ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ চৈত্রের মৃদু ছোঁয়া

১৬তম পর্ব

লেখক: আফরিনা আক্তার সুইটি

গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া

লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি

পর্বঃ ১৬

🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫

বিকেলের নরম আলো গা ছুঁয়ে যখন তারা সবাই মিলে হাতিরঝিল লেকের পাড়ে পৌঁছাল, তখন আইলিনের মনটা ছিল ভীষণ ফুরফুরে। চারদিকে হালকা বাতাস, লেকের পানিতে সূর্যের ঝিলিক—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন ছোট্ট এক আনন্দভ্রমণ।

কিন্তু পথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল লিসার সঙ্গে। প্রথমে বিষয়টা খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি আইলিন। ভেবেছিল, সবার সঙ্গে মিলে সময়টা ভালোই কাটবে। লিসাও তাদের সঙ্গে লেকের পাড়ে এলো। তবে আসার পর থেকেই সে ত্রিয়াশের সঙ্গে এমনভাবে লেগে রইল, যেন আশেপাশে আর কেউ নেই।

এই দৃশ্যটা আইলিনের ভালো লাগেনি। তার ভেতরের উচ্ছ্বাসটা ধীরে ধীরে মিইয়ে যেতে লাগল। একটু আগেও যে মনটা ছিল হালকা আর আনন্দে ভরা, তা হঠাৎই ভারী হয়ে উঠল। চারপাশের সুন্দর পরিবেশ, লেকের শান্ত পানি—সবকিছুই তখন যেন তার কাছে ফিকে লাগতে শুরু করল।

আইলিনের ভারী মনটা পৃথার একদমই ভালো লাগছে না। ও খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, আইলিনের মন খারাপের কারণটা কী। কোনো মেয়েই তো চায় না তার স্বামীর পাশে অন্য কোনো মেয়ে ঘুরঘুর করুক, অকারণে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করুক। আইলিনও তার ব্যতিক্রম নয়। ঠিক এই কারণেই তার মনটা আজ অদ্ভুত এক বিষণ্নতায় ডুবে আছে।

লিসাকে পৃথারও সহ্য হচ্ছে না। মেয়েটা কেমন যেন গায়ে পড়ে কথা বলে, বিশেষ করে ত্রিয়াশের আশেপাশে অকারণে ঘোরাঘুরি করে। বিষয়টা চোখে পড়ার মতোই স্পষ্ট। তবুও পৃথা এ নিয়ে আইলিনকে কিছু বলতে চাইছে না। সে জানে, আইলিন খুবই সেন্সিটিভ। আইলিনের হাত ধরে পৃথা একটু সাইডে নিয়ে হাসি মুখে বলে,

“ কি হয়েছে? মুখটা এমন বাংলা পাঁচের মতো করে রেখেছিস কেন? হুম। ”

“ হয়তো চোখে ভুল ভাল দেখছিস। ”

“ হবে হয়তো। ”

পৃথা আর কিছু বলল না। দুজনেই নিঃশব্দে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশে মানুষের কোলাহল থাকলেও তাদের মাঝখানে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে। ঠিক তখনই ইউভি আর নিশি এসে তাদের পাশে দাঁড়াল। দুজনের হাতেই ফুসকার প্লেট। নিশি আলতো করে একটি প্লেট আইলিনের দিকে বাড়িয়ে দিল।

আইলিন প্লেটটা হাতে নিলেও খাওয়া শুরু করল না। ফুসকা তার ভীষণ পছন্দের—তবু আজ কেন যেন সেই প্রিয় খাবারের দিকেও মন টানছে না। চুপচাপ বসে রইল সে, চোখে অন্যমনস্ক ভাব।

নিশি তখন নিজের প্লেট থেকে একে একে সবাইকে খাইয়ে দিতে লাগল। দেখে মনে হলো সে যেন সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছে। আসলে তার মনে ছিল অন্য কথা—এত মানুষের ভিড়ে যদি শুধু ইউভিকেই আলাদা করে খাওয়ায়, তবে কারও মনে ভুল ধারণা জন্মাতে পারে। তাই কৌশলে সবাইকেই খাইয়ে দিল, যাতে কোনো সন্দেহ বা প্রশ্ন না ওঠে।

ইউভি বিষয়টা বুঝতে পেরে মুচকি হাসল। তার ছোট্ট নিশিটা সত্যিই বড় হয়ে গেছে—ভাবনায়, বুঝতে পারায়, আর ভালোবাসার প্রকাশে।

ইউভি নিশিকে নিয়ে অন্য পাশে চলে গেল।

এদিকে আহান স্যারের হাতে আইসক্রিম। সে আইসক্রিম আইলিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“ ত্রিয়াশ স্যার দিয়েছে, তোমার জন্য কিনেছে ধরো। ”

এখানে আসার পর থেকে ত্রিয়াশের প্রতি আইলিনের মনে অভিমান জমেছে। আইলিন চুপচাপ আইসক্রিম টা নিল। সে চায় না কোনো ধরনের সিনক্রিয়েট করতে। আহান পৃথার দিকে ঝালমুড়ি এগিয়ে দিল। পৃথার পছন্দের। চুপচাপ বসে খাচ্ছে আর পৃথা আহানের টুকটাক কথা শুনছে। আইলিন আহান স্যারের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। মানুষ টা বউকে কতটা সময় দিচ্ছে, কোনটা ভালো লাগে, কোনটা খারাপ লাগে সবই খেলায় রাখছে।আর ত্রিয়াশ একবারও তার পাশে বসলো না। এসব ভেবে আইলিনের মনে অভিমানের পাহাড় জমছে। বুকের ভেতর ভারী হয়ে আসলো। চোখ দুটো টলমল করছে এই বুঝি টুপ করে একফোঁটা পানি পড়লো। নিজেকে স্বাভাবিক করে সামনে তাকালো।আইলিন একটা বিষয় লক্ষ করেছে আজকে বেশির ভাগ কাপলদের দেখছে। আনমনে পৃথাকে প্রশ্ন করলো,

“ পৃথা আজকে এত কাপল কেন রে? ”

“ কারণ আজকে ভ্যালেন্টাইনস ডে। গাধী তোর কাপল আছে তবুও জানিস না। ”

“ এটাকে কাপল বলে না, হয়তো দ্বায়িত্ব থেকেই আমাকে বহন করছে।”

কথাটা কানে যেতেই যেন বাতাসে এক ধরনের ধারালো শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল। পৃথা একদৃষ্টিতে আইলিনের বিষণ্ন মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই চেনা হাসিখুশি মুখে আজ কেমন অদ্ভুত ক্লান্তি। পৃথার বুকের ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠল—তাহলে কি সত্যিই আইলিন ভালো নেই?

আর এক মুহূর্তও দেরি করল না সে। হাতে ধরা ঝালমুড়ির ঠোঙাটা ফেলে দিয়ে হঠাৎ করেই আইলিনকে জড়িয়ে ধরল। কণ্ঠে ছিল দুষ্টুমি, অথচ ভেতরে ভেতরে নিখাদ মমতা,

“আজ যদি ভালোবাসা দিবস হয়, তাহলে আমি পৃথা তোকে সারাজীবন ভালোবাসতে চাই। আমার পাশে বান্ধবী হিসেবে তোকেই চাই। আই লাভ ইউ, ডার্লিং!”

শেষ কথাটা শুনেই আইলিন ফিক করে হেসে ফেলল। চোখের কোণে জমে থাকা কষ্ট যেন মুহূর্তেই গলে গেল। এই মেয়েটা তাকে এক মুহূর্তও মন খারাপ করে থাকতে দেয় না। দুঃখকে হাসিতে বদলে দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে তার।

দুই বান্ধবীর এই ভালোবাসার দৃশ্য দেখে আহান স্যার মুচকি হাসলেন। বন্ধুত্বের এই নির্ভেজাল টান যেন চারপাশটা উষ্ণ করে তুলেছিল। আর ঠিক তখনই দূরে কোথাও থেকে দুটি গভীর দৃষ্টি নিঃশব্দে আইলিনকে দেখে নিল।

