গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ২৮
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
চারপাশে ঘন অন্ধকার। দূর থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। আকাশে অর্ধেক চাঁদ, আর সেই চাঁদের ম্লান আলো এসে বারান্দার এক কোণে পড়েছে। সেই আধো আলো–আঁধারির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে নিশি। তার মনটা ভীষণ বিষণ্ন। সে কখনো চায়নি এভাবে তার বিয়ে হোক। ভালোবাসার মানুষকে পেয়েছে ঠিকই, তবুও বারবার মনে প্রশ্ন জাগে—বাবা কি সত্যিই খুশি?
নানান ভাবনায় ডুবে ছিল সে। হঠাৎ কাঁধে কারও নরম স্পর্শ অনুভব করল। চমকে উঠে পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখে তার বাবা, নিখিল মির্জা। বাবাকে দেখেই নিশি মাথা নিচু করে ফেলল। নিখিল মির্জা আলতো করে দুই হাতের আজলায় মেয়ের মুখ তুলে ধরলেন। দেখলেন, নিশির চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে। তিনি স্নেহভরে তার চোখের পানি মুছে দিলেন।
নরম, মমতাভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কি হয়েছে মা? কাঁদছিস কেন?”
নিশি ঠোঁট কাঁপিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল,
“বাবা… তুমি কি সত্যিই এই বিয়েটা মন থেকে মেনে নিয়েছো?”
নিখিল মির্জা মেয়ের মাথায় স্নেহের হাত রেখে মৃদু হেসে বললেন,
“অবশ্যই মেনে নিয়েছি। তাছাড়া তোমরা দুজন তো একে অপরকে ভালোবাসো। সেখানে আমি কেন আপত্তি করব? ওই ঘটনা না ঘটলে আমি নিজে থেকে তোমাদের বিয়ে দিতাম। ”
বাবার কথা শুনে নিশি বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের ভালোবাসার কথা বাবা জানেন—এটা সে কল্পনাও করেনি। মেয়ের বিস্ময়টা বুঝতে পেরে নিখিল মির্জা আবার বললেন,
“ইউভিকে তো ছোটবেলা থেকেই আমরা মানুষ করেছি। তাই ওর নাড়িনক্ষত্র সবই আমার জানা। আমি নিশ্চিত, ইউভির মতো ছেলেকে মেয়ে জামাই হিসেবে পেয়ে আমি গর্বিত। আর তোমার দায়িত্ব—ওকে ভালোবেসে আগলে রাখা।”
বাবার কথা শুনে নিশির বুকটা হালকা হয়ে গেল। সে নীরবে বাবার বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে রইল, তার বাবা অনেক পরামর্শ দিলেন, বুঝালেন এরপর নিঃশব্দে চলে গেল।
নিখিল মির্জাকে দেখে ইউভি আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি চলে যেতেই ইউভি ধীরে ধীরে নিশির ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল। বারান্দার সেই অন্ধকারের মাঝেই নিশি নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ইউভি এগিয়ে গিয়ে তার পাশে দাঁড়ালো। নিশি ইউভির উপস্থিতি টের পেলেও কিছু বলল না। তার এই নীরবতা ইউভির একদমই ভালো লাগল না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবশেষে নীরবতা ভেঙে ইউভি বলল—
“আমার অপরাধটা কী? এভাবে দূরে দূরে আছিস কেন? তুই তো আমার বিয়ে করা বউ, তবু মুখ ফিরিয়ে থাকবি?”
নিশি মৃদু রাগের ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“তাহলে কি কোলে উঠে থাকবো?”
ইউভি হালকা হেসে বলল,
“তোর যেখানে ইচ্ছে সেখানেই উঠবি। দরকার হলে সারাদিন গলা জড়িয়ে থাকবি, আমি কিছুই মনে করব না।”
নিশি অন্যদিকে তাকিয়ে একটু লাজুক গলায় বলল,
“সারাদিন গলা জড়িয়ে থাকতে পারব না… আমি রাতে গলা জড়িয়ে থাকবো।”
কথাটা বলেই নিশি নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল। ইউভি ঠোঁট কামড়ে মৃদু হাসল। একটু এগিয়ে এসে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
“রাতে তো শুধু গলা জড়িয়ে ধরলেই হবে না… আমাকে পুরোটা জড়িয়ে নিতে হবে।”
ইউভির কথায় নিশির গাল লাল হয়ে উঠল। লজ্জা সামলাতে দ্রুত কথা ঘুরিয়ে বলল—
“আমি চেয়েছিলাম লাল টুকটুকে বউ হবো আপনার… আমি এভাবে বিয়ে করতে চাইনি।”
ইউভি কোমল স্বরে বলল,
“আর একটু অপেক্ষা কর। আমি তোকে ঠিকই আমার লাল টুকটুকে বউ করে নিজের ঘরে তুলব… তারপর তোর দেহে মিশে যাবো। ”
নিশি লজ্জায় চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে কোনো কথা নেই, চোখ দুটো নিচের দিকে নত। লজ্জায় সে এতটাই অস্থির হয়ে পড়েছে যে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। ইউভিও বুঝতে পারছিল নিশির অবস্থা, তাই সে-ও আর কিছু বললো না। দুজনেই নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো—চারপাশে নীরবতা, শুধু হৃদয়ের অদৃশ্য কথাগুলো যেন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
।
।
এদিকে আইলিন বেশ কয়েক দিন পর আবার পড়তে বসেছে। কিন্তু পড়ায় আজ তার মন বসছে না। বইয়ের পাতাগুলো যেন বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, কেমন অদ্ভুত এক বিরক্তি আর অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরেছে।
ইফতারের সময়টাও তার জন্য বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। সবাই বারবার তার নাকফুলের কথা জিজ্ঞেস করছিল। আসলে নাকফুলটা তাকে সত্যিই খুব সুন্দর মানিয়েছে—এটা সবাই বলছিল, আর সেই কথাগুলো শুনে আইলিন লজ্জায় পড়ে যাচ্ছিল বারবার।
নাকফুলটার কথা মনে হতেই সে আবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তার গাল লাল হয়ে উঠল। লজ্জায় দু’হাত দিয়ে নিজেই মুখ ঢেকে ফেলল।
কিছুক্ষণ পরে ধীরে ধীরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো আইলিন। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল অর্ধেক চাঁদ, তবুও কী অপূর্ব ঝলমলে তার আলো! চারদিকে অসংখ্য তারা যেন আকাশে মেলা বসিয়েছে।
চাঁদের দিকে তাকিয়ে আইলিন মিষ্টি করে হাসল। তারপর আকাশের দিকে চেয়ে ধীরে ধীরে বলে উঠল,
“নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল করবে,
আমার নাকে আপনার নামের নাকফুল—
যেন আকাশও দেখে বলে,
ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর আলো
আজ পৃথিবীতে নেমে এসেছে।”
কথাগুলো বলেই আইলিন নিজেই লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল সেই মেসেজের কথা। সেই মেসেজের পর থেকে ত্রিয়াশের সাথে আর কোনো কথা হয়নি।
বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আইলিন ধীরে ধীরে পা বাড়াল আইরার ঘরের দিকে। ভেতরে কী করছে, সেটাই দেখার একটা কৌতূহল তার মনে কাজ করছিল। নিঃশব্দে এসে দরজার কাছে দাঁড়াতেই হঠাৎ তার চোখে পড়ল এক মায়াভরা দৃশ্য।
ঘরের ভেতরে নিলয় দাঁড়িয়ে আছে আইরার সামনে। আইরার উঁচু হয়ে ওঠা পেটে নিলয় খুব যত্ন করে একটা চুমু দিল, তারপর আদর ভরা স্পর্শে তার কপাল আর গালেও চুমু খেল। মুহূর্তটা ছিল খুবই আন্তরিক আর ভালোবাসায় ভরা।
এই দৃশ্য দেখে আইলিন হঠাৎ করে ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেল। মনে হলো যেন সে এমন কিছু দেখে ফেলেছে, যা দেখা তার ঠিক হয়নি। কোনো শব্দ না করেই আস্তে করে সেখান থেকে সরে গেল সে।
তারপর প্রায় দৌড়েই নিজের ঘরে এসে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। বিছানার পাশে বসে কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল
সব ভাবনা সরিয়ে রেখে আইলিন পড়াশোনায় মন বসানোর চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ ভেসে এলো। বিরক্ত মুখে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই অবাক হয়ে গেল—নিজের ঘরের সামনে লিসাকে দেখার আশা সে একেবারেই করেনি। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল লিসার দিকে। লিসা ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি রেখে বলল,
“ভেতরে আসতে পারি?”
আইলিন কিছু বলার আগেই লিসা নিজে থেকেই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। এতে আইলিন বেশ বিরক্ত হলো। বিরক্ত স্বরে বলল,
“কি বলবেন?”
লিসা খুব আয়েশ করে গিয়ে বিছানার উপর বসে পড়ল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
“তোমাকে এর আগে যে ছবি আর ভিডিও দেখিয়েছিলাম, সেগুলো সবই সত্যি। আমি আর ত্রিয়াশ দুজন দুজনকে খুব ভালোবাসি।”
কথাটা শুনে আইলিনের ভেতরে রাগের ঢেউ উঠল। নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু রাগের স্বরে বলল,
“ভালোবাসা যদি থেকেও থাকে, সেটা আমার বিয়ের আগে ছিল। কিন্তু এখন সে শুধু আমার—এবং সে আমাকে ভালোবাসে।”
আইলিনের কথায় লিসার যেন বেশ মজা লাগল। সে শব্দ করে হেসে উঠল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি রেখে বলল,
“তাই যদি হয়, তাহলে বলো তো—তোমার সাথে কি এখন পর্যন্ত একবারও কথা হয়েছে? অথচ দেখো, আমার সাথে কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই কথা হয়েছে।”
এই বলে লিসা নিজের ফোনটা আইলিনের সামনে ধরল। ফোনের স্ক্রিনে কিছু দেখাতেই আইলিনের বুকটা কেঁপে উঠল। তবুও সে নিজের দুর্বলতা লিসার সামনে প্রকাশ করতে চাইল না। চুপচাপ গিয়ে খাটের এক কোণায় বসে রইল।
ঘর থেকে বের হওয়ার আগে লিসা আবার বলল,
“তুমি চাইলে বাড়ির যে কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো—কত সাল থেকে আমরা প্রেম করতাম।”
কথা শেষ করে লিসা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, তবে তার ঠোঁটের কোণে তখনও সেই দুষ্টু হাসি লেগে ছিল।
লিসা বেরিয়ে যেতেই আইলিন ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তার ভেতরে তখন প্রচণ্ড রাগ জমে উঠেছে। মনে হচ্ছে নিজের চুল নিজেই ছিঁড়ে ফেলবে। আগে যখন সেই ছবি আর ভিডিও দেখেছিল, তখন সে ত্রিয়াশকে কিছুই বলেনি। সবকিছু ভুলে গিয়ে সংসারে মন দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আজ আর কিছুই সহ্য হচ্ছে না।
রাগে তার পুরো শরীর কাঁপছে। কণ্ঠ কাঁপছে, আর চোখ দিয়ে একনাগাড়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। শেষমেশ ফোনটা হাতে নিয়ে সে বারবার ত্রিয়াশের নাম্বারে কল করতে শুরু করল।
পাঁচ বারের মাথায় কলটা রিসিভ করলো।
ত্রিয়াশ কলটা ধরতেই আইলিন কোনো ভালো-মন্দ না জিজ্ঞেস করেই রাগী গলায় বলে উঠল,
“আপনার লিসার সাথে কী চলছে? যদি ওকে ভালোবাসেন, তাহলে আমাকে কেন ধরে রেখেছেন? আমাকে মুক্তি দিয়ে দিন।”
ওপাশ থেকে ত্রিয়াশ খুবই শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“তোমার সব প্রশ্নের উত্তর আমি বাসায় গিয়ে বলব।”
আইলিন যেন আরও বিরক্ত হয়ে উঠল।
“না, এখনই বলুন।”
ত্রিয়াশ একটু বিরক্ত স্বরে বলল,
“আইলিন, শান্ত হও। সবসময় এত বাড়াবাড়ি ভালো লাগে না।”
আইলিন কষ্ট মেশানো কণ্ঠে বলল,
“আমার সবকিছু ভালো লাগবে কীভাবে? ভালো তো লাগে লিসাকে।”
এবার ত্রিয়াশ ধৈর্য হারিয়ে ফেলল।
“শাট আপ। উল্টোপাল্টা কথা বলা বন্ধ করো। বললাম তো, বাসায় গিয়ে তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দেবো।”
আইলিন যেন কোনো কথাই শুনলো না। রাগে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে। নিজের উপর আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে সে ত্রিয়াশকে বলেই ফেলল,
“চোপ! একদম চোপ। যা বলার এখনই বল। নষ্টামি করে বেড়াস, ঘরে কি বউ নেই? তোদের মতো পুরুষের জন্যই সংসার ভাঙে।”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আইলিন জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। তার বুক উঠানামা করছে, চোখে জমে আছে অপমান আর রাগের ঝড়।
ওদিকে সারাদিনের কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে সবে হোটেলে ফিরেছে ত্রিয়াশ। ফোনের ওপাশ থেকে আইলিনের এমন তীব্র কথাগুলো শুনে তার মেজাজ মুহূর্তেই খারাপ হয়ে গেল। ক্লান্তির সাথে রাগ মিশে গিয়ে সে ফুঁসতে লাগল।
রাগী গলায়, প্রায় চিৎকার করেই ত্রিয়াশ বলল,
“তোমাকে বিয়ে করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। কেন আমার জীবনে এসেছিলে তুমি? তোমার সাথে যদি কখনো দেখা না হতো, তাহলে অনেক ভালো হতো। আর কখনো আমাকে কল দিয়ে ডিস্টার্ব করবে না। গট ইট!”
আইলিন কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে কল কেটে গেল।
নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আইলিন। তারপর হঠাৎ করেই নিজের ফোনটা বিছানার ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল সে। আর নিজেকে সামলাতে না পেরে শব্দ করে কেঁদে উঠল—ভেঙে পড়া এক বুক কষ্ট আর অপমান নিয়ে।
চলবে,,,
[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। আমি নবীন লেখিকা আপনাদের ভালোবাসা আমার প্রেরণা। ]