গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ১৭
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
আনুমানিক সকাল আটটা কিংবা সাড়ে আটটা বাজে। ঘরজুড়ে সকালের আলো। এই সময়েই নাহিদ মির্জা সবাইকে ড্রয়িংরুমে ডেকেছেন। একে একে সবাই এসে জড়ো হচ্ছে সেখানে।
মুনিরা বেগম সকাল বেলার চা বানিয়ে হাতে হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন সবার কাছে। তাকে সাহায্য করছে জড়িনা। ঘরের ভেতর চায়ের উষ্ণ সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে। ছেলেরা সোফায় আরাম করে বসে তৃপ্তি নিয়ে চা খাচ্ছে, যেন সকালের শান্ত মুহূর্তটুকু উপভোগ করছে।
একপাশের সিঙ্গেল সোফায় বসে আছে নিয়তি। তার সোফার হাতলের ওপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছে নিভান। অন্য পাশে দাঁড়িয়ে আছে নিশি। আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে আইলিন। মাঝেমধ্যে নিশি আর আইলিনের চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছে। চোখ মিলতেই দুজনেই লজ্জায় দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে—তবে আইলিনের লজ্জাটা যেন একটু বেশিই। তার মুখে স্পষ্ট অস্বস্তির ছাপ।
বারবার তার মনে ফিরে আসছে গত রাতের ঘটনাগুলো। হঠাৎ করেই সে যেন এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়েছিল। সেই মুহূর্তের কথা ভাবলেই তার গাল লাল হয়ে উঠছে।
গত রাতে যখন ত্রিয়াশ আইলিনের সাথে দুষ্টমি করছিল হঠাৎ আইলিন এক কাজ করে বসে, ত্রিয়াশের গলায় কামড় বসিয়ে দেয়। ত্রিয়াশ ব্যথায় চিৎকার করে উঠতেই আইলিন খিলখিল করে হাসতে হাসতে ঘর থেকে ভৌ দৌড়ে পালিয়ে যায়। পেছন থেকে ভেসে আসে ত্রিয়াশের রাগ মেশানো কণ্ঠ—
“আইলিনের বাচ্চা, এর শোধ তুলবোই!”
এত রাতে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। কোথায় যাবে বুঝে উঠতে না পেরে সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই আইলিন ঢুকে পড়ে নিশির ঘরে। কিন্তু ঘরে ঢুকেই সে অপ্রস্তুত এক দৃশ্যের মুখোমুখি হয়। স্পষ্ট দেখতে পায়, ইউভি নিশির ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে আইলিন তড়িঘড়ি নিজের চোখে হাত চেপে ধরে বলে ওঠে,
“আমি কিছু দেখিনি, আমি কিছু দেখিনি!”
ইউভির মুখে লজ্জার ছাপ না থাকলেও নিশির অবস্থা ঠিক উল্টো। লজ্জায় যেন মাটি ফুঁড়ে ঢুকে যেতে চায় সে। আইলিন যখন আঙুলের ফাঁক দিয়ে তাকায়, তখন দেখে ইউভি কোথাও নেই। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিশি জোর করে হাসার চেষ্টা করে।
ঠিক তখনই নিজের ঘাড়ে হাত বুলাতে বুলাতে ত্রিয়াশ সেখানে এসে হাজির। কিছু না বলেই সে আইলিনকে কাঁধে তুলে নেয় এবং সেখান থেকে নিয়ে চলে যায়। নিশির সামনে ত্রিয়াশের এমন আচরণে আইলিনও এবার সত্যিই লজ্জা পেয়ে যায়।
আইলিন নিজের ভাবনার গভীরে ডুবে ছিল, এমন সময় নাহিদ মির্জার কণ্ঠ ভেসে এলো তার কানে। গম্ভীর অথচ উষ্ণ স্বরে তিনি বললেন,
“যেহেতু সবাই এখানেই আছো, ডাকার কারণটা বলেই দিই—আমরা আগামীকাল সকলে মিলে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি।”
কথাটা শেষ হতেই নিয়তি, নিভান আর ইউভি আনন্দে চিৎকার করে উঠল। নিয়তি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“সত্যি বলছো, বাবা?”
নাহিদ মির্জা হেসে মাথা নেড়ে বললেন,
“হ্যাঁ। অনেক দিন কোথাও যাওয়া হয় না। তাছাড়া আইলিন তো আমাদের গ্রামের বাড়িতে কখনো যায়নি। ভাবলাম, সবাই মিলে গেলে একটা সুন্দর ফ্যামিলি ট্যুর হয়ে যাবে।”
কথা শেষ হতেই ইউভির আনন্দ যেন আর ধরে না। হঠাৎ করেই সে নাহিদ মির্জার গালে চুমু দিয়ে বসে। দৃশ্যটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে ঘরে উপস্থিত সবাই মিটিমিটি হেসে উঠল। নিজের কাজের কথা বুঝতে পেরে ইউভি লজ্জায় মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,
“আসলে নিজের বউ ভেবে টুপ করে চুমু দিয়ে ফেলেছি!”
ইউভির কথা শুনে নাহিদ মির্জা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন—এ ছেলে কী বলছে! আর এই কথাতেই পুরো ঘরে হাসির রোল পড়ে গেল। নিভান হাসতে হাসতে বলল,
“ ইউভি ভাই তোমার তো বউই নাই। দিনে দুপুরে কি সব ভাবছো। ”
“ আমার যে বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে সে খেয়াল কি কারোর আছে। ”
ইউভি কথাটা নিজে নিজে বললেও সকলের কানে ঠিকই পৌঁছেছে। নাহিদ মির্জা খুক খুক করে কাশলেন। নিহাল মির্জা মুচকি হেসে ইউভির কাঁধে হাত রেখে বলে।
“ যোগ্য মেয়েই আমাদের ইউভি কে এনে দিবো। ”
মনে মনে ইউভি বলে,
“ ছোট মামু,তোমার মেয়েটাকে দিলেই হবে। ”
একে একে সবাই ড্রয়িংরুম ছাড়লো। এখনি ব্যাগ গোছানোর কাজ শুরু করতে হবে। আইলিন রান্না ঘরের দিকে গেল, ত্রিয়াশ ব্ল্যাক কফি চলেছে। ড্রয়িং রুম থেকে যাওয়ার আগে ফিসফিস করে বলে গেছে, ”পাঁচ মিনিটের মধ্যে হট ব্ল্যাক কফি নিয়ে আসেন ম্যাডাম। আপনার জন্য অপেক্ষায় থাকবো। ”
খুব যত্ন নিয়ে আইলিন কফি বানালো। ত্রিয়াশ নিজের ইচ্ছেতেই কফি চেয়েছে—আর সে না বানিয়ে থাকবে, তা কি হয়! সবার আগে স্বামীসেবা—এই ভাবনাই তার মনে। আইলিন কফি বানাতে একেবারে পারফেক্ট নয়, তবে শাশুড়ির কাছ থেকে ধারণা নিয়ে মন দিয়ে কফিটা তৈরি করল। সবশেষে মগে ঢেলে সন্তুষ্ট মনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল।
মাঝ সিঁড়িতে হঠাৎ লিসার সঙ্গে দেখা। আইলিন ভদ্রভাবে সাইড কেটে এগিয়ে যেতে চাইলে লিসা পেছন থেকে ডেকে উঠল,
“আইলিন।”
ভ্রু কুঁচকে তাকাল আইলিন। কেন ডাকা হলো, বুঝতে পারছে না। তবুও স্বাভাবিক ও নম্র কণ্ঠে বলল,
“জ্বি আপু, কিছু বলবেন?”
লিসা তার কাছে এসে একটু নিচু স্বরে বলল,
“হ্যাঁ, বলার আছে। একটু সাইডে চলো।”
“আপনার ভাইকে কফিটা দিয়ে আসি, তারপর আসছি।”
“কাকে ভাই বলছো ত্রিয়াশকে? ত্রিয়াশ আমার ভাই হতে যাবে কেন?”
কথাটা শুনে আইলিনের চোখ বিস্ফোরিত হয়ে উঠল। অবাক না হয়ে তার উপায় নেই। সে তো এতদিন জেনেছে ত্রিয়াশ লিসার ভাই। তাহলে হঠাৎ এমন কথা কেন? তার মাথার ভেতর প্রশ্নের ঝড় উঠল। সত্যিই কি সে কিছু জানে না? তবে কি ত্রিয়াশের কোনো অতীত আছে—যার কথা সে জানে না?
মুহূর্তেই বাগানের সেই দৃশ্যটা মনে পড়ে গেল—ত্রিয়াশ কাউকে কিস করছিল। তখন দূর থেকে ঠিক বোঝা যায়নি মেয়েটা কে। যদি সে লিসাই হয়? ভাবতেই আইলিনের হাতের কফির মগটা আরও শক্ত করে ধরলো। বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা শুরু হলো। ঠোঁট কাঁপছে, তবু অনেক কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।
লিসা ভেতরে ভেতরে এক চিলতে শয়তানি হাসি হেসে বলল,
“আইলিন, তুমি জানো না—আমি আর ত্রিয়াশ একসময় রিলেশনে ছিলাম। আমাদের মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। তাই আমি দেশের বাইরে চলে যাই। সেই সুযোগে খালামনি তাড়াহুড়া করে তোমার সঙ্গে ত্রিয়াশের বিয়ে দিয়ে দেয়। কিন্তু বিশ্বাস করো, ত্রিয়াশ এখনো আমাকেই ভালোবাসে। তুমি শুধু অকারণে এই সম্পর্কে জড়িয়ে আছো।”
আর শুনতে পারছিল না আইলিন। তার চোখ গলিয়ে একফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। যেন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—নড়াচড়া করার শক্তিও নেই। চারপাশের সব শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
লিসা আবার বলল,
“জানি, আমার কথা তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তোমার মোবাইলটা চেক করলেই সব বুঝতে পারবে।”
কথা শেষ করে লিসা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের কাজে চলে গেল। আর আইলিন দাঁড়িয়ে রইল নিথর হয়ে। পা যেন এগোতেই চাইছে না। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে, কফির মগটা শক্ত করে ধরে ধীরে ধীরে ঘরের দিকে পা বাড়াল। বুকের ভেতরের অজানা আশঙ্কা তাকে ক্রমশ গ্রাস করছে।
ত্রিয়াশ ল্যাপটপে বসে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছিল। ঠিক তখনই আইলিন ঘরে ঢুকে ধীরে ধীরে সেন্টার টেবিলে কফির মগটা রেখে দিল। মগ রাখার ক্ষীণ শব্দে ত্রিয়াশ চোখ তুলে তাকাল। তাকিয়েই খেয়াল করল, আইলিনের মুখটা অদ্ভুতভাবে বিষণ্ন, যেন ভেতরে ভেতরে কোনো ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
আইলিন কিছু না বলে একটু সরে দাঁড়িয়ে মোবাইলটা অন করল। একে একে কিছু দেখছিল সে। হঠাৎ তার মুখের রঙ বদলে গেল। চোখ বড় হয়ে উঠল, ঠোঁট কাঁপতে লাগল। যা দেখেছে, তা যেন তার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো। বুকের ভেতর জমে থাকা আর্তনাদ গলায় এসে আটকে গেল—চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে, অথচ শব্দ বেরোচ্ছে না। হাতের মুঠোয় মোবাইলটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল সে। চোখের কোণ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।
ত্রিয়াশ তার এই অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করলেও গুরুত্ব দিল না। সে কফির মগটা হাতে তুলে এক চুমুক দিতেই কপাল কুঁচকে গেল। বিরক্ত গলায় বলল সে।
“এটা কফি? একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে! আমি তোমাকে বলেছিলাম হট কফি আনতে। আমার সাথে ফাজলামো করছো?”
আইলিন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখের পানি থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। শব্দ করে কাঁদছে না, কিন্তু তার নিঃশব্দ কান্না তার নিজের ভেতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ত্রিয়াশ বিরক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়াল এবং তার দিকে এগিয়ে এল। ত্রিয়াশ আইলিনকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে অবাকের চরমপর্যায়ে চলে গেল। কাঁদছে কিন্তু কেন? সে তো বকেনি তাহলে এই কান্নার কারণ? নিজের দুই হাতের আজলায় আইলিনের মুখ নিয়ে শান্ত নরম কন্ঠে বলে,
“ কি হয়েছে? কেউ কিছু বলছে? বল আমাকে। ”
ত্রিয়াশের মুখটা দেখে আইলিন ডুকরে কেঁদে উঠে। ত্রিয়াশের থেকে সরে মেঝেতে বসে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে শব্দ করে কাঁদছে আইলিন। আইলিনের কান্নার মানে এখনো ত্রিয়াশ বুঝতে পারছে না। আইলিনের এমন কান্না মাখা মুখ দেখে ত্রিয়াশের ভেতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। নিজেও আইলিনের পাশে বসে আবারও নরম কন্ঠে বলে,
“ সরি, আমি ঠান্ডা কফি খেয়ে নিবো আর কিছু বলবো না। ”
আইলিনের প্রচুর রাগ হলো। রাগে ত্রিয়াশের কলার চেপে ধরে চিৎকার করে বলে,
”কেন আমাকে বিয়ে করলেন, কেন আমার জীবনে আসলেন। কেন আমাকে এলোমেলো করে দিলেন। যখন ভালোই বাসতে পারবেন না তাহলে বসন্তের মতো কেন এসে ছিলেন। কেন, কেন, এসেছিলেন আমার জীবনে।”
হঠাৎ কি এমন হলো আইলিন কেন এমন হাইপার হয়ে গেছে। অবাক হয়ে শুধু ত্রিয়াশ তাকিয়ে আছে। আইলিন দম নিল পূনরায় আবারও বলে,
“ আমাদের পথ কোনো পথ চলা নেই। আমাদের মধ্যে ভালোবাসা নেই। যা আছে শুধু দায়িত্ব, এক কাজ করনে ছেড়ে দিন আমায়। মুক্তি দিয়ে দেন, এই ভালোবাসাহীন জীবন থেকে। ডিভোর্স দিয়ে দিন....
পুরো কথা শেষ করার আগে আইলিনের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিল ত্রিয়াশ। রাগে ফুঁসছে শরীর কাঁপছে। রক্তচক্ষু নিয়ে আইলিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। আইলিন গালে হাত দিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে। রাগে ত্রিয়াশ ঘর থেকে চলে গেল। আইলিন বিরবির করে বলে,
“ আমি একটা ভালোবাসার মানুষ চেয়ে ছিলাম। সেই মানুষ টা আপনি হলে কি খুব ক্ষতি হতো মির্জা সাহেব। আমার বুকে যন্ত্রণা হচ্ছে একটু খানি আমায় জড়িয়ে ধরতেন। আকাশ সম যন্ত্রণার মধ্যে রেখে চলে গেলেন মির্জা সাহেব। আপনি খারাপ স্বামী মির্জা সাহেব। ”
চলবে,
[ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। আমি নবীন লেখিকা আপনাদের ভালোবাসা আমার প্রেরণা। ]