এই মূহুর্তে পৃথা আইলিন কে সর্বোচ্চ সময় দিল এতে আহানও কিছু বললো না। তাদের বন্ধুত্ব তার অনেক ভালো লাগে। সে একটু দূরে গেল থাক না দুই বান্ধবী কিছু সময় একা। কথা বলার মধ্যে হঠাৎ আইলিন গলগল করে বমি করে দিল। এই দৃশ্য দেখে পৃথা ভয় পেয়ে যায়। আহান স্যার কে চেচিয়ে বলে,“ এদিকে আসুন ”। আহান তাদের থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। পৃথার এমন ডাক শুনে পা চালিয়ে এসে দেখে, আইলিন বমি করে অস্থির হয়ে গেছে। পৃথা কান্না করছে। আহান একটু রাগ নিয়ে বলে,

“ পৃথা, প্লিজ স্টপ ক্রাইং। এবার বলো আইলিনের এমন অবস্থা হলো কি করে? ”

“ মনে হচ্ছে ফুড পয়জনিং হয়েছে। ”

“ এমন কি খেল ফুড পয়জনিং হলো।”

পৃথা চট করে বলে,

“ মনে হচ্ছে আইসক্রিম খাওয়ার জন্য। ওই বজ্জাত ত্রিয়াশ স্যার ডেট এক্সপায়ার আইসক্রিম দিয়েছে। ”

আহান সঙ্গে সঙ্গে পৃথার মুখ চেপে ধরে বলে,

“ চুপ, ত্রিয়াশ স্যার শুনলে কি ভাববে। ”

“ ছাড়ুন, আপনারা স্যাররা আসলো এক একটা বজ্জাত। ”

এর মধ্যে ইউভি আর নিশি চলে আসে। নিশিকে দেখে আইলিন ভেঙে ভেঙে বলল,

“ নিশি আপু,বাড়ি যাবো। ”

“ হ্যাঁ যাবো। এই ইউভি ভাই যাও গাড়ি নিয়ে আসো। ”

ইউভি চলল গাড়ি ঘুরাতে। ত্রিয়াশ ফোনে কথা বলছিল হঠাৎ এদিকে চোখ পড়তে কলটা কেটে দিল। ত্রিয়াশের সঙ্গে লিসা সেই থেকে চিপকে আছে। এদিকে ত্রিয়াশ দু পয়সার পাত্তা দিচ্ছে না তবুও আঠার মতো লেগে আছে। ত্রিয়াশ এদিকে তড়িঘড়ি করে আসে, গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

“ হোয়াট হ্যাপেন্ড? এখানে হচ্ছেটা কি। ”

পৃথা একটু কর্কশ গলায় বলে,

“ বউয়ের প্রতি একটু যত্ন নেন। আপনার বউয়ের ফুড পয়জনিং হয়েছে বারবার বমি করছে। বউকে নিয়ে ঘুরতে আসছেন ভালো কথা, অন্তত সময় থাকতে বউকে আগলে রাখেন। মনে রাখবেন, প্রিয় মানুষগুলো পাশে থাকতে থাকতেই তাদের গুরুত্ব বোঝা উচিত। হারিয়ে যাওয়ার পর কিন্তু আমরা সবাই খুঁজি, আফসোস করি, ‘আরেকটু যত্ন নিলেই হতো ' এই কথাটা যেন বলতে না হয়। ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, যত্নে, দায়িত্বে আর উপস্থিতিতেই প্রমাণিত হয়।”

আহান পাশ থেকে ধমকে উঠে,

“ স্টপ দিজ পৃথা। ”

ত্রিয়াশ এক হাটু ভেঙে বসে পড়ে আইলিনের পাশে। এক হাতে আইলিনের গাল ধরে। আইলিনের শরীরে মনে হচ্ছে সব শক্তি শেষ হয়ে গেছে তবুও সে ত্রিয়াশের হাত নিজের গাল থেকে সরিয়ে বলে,

“ ছুবেন না আমায়। আপনি খুব খারাপ স্বামী। ”

ডুকরে কেঁদে ফেলে। ত্রিয়াশ নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,

“ হুম আমি অত্যন্ত খারাপ স্বামী। ”

আবারও গলগল করে বমি করে দিল তবে এবার ত্রিয়াশের শার্টে। নিশি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে — এই বুঝি নাক ছিটকে থাপ্পড় বসিয়ে দিবে। আশ্চর্য বিষয় ত্রিয়াশ কিছু বললো না। আইলিনের গালে হাত দিয়ে একনাগাড়ে বলতে থাকে,

“ আইলিন, এই আইলিন খুব কষ্ট হচ্ছে। কোথায় কষ্ট হচ্ছে আমাকে বলো। ”

“ আপনি সরেন, আমি খারাপ স্বামী চাই না। ”

আর কোনো কথা ব্যয় না বলে আইলিনকে আলতো করে কোলে তুলে নিল। তারপর ধীর পায়ে হাঁটা শুরু করল। শরীরে শক্তি না থাকায় আইলিন আর ছটফট করল না, বাধাও দিল না। নিস্তেজ শরীরটা শুধু ত্রিয়াশের বুকে হেলে রইল।

তার চোখের কোণা বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল নোনাজল। সে নিজেও বুঝতে পারল না—এই অশ্রু কি সুখের, না কি দীর্ঘদিনের জমে থাকা দুঃখের? হয়তো দুটোরই মিশেল। মুহূর্তটা নীরব ছিল, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল অগণিত না-বলা কথা।

~~

রাত বারোটা পয়ত্রিশ মিনিট। আইলিন পিটপিট করে চোখ খুলে দেখে সে বিছানায়। তার মনে পড়ে সন্ধ্যা সাতটা সময় তারা বাহির থেকে বাড়িতে আসছিল। এরপর ফ্রেশ হয়ে ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। আইলিন দেখে ত্রিয়াশ তার পাশে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। আইলিন উঠে বসে পাশে চোখ পড়তে দেখে দুটো গোলাপ ফুল রাখা। একটা সাদা একটা লাল। সেখানে একটা কাগজ হাতে তুলে নিয়ে দেখে গোটা গোটা ইংরেজি অক্ষরে লেখা “ SORRY ”

আইলিন কাগজটা মুচড়ে ত্রিয়াশের দিকে ছুড়ে ফেলে দিল।

ল্যাপটপ বন্ধ করে আইলিনের দিকে তাকিয়ে বলে,

“ রাগ নাকি অভিমান। ”

আইলিন মুখ ফিরিয়ে নিল। কথা বলতে চাই না। ত্রিয়াশ পাশে শুতে শুতে আবারও বলে,

“ কি হলো? চুপচাপ কেন উত্তর দাও। ”

“ কে হই আমি যে আপনার সাথে রাগ অভিমান করবো। ”

“ ঠিক বলেছ, কে হও তুমি কেউ নাহ। ”

“ আপনি সত্যি একটা খারাপ স্বামী। ”

ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে আইলিন। এখনো সেভাবে বসে আছে। ত্রিয়াশ আইলিনের হাত ধরে হেঁচকা টানে নিজের বুকে ফেলে দেয়। আইলিন ছটফট করে থাকবে না এবুকে। ত্রিয়াশ নিজের বাম হাত দিয়ে আইলিনের জামার চেইন খুলে দিল।আইলিনের ছটফট করা কমে এলো।স্থির হয়ে গেছে গলা শুকিয়ে আসছে। দম নিতেও যেন আইলিন ভুলে গেছে। আইলিনের এমন স্ট্যাচু হয়ে যাওয়া দেখে ত্রিয়াশ ঠোঁট টিপে হাসছে। বউকে সোজা করা তার বা হাতের খেল। ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসি রেখে বলে,

“ আর একবার ছটফট করলে, বাসর রাতে যে কাজটা করা বাকি ছিল ওটাই আজ রাতে করবো। ”

আইলিনের কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে। চোখ খিঁচে বন্ধ করে আছে। মনে মনে নির্লজ্জ গালি দিতে ভুললো না, ত্রিয়াশ কে।

চলবে,

[ ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। আমি নবীন লেখিকা আপনাদের ভালোবাসা আমার প্রেরণা। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন