গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ২৪
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
সকাল সাড়ে এগারোটা। রমজান মাস—দুপুরের খাবারের কোনো আয়োজন নেই, সবাই যে যার ঘরে। পুরো বাড়িটা অদ্ভুত নিরবতায় ডুবে আছে। সেই নিরবতার মাঝেই নিজের ঘরে বন্দী হয়ে বসে আছে রিদিশা।
কিছুক্ষণ আগেও তার কান্না থামছিল না। কান্নাকাটি করতে করতে চোখ-মুখ ফুলে গেছে, চোখের কোণে শুকনো অশ্রুর দাগ। এখন আর কাঁদছে না, তবুও বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে। হাঁটু জড়িয়ে মুখ গুঁজে বসে ছিল এতক্ষণ। এলোমেলো চুলগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছিল, যেন তার ভেতরের অগোছালো অনুভূতিরই প্রতিচ্ছবি।
ধীরে ধীরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল সে। মনে মনে মেনে নিয়েছে—ভালোবাসা বুঝি তার জন্য নয়। তবুও সেই চাপা কষ্টটা বুকের গভীরে রয়ে গেছে, নিঃশব্দে পোড়াচ্ছে তাকে।
একসময় হাত বাড়িয়ে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে খোঁপা করে নিল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে গেল। নিজের ফোলা চোখ আর ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে একটুখানি কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল,
“গরীবের আবার ভালোবাসা।”
নিজেকে একটু ফ্রেশ করে রিদিশা ঘর থেকে বাইরে বের হলো। ঘর থেকে একটু পেরিয়ে কিছু দূর যেতেই হঠাৎ কেউ পেছন থেকে ডাকল,
“রিদিশা!”
চমকে উঠে সে পেছনে ফিরে তাকাল। দেখল নিশি দাঁড়িয়ে আছে। নিশিকে দেখেই রিদিশা চোখ নিচু করে নিল। নিশি এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলল,
“কোথায় ছিলে? তোমাকে খুঁজছিলাম।”
রিদিশা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কিসের জন্য?”
নিশি একটু উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল,
“বাড়ির পেছনে যে পদ্মপুকুরটা আছে, সেখানে একটু যেতে চাই।”
“কখন যাবেন?”
“দুই দিন পর। তোমাকে আগে থেকেই বলে রাখলাম, আমার সঙ্গে যাবে কিন্তু। বুঝলে, মেয়ে?”
কথা শেষ করে নিশি হেসে ফেলল।
তারপর আর কিছু না বলে হাসিমুখেই চলে গেল সে। রিদিশা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। নিশির চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,
“আপনি সত্যিই ভাগ্যবতী, নিশিপু...”
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুকের ভেতর থেকে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে নিজের কাজে ফিরে গেল সে।
বাড়িটা বিশাল বড়। বাড়ির পেছন দিকে নানা রঙের ফুলে ভরা সুন্দর একটি বাগান। গোলাপ, রজনীগন্ধা, গাঁদা আর জুঁই ফুলের ঘ্রাণে চারদিক ম-ম করছে। বাগানের এক কোণে পুরনো একটি দোলনা ঝুলছে। সেখানেই ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে বসে পড়ে রিদিশা। দোলনাটা আলতো করে দুলছে, কিন্তু তার মন যেন একদম স্থির—ভারী আর ক্লান্ত। চোখ-মুখ শুকনো, তবু বোঝা যায় কিছুক্ষণ আগেই কেঁদেছে।
এমন সময় রাফসান এদিকে চলে আসে। দূর থেকেই বোনকে একা দোলনায় বসে থাকতে দেখে তার কপালে ভাঁজ পড়ে। কাছে এসে মৃদু স্বরে বলে,
“বোনু, একা একা এখানে কী করছিস?”
রিদিশা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে জবাব দেয়,
“এমনি… বসে বসে দোল খাচ্ছি।”
রাফসান ভালো করে তাকাতেই বুঝতে পারে, কিছু একটা হয়েছে। রিদিশার চোখ ফুলে আছে, মুখটা কেমন মলিন। সে একটু এগিয়ে এসে বোনের মাথায় হাত রাখে, আদুরে কণ্ঠে বলে,
“কী হয়েছে বোনু? ভাইয়াকে বল।”
ভাইয়ের স্নেহমাখা স্পর্শ পেয়ে রিদিশা আর নিজেকে সামলাতে পারে না। হঠাৎ করেই রাফসানকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। বোনের এমন কান্না দেখে রাফসান অস্থির হয়ে যায়। ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কী হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে? কেউ বকেছে?”
রিদিশা মাথা নাড়িয়ে জানায়, কেউ কিছু বলেনি। তবুও তার কান্না থামে না। রাফসান আরও নরম গলায় বলে,
“তাহলে মন খারাপ কেন?”
আর লুকাতে পারে না রিদিশা। কান্নার ফাঁকেই সব কথা খুলে বলে দেয়—তার কষ্ট, তার ইউভির জন্য অনুভূতিগুলো । সব শুনে রাফসান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর আলতো করে বোনের চোখের পানি মুছে দেয়। দুই হাতের আজলায় তার মুখটা তুলে নিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বলে,
“বোন, যে মানুষ আমাদের সত্যিকারের ভালোবাসে, আমাদের জায়গা তার কাছেই হওয়া উচিত। একতরফা ভালোবাসা কখনো পূর্ণতা পায় না—ওটা শুধু ধীরে ধীরে হৃদয়কে কষ্ট দেয়। তাই এমন অনুভূতিকে মনে আঁকড়ে না ধরে সাহস করে ছেড়ে দিতে শিখ। বিশ্বাস রাখ, একদিন এমন একজন আসবে যে তোকে মন থেকে ভালোবাসবে; যার হৃদয়ের পিঞ্জিরায় তুই রানি হয়ে রাজত্ব করবি। ততদিন নিজের মর্যাদা আর স্বপ্নগুলোকে আগলে রাখ।”
রাফসান এতটুকু বলেই থামলো।তার প্রত্যেকটা কথা রিদিশা মন দিয়ে শুনলো। মনে মনে নিজেকে শক্ত করলো। রাফসান আবার বলল,
“ এসব কথা আর কেউ যেন না জানে। ”
রিদিশা মাথা নাড়ালো। রাফসান চলে গেল আর রিদিশা সেখানেই চুপচাপ বসে রইলো। সে একা-একা বিড়বিড় করে,
“মানুষ কি কখনো সত্যিই একা থাকে? না, একা থাকে শুধু সেই মুহূর্তে, যখন তার ভালোবাসা পায় না প্রাপ্য উত্তর।”
~~
আজ আইলিন রোজা রাখেনি। খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে গভীর মনোযোগে একটি উপন্যাস পড়ছিল সে। বইয়ের পাতায় এমনভাবে ডুবে ছিল যেন চারপাশের সবকিছু তার অগোচরেই থেকে গেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, ভার্সিটির পড়াশোনাতেও বুঝি এত মনোযোগ দেয় না। দূর থেকে ত্রিয়াশ বেশ কিছুক্ষণ ধরে বিষয়টা লক্ষ করছিল।
সে দু’বার আইলিনকে ডাকল, কিন্তু কোনো সাড়া পেল না। অবশেষে বিরক্ত ও খানিকটা চিন্তিত হয়ে উঠে এসে তার গাল ও কপালে হাত দিয়ে দেখল—জ্বর এখনো আছে কি না।
হঠাৎ স্পর্শে চমকে উঠে আইলিন বলল,
“কি… কি করছেন? এটা কী!”
ত্রিয়াশ শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“দেখছি জ্বর এখনো আছে কি না।”
আইলিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“সেটা আমাকে বললেই পারতেন।”
ত্রিয়াশ হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“দু’বার ডেকেও তো কোনো সাড়া পাইনি।”
আইলিন আর কিছু বলল না। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আবার বইয়ের দিকে তাকাল। ত্রিয়াশ নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“এখন কেমন লাগছে?”
সংক্ষিপ্ত উত্তর এলো,
“হুম, ভালো।”
ত্রিয়াশ আরেকটু এগিয়ে এসে, আইলিনের সামনে দুটি প্যাকেট রাখলো। আইলিন বইয়ের পাতায় থেকে চোখ সরিয়ে প্যাকেটে চোখ রাখলো। কি আছে তার জানা নেই। ভ্রু কুচকে ত্রিয়াশের দিকে তাকালো, ত্রিয়াশ চোখ দিয়ে ইশারায় বুঝালো খুলে দেখতে। আইলিন হাতের বইটা পাশে রেখে প্যাকেট টা খুললো, খুলেই সে হতভম্ব হয়ে গেল। দুই দিন আগেই যে শাড়ি গুলো অনলাইনে দেখছিল সেগুলো এখন তার সামনে। আইলিন এতোটাই খুশি হয়ে যায়। খুশিতে ত্রিয়াশকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“ থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।”
এই সুযোগে ত্রিয়াশ আইলিনকে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
“ পছন্দ হয়েছে? ”
আইলিনের হুশ ফিরতেই ত্রিয়াশকে ছেড়ে দূরে দাঁড়িয়ে পড়ে। খুশিতে কি করে ফেলেছে বুঝতে পেরে তার লজ্জা লাগছে। এখানে আর এক মূহুর্ত দাড়াতে পারলো না। দৌড়ে চলে গেল পৃথার কাছে। আইলিনকে এভাবে চলে যেতে দেখে ত্রিয়াশ হো হো করে হেসে উঠলো।
আইলিন পৃথার ঘরে এসে দেখে কেউ নেই। নিশির ঘরের দিকে পা বাড়ায়, সেখানে এসে দেখে নিশি নিয়তি আর পৃথা কিছু একটা দেখছে। সে এগিয়ে আসলো, তাকে দেখে পৃথা হাত ধরে পাশে বসিয়ে বলে,
“ এখন কেমন লাগছে? ”
“ হুম, ভালো লাগছে। তোরা কি দেখছিস? ”
নিয়তি ফোনটা তুলে দেখালো, তারা অনলাইনে ড্রেস দেখছে কিন্তু পছন্দ হচ্ছে না। পছন্দ না হওয়ায় তারা ঠিক করেছে শপিং করতে যাবে, তবে ঢাকায় ফিরে শপিং করবে। পরশু এই বাড়িতে সকল গ্রামের মানুষ কে ইফতারি করাবে, তারপর তারা ঢাকা ফিরে যাবে।
তারা চারজনেই টুকটাক কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে গেল। তবে আইলিন মনে মনে রিদিশাকে খুজলো। সকালের পরে একবারও দেখেনি। ভালোবাসা এমনি কষ্ট ছাড়া কিছু মেলে না। আইলিন কে অন্য মনস্ক হতে দেখে, নিশি জিজ্ঞেস করে,
“ ভাবি, কি হয়েছে? মন খারাপ নাকি? এমন মন মরা হয়ে আছো কেন? ”
আইলিন মুচকি হাসলো, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি রেখে বলে,
“ তেমন কিছু না। "
পৃথা আইলিনের হাত ধরে বলে,
” কি হয়েছে বল? চুপচাপ কেন? ”
আইলিন আনমনে বলে,
“কিছু ভালোবাসা যেন অদ্ভুত এক নিয়ম মেনে চলে।
যারা আমাদের নিঃশব্দে, নির্ভরতায়, নিশ্চিন্তে ভালোবাসে—তাদের দিকে আমরা তেমন করে তাকাই না। আর যাদের জন্য আমাদের হৃদয় অপেক্ষায় থাকে, যাদের একটুখানি খেয়াল পাওয়ার আশায় দিন গুনি—তারা হয়তো আমাদের জন্য একই অনুভূতি পোষণ করে না। এভাবেই অনেক সময় ভালোবাসা হয়ে যায় একতরফা এক গল্প—কেউ না বলা যত্নে ভরে রাখে মন, কেউ না পাওয়া আকাঙ্ক্ষায় ভরে রাখে শূন্যতা। ”
তার এই কথা গুলো শুনে, নিশি তার হাত ধরে বলে,
“ ভাইয়া তোমাকে ভালোবাসে হয়তো প্রকাশ করে না। তবে তোমরা প্রতি তার যত্ন, আচার আচরণই বলে সে তোমাকে ভালোবাসে। ”
“ আমি আমার কথা বলছি না, নিশিপু। আমাদের চারপাশে এমনও মানুষ আছে তারা গোপনে নিঃশব্দে ভালোবেসে যায়, তারা জানে সেই ভালোবাসা তার জন্য নিষিদ্ধ তবুও নীরবে ভালোবাসে। ”
পৃথা ভ্রু কুচকে বলে,
” কার কথা বলছিস তুই। ”
আইলিন কথা ঘুরানোর জন্য হালকা হাসলো। হেসেই বলল,
“ আমি আবার কার কথা বলবো, অনলাইনে তো কতকিছু দেখা যায়। ”
কেউ কিছু বলল না। নীরবতার ভেতরেও যেন অনেক কথা জমে ছিল। তবে একটা সত্যি অস্বীকার করার উপায় নেই—ভালোবাসা মানুষকে যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি যন্ত্রণাও দেয়। একতরফা ভালোবাসার কষ্ট গভীর, কিন্তু পেয়ে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা যেন আরও তীব্র, আরও অসহনীয়। যে স্বপ্ন একদিন হাতে ধরা ছিল, তা হঠাৎ ফসকে গেলে শূন্যতাটা আরও বেশি করে অনুভূত হয়।
সবাইকে এমন চুপচাপ দেখে নিয়তি মৃদু হেসে বলল,
“চলো, বাগান থেকে ঘুরে আসি।”
তার কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিকতার ছোঁয়া, যেন ভারী পরিবেশটা একটু হালকা করতে চায়। কেউ না করল না। হয়তো সবারই একটু মুক্ত বাতাস দরকার ছিল, কিছুক্ষণের জন্য হলেও মনটাকে অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
হাসিমুখে সকলে বাড়ির বাগানের দিকে হাঁটতে শুরু করল। বাইরে গাছের পাতায় হালকা বাতাস দুলছিল, ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসছিল চারপাশে। প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হলো, জীবনের সব কষ্টের মাঝেও ছোট ছোট স্বস্তির মুহূর্ত লুকিয়ে থাকে। শুধু সেগুলো খুঁজে নিতে জানতে হয়।
~~
কাঙ্ক্ষিত দিনটি অবশেষে এসে গেছে। আজ মির্জা বাড়িতে ইফতারের বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে। সকাল থেকেই বাড়ির ছেলেরা নানা কাজে ব্যস্ত—কেউ বাজারের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে, কেউ আবার বাগানের সাজসজ্জা দেখভাল করছে। অন্যদিকে বাড়ির ভেতরে মেয়েরাও সমান তালে কাজ করছে; ফলমূল কেটে সুন্দর করে প্লেটে সাজিয়ে রাখা, শরবত তৈরি করা—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
সবাই মিলে হাতে হাতে কাজ করায় প্রস্তুতির কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। প্রায় সবকিছুই শেষের পথে। এখন শুধু তিশা বেগম, মুনিরা বেগম আর ফরিদা বেগম শেষ মুহূর্তের কিছু কাজ গুছিয়ে নিচ্ছেন। বাকিদের তারা ফ্রেশ হয়ে নিতে পাঠিয়েছেন, কারণ ঘড়িতে তখন প্রায় তিনটা বাজে।
ফ্রেশ হতে যাওয়ার আগে আইলিন একবার বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে বাগানের দিকে তাকালো। সেখানে ইফতারের মূল আয়োজন সাজানো হয়েছে। চারদিকে ব্যস্ততা, আর সেই ভিড়ের মাঝেই তার চোখ পড়লো ত্রিয়াশের দিকে। ঘামে ভেজা অবস্থা, তবুও কাজ করে যাচ্ছে মন দিয়ে। হঠাৎই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। লজ্জায় আইলিন দ্রুত ভেতরে চলে গেল। আর তা দেখে ত্রিয়াশ ঠোঁট কামড়ে মুচকি হেসে আবার কাজে মন দিল।
আইলিন অলিভ গ্রীন রঙের জর্জেট থ্রি-পিস পরে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। মুখে কোনো সাজসজ্জা নেই, তবুও তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য যেন আরও বেশি ফুটে উঠেছে। চুলগুলো হাতখোঁপা করে বাঁধা, মাথায় ওড়না টেনে নিজেকে পরিপাটি করে রেখেছে। হাতে মোটা স্বর্ণের চুড়ি—যা দুই দিন আগে ত্রিয়াশ তাকে গিফট দিয়েছিল। আজ তাকে অন্য রকম শান্ত আর স্নিগ্ধ লাগছে।
নিচে নেমে সে দেখে বাড়ির অনেকেই বসে আছে। বড়দের উপস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই তার ভেতরটা কেমন যেন সংকোচে ভরে ওঠে। হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে থামে ত্রিয়াশের ওপর। সাদা পাঞ্জাবি পরা, হাতা ফোল্ড করা—অসাধারণ মানিয়েছে তাকে। ত্রিয়াশ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আইলিনের দিকে, চোখে স্পষ্ট মুগ্ধতা। এক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হতেই আইলিন লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়। বড়রা আছে, এমন অবস্থায় বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
কিন্তু ত্রিয়াশ যেন আজ কোনো কিছুই তোয়াক্কা করছে না। তার কাছে আজ আইলিনকে অন্য রকম লাগছে—আরও বেশি আপন, আরও বেশি সুন্দর। সে বেহায়ার মতোই তাকিয়ে থাকে।
ত্রিয়াশকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইউভি এগিয়ে এসে ধীরে বলে,
“উহুম, উহুম… এভাবে তাকিয়ে থাকিস না। বড়রা আছে।”
ত্রিয়াশ বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে জবাব দেয়,
“থাকুক, সমস্যা কী? অন্য কাউকে তো দেখছি না, নিজের বিয়ে করা বউকেই দেখছি। পারলে তুইও বিয়ে করে বউকে দেখ।”
এই কথা বলে সে আর ইউভিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সেখান থেকে সরে যায়। আর ইউভি হতভম্ব হয়ে তার যাওয়ার পথের দিকেই তাকিয়ে থাকে।
কখন যে সময় কীভাবে কেটে গেল, কেউ টেরই পেল না। এরই মধ্যে ইফতারে আসা অধিকাংশ মানুষ খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চলে গেছে। এখন শুধু অতি নিকট আত্মীয়-স্বজনরা আছেন, তারাও আর কিছুক্ষণ পর বিদায় নেবেন। আত্মীয়দের মধ্যে কেউ মির্জা বাড়ির ছেলেদের বউদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, আবার কেউ আড়ালে-আবডালে আইলিনকে নিয়ে কটু কথা বলতে ছাড়েনি।
আইলিন উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের হলেও তার চেহারায় এক ধরনের স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে, যা সহজেই নজর কাড়ে। তবে হিংসুটে মানুষের চোখে এসব সৌন্দর্য ধরা পড়ে না; তারা বরং নিন্দা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এতক্ষণ ধরে প্রতিবেশীদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে আইলিনকে। কিছু প্রশ্ন ছিল অপ্রয়োজনীয়, আবার কিছু ছিল এতটাই ব্যক্তিগত যে সে ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যায়। তার বিরক্তি আর অস্বস্তি বুঝতে পেরে মুনিরা বেগম তাকে অন্য কাজে ব্যস্ত করে দেন।
বর্তমানে আইলিন বাগানের এক পাশে দাঁড়িয়ে পৃথার সঙ্গে কথা বলছে। দু’জন বান্ধবী নিজেদের মতো করে গল্পে মশগুল। ঠিক তখনই লিসা এসে তাদের পাশে দাঁড়ায়। আজ তাকে একটু অন্যরকম লাগছে—থ্রি-পিস পরা, মাথায় ওড়না টেনে রাখা, যেন আচরণেও বাড়তি গাম্ভীর্য। কিন্তু লিসার উপস্থিতি আইলিন আর পৃথার কারোরই ভালো লাগল না।
লিসার হাতে একটি জুসের গ্লাস। ঠোঁটে হালকা মুচকি হাসি নিয়ে সে গ্লাসটা আইলিনের দিকে বাড়িয়ে বলল,
“এটা ত্রিয়াশকে দিয়ে এসো। আমিই দিতাম, কিন্তু আমার একটু কাজ আছে। তাই বলছি তুমি দিয়ে আসো। আসলে তখন ত্রিয়াশই চেয়েছিল, ধরো।”
কথাগুলো আইলিনের মোটেও ভালো লাগল না। কপালে ভাঁজ ফেলে সে গ্লাসটা হাতে নিল। লিসাকে কিছু বলার আগেই সেখান থেকে সরে গেল। লিসাকে যেতে দেখে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,
“অদ্ভুত!”
চারদিকে তাকিয়েও ত্রিয়াশকে কোথাও দেখতে পেল না সে। এদিকে আহান পৃথাকে ডাকায় চারপাশে হালকা ব্যস্ততা তৈরি হয়েছে। আইলিন এদিক-ওদিক খুঁজেও যখন ত্রিয়াশের দেখা পেল না, তখন ক্লান্ত হয়ে বাগানের একপাশে গিয়ে বসে পড়ল। হাতে ধরা জুসের গ্লাসটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর একরকম বিরক্তি থেকেই নিজেই জুসটা খেয়ে ফেলল।
জুস শেষ করতেই হঠাৎ তার মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করে উঠল। চোখের সামনে সবকিছু দুলে উঠছে, মানুষগুলোকে দু’টো করে দেখা যাচ্ছে। সে স্থির হয়ে বসে থাকার চেষ্টা করল, কিন্তু শরীরটা যেন আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।
এদিকে ত্রিয়াশ আইলিনকে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে বাগানের সাইডে এসে তাকে দেখতে পেল। তবে আইলিনকে স্বাভাবিক লাগছে না। সে চুপচাপ বসে আছে, চোখে অদ্ভুত ঝাপসা দৃষ্টি। ত্রিয়াশকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আইলিন হঠাৎই চওড়া এক হাসি দিল।
আইলিন হঠাৎই ত্রিয়াশকে দেখামাত্র এগিয়ে এসে তার গলা জড়িয়ে ধরল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে ত্রিয়াশের অ্যাডামস অ্যাপলে গভীর এক চুমু এঁকে দিল। ঘটনাটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে ত্রিয়াশ পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। তার মনে হলো—এই মেয়েটা কি সত্যিই পাগল হয়ে গেল ? এমন আচরণ তো তার স্বভাবসিদ্ধ নয়!
ত্রিয়াশ বিস্ফারিত চোখে আইলিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি বাড়তে লাগল। খুব স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল, আইলিন স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। তার চোখে এক অদ্ভুত আবেশ, আচরণেও অস্বাভাবিক তাড়না।
চারপাশে বাগানে বেশ কিছু মানুষ ছিল। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাও ঠিক হবে না বুঝে ত্রিয়াশ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। আর কোনো উপায় না দেখে সে আলতো করে আইলিনকে কোলে তুলে নিল। ত্রিয়াশ দৃঢ় পায়ে ঘরের দিকে হাঁটা ধরল—মনে মনে ভাবছে, আগে ওকে শান্ত করতে হবে, তারপর বোঝার চেষ্টা করবে ঠিক কী হয়েছে।
ত্রিয়াশ ঘরে ঢুকেই আগে দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল। বাইরে যেন আর কোনো শব্দ না যায়। এদিকে আইলিনের আচরণ একেবারেই স্বাভাবিক লাগছে না। সে অদ্ভুতভাবে হাসছে, কখনও খিলখিল করে, আবার হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে। ত্রিয়াশ খুব দ্রুতই বুঝতে পারল—আইলিন ড্রিংক করেছে। কিন্তু বাড়ির ভেতরে এসব এলো কীভাবে, সেটাই তার মাথায় ঢুকছে না।
আইলিন টলতে টলতে তার কাছে এসে দাঁড়াল। একবার তার চোখে, একবার মুখে, আবার ঠোঁটে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। নিজের মনে হাসছে, যেন পৃথিবীর সব সুখ তার মাঝেই লুকিয়ে আছে। হঠাৎ ঠোঁট উল্টে কান্নাজড়ানো গলায় বলল,
“আপনি পচা স্বামী। আমাকে ভালোবাসেন না। আমি আপনাকে ভালোবাসি।”
বলেই আবার ত্রিয়াশের অ্যাডামস অ্যাপলে চুমু এঁকে দিল। ত্রিয়াশ গভীর শ্বাস নিল। নিজেকে শক্ত করে সামলে রাখল। আইলিন এখন স্বাভাবিক অবস্থায় নেই—এই অবস্থায় কোনো দুর্বলতা সে চায় না।
সে আলতো করে আইলিনের মুখ দু’হাতের আজলায় নিল। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কি খেয়েছো? আমাকে বলো।”
আইলিন মাথা নেড়ে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
“বলবো না।”
ত্রিয়াশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আপাতত জোর করার মানে নেই। সে আইলিনকে ধীরে ধীরে খাটের উপর বসিয়ে বলল,
“এখানেই চুপচাপ বসে থাকবে। আমি যাবো আর আসবো।”
কিন্তু আইলিন তাকে যেতে দিল না। দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ত্রিয়াশ বুঝিয়ে বলছে, ছাড়তে বলছে—তবুও সে অনড়। গলা জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“আমি আপনার কি হই জানেন?”
ত্রিয়াশ একটু থেমে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কি হও?”
ত্রিয়াশের গলা জড়িয়ে ধরা অবস্থা গানের কয়েকটি লাইন মাতলামি অবস্থায় বলে উঠে,
“ আমি তোমার লাল চমচম,
আমি তোমার আলুর দম
আমি তোমার চিনি কম,
আমি তোমার এটম বোম
এতটুকু বলেই আইলিন খিলখিল করে হাসলো। এদিকে ত্রিয়াশের মাথায় হাত, তার পেট ফেটে হাসি আসছে কিন্তু বউয়ের এমন অবস্থায় হাসা ঠিক না। আইলিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো, জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। সোজা করে শুয়ে দিয়ে জলদি নিচে চলে গেল।
চলবে,
[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। আমি নবীন লেখিকা আপনাদের ভালোবাসা আমার প্রেরণা। ]