ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ চৈত্রের মৃদু ছোঁয়া

২৩তম পর্ব

লেখক: আফরিনা আক্তার সুইটি

গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া

লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি

পর্বঃ ২৩

🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫

এখন রাত নয়টা। এশার নামাজ আদায় করে বারান্দায় এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে আইলিন। চারপাশে নরম নিস্তব্ধতা, দূরে কোথাও মৃদু শব্দ হলেও এই মুহূর্তে তা যেন থেমে আছে। হালকা ঠান্ডা বাতাস এসে তার চোখে-মুখে ছুঁয়ে যাচ্ছে। বাতাসে একধরনের সতেজতা আছে, যেন সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দিচ্ছে। চুলের গোছা এলোমেলো করে দেওয়া সেই মৃদু হাওয়া তাকে অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিচ্ছে। আইলিন চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। সে চোখ বুজে মুহূর্তটাকে অনুভব করছে। এমন সময় নিঃশব্দে এসে তার পেছনে দাঁড়ায় ত্রিয়াশ। কোনো শব্দ না হলেও আইলিন তার উপস্থিতি টের পায়। গত কয়েক মাসে ত্রিয়াশের শরীরের ঘ্রাণ তার কাছে অচেনা নেই আর; বরং সেই পরিচিত গন্ধই যেন তার হৃদয়ে আলতো ঢেউ তোলে। দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশে শুধু বাতাসের মৃদু সুর।

হঠাৎ নরম কণ্ঠে ত্রিয়াশ ডেকে ওঠে,

“বউ।”

এই একটি শব্দেই কেঁপে ওঠে আইলিন। গত দুদিন ধরে সে বারবার এই সম্বোধন শুনছে, আর প্রতিবারই তার ভেতরটা কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। অচেনা এক অনুভূতি তাকে গ্রাস করে—লজ্জা, ভালো লাগা আর অদ্ভুত এক উষ্ণতা মিলেমিশে যায় হৃদয়ের গভীরে। অনুভূতিটা কী, সে ঠিক জানে না; শুধু বুঝতে পারে, এই ডাক তার ভীষণ ভালো লাগে।

ত্রিয়াশ আবারও একই ভঙ্গিতে ডাকে,

“বউ।”

এবার আর চুপ করে থাকে না আইলিন। মৃদু স্বরে সাড়া দেয়,

“হুম।”

ত্রিয়াশের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। সেই হাসিতে প্রশান্তি, তৃপ্তি। নরম স্বরে সে বলে,

“এক কাপ চা করে দিতে পারবে?”

আইলিন মাথা নাড়িয়ে চা বানাতে চলে গেল। সে সব রান্না না পারলেও কিছু কিছু রান্না ভালোই পারে। চা টা আইলিন খুব ভালো বানায়।

আইলিন ধীরে পায়ে রান্নাঘরে ঢুকল। নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ—রান্নাঘরের কোন তাকেতে কী রাখা আছে, সে সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। বাড়ির সবাই তখন নিজেদের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে।

ঠিক সেই সময় এদিক দিয়ে রিদিশাকে যেতে দেখতে পেয়ে আইলিন ডেকে উঠল,

“রিদিশা, একটু হেল্প করো।”

আইলিনের ডাক শুনে রিদিশা এগিয়ে এল। ঠোঁটে চওড়া হাসি টেনে বলল,

“জ্বি ভাবি, বলেন। কেমন হেল্প লাগবে?”

আইলিন হালকা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,

“চা বানাবো, কিন্তু কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না। একটু দেখিয়ে দাও তো।”

রিদিশা এক সেকেন্ডও দেরি করল না। দক্ষ হাতে তাক থেকে চায়ের ডিব্বাটা নামিয়ে আইলিনের সামনে ধরল।

“এই যে ভাবি, এখানে রাখা আছে।”

আইলিন হাসিমুখে ডিব্বাটা নিল। চুলায় পানি বসিয়ে দিল গরম করার জন্য। চায়ের ডিব্বাটা দিয়ে রিদিশা চলে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই আইলিন আবার ডাকল,

“রিদিশা, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”

রিদিশা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,

“হুম, বলেন।”

আইলিন একটু থেমে নরম স্বরে বলল,

“এখন না… পরে বলব।”

রিদিশা মাথা নেড়ে বলল,

“ঠিক আছে ভাবি,”

তারপর সে নিজের কাজে চলে গেল।

আইলিন আবার নিজের কাজে মন দিল। ধীরে ধীরে চা বানাতে শুরু করল। ঠিক তখনই লিসা রান্নাঘরে এসে ঢুকল। লিসা কে এই মূহুর্তে রান্না ঘরে আশা করেনি। লিসাকে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আইলিনের কপালে হালকা ভাঁজ পড়ল। ভেতরে ভেতরে এক ধরনের বিরক্তি জমে উঠল, তবে সেটা মুখে প্রকাশ করল না। লিসাকে দেখেও না দেখার ভান করে সে নিজের কাজে মন দিল। ধীরে সুস্থে চা বানাতে লাগল।

চা বানানো শেষ হলে যত্ন করে কাপে ঢেলে নিল আইলিন। তার উদ্দেশ্য একটাই—ত্রিয়াশকে নিজ হাতে চা দেওয়া। কাপটা হাতে নিয়ে ঘুরতেই দেখল, লিসা স্থির দৃষ্টিতে তার পুরো কাজটাই লক্ষ্য করছিল।

আইলিন এগিয়ে যেতে চাইলে লিসা সামনে এসে দাঁড়াল। ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলল,

“এটা নিশ্চয়ই ত্রিয়াশকে দেবে? আমাকে দাও, আমি দিয়ে আসি।”

কথাটা শুনে আইলিনের শরীর যেন জ্বলে উঠল। এতক্ষণ সংযত থাকলেও এবার কণ্ঠে কঠোরতা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

“আমি থাকতে এসব আপনাকে কেন করতে হবে? আপনি আপনার কাজে মন দিন।”

আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আইলিন পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই লিসা পেছন থেকে বলে উঠল,

“বউগিরি দেখাচ্ছো? মনে রেখো, ত্রিয়াশ কিন্তু আমাকেই ভালোবাসে।”

পা থেমে গেলেও আইলিন ফিরে তাকাল না। বুকের ভেতর রাগে ধুকপুক করছে, হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে এসেছে। ইচ্ছে হচ্ছিল ঘুরে দাঁড়িয়ে দুটো কড়া কথা শোনাতে, এমনকি একটা থাপ্পড় দিতেও। কিন্তু নিজেকে সামলে নিল সে। চুপ থাকাটাই বোধহয় এই মুহূর্তে সবচেয়ে শক্ত জবাব।

আইলিনকে নীরব দেখে লিসা আবার কয়েক কদম এগিয়ে এলো, যেন আরও কিছু বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে,

কিন্তু লিসা আর দুই কদম এগিয়ে আইলিনের অগোচরে তার সামনে একটু রান্নার তেল ঢেলে দিল। কিছুই বুঝতে না পেরে আইলিন স্বাভাবিকভাবেই সামনে পা বাড়াতেই হঠাৎ পা পিছলে গেল। ভারসাম্য হারিয়ে তার হাতের চায়ের কাপটি ছিটকে মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে ভেঙে গেল। একই সঙ্গে তার মাথা সজোরে গিয়ে লাগল টেবিলের কোণায়।

ব্যথায় তার মুখ থেকে চাপা “আহ্” শব্দ বেরিয়ে এলো। কপাল কেটে র'ক্ত বেরোতে শুরু করতেই সে তড়িঘড়ি করে হাত দিয়ে জায়গাটা চেপে ধরল।

আইলিনের আসতে দেরি হচ্ছে দেখে ত্রিয়াশ নিচে নেমে এলো। নিচে এসে এই দৃশ্য দেখে সে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল,

“আইলিন!”

সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে এসে ত্রিয়াশ দ্রুত আইলিনের কাটা জায়গায় হাত চেপে ধরল, র'ক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করল। আর ঠিক তখনই লিসা এগিয়ে এসে ভান করা উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,

“কি করে পড়ে গেলে? ঠিক আছো?”

লিসার কথায় পাত্তা না দিয়ে, ত্রিয়াশ আইলিনকে পাঁজা কোলে তুলে নিল। এত রাত হওয়ায় কেউ নেই। ত্রিয়াশ ওপরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় তখনি পিছনে ঘুরে লিসার দিকে তাকিয়ে বলে,

“ মেঝেটা পরিষ্কার করে রাখিস। ”

লিসা মনে মনে ক্ষেপে গেল। ত্রিয়াশকে কিছু বলতেও পারলো না। তার মনে হলো তাকে অপমান করা হলো। ত্রিয়াশের কথা অমান্য করতে পারলো না। মেঝেতে বসে ভাঙা কাপের টুকরো গুলো তুলছে, এখান দিয়ে জড়িনাকে যেতে দেখে কাজ গুলো জড়িনা কে দিয়ে চলে গেল। জড়িনা লিসার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুখ বাকালো। বিড়বিড় করে বলে,

“ পুরাই ডাইনি, শয়তানের খালাম্মা। ”

~~

আইলিনকে খাটের উপর বসিয়ে ত্রিয়াশ দ্রুত ফার্স্ট এইড বক্সটা এনে পাশে রাখল। খুব যত্ন করে কপালের কাটা জায়গাটা পরিষ্কার করতে লাগল সে। হেক্সোসোল লাগাতেই আইলিন চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, আর ব্যথায় ত্রিয়াশের হাত খামচে ধরে রইল। ত্রিয়াশ আস্তে আস্তে ফুঁ দিতে দিতে ওষুধ লাগাচ্ছিল, যেন জ্বালাটা একটু কমে। কিন্তু আইলিন এমন জোরে তার হাত চেপে ধরেছিল যে আঙুলের নখের দাগ পর্যন্ত বসে গেল।

জ্বালা-পোড়ায় কাঁপতে কাঁপতে আইলিন ভাঙা গলায় বলল,

“এগুলো সরান… খুব জ্বলছে। আমি আর ওষুধ লাগাবো না।”

ত্রিয়াশ নরম স্বরে তাকে আশ্বস্ত করল,

“আরেকটু সহ্য করো, দেখবে আর জ্বলবে না। আমি মলমটা লাগিয়ে দিচ্ছি।”

খুব যত্ন করে আইলিনের কপালে মলম লাগিয়ে দিল ত্রিয়াশ। তার আঙুলের ছোঁয়ায় ছিল অদ্ভুত কোমলতা, যেন সামান্য ব্যথাটুকুও নিজের ভেতর টেনে নিতে চায়। মলম লাগানো শেষ হলে ফার্স্ট এইড বক্সটা খাটের পাশে গুছিয়ে রেখে সে আবার আইলিনের দিকে তাকাল। নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“এখন ভালো লাগছে?”

আইলিন ক্ষীণ স্বরে বলল,

“হুম।”

ত্রিয়াশ মৃদু স্বরে বলল,

“শুয়ে পড়ো।”

আইলিনের সত্যিই আর ভালো লাগছে না। মাথার ভেতরটা চিনচিন করে ব্যথা করছে। সে আর কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ল। চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

ত্রিয়াশ চুপচাপ বসে রইল। মায়াভরা দৃষ্টিতে আইলিনের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল সে। তার মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। যেন এই নির্ভার ঘুমটাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কী এক ভাবনায় হালকা করে মুচকি হাসল ত্রিয়াশ। তারপর ধীরে ধীরে ঝুঁকে এসে আইলিনের কপালে গভীর, যত্নভরা একটি চুম্বন এঁকে দিল। রাত ভারী হয়ে আসছে, ত্রিয়াশও শুয়ে পড়ে আবার সেহরির সময় উঠতে হবে।

রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ গোঙানির শব্দে ত্রিয়াশের ঘুম ভেঙে গেল। আধো অন্ধকার ঘরে চোখ খুলতেই দেখল, আইলিন তার বুকে মুখ গুঁজে কাতর স্বরে গোঙাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে ত্রিয়াশের বুক ধক করে উঠল। তাড়াতাড়ি তাকে আলতো করে বালিশে শুইয়ে কপাল আর গালে হাত রাখতেই বুঝল—শরীরটা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই আইলিন কেঁপে কেঁপে উঠছে।

কোনো উপায় না দেখে ত্রিয়াশ জলপট্টি দিল। ভেজা কাপড় কপালে চেপে ধরে বসে রইল কিছুক্ষণ, কিন্তু জ্বর যেন কমার নামই নিচ্ছে না। উৎকণ্ঠায় সে ফার্স্ট এইড বক্স খুলে জ্বরের ওষুধ খুঁজতে লাগল। সৌভাগ্যবশত ওষুধ পাওয়া গেল। এখন শুধু আইলিনকে খাওয়ানো বাকি।

সে আইলিনের মাথাটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে নরম গলায় ডাকল,

“আইলিন… এই আইলিন, চোখ খোলো। আমাকে এভাবে ভয় পাইয়ে মারতে চাও নাকি?”

কয়েকবার ডাকার পর আইলিন ধীরে ধীরে সাড়া দিল। আধখোলা চোখে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। ত্রিয়াশ সাবধানে তাকে ওষুধ খাইয়ে আবার আরাম করে শুইয়ে দিল। গায়ে কম্ফর্টার জড়িয়ে দিল যত্ন করে।

তার আর শোওয়া হলো না। একটু পরেই সেহরির সময় হয়ে যাবে। তাই সে আইলিনের মাথার কাছে বসে রইল। আলতো করে তার চুলে বিলি কাটছে।

~~

সকালের সোনালি রোদ এসে আইলিনের চোখে-মুখে পড়তেই তার ঘুম ভাঙল। ধীরে ধীরে চোখ খুলে সে দেখল, ত্রিয়াশ তার দিকেই মুখ করে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আইলিন কিছুক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে রইল তার দিকে। এলোমেলো সিল্কি চুলগুলো কপালের ওপর পড়ে আছে, তবুও এই মুহূর্তে ত্রিয়াশকে তার ভীষণ সুদর্শন লাগছে।

হঠাৎ মনে পড়তেই মনটা খারাপ হয়ে গেল—আজ সে সেহরি করেনি। উঠতে গিয়েও পারল না, মাথাটা অদ্ভুত ভারী লাগছে। তাই চুপচাপ শুয়ে রইল। আবার ত্রিয়াশের দিকে ভালো করে তাকাল। ডান চোখের পাশের বাদামি রঙের ছোট তিলটা তার নজর কাড়ল। ঘুমিয়ে থাকা ত্রিয়াশকে কত নিষ্পাপ লাগছে! অথচ সারাদিনই মুখটা গোমড়া করে রাখে।

আইলিন আস্তে করে ফিসফিসিয়ে বলল,

“আপনাকে এই মুহূর্তে খুব নিষ্পাপ লাগছে।”

হঠাৎই উত্তর এল,

“তাই?”

আইলিন চমকে উঠল। ঘুমিয়ে থাকা মানুষ আবার কথা শোনে কী করে? তবে কি সে জেগেই ছিল? ভাবনার মাঝেই ত্রিয়াশ একটু সরে এসে আরও কাছে এগিয়ে বলল,

“নিষ্পাপ তো লাগবেই, এখনো তো কিছুই করি নি।”

আইলিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কথার মানে বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,

“কি করেন নি?”

ত্রিয়াশ মুচকি হেসে বলল,

“ওসব তুমি বুঝবে না।”

“কেন? আমি কি বাচ্চা নাকি?”

“তাহলে বলতে চাচ্ছো তুমি যথেষ্ট বড় হয়েছো?”

আইলিন একটু গর্বের সুরে বলল,

“বড় না হলে বিয়ে হয়েছে?”

ত্রিয়াশ কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে রইল। চোখে এক অদ্ভুত দুষ্টুমি আর গভীরতা। কিছু না বলে নিজেই বিড়বিড় করে বলল,

“তাহলে এবার নিজের জিনিস বুঝে নেওয়া ভালো…”

আজ কয়েক দিন হলো তারা গ্রামের বাড়িতে এসেছে। তাই নাহিদ মির্জা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবার গ্রামে দরিদ্রদের জন্য ইফতারের আয়োজন করবেন। যদিও তিনি প্রতিবছর গ্রামে না এলেও ইফতার করান, তবে এবার নিজের বাড়িতেই আয়োজন করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। ড্রয়িংরুমে সবাইকে নিয়ে বসে তিনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেন।

আইলিন অসুস্থ—কপালের পাশে কেটে গেছে, বিষয়টি সবারই জানা। তাই তাকে নিচে আসতে মানা করা হয়েছিল, বিশ্রাম নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আইলিনের জেদ—সে নিচে আসবেই। শেষমেশ ত্রিয়াশ আর উপায় না পেয়ে তাকে ড্রয়িংরুমে নিয়ে এসে সোফায় বসিয়ে দিল।

নিচে এসেও আইলিনের চোখ যেন কাউকে খুঁজছিল। চারদিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেল সিঁড়ির পাশে—রিদিশা দাঁড়িয়ে আছে, একদৃষ্টে ইউভির দিকে তাকিয়ে। এদিকে বাড়ির ছেলেরা অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত আলোচনায় মগ্ন। সুযোগ বুঝে আইলিন ধীরে ধীরে রিদিশার কাছে এগিয়ে গেল। তার হাত আলতো করে ধরে বলল,

“তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে, রিদিশা।”

“যা বলার পরে বলবেন। এখন আপনার বিশ্রাম নেওয়া দরকার।”

আইলিন হালকা হেসে জবাব দিল,

“সমস্যা নেই, আমি ঠিক আছি।”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে রিদিশা বলল,

“ঠিক আছে, চলুন। কোন দিকে যাবো?”

“তোমার ঘরে।”

রিদিশা নীরবে মাথা নেড়ে আইলিনকে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে রওনা হলো। তার মনে প্রশ্ন—কি এমন কথা বলবে সে? মাত্র দুই মিনিটের মধ্যেই তারা ঘরে পৌঁছে গেল।

ঘরে ঢুকেই আইলিন দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল। রিদিশাকে খাটে বসিয়ে নিজেও পাশে বসল। অস্থির ভঙ্গিতে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল সে। তারপর ধীরে, একটু কাঁপা কণ্ঠে রিদিশার হাত ধরে বলল,

“তুমি কি ইউভি ভাইয়া কে ভালোবাসো?”

এই প্রশ্নে রিদিশা চমকালো, ভড়কালো। হঠাৎ যেন চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কি বলবে বুঝতে পারছে না সে। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেছে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। ভয় হচ্ছে তার—যদি আইলিন রাগ করে? যদি ভুল বুঝে? বারবার ঢোক গিলছে রিদিশা, ঠোঁট কাঁপছে হালকা করে।

রিদিশার অবস্থা দেখে আইলিন নরম গলায় বলল,

“ভয় পেয়ো না, বলো।”

কিছুক্ষণ ইতস্তত করে রিদিশা আস্তে করে মাথা নাড়িয়ে বুঝালো, “হ্যাঁ।” আইলিন চোখ বন্ধ করে গভীর একটা শ্বাস নিল। যেন নিজেকে সামলে নিচ্ছে। তারপর রিদিশার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,

“আমি যা বলবো, মন দিয়ে শোনো।”

আইলিন একটু থামলো। রিদিশা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আইলিনের চোখে কষ্ট আছে, আবার একরকম মমতাও আছে। আইলিন ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,

“ভালোবাসা খুব সহজ একটা অনুভূতি না, রিদিশা। এটা শুধু পছন্দ বা মোহ না। ভালোবাসা মানে দায়িত্ব, ধৈর্য, আর ত্যাগও। তুমি যদি সত্যিই ইউভি ভাইয়াকে ভালোবাসো, তাহলে আগে নিজেকে শক্ত করতে হবে। কারণ ভালোবাসা মানুষকে যেমন সুখ দেয়, তেমনি অনেক কষ্টও দেয়। ”

রিদিশা নিঃশব্দে শুধু কথা গুলো শুনছে। আইলিনের রিদিশার জন্য মায়া হচ্ছে। আবারও বলে,

“ভালোবাসা তখনই সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পায়, যখন দুটি হৃদয় একই স্বপ্নে বাঁধা পড়ে, যখন দু’জন দু’জনকে সমানভাবে চায়। একতরফা ভালোবাসা যত গভীরই হোক, সেখানে অপেক্ষা থাকে, দীর্ঘশ্বাস থাকে—কিন্তু পূর্ণতা থাকে না।

ইউভি ভাইয়া আর নিশি আপু একে অপরকে ভালোবাসে, তাদের অনুভূতি দুজনার জন্যই সমান। তাই রিদিশা, তোমার হৃদয়ের এই টানটা শুধুই একতরফা থেকে গেছে। জানি, এই সত্যটা শুনে তোমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে—হয়তো বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে। তবুও বলছি, কারণ অন্ধ আশা নিয়ে এগোতে থাকলে কষ্টটা আরও গভীর হবে।

মরীচিকার পেছনে যতই ছুটো, তৃষ্ণা মেটে না—শুধু ক্লান্তি বাড়ে। তুমি এমন এক ভালোবাসার যোগ্য, যেখানে তোমার হাসি, তোমার অনুভূতি, তোমার অপেক্ষা—সবকিছুরই সমান মূল্য থাকবে। তাই নিজেকে শক্ত করো, ইউভি ভাইয়াকে ভুলে যাও। বিশ্বাস করো, একদিন এমন কেউ তোমার জীবনে আসবে, যে তোমাকে ঠিক ততটাই চাইবে, যতটা তুমি তাকে চাইবে। ”

আইলিনের এই দীর্ঘ কথার মাঝে রিদিশার কানে এসে বারবার বাড়ি খাচ্ছে, “ ইউভি ভাইয়া নিশি আপুকে ভালোবাসে ”। রিদিশার বুকের মধ্যে কেমন করে উঠলো। চারপাশ শূন্য শূন্য লাগছে। রিদিশা দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে শব্দ করে কান্না করে দিল।

রিদিশার কান্না দেখে আইলিনের কষ্ট হচ্ছে কিন্তু সে যা বলেছে প্রতিটা কথাই সত্য।

আইলিন রিদিশার মাথায় হাত দিয়ে বলে,

“ তুমি বুঝদার মেয়ে, আশা করি তুমি বুঝবে। নিজেকে ভুল পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে আসবে। ”

আইলিন চলে গেল, তারও খারাপ লাগছে ভালোবাসা যেমন সুখ দেয় তেমনি দুঃখও দেয়।

রিদিশা দৌড়ে এসে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে, মেঝেতে বসে হাঁটুতে মুখ গুজে শব্দ করে কান্না করছে। রিদিশার পাগল পাগল লাগছে। বুকের বাম পাশে কেমন চিনচিন ব্যাথা করছে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে, আহারে কি অসহায় সে কান্না। ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রণা মৃ'ত্যু যন্ত্রণার মতো ভয়ংকর। রিদিশা কান্না করতে করতে একাই বলে,

“আল্লাহ গো, এ কেমন যন্ত্রণা দিচ্ছো, যাকে আমার জন্য বানাওনি, তার জন্য কেন জন্ম দিলে এই অনুভূতি? বুকের ভিতর যেন আগুন জ্বলছে,

নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে , মন ভারাক্রান্ত। কেন হৃদয়ে একতরফা ভালোবাসার জন্ম দিলে খোদা। তার ভালোবাসা একটু খানি আমার নামে কেন দিলা না। ”

চলবে,,

[ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। আমি নবীন লেখিকা আপনাদের ভালোবাসা আমার প্রেরণা। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন