গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ২০
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
চারপাশ থেকে মাইকের প্রতিধ্বনি ভেসে আসছে, “সেহরির সময় হয়ে গেছে, সবাই উঠে পড়ুন।” নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে সেই ডাক যেন বারবার আঘাত করছে। ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় দুইটা আটত্রিশ ছুঁইছুঁই।
ত্রিয়াশ এখনও বেলকনিতে দাঁড়িয়ে। চারদিক অন্ধকার, বাতাসে হালকা শীতলতা। কিন্তু তার চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। মাথার ভেতর শুধু দুশ্চিন্তার ভার—অগণিত ভাবনা এসে জট বেঁধেছে। আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি যেন রইল না, ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল।
ঘরে এসে দেখে আইলিন খাটের এক কোণায় কুঁকড়ে শুয়ে আছে। মুখে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ, বুঝতে বাকি থাকে না—কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়েছে সে। ম্লান আলোয় তাকে আরও অসহায় লাগছে। ত্রিয়াশ এক মুহূর্ত থেমে তার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কিছু বলতে চায়, তবু ডাকল না।
নীরবে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল ফ্রেশ হতে। বাইরে তখনও মাইকের শব্দ ভেসে আসছে, কিন্তু ঘরের ভেতর নেমে এসেছে অব্যক্ত কষ্ট আর না বলা কথা। এই না বলা কথা সে আইলিনকে বলতে চায়।
ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসে ত্রিয়াশ দেখল, আইলিন ইতিমধ্যেই উঠে পড়েছে—সম্ভবত মাইকের শব্দেই তার ঘুম ভেঙেছে। কোনো কথা না বলে আইলিন চুপচাপ ফ্রেশ হতে চলে গেল। প্রায় দশ মিনিট পর যখন সে বের হলো, ত্রিয়াশ তার মুখের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করল—চোখ-মুখ ফুলে আছে। কিছু না বলে আইলিন মাথায় ওড়না তুলে নিচে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। ত্রিয়াশও নীরবে তার পেছন পেছন চলল।
নিচে তখন তিশা বেগম, মুনিরা বেগম আর ফরিদা বেগম সেহরির আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। ত্রিয়াশ আর আইলিনকে একসাথে আসতে দেখে মুনিরা বেগম হেসে বললেন,
“এতো তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছো কেন? এখনো তো অনেক সময় আছে, আমরা সামলে নিচ্ছি।”
আইলিন মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বলল,
“কাকিমনি, প্রথম রোজা তো… তাই একটু এক্সাইটেড হয়ে উঠে পড়েছি।”
“ওহ আচ্ছা! যখন উঠেছো, তাহলে সবাইকে ডেকে নিয়ে আসো।”
মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে আইলিন সিঁড়ির দিকে এগোল। অর্ধেক সিঁড়ি উঠতেই পেছন থেকে ত্রিয়াশ বলল,
“চলো, ছাদে যাই।”
আইলিন সংক্ষিপ্ত জবাব দিল,
“ইচ্ছে নেই।”
বড় বড় পা ফেলে সে প্রথমে নিশি আর নিয়তিকে ডাকল, তারপর পাশের ঘরে থাকা পৃথাকেও। পৃথা তখনও জেগেই ছিল । আইলিনের ডাক শুনে বেরিয়ে এসে সে তাকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বাসভরে বলল,
“আজ আমি খুব খুশি। বিয়ের পর এটাই আমার প্রথম রোজা!”
আইলিন হেসে বলল,
“কংগ্র্যাচুলেশন ডিয়ার পৃথা। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত যেন তোরা প্রতিটা রোজা একসাথে পালন করতে পারিস।”
পৃথা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল,
“তোরও তো বিয়ের পর এটাই প্রথম রোজা, স্বামীর সাথে প্রথম সেহরি!”
আইলিন মুচকি হেসে চুপ করে রইল। পৃথা তখন খেয়াল করে তার চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী হয়েছে? চোখ-মুখ এমন ফুলে আছে কেন?”
আইলিন স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,
“দেরিতে ঘুমিয়েছি, আবার এখন উঠেছি—এই জন্যই হয়তো। চল, আগে সেহরি করি।”
হাঁটতে হাঁটতে আইলিন হালকা স্বরে বলল,
“বিয়ের পর আবারও আমরা প্রথম সেহরি একসাথে করছি।”
পৃথা হাসতে হাসতে উত্তর দিল,
“এটাকেই তো বলে সৌভাগ্য।”
।
এই মুহূর্তে বিশাল ডাইনিং টেবিলে সবাই সেহরি খেতে বসেছে। চারদিকে ভোররাতের নিস্তব্ধতা, কেবল থালা-বাসনের মৃদু শব্দ আর ফিসফাস কথা। শাশুড়ির কথামতো আইলিন এখনও ত্রিয়াশকে খাইয়ে দিচ্ছে, আর ফাঁকে ফাঁকে নিজেও দু’এক লোকমা মুখে তুলছে। নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে এই কাজটা বারবার করতে হয়—মনে না চাইলেও দায়িত্বের কাছে হার মানতে হয় তাকে।
আজ ত্রিয়াশ দুষ্টুমি করছে না, চুপচাপ বসে খাচ্ছে। কিন্তু তিন-চারবার লোকমা মুখে নিয়েই হঠাৎ উঠে চলে গেল। তার গলা দিয়ে যেন ভাত নামছিল না। ভোররাতের সময় বলে হয়তো ঠিকমতো খেতে পারল না—এ নিয়ে কেউ কিছু বলল না।
আইলিন কোনো রকমে নিজের খাওয়া শেষ করে ধীর পায়ে আইরার কাছে চলে গেল।
আইলিন এসে দেখলো, নিলয় কিছু ফল কেটে রেখে গেছে। আইরা বসে বসে সেগুলো খাচ্ছে। তার গোল হয়ে ওঠা পেটটা দু’হাতে ধরে সে একা একা কীসব যেন বকবক করছে। দৃশ্যটা দেখে আইলিনের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। সে ফিক করে হেসে ফেলতেই শব্দ শুনে আইরা দরজার দিকে তাকালো।
আইলিনকে দেখে আস্তে করে বলল,
“ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে আয়। বোনু, তুই বিয়ের পর আমাকে ভুলে গেলি।”
আইলিন কোমরে হাত রেখে নাক ফুলিয়ে মিষ্টি অভিমানী গলায় বলল,
“আপু, ভুললাম কই? দু’জনের তো এক বাড়িতেই বিয়ে হয়েছে। একসাথেই থাকছি, খাচ্ছি— তবুও বলছো ভুলে গেলাম! এটা কিন্তু অন্যায়, আপু, ঘোর অন্যায়।”
আইরা হেসে বলল,
“ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর নাক ফুলিয়ে থাকতে হবে না। এদিকে আয়, বেবি ডাকছে খালামুনিকে।”
কথাটা শুনে আইলিনের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে এগিয়ে এসে আইরার পেটে আলতো করে কান রাখল। তারপর আদুরে গলায় বলল,
“খালামুনি অপেক্ষা করছে, তাড়াতাড়ি আসো। মাম্মামকে কিন্তু ব্যথা দিও না।”
বলেই পেটের উপর আলতো করে একটা চুমু খেল।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল ত্রিয়াশ। আইলিনের শিশুসুলভ কথা আর আচরণ দেখে তার ঠোঁটে অজান্তেই মুচকি হাসি ফুটে উঠল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছিল ত্রিয়াশ। কিন্তু হঠাৎ করেই সামনে থেকে এসে ধাক্কা লাগে লিসার সঙ্গে। মুহূর্তেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। লিসাকে দেখামাত্র ত্রিয়াশের রাগ যেন সপ্তম আসমানে উঠে যায়। চোখ-মুখ শক্ত হয়ে ওঠে, চোয়াল শক্ত করে দাঁত কটমট করতে থাকে সে। রাগে তার হাত দু’টি মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়।
এক ঝটকায় লিসার হাত শক্ত করে ধরে সে তাকে টেনে ছাদের দিকে নিয়ে যায়। তার ভেতরে যেন জমে থাকা ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফুঁসে উঠছে। দ্রুত, ভারী শ্বাস নিচ্ছে সে—প্রতিটি নিঃশ্বাসে স্পষ্ট রাগের উত্তাপ। অবশেষে হুংকার দিয়ে বলে ওঠে,
“তোর সাহস দেখে আমি সত্যিই অবাক হচ্ছি। তোর মতো নোংরা মানসিকতার মানুষ সবই করতে পারে!”
লিসা না বোঝার মতো করে বলে,
“ কি করেছি?
ত্রিয়াশ রাগে চিৎকার করে বলে,
”শ্যাট আপ রাইট নাউ। ডোন্ট ইউ ডেয়ার প্রিটেন্ড ইউ ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড।”
“ ত্রিয়াশ, তুমি কি বলছো আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না, আর এমন রেগে যাচ্ছো কেন? আমার সাথে তো তুমি কখনো রেগে কথা বলতে না — তাহলে এমন কেন করছো? ”
“দেখ লিসা, তুই এতোটাও বাচ্চা না যে কিছুই বুঝিস না। তুই আমার বউকে ওসব উল্টো-পাল্টা ছবি দেখিয়েছিস কেন? তুই খুব ভালো করেই জানিস, তোর সঙ্গে আমার সেরকম কোনো সম্পর্ক ছিল না।”
ত্রিয়াশের কণ্ঠে স্পষ্ট রাগ আর হতাশা। লিসা কল্পনাও করেনি যে ছবিগুলো শেষ পর্যন্ত ত্রিয়াশই দেখে ফেলবে। সে ভেবেছিল ছবিগুলো দেখে আইলিন কষ্ট পেয়ে ত্রিয়াশের জীবন থেকে সরে যাবে, আর তখন সে সুযোগ নিয়ে নিজের জায়গা করে নেবে। এতদিনে লিসা বুঝেছে, ত্রিয়াশ ধীরে ধীরে আইলিনের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবুও সে হার মানার মেয়ে নয়—হারতে সে আসেনি। মনে মনে হাজারো পরিকল্পনা আর কল্পনা ঘুরপাক খেতে থাকে তার মাথায়।
ন্যাকা স্বরে সে বলে উঠল,
“এভাবে বলো না ত্রিয়াশ। আমি তোমাকে এখনো ভালোবাসি। আমি বিশ্বাস করি, তুমিও আমাকে আগের মতোই ভালোবাসো।”
লিসার প্রতিটি কথা ত্রিয়াশের রাগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। তার চোখে ভেসে উঠছিল আইলিনের কষ্ট পাওয়া মুখটা। অথচ লিসা যেন কিছুই বোঝে না, আগের মতোই আবেগী সুরে আবার বলল,
“মানলাম, আমরা খুব ঘনিষ্ঠ হইনি। কিন্তু আমরা তো কিস করেছি, একসাথে ঘুরেছি। কত স্মৃতি আছে আমাদের! সেগুলো আমি কী করে ভুলে যাই বলো?”
“ জাস্ট শ্যাট আপ। এই ত্রিয়াশ তোর মতো চরিত্রহীনা কে কখনো ভালোবাসে না। তোর মতো মেয়েরা জীবন নষ্ট করতে পারে, সারাজীবন পাশে থাকতে পারে না। ”
লিসা হঠাৎ করেই এমন এক অপ্রত্যাশিত কাজ করে বসলো, যা ত্রিয়াশকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিল। সে এগিয়ে এসে ত্রিয়াশকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ন্যাকাস্বরে কাঁপা গলায় বলল—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে ছেড়ে যাওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আবারও আমাকে তোমার কাছে টেনে নাও। আমি তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসি… আই লাভ ইউ, ত্রিয়াশ। তুমি… তুমি আইলিনকে ডিভোর্স দিয়ে দাও। তাহলে আমরা দু’জন নতুন করে সুখের সংসার গড়তে পারবো।”
কথাগুলো যেন ছুরির মতো বিঁধতে লাগল ত্রিয়াশের মনে। আচমকাই সে ঝটকা মেরে নিজেকে লিসার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিল। ঠিক তখনই ছাদের দরজার কাছে একটা ছায়ামূর্তি সরে যেতে দেখল সে। মুহূর্তের মধ্যে তার বুক ধক করে উঠল। মনে অজানা আশঙ্কা। বারবার আইলিনের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল।
দূরে কোথাও থেকে ফরজের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল, নিস্তব্ধ রাতকে আরও গম্ভীর করে তুলছিল সেই সুর। ত্রিয়াশ আর এক মুহূর্তও ছাদে দাঁড়িয়ে থাকল না। অস্থির পায়ে দ্রুত নিচে নেমে গেল—মনের ভেতর অপরাধবোধ, ভয় আর অজস্র প্রশ্নের ঝড় নিয়ে, ছায়ার মানুষ টা আইলিন না তো। আইলিন আবার ভুল বুঝবে নাতো এই ভয়ে ত্রিয়াশের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।
চলবে,,,
[ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। আমি নবীন লেখিকা আপনাদের ভালোবাসা আমার প্রেরণা। ]