গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ৩২
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
বিকেল সাড়ে তিনটার মতো বাজে । আকাশে তেমন মেঘ নেই, হালকা সোনালি রোদের ঝিলিক চারদিকে ছড়িয়ে আছে। তবে আবহাওয়ার কোনো ভরসা নেই—যেকোনো সময় আবার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নেমে আসতে পারে।
মির্জা বাড়ির ছোটরা সবাই আজ বেরিয়েছে ঘুরতে, শুধু বড়রাই বাড়িতে রয়ে গেছে। বর্তমান এই সময়ে ঢাকার রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা, তাই তারা গাড়ি নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে নিজেদের ইচেমতো ছবি তুলছে, হাসি-আনন্দে সময় কাটাচ্ছে।
আইরা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় বাড়িতেই আছে, আর নিলয়ও তার পাশে থাকার জন্য বাইরে আসেনি। নিভান তার আদরের বোন নিয়তিকে নিয়ে ব্যস্ত, অন্যদিকে ইউভি আর ত্রিয়াশ নিজেদের স্ত্রীদের সঙ্গেই সময় কাটাচ্ছে। নিভান আবার তাদের সুন্দর কিছু কাপল ছবিও তুলে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে আইলিনের এবারের ঈদ শ্বশুরবাড়ির সবার সঙ্গে খুব আনন্দেই কাটছে। ঘুরতে বের হওয়ার আগে ত্রিয়াশের দেওয়া একখানা শাড়ি পরে বেড়িয়েছে। এক্সিডেন্টের পর ত্রিয়াশের সঙ্গে তার কথা বন্ধ ছিল, তবে ধীরে ধীরে ত্রিয়াশের যত্ন আর আন্তরিকতায় তার মন গলতে শুরু করেছে। আজ যে সে ত্রিয়াশের সঙ্গে ঘুরতে বের হয়েছে, এতে মনে মনে সে ভীষণ খুশি—একটা নীরব ভালো লাগা তাকে ঘিরে আছে।
ঘোরাঘুরি করতে করতে সন্ধ্যা নেমে এসেছিল। সবাই বাড়ির পথে রওনা দিলেও ইউভি মাঝপথে কোনো কাজে চলে যায়। ত্রিয়াশ বাকিদের নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। সারাদিনের ক্লান্তিতে যে যার ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে থাকে।
আইলিনও নিজের ঘরে ঢোকে, কিন্তু ত্রিয়াশ তখনো আসেনি। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে সে। শরীরটা এমনিতেই বেশ দুর্বল—এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি, নিয়মিত ওষুধও খেতে হচ্ছে। ক্লান্তির কারণে খুব দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়ে আইলিন।
কিছুক্ষণ পর ত্রিয়াশ ঘরে এসে দেখে আইলিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কোনো শব্দ না করে সে নিঃশব্দে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। অল্প সময়ের মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে তখন সাতটা পঁচিশ বাজে। আপাতত তার বিশেষ কোনো কাজ না থাকায় ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ে সে।
নিভান কিছুক্ষণ আগেই ইমেইলে সবার ছবিগুলো পাঠিয়েছে। এখন ত্রিয়াশ সেগুলো মন দিয়ে দেখছে—বিশেষ করে তার আর আইলিনের ছবিগুলো। ছবির পর ছবি দেখতে দেখতে হঠাৎ তার মনে পড়ে যায় বিয়ের প্রথম রাতের কথা। সেদিন সে আইলিনকে বলেছিল, “ভালোবাসা” শব্দটাই সে ঘৃণা করে। অথচ সময়ের ব্যবধানে সবকিছু কত বদলে গেছে! বিয়ের বছরও ঘোরেনি, এর মধ্যেই সে গভীরভাবে আইলিনের প্রেমে পড়ে গেছে—এমন এক প্রেম, যেখান থেকে সে আর কখনো মুক্তি পেতে চায় না।
এই ভালোবাসাকে সে এক ধরনের অসুখ মনে করে—একটা মধুর, অদ্ভুত অসুখ। আর সেই অসুখের একমাত্র ওষুধ আইলিন নিজেই। এখন সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারে, আইলিন ছাড়া তার কোনো গন্তব্য নেই। এত ভালোবাসার পরও এখনো মুখ ফুটে প্রিয় মানুষটাকে বলা হয়নি তার মনের কথা।
ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে ত্রিয়াশের ঠোঁটে ভেসে ওঠে এক মৃদু, তৃপ্তির হাসি। তারপর ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে সে তাকায় ঘুমন্ত আইলিনের দিকে। ধীর পায়ে, এক পা এক পা করে সে এগিয়ে যায় তার কাছে। ঝুঁকে পড়ে আলতো করে আইলিনের কপালে একটি চুমু এঁকে দেয়।
ঘুমের মধ্যে আইলিন একটু নড়ে ওঠে, ঠোঁটটা হালকা উল্টে দেয়। সেই দৃশ্য দেখে ত্রিয়াশ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে—তার খয়েরি রঙের ঠোঁটের দিকে। মনে এক অদ্ভুত আকর্ষণ জাগে, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নেয়। ঘুমন্ত অবস্থায় আইলিনের সুযোগ নিতে সে চায় না।
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সে সেখান থেকে সরে এসে অন্ধকার বেলকনিতে দাঁড়ায়। একটা সিগারেট ধরায়, ধোঁয়ার সাথে সাথে নিজের ভেতরের অস্থিরতাটাও ধীরে ধীরে শান্ত করার চেষ্টা করে।
হঠাৎ করেই মোবাইলে মেসেজের শব্দ ভেসে এলো। ত্রিয়াশ টাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফোন বের করতেই দেখল—ইউভির মেসেজ। কপালে ভাঁজ ফেলে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে পড়ল, সেখানে শুধু দু’টি শব্দ,
“ছাদে আয়।”
এই অসময়ে ছাদে যাওয়ার কারণ তার মাথায় ঢুকল না, বরং বিরক্তিই বেশি লাগল। হাতে ধরা সিগারেটটা সে অ্যাশট্রে নিভিয়ে ফেলল। ঠিক তখনই আবার ইউভির কল এলো। বিরক্তি নিয়েই ফোনটা রিসিভ করে বলল,
“মেয়েদের মতো রাত বিরাতে ডিস্টার্ব করছিস কেন? জানিস না, ঘরে বউ আছে?”
ওপাশ থেকে ইউভির ঠাট্টার সুর,
“বউকে তো চাইয়া দেহোস, কিছু তো করতে পারোস না। হু!”
ত্রিয়াশ আরও বিরক্ত হয়ে বলল,
“কিছু করতে হলে কি তোকে দেখিয়ে করব?”
ইউভি হেসে উঠল,
“না দেখালি, তবুও তো আমরা কিছু-টিছু দেখতাম!”
ত্রিয়াশ কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল।
“কি দেখতি?”
“তোর লাভ বাইট!”
এই ফালতু কথায় ত্রিয়াশ চুপ করে গেল। ইউভির এই বাজে রসিকতা তার একদমই সহ্য হয় না। ওকে চুপ থাকতে দেখে ইউভি আবার তাড়া দিয়ে বলল,
“তাড়াতাড়ি ছাদে আয়, কাজ আছে।”
এরপর কোনো সুযোগ না দিয়েই কল কেটে দিল।
ত্রিয়াশ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা পকেটে ঢুকাল। না গেলে যে ইউভি সরাসরি ঘরে চলে আসবে, সেটা সে ভালোই জানে। আইলিন ঘুমিয়ে আছে—তাকে বিরক্ত করতেও চায় না। তাই বাধ্য ছেলের মতোই সে ছাদের দিকে হাঁটা দিল।
ছাদে যাওয়ার পথে ত্রিয়াশের সঙ্গে দেখা হলো নিহাল মির্জার। তিনি চোখের চশমাটা ঠিক করতে করতে একটু কৌতূহলী ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন,
“এদিকে কোথায় যাচ্ছিস?”
ত্রিয়াশ স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিল,
“চাচ্চু, একটু ছাদে যাই।”
নিহাল মির্জা বাইরে তাকিয়ে আবহাওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন,
“আজ তো বেশ ঠান্ডা পড়েছে, তার ওপর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি—হঠাৎ ছাদে কেন?”
ত্রিয়াশ সংক্ষিপ্তভাবে বলল,
“ইউভি ডেকেছে।”
“ওহ, আচ্ছা,”
বলে নিহাল মির্জা আর কিছু না বলে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
ত্রিয়াশও আর দেরি না করে দ্রুত পা চালিয়ে ছাদের দিকে এগিয়ে গেল।
।
।
পৃথা তার শ্বশুরবাড়ি রাজশাহীতে ঈদ করতে এসেছে। এবারের ঈদে তার মনটা একটু বিষণ্ণ—কারণ আইলিনের সঙ্গে দেখা হবে না। তবে ফোনে কথা হয়েছে, সেটাতেই কিছুটা শান্তি পেয়েছে সে। মন খারাপ দেখে আহান তাকে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল, তবুও পৃথা গাল ফুলিয়েই আছে।
কারণটা ছোট হলেও তার কাছে বেশ বড় মনে হচ্ছে—রাত হয়ে গেল, তবুও আইলিন তাদের কাপল পিকটা দেয়নি। এমনকি পৃথা নিজেরটা পাঠানোর পরও সে সেটি সিন করেনি। ফোনটা সামনে রেখে অভিমানী মুখে বসে আছে পৃথা।
আহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম স্বরে বলল,
“আইলিন তো এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি, হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। সকালে কথা বলো।”
আহানের কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। পৃথা আর রাগ-অভিমান করে থাকল না। শ্বশুরবাড়িতে এটাই তার প্রথম ঈদ, তাই নতুন পরিবেশে সবকিছুই তার কাছে অন্যরকম ভালো লাগছে। ধীরে ধীরে মনটাও হালকা হয়ে এল।
এদিকে ত্রিয়াশ ছাদে উঠে দেখল—আগেই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে নিভান, নিলয় আর ইউভি। তিনজনই ছাদের পাঁচিল ধরে আড্ডা দিচ্ছিল। ত্রিয়াশকে দেখেই ইউভি হেসে বলল,
“অবশেষে আসলি!”
কিন্তু ইউভির কথায় কোনো গুরুত্ব দিল না ত্রিয়াশ। সে চারপাশটা ভালো করে দেখে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“এগুলো কী?”
ইউভি মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“বিয়ার। আজকে আমরা ব্যাচেলর পার্টি করবো!”
ত্রিয়াশ বিরক্ত হয়ে বলল,
“তাই বলে আজকের দিনে? ওয়েট, তোরা ব্যাচেলর? দুই দিন পর বাচ্চার বাপ হবি—এসব বলতে লজ্জা করে না?”
নিভান নির্লজ্জ ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বলল,
“আমি তো এখনো ব্যাচেলর আছি!”
ত্রিয়াশ সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে উঠল,
“চুপ, বেয়াদব!”
পরিস্থিতি সামলাতে ইউভি আবার বলল,
“আরে রাগ করিস না। আমাদের বিয়েটা তো হঠাৎ করেই হয়ে গেছে। পরে ধুমধাম করে অনুষ্ঠান হবে। তাই ভাবলাম, এখনই একটু ব্যাচেলর পার্টি করা যাক।”
ত্রিয়াশ চুপ করে রইল। তখন ইউভি আবার যোগ করল,
“এছাড়া, এর আগেও তো আমরা ছাদে বসে বিয়ার খেয়েছি। আশা করি মামুরা কেউ জানবে না।”
ত্রিয়াশ গম্ভীর কণ্ঠে শুধু বলল,
“না জানলেই ভালো।”
এরপর ইউভি নিজ হাতে সবার মধ্যে বিয়ারের বোতল বিলিয়ে দিল। ত্রিয়াশও নিল, এবং এক ঢোকে অনেকটা খেয়ে ফেলল। ইউভি, নিভান আর নিলয় একসাথে দাঁড়িয়ে পান করছিল, আর ত্রিয়াশ ছাদের পাঁচিলে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ল।
কিন্তু বিয়ার খাওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই ত্রিয়াশের শরীরে অদ্ভুত অনুভূতি শুরু হলো। যেন শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ বয়ে যাচ্ছে। সে লক্ষ্য করল, বাকি তিনজন নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছে। ত্রিয়াশের সন্দেহ হলো—তার বিয়ারে কিছু মেশানো হয়েছে।
তার শরীর অস্থির হয়ে উঠল, ঘামতে লাগল প্রচণ্ডভাবে। রাগী গলায় সে বলে উঠল,
“সত্যি করে বল—আমার বিয়ারে কে কী মিশিয়েছিস?”
ইউভি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
“কি… কী বলছিস? একই বিয়ার তো আমরাও খেয়েছি!”
কিন্তু ত্রিয়াশ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিল না। কেমন উন্মাদ লাগছে নিষিদ্ধ বাসনা জাগছে মনে। অস্বস্তি আর অস্থিরতায় সে আর এক মুহূর্তও ছাদে দাঁড়িয়ে থাকল না। দ্রুত নিচে নেমে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
ত্রিয়াশের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ইউভি ধীরে বলে উঠল,
“কাম হো গেয়া, আজ দোস্ত কে প্যারে কি শুরুয়াত হোগি।”
ইউভি ধীরে বললেও নিলয় কথাটা শুনে ফেলে। ইউভির কাঁধে হাত রেখে বলে,
“ কাল সকালের চিন্তা কর, ত্রিয়াশ কি করবে। ”
“ কিচ্ছু করবে না। ”
“ তুই সিউর কি করে? ”
“ কাল দেখলেই বুঝতে পারবে। ”
ইউভি নিলয়ের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলে,
“আজ রাত উস্কি পহলি রাত হে, জিসে কভি ভুলাইয়া নেহি যা সাক্তা।”
বলেই ইউভি হো হো করে হেসে ফেলে সাথে নিলয় আর নিভান দুজনেই হেসে ফেলে।
চলবে,,
[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। আমি নবীন লেখিকা আপনাদের ভালোবাসা আমার প্রেরণা। ]