গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ৩৫
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
চারপাশ জুড়ে ঝিঁঝি পোকার অবিরাম ডাক—নিঃশব্দ রাতটাকে যেন আরও গভীর করে তুলেছে। বাইরে হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে, তার ছোঁয়ায় পরিবেশে এক অদ্ভুত প্রশান্তি মিশে আছে। আকাশটা মেঘলা, মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে নেমে আসতে পারে ঝুম বৃষ্টি।
এই শান্ত, আবছা অন্ধকারে বারান্দার একটি চেয়ারে বসে আছে আইরা। ঠান্ডা বাতাস তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে, যেন মমতার পরশ দিচ্ছে। ধীরে ধীরে তার ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে আসছে—একটা নতুন জীবনের আগমনের অপেক্ষা, যার সাথে মিশে আছে আনন্দ আর অজানা এক ভয়। নিজের উঁচু হয়ে ওঠা পেটের উপর আলতো করে হাত রেখে সে আস্তে করে দাঁড়িয়ে পড়ল।
বারান্দার গ্রিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই বাতাস যেন আরও জোরে এসে তাকে ছুঁয়ে গেল। সেই মুহূর্তে হঠাৎ তার মনে হলো—সে একা নয়। পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কোনো শব্দ নয়, কোনো ছোঁয়া নয়—শুধু পরিচিত এক ঘ্রাণেই সে বুঝে গেল, নিলয় এসেছে।
নীরবতা ভেঙে নিলয় মৃদু, ভালোবাসা ভরা কণ্ঠে বলল,
“ভেতরে আসো, ঠান্ডা লেগে যাবে তো।”
আইরা মৃদু হাসল, চোখে প্রশান্তির ছায়া,
“এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে। এই ঠান্ডা হাওয়ায় শরীরটা যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে।”
নিলয় আর কিছু বলল না। সেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সত্যি বলতে, তারও এই মুহূর্তটা ভালো লাগছে—এই নীরবতা, এই কাছাকাছি থাকা, এই অদৃশ্য বন্ধন।
আইরা ধীরে ধীরে নিলয়ের কাছে এগিয়ে এল। খুব আস্তে করে বলল,
“আপনার ছেলে সন্তান পছন্দ, নাকি মেয়ে সন্তান?”
নিলয় একটু ঘুরে তার দিকে তাকাল। কণ্ঠে মৃদু কঠোরতা, কিন্তু ভালোবাসার গভীরতা স্পষ্ট,
“সন্তান তো সন্তানই হয়। এখানে পছন্দের প্রশ্ন আসে কেন? হুম? এমন কথা আর যেন না শুনি।”
আইরা চুপ করে গেল। তার চোখে যেন লজ্জা আর ভালোবাসার মিশ্র অনুভূতি।
নিলয় আলতো করে তার দুই হাতের মাঝে আইরার মুখটা ধরে, শান্ত গলায় বলল,
“জান, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।”
তার চোখে তখন জল চিকচিক করছে। আইরা সেই চোখের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত মায়ায় ভরে গেল। ঠোঁটে মিষ্টি হাসি এনে সে হালকা খুনসুটির ভঙ্গিতে বলল,
“জানি তো… কয়েকদিন পর বাচ্চার বাবা হবেন, আর এখনই কাঁদছেন—এটা কি ভালো দেখায়?”
নিলয় আর কিছু বলতে পারল না। হঠাৎ করেই সে আইরাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল,
“তোমার ডেলিভারির তারিখ যত এগিয়ে আসছে, আমার ততই ভয় লাগছে…”
আইরা নরম গলায় বলল,
“কিচ্ছু হবে না। আপনার সাথে সংসার করার স্বাদই তো ঠিকমতো মেটেনি এখনও… কোথাও যাচ্ছি না আমি। আপনাকে জ্বালানো এখনো যে বাকি, মশাই।”
কথা শেষ করেই সে খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে রাতের নিস্তব্ধতাও যেন একটু নরম হয়ে গেল। নিলয়ও মুচকি হেসে ফেলল—এই মানুষটার জন্যই তার সব ভয়, আবার সব সাহসও।
ঠান্ডা বাতাসে দোলনায় এসে দুজন বসে পড়ল। আইরা নিলয়ের কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল। এই ছোট্ট মুহূর্ত—তাদের কাছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শান্তি।
কিছুক্ষণ পর আইরা আবার ধীরে বলে উঠল,
“আজকে আইলিনকে একটু বেশিই সুন্দর লাগছিল…”
নিলয় কিছু বলল না। শুধু মনে মনে হাসল। নীরবে একটা দোয়া করল—ত্রিয়াশ আর আইলিন যেন সবসময় সুখী থাকে।
~~~~~~~
সকালে শাশুড়ীর কাছে থেকে ডেকে এনে ত্রিয়াশ
একটানা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে পড়িয়েছে—কোনো বিরতি নেই, কোনো ছাড় নেই। সামনে ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা, তাই ত্রিয়াশ বারবার করে ভালো রেজাল্ট করার গুরুত্ব বুঝিয়েছে। কিন্তু এত উপদেশ আর চাপ আইলিনের কাছে একদমই ভালো লাগেনি।
ঈদের পরের দিন—চারপাশে উৎসবের আমেজ, আত্মীয়স্বজনের দাওয়াত, ঘুরে বেড়ানো, আনন্দ—সবকিছু মিলিয়ে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ। অথচ আইলিনের জীবনটা যেন ঠিক উল্টো পথে চলছে। সবাই যখন আনন্দে ব্যস্ত, তখন সে বসে আছে পড়ার টেবিলে। তার মনে হচ্ছিল, বিয়ের পর স্বামী তাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে, সময় দেবে—কিন্তু বাস্তবে সে পেয়েছে এক “খাটাশ” স্বামী, যে শুধু পড়াশোনাই বোঝে।
এইসব জমে থাকা অভিমান নিয়ে পৃথাকে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে একটানা নিজের মনের কথা বলে গেল—ত্রিয়াশের প্রতি অভিযোগ, নিজের হতাশা, আর ঘুরতে না পারার কষ্ট। পৃথা চুপচাপ সব শুনছিল। কারণ তার নিজের অবস্থাও প্রায় একই রকম। তাই কোনো সান্ত্বনার কথা বলার মতো অবস্থায় সে ছিল না। শুধু নীরব শ্রোতা হয়ে রইল।
কথা বলা শেষে আইলিন বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকল। ঘরে এসে দেখে ত্রিয়াশ ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত। এই দৃশ্য দেখে তার মেজাজটা আবার খারাপ হয়ে গেল। মনে হলো, তার কোনো অনুভূতিরই যেন কোনো মূল্য নেই। আবার ফোন করল পৃথাকে—এবারও তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নিজের মতো করে বলতে শুরু করল,
“আগে যখন ঘুরতে যেতে চাইতাম, তখন বাবা-মা বলত—বিয়ের পর জামাইয়ের সঙ্গে ঘুরবি। এখন বিয়ে হয়েছে, জামাই বলে—পড়তে বসো! কেন? আমার কি মন চায় না ঘুরতে? একটু ঘুরলে মনটা ফ্রেশ হয়, তারপর না পড়ায় মন বসে—এটা বোঝার মতো কেউ নেই! ফাহহ।”
কথা শেষ না করেই সে ফোন কেটে দিল।
ত্রিয়াশ ল্যাপটপে ব্যস্ত থাকলেও, সে বুঝতে পেরেছে—এই কথাগুলো আসলে তাকেই শোনানো হয়েছে। কিন্তু সে কিছু বলল না। চুপচাপ ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ আইলিনের দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত স্বরে বলল,
“রেডি হও।”
আইলিন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
ত্রিয়াশ হালকা মুচকি হেসে বলল,
“এই যে একটু আগে ৭ই মার্চের ভাষণ দিচ্ছিলে—তোমাকে কেউ ঘুরতে নিয়ে যায় না—চলো, ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।”
আইলিন বিরক্ত হয়ে বলল,
“জুতা মেরে গরু দান লাগবে না।”
ত্রিয়াশ অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
আইলিন গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল,
“মানে আপনি আগে আমাকে অপমান করলেন, এখন আবার ঘুরতে যাওয়ার অফার দিচ্ছেন। ভাবছেন আমি কিছু বুঝি না?”
“কে বলেছে তুমি বোঝো না? তুমি তো একটু বেশিই বোঝো।”
আইলিন আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ত্রিয়াশ দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল—
“আর একটা কথাও না। চুপচাপ রেডি হও।”
এ কথা বলে সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আইলিন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মনে মনে একটা প্রবাদ ভাবল—
“রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন।”
সে বুঝল, এই মুহূর্তে রাগ করলে তারই ক্ষতি। আসলে সে তো ত্রিয়াশের সাথেই ঘুরতে যেতে চায়। এতদিনের অভিমান, রাগ—সবকিছু একপাশে রেখে সে সিদ্ধান্ত নিল, এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করবে না।
মুখে হালকা হাসি নিয়ে সে রেডি হতে চলে গেল—মনে একরাশ উত্তেজনা নিয়ে।
আইলিন আজ খুব খুশি মনে সাজগোজ করেছে। বেবি পিংক রঙের সিকুয়েন্সের শাড়িতে তাকে বেশ মায়াবী লাগছে। হাতে চুড়ি, চোখে কাজল আর মুখে হালকা মেকআপ—সব মিলিয়ে নিজেকে আয়নায় দেখে তার ভালোই লাগল। একবার ভালো করে দেখে নিল, সব ঠিক আছে কিনা।
ঠিক তখনই ত্রিয়াশ এসে তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। আইলিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে তার খোপায় বেলি ফুলের গাজরা পরিয়ে দিল। এতে আইলিন লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ত্রিয়াশ কিছু বলতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত শুধু বলল,
“বাইরে অপেক্ষা করছি… আসো।”
বলেই সে চলে গেল।
আইলিন আবার একবার আয়নায় নিজেকে দেখে বাইরে বের হলো। ড্রয়িংরুমে এসে দেখল কেউ নেই, তাই কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ বেরিয়ে গেল।
বাগানে এসে দেখে ত্রিয়াশ বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারল তারা বাইকে করে কোথাও যাবে—ভাবতেই তার মনে আনন্দ জাগল। সে চুপচাপ গিয়ে ত্রিয়াশের পেছনে বসল।
ত্রিয়াশ বলল,
“শক্ত করে ধরে বসো।”
আইলিন তার কাঁধে হাত রাখল। তারপর ত্রিয়াশ বাইক স্টার্ট করে রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে এগিয়ে গেল।
রাত ধীরে ধীরে গভীর হয়ে উঠছে। শহরের কোলাহল যেন কোথাও মিলিয়ে গেছে—চারপাশে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। ফাঁকা রাস্তাগুলোতে কেবল হালকা বাতাসের শব্দ, মাঝে মাঝে দূরের কোনো অচেনা আওয়াজ। এই নির্জন শহর জুড়ে বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ত্রিয়াশ। পিছনে বসে আছে আইলিন—প্রথমে সে হালকা করে ধরেছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অজান্তেই শক্ত করে জাপ্টে ধরেছে ত্রিয়াশকে।
যেন এই মুহূর্তটা, এই পথচলাটা সে হারাতে চায় না।
চারপাশে শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে, আকাশে মেঘ জমে উঠেছে—যে কোনো সময় নেমে আসতে পারে ঝুম বৃষ্টি। কিছুদূর এগিয়ে ত্রিয়াশ বাইকটা থামালো একটি ছোট টং দোকানের সামনে। এই দোকানটা রাতে জেগে থাকে—সারারাত এখানে মালাই চা পাওয়া যায়।
আইলিনকে নামিয়ে বেঞ্চে বসতে বসতে ত্রিয়াশ বলল,
“মামা, দুটো মালাই চা দেন।”
চা-ওয়ালা মামা দু’জনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চা বানাতে লাগলেন। তারপর কাপ এগিয়ে দিয়ে ফোকলা দাঁতে হেসে বললেন,
“তোমাদের দু’জনকে বেশ মানিয়েছে। তোমাদের দম্পতি জীবন সুখের হোক।”
ত্রিয়াশ হালকা করে হেসে ফেলল, কিন্তু আইলিন একটু লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তারা চুপচাপ বসে থাকল কিছুক্ষণ।
হঠাৎ করেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। যেন আকাশ একসাথে সব জল ঢেলে দিচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো টিনের ছাউনিতে পড়ে এক অদ্ভুত সুর তুলছে। মানুষজন ছুটোছুটি শুরু করল—যে যেখানে পারে আশ্রয় নিতে লাগল।
কিন্তু আইলিনের কাছে বৃষ্টি মানেই আনন্দ। সে আধখাওয়া চা রেখে হঠাৎ করেই ছুটে গেল বৃষ্টির মাঝে। ত্রিয়াশ অবাক হয়ে চিৎকার করে বলল,
“আইলিন! বৃষ্টিতে ভিজো না, ঠান্ডা লেগে যাবে!”
কিন্তু আইলিন যেন কিছুই শুনল না। সে বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে দু’হাত মেলে দিল—মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল। তার চোখে-মুখে এমন এক শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস, যা কোনো কথায় প্রকাশ করা যায় না।
ত্রিয়াশ আর বসে থাকতে পারল না। সেও বৃষ্টির মাঝে গিয়ে আইলিনের হাত ধরে বলল,
“চলো, ঠান্ডা লাগবে।”
আইলিন মাথা নেড়ে হাসল,
“না, যাবো না। বৃষ্টিতে ভিজতে আমার খুব ভালো লাগে।”
ত্রিয়াশ আর কিছু বলতে পারল না। তার আগেই আইলিন তাকে টেনে নিয়ে গেল রাস্তায় জমে থাকা পানির দিকে। সেখানে গিয়ে সে ছোট বাচ্চাদের মতো পানিতে লাফাতে শুরু করল—পানি ছিটকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, আর তার হাসির শব্দ বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
ত্রিয়াশ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা—নেশাতুর দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে আইলিনের দিকে। যেন এই মুহূর্তটাই তার কাছে সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে সত্যি।
বৃষ্টি পড়ছে, শহর নীরব, আর সেই নীরবতার মাঝেই তাদের দু’জনের ছোট্ট পৃথিবীটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
চলবে,
[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। আমি নবীন লেখিকা আপনাদের ভালোবাসা আমার প্রেরণা। ]