঞেস করে—

“তাহলে তুমি কত নাম্বার পেতে ?”

“বিশ নাম্বার।”

আইলিনের এই উত্তর শুনে সবাই কিছুক্ষণ মূর্ছা হয়ে যায়। এ সময় ত্রিয়াশ সিঁড়ির রেলিংয়ের সাথে হেলান দিয়ে, পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছিল, সব দেখছিল। আইলিনের কথা শুনে সে হাসল তবে গাম্ভীর্য মুখে বোঝা গেল না,নিচে নামতে নামতেই বলল—

“বিশ আর দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? শূন্যের আগে দুই আর শূন্যের পরে দুই—দুটোর চেহারা কিন্তু এক রকম। যা লিখেছো, তাতে তুমি ডিজাভ করেছ শূন্যের পরে দুই!”

সবাই মিটমিটিয়ে হাসতে থাকে। ত্রিয়াশ আইলিনের দিকে তাকিয়ে আবারও বলে।

“ ভালো লেখো আমি এক নাম্বারও কাটবো না। ”

“ আমি ভালো করে দেখাবোই, হুহ।”

“ ওকে। ”

আইলিন রাগ করে ওপরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। ইউভি কিছু ভেবে বলল,

“আইলিন, মেলায় যাবে?”

আইলিন পেছনে ঘুরে ভ্রু কুঁচকে ইউভির দিকে তাকাল। ঠিক সেই মুহূর্তে নিশি আর নিয়তি এগিয়ে এলো আইলিনের দিকে। নিয়তি উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে বলল,

“ছোট ভাবি, আমাদের কলেজের ওই দিকে মেলা হচ্ছে। যাবে তো? আমরা অনেক মজা করবো!”

আইলিন কিছু একটা ভেবে বলল।

“ হ্যা যাবো। ”

নিভান চেচিয়ে বলল।

“ হররেএএএ আজকে রাতেই যাবো।”

বাচ্চাদের খুশি দেখে বড়রাও খুশি হয়ে গেল। মুনিরা বেগম হাসতে হাসতে বলল।

“ আইলিন, তুমি তো খালামনি প্লাস কাকিমনি দুটোই হচ্ছো।”

আইলিনের প্রথমে বুঝতে একটু দেরি হলো — যখন বুঝলো দৌড়ে এসে আইরাকে জড়িয়ে ধরলো।

আজ সকালেই আইরা গর্ভধারণ পরীক্ষা করে পজিটিভ ফলাফল পেয়েছেন। এই সুসংবাদে পুরো পরিবারে অদ্ভুত আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হচ্ছে ঘরটা যেন এক মুহূর্তেই উজ্জ্বল আলোর ঝলকে ভরে উঠেছে।

শীঘ্রই তাদের জীবনে আসছে এক নতুন অতিথি—একটি ছোট্ট প্রাণ, যে ঘরকে খুশি, আশা ও প্রেমে পরিপূর্ণ করবে। এই নতুন যাত্রার আগমনে তাদের হৃদয় উচ্ছ্বসিত, প্রতিটি মুহূর্তে আনন্দ আর আশীর্বাদ বয়ে চলেছে। সত্যিই, জীবনের এ সুন্দর অধ্যায় শুরু হওয়ায় তাদের পরিবার আনন্দের ঢেউয়ে ভেসে উঠেছে।

চলবে,

[ ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সকলে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। রেসপন্স করবেন। ভালো ভালো কমেন্ট করলে লেখার আগ্রহ জাগে। আপনাদেরই জন্য লেখা দয়া করে লাইক কমেন্ট করবেন ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন