গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ২৭
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
দূর থেকে এশার আজানের মৃদু প্রতিধ্বনি ভেসে আসছে। বিষণ্ন মন নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আইলিন। অদ্ভুত এক অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরেছে। কেন এমন লাগছে, সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারছে না। বিকেলের পর থেকে আর ত্রিয়াশের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। আসলে বিকেলেই ত্রিয়াশ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে—সেখান থেকে কাল সকালেই তার সিঙ্গাপুরের ফ্লাইট।
কিছুক্ষণ আগেই আইলিন জানতে পেরেছে, ত্রিয়াশ বিকেলেই চলে গেছে। যাওয়ার আগে একবারও তাকে বলে যায়নি। এই ভাবনাতেই তার মনে ভীষণ অভিমান জমে উঠল। বুকের ভেতরটা হালকা কষ্টে ভরে গেল। সে যে ত্রিয়াশকে কতটা মিস করছে, তা যেন কাউকে বোঝানোর ভাষা নেই। কখন যে ত্রিয়াশের প্রতি সে এতটা আবিষ্ট হয়ে পড়েছে, নিজেও ঠিক বুঝতে পারেনি। কিন্তু ত্রিয়াশ কি সেটা একবারও বুঝতে পারে না? যাওয়ার পরও সে একটা মেসেজ বা ফোন কল পর্যন্ত করেনি।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আইলিন নিজের মোবাইলটা বের করল। গ্যালারি খুলে একটি ছবি সামনে আনল। ত্রিয়াশ যখন নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল, তখন চুপিসারে সে ছবিটা তুলে রেখেছিল। ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল সে। অজান্তেই তার ঠোঁটে হালকা একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
এই মানুষটিই তার স্বামী। ছবিটির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
“কখনো কল্পনা করিনি, আপনি-ই হবেন আমার জীবনসঙ্গী। কিন্তু আজ মনে হয়, আপনাকে ছাড়া আমার পৃথিবীটা অসম্পূর্ণ। ধীরে ধীরে আপনি হয়ে উঠেছেন আমার অভ্যাস, আমার ভালোবাসা, আমার সবকিছু। এখন আপনার সামান্য দূরত্বও মনকে অস্থির করে তোলে, কারণ আমার শান্তি আর স্বস্তি সবটাই যেন আপনার মাঝেই লুকিয়ে আছে। ”
কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা নিজের ঠোঁটের কাছে এনে স্ক্রিনে ভেসে থাকা ত্রিয়াশের ছবির ওপর আলতো করে একটা চুমু এঁকে দিল। তারপর ফোনটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরলো। চোখ দুটো বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল আইলিন । বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানটা যেন আরও গভীর হয়ে উঠল। আবারও ত্রিয়াশের কথা মনে পড়তেই মনটা কেমন ভারী হয়ে গেল। তবু নিজের মনেই সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল—ত্রিয়াশ সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এলেও সে তার সাথে কথা বলবে না। এই অভিমানটা অন্তত কিছুদিন সে ধরে রাখবেই রাখবে।
আইলিনের আজ কিছুই ভালো লাগছে না। মনটা অদ্ভুত ভারী হয়ে আছে। ধীর পায়ে সে এগিয়ে গেল তার বোন আইরার ঘরের দিকে। দরজার কাছে এসে দেখে, আইরা খাটে শুয়ে আছে, আর নিলয় ঘরে নেই। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে বোনের পাশে গিয়ে বসলো সে।
আইরা আইলিনকে দেখেই মুচকি হাসল। কিন্তু আইলিনের মুখটা ছোট হয়ে আছে, চোখেমুখে স্পষ্ট অভিমান। সেটা দেখে আইরা নরম গলায় বলল,
“কি হয়েছে বোনু? মন খারাপ কেন?”
আইরা তার উঁচু হয়ে ওঠা পেটটা আলতো করে ধরে খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসল। আইলিন অভিমানী সুরে বলল,
“তোমার দেবরটা খুব পচা আপু। সারাদিন গম্ভীর হয়ে থাকবে, নিজের যা ইচ্ছা তাই করবে। আমি কে, হ্যাঁ? আমি তো আর ওনার বউ না। তাই আমাকে কিছু না বলেই সিঙ্গাপুর চলে গেল।”
কথাগুলো বলতে বলতে আইলিনের চোখ ভিজে উঠল। বোনের এমন অভিমানী চেহারা দেখে আইরা নিঃশব্দে একটু হাসল। সে বুঝতে পারছে, তার ছোট বোনটা আস্তে আস্তে স্বামীপাগল হয়ে যাচ্ছে।
আইলিনের হাতটা ধরে আইরা মৃদু স্বরে বলল,
“অফিসের কাজেই গেছে। চলে আসবে। আর ভাইয়া এমনিতেই একটু গম্ভীর স্বভাবের। তবে আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি—আগের থেকে এখন ওর গম্ভীর ভাবটা অনেক কমে গেছে। জানিস, মাঝে মাঝে ভাইয়াকে মুচকি হাসতেও দেখা যায়। মনে হয় বউ পেয়ে একটু একটু করে বদলাচ্ছে।”
কথা শেষ করে আইরা হেসে উঠল। কিন্তু আইলিনের মনে তখন অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। লিসা আসার পর থেকেই কি এই পরিবর্তন? নাকি এর পেছনে অন্য কিছু আছে?
আর ভাবতে পারছে না সে। রাগ, অভিমান আর কান্না—সব মিলিয়ে বুকটা ভারী হয়ে উঠছে। কিছু না বলে আইলিন চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। তারপর নিঃশব্দে নিজের ঘরের দিকে ফিরে গেল।
।
।
নিলয়ের ভীষণ হাসি পাচ্ছে, কিন্তু ইউভির কড়া চাহনির কারণে সে কোনোমতে হাসিটা চেপে রেখেছে। ইউভি মুখ গোমড়া করে, হালকা রাগ মিশিয়ে বলল,
“শা'লা, কিছু না বলেই সিঙ্গাপুর চলে গেছে! আমার সব প্ল্যান একেবারে ভেস্তে গেল।”
নিলয় এতক্ষণ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছিল। কিন্তু আর পারল না—হো হো করে হেসে উঠল। তার হাসি যেন থামতেই চায় না।
বেচারা ইউভি! কত পরিকল্পনা করেছিল ত্রিয়াশের বাসরটা জমিয়ে দেবে বলে। কত আয়োজন, কত ভাবনা! আর এদিকে ত্রিয়াশ সব পরিকল্পনায় পানি ঢেলে তাদের কে না বলেই সিঙ্গাপুর চলে গেল। কথা ছিল কাল যাবে কিন্তু আজই চলে গেছে।
নিলয়ের কাছে ব্যাপারটা ভীষণ মজার লাগছে, কিন্তু ইউভির অবস্থা দেখলে আবার হাসিটা আটকানোও কঠিন। ইউভি এখনও মুখ গোমড়া করে বসে আছে, আর নিলয় হাসতে হাসতে মনে মনে ভাবছে—ত্রিয়াশ ফিরে এলে ইউভি ওকে ঠিকই জব্দ করবে।
ইউভি ছাদের পাঁচিলের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠল,
“নিলয় ভাই, থাকো তুমি। আমার তো এখনো বাসর করা বাকি, তাই বাকি কাজটা সেরে আসি।”
তার কথা শুনেই নিলয় খুকখুক করে কাশি শুরু করল। ইউভি ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বিরক্তির সুরে বলল,
“কী হলো? বমি করবে নাকি? পোয়াতি তো তোমার বউ, আর বমি করছো তুমি! ছ্যাহ!”
নিলয় চোখ রাঙিয়ে বলল,
“চুপ কর। বড় ভাইয়ের সামনে কী সব উল্টোপাল্টা বলছিস!”
ইউভি একদম নির্লজ্জ ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দিল,
“কেন? কী আর বললাম! বাসর আর বমির কথাই তো বললাম।”
এবার নিলয় দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সামলে বলল,
“যার সাথে বাসর করার কথা বলছিস, তার বড় ভাই আমি।”
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না নিলয়। হনহন করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
নিলয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল ইউভি। তারপর হঠাৎই শব্দ করে হেসে উঠল। তার হাসিতে যেন দুষ্টুমি আর মজা দুটোই মিশে ছিল।
।
সকাল সাতটা। ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার জন্য সবাই প্রস্তুত। বাড়ির গেটের সামনে নিজেদের ব্যাগপত্র নিয়ে একে একে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। ধীরে ধীরে সবাই গাড়িতে উঠে বসছে।
আইলিন চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো। গ্রামটা তার বরাবরই খুব ভালো লাগে। এই কয়েকটা দিন গ্রামের শান্ত সকাল, খোলা হাওয়া আর নিস্তব্ধতা সে বেশ উপভোগ করেছে। মনে মনে ভাবলো—আবার কবে আসা হবে, আদৌ হবে কি না তা সে জানে না। কিন্তু এই কয়েকটা দিনের স্মৃতি হয়তো অনেক দিন তাকে টানবে। গ্রামের এই সুন্দর সকালগুলোকে সে নিশ্চয়ই খুব মিস করবে।
চারপাশে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রিদিশাকে দেখতে পেল আইলিন। সে ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেল।
হালকা হাসি দিয়ে আইলিন বলল,
“তুমি কিন্তু ঢাকায় অবশ্যই যাবে। তোমাকে আমি ভীষণ মিস করবো।”
রিদিশা মিষ্টি করে হেসে বলল,
“আবার আসবেন ভাবী।”
আইলিনও হেসে বলল,
“অবশ্যই আসবো।”
রিদিশা মেয়েটা সত্যিই খুব মিষ্টি। আইলিনের তার প্রতি আলাদা একটা স্নেহ জন্মে গেছে এই কদিনে। সে রিদিশার হাতটা আলতো করে ধরে বলল,
“তোমার মতো মিষ্টি মেয়ের জীবনে একদিন একটা রাজকুমার আসবেই।”
রিদিশা শুধু মৃদু হাসলো। কিন্তু আইলিন বুঝতে পারলো—মেয়েটা এখনও একতরফা ভালোবাসার কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে স্নেহভরা কণ্ঠে বলল,
“রিদিশা, যে ভালোবাসার জন্য তুমি আজ কষ্ট পাচ্ছো, একদিন তার থেকেও দ্বিগুণ ভালোবাসা আসবে তোমার জীবনে।”
এরপর আর দাঁড়াল না আইলিন। বিদায়ের মুহূর্তটা দীর্ঘ করতে চাইল না। তারা সবাই রিদিশাদের পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠলো।
গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল ঢাকার উদ্দেশ্যে, আর পেছনে পড়ে রইল সেই শান্ত, র'ক্তের না হলেও আপন কিছু মানুষ।
।
রাস্তায় কোনো জ্যাম ছিল না। তাই তারা দুপুর দুইটার মধ্যেই এসে পৌঁছেছিল। বাড়িতে ঢুকেই সবাই যে যার ঘরে চলে গেল। রোজার দিনে এতটা জার্নি করে সবাই বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
আইলিনও নিজের ঘরে এসে আগে একটা শাওয়ার নিয়ে নিল। শাওয়ার থেকে বের হতেই নিজেকে একটু ফ্রেশ লাগলো। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে ফোনটা হাতে নিল—ত্রিয়াশ কল বা মেসেজ দিয়েছে কি না দেখার জন্য। কিন্তু স্ক্রিনে তাকিয়েই তার মনটা একটু ভারী হয়ে গেল। কোনো কল নেই, কোনো মেসেজও না। অভিমানী মনটা আরও একটু খারাপ হয়ে গেল।
মন খারাপ নিয়েই সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনি করতে লাগলো। হঠাৎই তার চোখ পড়লো আয়নার কোণায় লাগানো একটা ছোট হলুদ রঙের চিরকুটে। ভ্রু কুঁচকে সেটি হাতে নিল। তাতে লেখা,
“কি ম্যাডাম, মন খারাপ? সামনে এগিয়ে গিয়ে আলমারিটা খুলুন।”
কৌতূহল নিয়ে আইলিন চিরকুটটা হাতে নিয়েই আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। একটানে আলমারি খুলতেই সে পুরো অবাক হয়ে গেল। আলমারির ভেতরটা ভর্তি নতুন নতুন শাড়ি আর থ্রি-পিসে। কাপড়ের ভাঁজের মাঝে আরেকটা চিরকুট রাখা। সেটাও হাতে নিয়ে পড়লো,
“সামনে একটা বক্স আছে, খোলো।”
আইলিন সামনে তাকিয়ে দেখলো সত্যিই একটা বক্স রাখা আছে। সে বক্সটা হাতে নিয়ে বিছানার ওপর বসলো। ধীরে ধীরে বক্সটা খুলতেই ভেতরে দেখতে পেল নানা ধরনের সুন্দর গহনা। সেখানেও আরেকটা ছোট চিরকুট রাখা।
চিরকুটটা খুলে সে পড়লো,
“বিয়ের পর এখন অব্দি কিছুই দেওয়া হয়নি, এমনকি বাসর ঘরের গিফটটাও না। ওখানে একটা ডায়মন্ডের নোজপিন আছে, পরে ফেলো।”
এগুলো পড়তে পড়তেই আইলিনের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। কিছুক্ষণ আগের সব অভিমান যেন মুহূর্তেই উড়ে গেল। সে আয়নার সামনে গিয়ে ডায়মন্ডের নাকফুলটা পরে নিল।
নিজেকে আয়নায় দেখে আজ তার মনে হচ্ছে—সে যেন আজই নতুন করে বিয়ে করেছে। তার মনটা ভরে উঠলো অদ্ভুত এক আনন্দে।
আইলিন খুশি মনে সবগুলো গুছিয়ে রাখল। হঠাৎ কাপড়ের ভাঁজ থেকে আরেকটা চিরকুট বের হয়ে এল। সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,
“অভিমান কমেছে, একা থাকতে ভয় পেলে নিয়তির সঙ্গে গিয়ে ঘুমাও। পরশু থেকে পরীক্ষা আছে মন দিয়ে পড়বে।”
হঠাৎ করে আইলিনের ফোনে মেসেজ আসার শব্দ হয় হাতে নিয়ে দেখে ত্রিয়াশের মেসেজ। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রোদের মতো ঝলমলে হাসি দেখা গেল। মেসেজ পড়ে হাসি চওড়া হয়ে গেল,
“যার হাসিতে শান্তি পাওয়া যায়,
সেই হাসির মালিকই ত্রিয়াশের বউ”
চলবে,
[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। আমি নবীন লেখিকা আপনাদের ভালোবাসা আমার প্রেরণা। ]