গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ২৯
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
তিন দিন কেটে গেছে। সেদিন আইলিনের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করার পর থেকেই ত্রিয়াশ নিজেই নিজের ভেতরটা পুড়িয়ে যাচ্ছে। মাথা ঠান্ডা হওয়ার পর এই তিন দিনে সে কতবার যে আইলিনকে মেসেজ করেছে, কল করেছে—তার হিসাব নেই। কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি। আইলিন তার একটি মেসেজও এখনো সিন করেনি।
এদিকে সিঙ্গাপুরে তার কাজও পুরো শেষ হয়নি, তবু কালকের মধ্যেই সে বাংলাদেশে ফিরতে চায়। সাততলা বিল্ডিংয়ের অফিস রুমে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিয়াশ। চারদিকে কাচে ঘেরা রুম—সেখান থেকে বাইরের পুরো শহরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ব্যস্ত রাস্তা, গাড়ির লাইট, দূরের বিল্ডিং—সবকিছুই চোখে পড়ছে, অথচ তার মন যেন কোথাও আটকে আছে।
হাতে ধরা ফোনটার দিকে আবারও তাকালো সে। না, এখনো আইলিন মেসেজটা দেখেনি। বুকের ভেতর অস্থিরতা আরও বেড়ে গেল। আবারও কল দিল সে। রিং হতে হতে শেষ পর্যন্ত কেটে গেল।
রাগে মনে হলো ফোনটা ছুড়ে ভেঙে ফেলবে। আবার সেই রাগটাই গিয়ে পড়ছে আইলিনের ওপর। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে সে একটা মেসেজ লিখে পাঠাল—
“কতদিন এভাবে ইগনোর করে রাখবে, আইলিন? ভুল করেছি, সেটা আমি স্বীকার করছি। তাই বলে এভাবে একেবারে গায়েব হয়ে থাকবে? অন্তত একটা রিপ্লাই তো দিতে পারো। আজ যদি রিপ্লাই না আসে তাহলে শাস্তির জন্য প্রস্তুত হও।”
ত্রিয়াশ দেখল আইলিন অনলাইনে আছে, তবুও তার পাঠানো মেসেজটি এখনো সিন করেনি। এমনিতেই দূরে থাকার কারণে মনটা খারাপ ছিল, তার ওপর আইলিনের এই উপেক্ষা যেন আরও বেশি বিরক্ত করে তুলল তাকে। রাগটা আর ধরে রাখতে পারল না সে। শেষমেশ বিরক্তি আর রাগ মিশিয়ে আবারও একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিল—
“শা'লি, আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিস না… নইলে কিন্তু খুব খারাপ হবে।”
ত্রিয়াশের ভীষণ রাগ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে আইলিন সামনে থাকলে তাকে একটা ঠাটিয়ে থাপ্পড় মেরে দিতো—ইগনোর করার ফলটা ভালো করে বুঝিয়ে দিতো। কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে বিরক্তি নিয়ে সেটি পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। তারপর হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিল। মিটিংয়ের সময় হয়ে গেছে। আজই সব ডিল ফাইনাল করতে হবে, কারণ কালই সে বাংলাদেশে ফিরবে। ভাবনাগুলো সরিয়ে রেখে ত্রিয়াশ ধীর পায়ে মিটিং রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
।
।
এদিকে আইলিনের পরীক্ষা শুরু হয়েছে দুই দিন হলো। আজও পরীক্ষা দিয়ে মাত্র হল থেকে বের হলো সে। কিন্তু গত তিন দিন ধরে সে কারোর সাথেই ঠিকমতো কথা বলছে না। চুপচাপ ধীর পায়ে এসে দাঁড়াল ইউভির সামনে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে ইউভিই তাদেরকে আনা-নেওয়া করছে। ইউভির পাশে আগেই দাঁড়িয়ে ছিল নিশি আর নিভান।
আইলিনকে দেখেই ইউভি তার ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ত্রিয়াশ অনেকবার কল করেছিল। আমি ধরিনি, তুমি দেখো কি বলবে।”
আইলিন কোনো কথা না বলে শান্তভাবে নিজের ফোনটা হাতে নিল। ঠিক তখনই নিশি বলে উঠল,
“চলো না, একটু কেনাকাটা করে আসি।”
কেউ আপত্তি করল না। সামনে ঈদ, কিছু না কিছু তো কিনতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটু এগোলেই একটা বড় মল আছে, ঠিক করল সেখান থেকেই শপিং করবে।
ইউভি, নিশি আর নিভান সামনে হাঁটছিল, আর তাদের একটু পেছনে হাঁটছিল আইলিন আর পৃথা। পৃথা লক্ষ্য করছিল—আইলিন আজ খুব চুপচাপ। কী হয়েছে বুঝতে পারছে না। তাই ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“আইলিন, কী হয়েছে তোর? এত চুপচাপ হয়ে আছিস কেন?”
আইলিন হালকা স্বরে বলল,
“কিছু না… এমনিতেই ভালো লাগছে না।”
পৃথা একটু হাসার ভঙ্গিতে বলল,
“এমনিতেই আবার কারো ভালো লাগে না নাকি? ত্রিয়াশ স্যারের জন্য মন খারাপ? তাহলে কল করে কথা বলে নে। আরে পাগলি, তোরই তো জামাই!”
পৃথার কথার কোনো জবাব দিল না আইলিন। চুপচাপ হাঁটতে লাগল। তাকে আজ একটু দুর্বলও লাগছে। রোজা রেখে পরীক্ষা দিচ্ছে—সেটার ক্লান্তি তো আছেই। তবে তার চেয়েও বেশি ক্লান্ত আর ভারী হয়ে আছে তার মনটা।
অনেকক্ষণ ধরে তারা শপিং মলের ভেতর ঘুরে ঘুরে জামা–কাপড় দেখছে। এত ঘোরাঘুরি আইলিনের মোটেও পছন্দ নয়। তার স্বভাবটাই এমন—যা ভালো লাগে, দাম কম হোক বা বেশি, পছন্দ হলে কিনে নেয়; অযথা সময় নষ্ট করে ঘোরাঘুরি করা তার ধাতে নেই। তবুও সে কিছু বলল না। নিশির তো নতুন বিয়ে হয়েছে, খুশি মনে শপিং করুক—এই ভেবেই চুপ করে থাকল আইলিন।
একসময় আইলিন একটা চুড়ির দোকানে ঢুকল। সেখানে ঢুকেই একটা চুড়ি তার ভীষণ পছন্দ হয়ে গেল। না ভেবেই সে দুই ডজন চুড়ি কিনে নিল এবং সেগুলো সুন্দর করে প্যাকেটিং করে নিতে বলল। এর সাথে আরও তিন জোড়া চুড়ি নিল। তারপর টুকটাক নিজের জন্য আর আইরার জন্যও কিছু জিনিস কিনে ফেলল।
এসব কেনাকাটার পর তার মনটা বেশ ভালো লাগছিল। দোকান থেকে বের হতেই হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল পৃথা। মুখে চওড়া হাসি, হাতে একটা ছোট প্যাকেট। প্যাকেটটা আইলিনের দিকে এগিয়ে দিয়ে সে বলল,
“এটা শুধু তোর জন্য, আমার প্রাণের, আমার সুখে দুঃখের বান্ধবী ।”
কথাটা শুনে আইলিন হেসে ফেলল। প্রতি ঈদের সময়ই পৃথা তাকে কিছু না কিছু উপহার দেয়—এটা যেন তাদের এক মিষ্টি অভ্যাস হয়ে গেছে। হাসিমুখেই আইলিন নিজের হাতে ধরা প্যাকেটটা পৃথার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“শাঁকচুন্নি, এটা তোর জন্য।”
পৃথা খিলখিল করে হেসে উঠল।
ওদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ইউভি সবকিছু ত্রিয়াশকে দেখাচ্ছিল। আইলিনের সাথে ত্রিয়াশের এখনো কথা হয়নি, কিন্তু তবুও ত্রিয়াশ ভিডিও কলে ইউভির মাধ্যমে সারাক্ষণ আইলিনকে দেখছিল। এমনকি মিটিংয়ের মাঝেও সে এক ঝলক বউকে দেখে নিয়েছে।
আইলিনের যত রাগ আর অভিমান আছে, সব সে ভাঙবেই—ভালোবাসা দিয়েই।
অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, কিন্তু পৃথা আর নিশির কেনাকাটা যেন শেষই হচ্ছে না। এদিকে আইলিন মলের ভেতর ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখছে, তবুও তার তেমন কিছুই পছন্দ হচ্ছে না। তাই ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে কেউ বলে উঠল,
“তুমি কি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো?”
অপ্রত্যাশিত এই প্রশ্নে আইলিন পেছনে ফিরে তাকাল। দেখল, এক মধ্যবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে দেখে মহিলা মুচকি হাসলেন। সামনে এসে আবার বললেন,
“আসলে তোমার গলায় আইডি কার্ড দেখে জিজ্ঞেস করলাম। তুমি কোন বর্ষের স্টুডেন্ট?”
আইলিন মিষ্টি হেসে উত্তর দিল,
“আন্টি, আমি প্রথম বর্ষের স্টুডেন্ট।”
মহিলাটি হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
“আমার মেয়েও ওই ভার্সিটিতেই পড়ত।”
আইলিন কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এখন পড়ে না?”
মহিলাটি একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“সে এখন আকাশের তারা হয়ে গেছে। গত রমজানে সড়ক দুর্ঘটনায়…”
এরপর আর কিছু বলতে পারলেন না। তার চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। আইলিনের খুব মায়া লাগল, কিন্তু তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পেল না।
মহিলাটি নিজের চোখের পানি মুছে হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
“দেখো না, তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিলাম। আসলে আমার মেয়েটাও তোমার মতোই দেখতে ছিল।”
আইলিন তাড়াতাড়ি বলল,
“না না আন্টি, আমি কিছু মনে করিনি।”
মহিলাটি স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
“আচ্ছা মা, এসব কথা বাদ দাও। রাস্তা-ঘাটে সাবধানে চলাফেরা করবে।”
আইলিন শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তার মুখের দিকে তাকিয়ে মহিলা আবার জিজ্ঞেস করলেন,
“মা, তুমি কি বিবাহিত?”
প্রশ্নটা শুনে আইলিন একটু লজ্জা পেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“জি আন্টি।”
মহিলাটি মুচকি হেসে দোয়া করলেন,
“মাশা-আল্লাহ। আল্লাহ তোমাদের সুন্দর আর সুখের সংসার দান করুন।”
আর কিছুক্ষণ কথা বলে তিনি চলে গেলেন। আইলিন তার চলে যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর সামনে এগিয়ে এসে কাচের দেয়ালের পাশে দাঁড়াল। মলের ভেতর থেকেই বাইরের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়।
সে রাস্তায় তাকিয়ে দেখল—বিকেল হয়ে এসেছে। চারপাশে বেশ ভিড় জমেছে। কেউ ইফতার কিনছে, কেউ আবার পরিবার নিয়ে শপিং করতে এসেছে।
হঠাৎ আইলিনের চোখ এক জায়গায় গিয়ে থেমে গেল। একটি দম্পতি দাঁড়িয়ে আছে, তাদের সাথে তিন বছরের ছোট্ট একটি মেয়ে। মেয়েটি বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে এত মিষ্টি যে, আইলিনের মন চাইল গিয়ে একটু আদর করে গাল টিপে দিতে।
আইলিন ছোট বাচ্চা খুব ভালোবাসে। কোনো বাচ্চা দেখলেই তার আদর করতে ইচ্ছে করে। তাই ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে মলের বাইরের দিকে এগিয়ে গেল।
পৃথা আর নিশির কেনাকাটা শেষ। তারা চারদিকে তাকিয়ে আইলিনকে খুঁজলো, কিন্তু কোথাও তাকে দেখতে পেল না। হঠাৎ কাচের দেওয়াল ভেদ করে বাইরে চোখ গেল পৃথার। দেখল, আইলিন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। তারা তাড়াহুড়ো করে নিচে নামতে লাগল। বাসায় গিয়ে আবার ইফতারও করতে হবে, তাই সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। নিচে নেমে তারা একটু এগোলেই আইলিনের কাছে পৌঁছে যাবে।
এদিকে আইলিন রাস্তার এপাশে দাঁড়িয়ে সেই ছোট্ট বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে। বাচ্চাটা রাস্তার ওপাশে তার বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎই মেয়েটা বাবার হাত ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে রাস্তায় নেমে পড়ল। চারদিকে দ্রুতগতির গাড়ি চলাচল করছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে—এটা আইলিন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না।
এক মুহূর্ত দেরি না করে সে হাতের সব ব্যাগ মাটিতে ফেলে দৌড়ে গেল বাচ্চাটার দিকে। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে মেয়েটাকে রাস্তার পাশের দিকে সরিয়ে দিল। কিন্তু নিজে আর সরে দাঁড়াতে পারল না। ঠিক তখনই দ্রুতগামী একটি গাড়ি এসে তাকে ধাক্কা দিল। আইলিন ছিটকে কিছুটা দূরে গিয়ে পড়ল। তার কপাল কেটে রক্ত ঝরতে লাগল।
এই দৃশ্য দেখে পৃথা চিৎকার করে উঠল,
“নাআআ… আইলিন!”
চারপাশে থাকা সবাই হতবাক হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই সবাই দৌড়ে এসে আইলিনের চারপাশে ভিড় করল। আইলিনের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা ছিল তার ফোন। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে ত্রিয়াশের কল—বারবার কল করছে, কিন্তু সেই কল ধরার মতো অবস্থায় নেই আইলিন। নিথর দেহটা পিচঢালা রাস্তায় পড়ে রইল।
পৃথা দৌড়ে এসে আইলিনের মাথাটা নিজের বুকে তুলে নিল। চোখের পানি থামছে না তার। কাঁদতে কাঁদতে সে বলল,
“আমাদের তাড়াতাড়ি হসপিটালে পৌঁছাতে হবে… প্লিজ, কেউ হেল্প করুন!”
নিশি আর নিভান যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু কীভাবে এভাবে বদলে গেল, তারা যেন বুঝতেই পারছে না। ইউভি দ্রুত আইলিনকে পাঁজা কোলে তুলে নিল এবং ছুটল হসপিটালের দিকে।
তার মনে তখন শুধু একটাই মুখ ভেসে উঠছে—ত্রিয়াশ। মনে মনে শুধু ভাবছে, তাকে কী জবাব দেবে সে…।
চলবে,,,
[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। আমি নবীন লেখিকা আপনাদের ভালোবাসা আমার প্রেরণা। ]