ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ চৈত্রের মৃদু ছোঁয়া

৩৭তম পর্ব

লেখক: আফরিনা আক্তার সুইটি

গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া

লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি

পর্বঃ ৩৭ ( প্রথম অংশ )

🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫

নতুন দিনের সূচনা যেন ধীরে ধীরে উঁকি দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে সূর্য মামা। ভোরের কোমল আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে, আর সেই সোনালী রোদে যেন পুরো পরিবেশটা এক অন্যরকম মায়াবী আবেশে ভরে উঠেছে। সকালের এই নির্মল প্রশান্তি আর সতেজ হাওয়ায় মনও হয়ে উঠছে প্রফুল্ল।

আজ আইলিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। এমনকি ত্রিয়াশও আজ দেরি করেনি। কারণটা একেবারেই বিশেষ—বাড়িতে বিয়ের আয়োজন। এমন দিনে তো সকাল সকাল উঠতেই হয়, কারণ হাতে অনেক কাজ, আর প্রতিটা কাজই গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য অবহেলারও সুযোগ নেই, সবকিছু নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতেই হবে।

ত্রিয়াশ সকাল থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ডেকোরেশনের ছেলেদের সঙ্গে। কোথায় কীভাবে সাজাতে হবে, কোন জায়গায় কী বসবে—সবকিছু সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট দায়িত্ববোধ, কারণ এটি মির্জা বাড়ির মেয়ের বিয়ে। তাই আয়োজনের প্রতিটি খুঁটিনাটি যেন ঠিকঠাক হয়, সে ব্যাপারে সে অত্যন্ত যত্নশীল।

অন্যদিকে আইলিনও কম ব্যস্ত নয়। সে এই বাড়ির বউ, তাই তার ওপরও দায়িত্ব কম নয়। সকাল থেকেই সে কাজে লেগে পড়েছে। ঘরের ভেতরের কাজ হোক বা বাইরে অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি—সবকিছুতেই সে সমান দক্ষতায় হাত লাগাচ্ছে। তার কাজ করার ভঙ্গি এতটাই সুন্দর আর পরিপাটি যে, দেখলেই বোঝা যায় সে কতটা আন্তরিক।

চারপাশে উৎসবের আমেজ, ব্যস্ততা আর আনন্দ—সব মিলিয়ে এক অনন্য পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নতুন দিনের এই শুরুটা যেন শুধু একটি দিনের সূচনা নয়, বরং একটি নতুন সম্পর্ক, নতুন অধ্যায়ের সূচনার।

দেখতে দেখতে সকাল গড়িয়ে সাড়ে এগারোটা বাজে। বাড়িজুড়ে আজ এক অদ্ভুত ব্যস্ততা। ঠিক এই সময়েই পার্লার থেকে লোক এসে পৌঁছায়, নিশিকে সাজিয়ে তুলবে একদম পরিপূর্ণ বউয়ের সাজে। ঘরের ভেতরে প্রস্তুতি চলছে, নিশি শুধু একাই সাজবে না সকলেই সাজবে।

এদিকে আইলিন এখনো গোসলই করতে পারেনি। এত কাজের ভিড়ে নিজের দিকে তাকানোর সময় যেন পাচ্ছে না সে। তবুও দায়িত্ব তো দায়িত্বই—হাতে একটি ট্রে, তাতে কিছু ফল আর এক গ্লাস জুস নিয়ে সে নিশির ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সে জানে, একবার সাজানো শুরু হলে নিশির আর খাওয়ার সময় থাকবে না।

ঠিক তখনই হঠাৎ করে সামনে পড়ে লিসা। আইলিনের ভ্রু কুঁচকে যায়। লিসাকে সে একদমই পছন্দ করে না, বিশেষ করে যখন তাকে ত্রিয়াশের আশেপাশে দেখতে পায়—তখন তার বিরক্তি যেন আরও বেড়ে যায়। তাই কোনো কথা না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় আইলিন।

কিন্তু লিসা থেমে থাকার মেয়ে নয়। ঠোঁট বাঁকিয়ে, কেমন একটা মুচকি হাসি হেসে বলে ওঠে—

“আজকাল বেশ গ্লো করছো দেখছি!”

আইলিন থামে, ঘুরে তাকায়। তার চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ঠোঁটে কটাক্ষের হাসি।

“হ্যাঁ আপা, জামাইয়ের ভালোবাসার ডোজ পড়ছে তো, তাই। বলছি কী—আপনি অন্যের জামাইয়ের দিকে নজর না দিয়ে নিজে একটা জোগাড় করে নেন, দেখবেন আপনিও গ্লো করবেন।”

কথা শেষ করেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না আইলিন। বড় বড় পা ফেলে সোজা চলে যায়। লিসার সঙ্গে কথা বলতে তার একদমই ভালো লাগে না—বরং যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতেই সে স্বস্তি পায়।

আইলিনের চলে যাওয়া পিঠের দিকে তাকিয়ে থাকে লিসা। তার চোখে এক ঝলক তাচ্ছিল্য, ঠোঁটে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে এক কুটিল হাসি। মনে মনে বলে—

“দেখি, এই গ্লো কতক্ষণ থাকে…”

এরপর নিঃশব্দে, নিজের মতো করে কিটকিটে হেসে সেও সেখান থেকে সরে যায়।

আজকের দিনটি যেন সময়ের গতিকে হার মানিয়েছে—দুপুর থেকে সন্ধ্যার কোঠায় এসে ঘড়ির কাঁটা অচেতনভাবে চলে এসেছে। আইলিনের মনে হচ্ছিল সময় যেন একেবারেই দ্রুত পেরিয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে নিশি স্টেজে বরের পাশে দাঁড়াবে, আর কাগজে কলমে বিয়ে সম্পন্ন হবে।

সিড়ি দিয়ে নামার সময় আইলিন নিশির কানে ফিসফিস করে বলল,

“আজ ইউভি ভাইয়া তোমাকে বউ সাজে দেখে হার্ট অ্যাটাক করবে।”

নিশির লজ্জা যেন আকাশচুম্বী। সে মাথা নুয়ে ফেলল, চুপচাপ হয়ে গেল। আইলিন আর কিছু বলল না, কিন্তু পৃথা একপলক হাঁসফাঁস করে আইলিনকে খোচা দিল—

“আর তোকে দেখে যে আমাদের ত্রিয়াশ স্যার, ওরফে দুলাভাই, হার্ট অ্যাটাক করবে সে চিন্তা আছে তোর।”

বলেই পৃথা হালকা হাসি ছড়িয়ে দিল, সাথে হাসল বাকিরাও। নিশিকে সঙ্গে করে তারা স্টেজের দিকে এগোলো। ইউভি এগিয়ে এসে হাত বাড়াল, সেই হাতে হাত রেখে নিশি ধীরে ধীরে স্টেজে উঠে গেল।

দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা পর ত্রিয়াশ আইলিনকে দেখল। মুগ্ধ হয়ে তাকাল—নিল রঙের, সোনালী পাড়ের কারুকাজ করা কাতান শাড়ি আইলিনের উপর যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আইলিন কে বেশ মিষ্টি লাগছে । ত্রিয়াশের চোখ থেকে পলকও পড়ছে না, তার মুগ্ধতা স্পষ্ট।

পৃথা হেসে আইলিনকে ফিসফিস করে বলল,

“দেখ বান্ধবী, তোর জামাইয়ের তো পলকই পড়ছে না। আমি নিশ্চিত, সে তোর প্রেমে পিচলে পড়েছে।”

আইলিন ঠোঁট সামান্য বেঁধে হেসে উত্তর দিল,

“তুই একটা যা তা।”

পৃথা আরও কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু আইলিন থামাল। এখন বিয়ের কাজ চলছে, আর মুহূর্তগুলো সত্যিই বিশেষ একজন মেয়ের কাছে।

~~

রাত ঠিক আটটা। চারদিক যেন এখনও উৎসবের আবেশে মোড়া। একটু আগেই ইউভি আর নিশির বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। এখন তাদেরকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পরবর্তী আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার জন্য। ঘরের ভেতরে হাসি-আনন্দ আর কোলাহলে ভরে উঠেছে পরিবেশ। তবে বাইরে, বিশেষ করে বাগানের দিকে, এখন তুলনামূলক শান্ত—অতিথির সংখ্যাও অনেকটাই কমে এসেছে।

এই ফাঁকেই ত্রিয়াশ সুযোগটা কাজে লাগালো। অনেকক্ষণ ধরেই সে আইলিনের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চাইছিল। অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে সে আইলিনের মোবাইলে একটি ছোট্ট মেসেজ পাঠালো,

“বাগানের দক্ষিণ পাশে আসো, আমার জরুরি কথা আছে।”

এদিকে আইলিনের দিনটা কেটেছে ভীষণ ধকলের মধ্যে। সকাল থেকে বিয়ের প্রস্তুতি, সাজসজ্জা, অতিথি আপ্যায়ন—সব মিলিয়ে শরীরটা বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তার। ভারী পোশাক আর গয়নায় নিজেকেও যেন অস্বস্তিকর লাগছিল। তাই একটু আগে সে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসেছে।

ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে খাটের পাশে রাখা মোবাইলটা হাতে নিতেই মেসেজ টোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই ত্রিয়াশের নাম। মেসেজটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটুখানি হাসি ফুটে উঠলো। মনে যেন হালকা একটা দোলা লাগলো।

আসলে আইলিনও ত্রিয়াশকে কিছু বলতে চাইছিল। সারাদিনের ব্যস্ততার মাঝে সেই সুযোগটা আর হয়ে ওঠেনি। তাই এই মেসেজটা যেন তার মনের কথাকেই ডেকে আনলো।

এক নিমেষেই যেন তার সব ক্লান্তি উধাও হয়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ওড়নাটা ঠিক করে মাথায় টেনে নিল সে। চোখে-মুখে এক অদ্ভুত আলো, একরাশ কৌতূহল আর লুকোনো আনন্দ নিয়ে ধীর পায়ে রওনা দিল বাগানের দক্ষিণ দিকে ত্রিয়াশের কাছে।

আইলিন সবার চোখ এড়িয়ে নিঃশব্দে বাগানের দক্ষিণ পাশের দিকে চলে আসে। চারপাশটা অদ্ভুত রকম নিস্তব্ধ—হালকা বাতাসে পাতার মর্মর শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই যেন তার বুকের ভেতর তুমুল ঝড় বইছে। হঠাৎ করেই তার পা থমকে যায়। যেন আর এক পা-ও এগোনোর শক্তি নেই তার।

তার চোখ দুটো টলমল করছে, অশ্রুতে ভরে উঠেছে দৃষ্টি। সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। পা দুটো ক্রমশ অসাড় হয়ে পড়ছে, মনে হচ্ছে এই বুঝি সে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। তার পায়ের নিচের শক্ত মাটিটাও যেন হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেছে—কোনো ভরসা নেই, কোনো স্থিরতা নেই। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা যেন এক মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হতে চায়। তার খুব ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে, বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসুক—কিন্তু সে নিজেকে কোনোভাবে সামলে রাখে।

সামনে তাকায়ে আছে আইলিন। দূরে, একটু আলো-ছায়ার ফাঁকে সে দেখতে পায় ত্রিয়াশ দাঁড়িয়ে আছে। ত্রিয়াশের পেছনে তার পিঠের দিকে,মুখ করে করে ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে লিসা। মুহূর্তটা যেন সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে থমকে আছে—স্থির, নিঃশ্বাসহীন।

আইলিনের কানে ভেসে আসে ত্রিয়াশের কণ্ঠ, গভীর, স্থির অথচ আবেগে ভরা,

“আমি তোমার সাথে নতুন একটা জীবন শুরু করতে চাই… একটা সুন্দর সংসার—তোমার আর আমার সংসার। খুব বড় কিছু না, ছোট্ট, শান্ত একটা ঘর। আমি খুব একটা ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারি না, শব্দে তা বোঝাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না… কিন্তু তোমাকে আমি চাই, ভীষণভাবে চাই। এত কথা বাড়াতে চাই না… শুধু এটুকুই বলি—আমি তোমাকে চাই। উইল ইউ ম্যারি মি?”

কথাগুলো বলেই ত্রিয়াশ ধীরে ধীরে পিছনে ঘুরে দাঁড়ায়।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আইলিন যেন বাস্তবে ফিরে আসে। যেন কেউ তার বুকের ভেতর থেকে হঠাৎ করে সবকিছু ছিনিয়ে নিয়েছে। দ্রুত, প্রায় দৌড়ে, সে আড়ালে সরে যায়—এমনভাবে যেন তাদের চোখে না পড়ে, যেন তার উপস্থিতির কোনো চিহ্নই না থাকে সেখানে।

একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। দূর থেকে তাকিয়ে থাকে—ত্রিয়াশ আর লিসার দিকে। তারা কিছু বলছে, কথা বলছে, কিন্তু সেই কথাগুলো আইলিনের কানে পৌঁছায় না। সব শব্দ যেন কোথাও গিয়ে থেমে গেছে।

আইলিন মুখে ওড়না চেপে কান্না থামানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে। তবুও তার চোখের জল কিছুতেই থামছে না। সামনে যা দেখছে, তা যেন তার হৃদয়টাকে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে—ত্রিয়াশ আর লিসা খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে, হয়তো একে অপরকে চুমু খাচ্ছে। দৃশ্যটা এতটাই অসহনীয় যে আইলিন আর নিজেকে সামলাতে পারছে না। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার।

কান্না লুকাতে চাইলেও সেটা বৃথা হয়ে যাচ্ছে। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম। হঠাৎই তার হাত ধীরে ধীরে নিজের পেটের ওপর গিয়ে থামে। সেই স্পর্শে যেন তার ভেতরের আরেকটা অনুভূতি জেগে ওঠে। সে ডুকরে কেঁদে ওঠে—এই কান্নায় আছে কষ্ট, অভিমান, আবার এক অদ্ভুত মায়াও।

তার মনে পড়ে যায় সকালের ঘটনাটা।

সকাল ঠিক নয়টার দিকে একটা পার্সেল এসেছিল তার নামে। বাড়ির সবার চোখ এড়িয়ে সে নিঃশব্দে পার্সেলটা নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ে। দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে, যেন ভেতরে কী আছে সেটা জানার আগেই তার বুক ধড়ফড় করছিল। অবশেষে কাঁপা হাতে পার্সেলটা খুলে ফেলে।

ভেতর থেকে বের হয় কিছু রিপোর্ট।

তার হাত কাঁপছিল। ধীরে ধীরে সে রিপোর্টগুলো খুলে দেখে। চোখ বুলাতেই সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না। কয়েক মুহূর্তের জন্য সবকিছু থমকে গিয়েছিল তার কাছে। তারপর হঠাৎই তার চোখে জল চলে আসে—কিন্তু এই জল কষ্টের নয়, নিখাদ আনন্দের। সে মা হতে চলেছে। তার ভেতরে একটা ছোট্ট প্রাণ ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। সে ছয় সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। এই খবরটা যেন তার পুরো পৃথিবী বদলে দেয়। আনন্দে, আবেগে তার চোখ ভিজে ওঠে। সে নিজের পেটের ওপর হাত রেখে মৃদু হেসে ওঠে, আবার কেঁদেও ফেলে। এত বড় একটা সুখের খবর, তবুও কাউকে বলার সুযোগ হয়নি তার।

সে খুব যত্ন করে রিপোর্টগুলো গুছিয়ে রেখে দেয়, যেন এগুলো তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু সেই মুহূর্তে সে জানত না, দিনের শেষে তাকে এমন একটা দৃশ্য দেখতে হবে, যা তার এই আনন্দকে মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত করবে।

ত্রিয়াশকে—এমনকি বাড়ির কাউকেও—সে এই সুখবরটা জানাতে পারেনি।

শুধু দৃশ্যটা স্পষ্ট—আর সেই দৃশ্যই তার হৃদয়টাকে বারবার ভেঙে দিচ্ছে।

আইলিন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ বেয়ে নেমে আসা অশ্রুগুলোই শুধু প্রমাণ দিচ্ছে—তার ভেতরে ঠিক কতটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া

লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি

পর্বঃ ৩৭ ( দ্বিতীয় অংশ )

🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫

চারপাশটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে হাসি-আনন্দে মুখর ছিল পুরো বাড়ি, এখন সেখানে এক ধরনের শূন্যতা নেমে এসেছে। আর মনে হচ্ছে না এটা কোনো বিয়েবাড়ি—সবকিছু যেন মুহূর্তেই থেমে গেছে। হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ ছাড়া বাকি সবাই চলে গেছে, কেউ বা ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

রাত তখন প্রায় এগারোটার কাছাকাছি। এই নিরিবিলি সময়ে ড্রয়িংরুমের এক কোণের সোফায় চুপচাপ বসে আছে আইরা। শরীরটা তার একদম ভালো লাগছে না। ডেলিভারির সময় ঘনিয়ে আসায় পা দুটো ফুলে গেছে, ভারী হয়ে আছে পুরো শরীর। কয়েকদিন ধরে তার ঠিকমতো ঘুমও হচ্ছে না—রাত হলেই অস্থির লাগে, বিছানায় শুয়ে থাকতে পারে না, উঠে বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

এই কারণেই তার ঘরটা ওপরতলা থেকে নিচতলায় করে দেওয়া হয়েছে, যেন ওঠানামার কষ্টটা কম হয়। তবুও স্বস্তি যেন কোথাও নেই। নিঃশব্দ ড্রয়িংরুমে বসে আইরা চারপাশে তাকায়—কাউকে চোখে পড়ে না। মনে হয়, ক্লান্তিতে সবাই ঘুমিয়ে গেছে।

ঠিক তখনই হঠাৎ করে সে খেয়াল করে, নিয়তি তার দিকে এগিয়ে আসছে। নিস্তব্ধতার মধ্যে নিয়তির পদচারণার শব্দটা কানে ভেসে আসে। কাছে এসে নিয়তি একটু অবাক হয়ে বলে,

“এখনো ঘুমাওনি? নিলয় ভাইয়া কোথায়?”

আইরা যেন প্রশ্নটা শুনেও শুনলো না। নিজের চিন্তায় ডুবে থাকা কণ্ঠে সে পাল্টা প্রশ্ন করে বসে,

“আইলিন কি পৃথার সাথে আছে? ওদের তো একবারও দেখলাম না...”

নিয়তি একটু থেমে উত্তর দেয়,

“পৃথা আপু বিয়ে পড়ানোর পরপরই চলে গেছে। তার শাশুড়ি নাকি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আর আইলিন ভাবিকে তো... আমি নিজেও দেখিনি।”

আইরা নিয়তিকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার চোখ চলে গেল সিঁড়ির দিকে। সেখানে দেখা গেল ত্রিয়াশ হন্তদন্ত হয়ে নিচে নামছে। তার চেহারা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, চুল এলোমেলো, আর হাতে কিছু কাগজ শক্ত করে ধরা। সে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে চিৎকার করে ডাকছে,

“মা! মা! কোথায় তোমরা? তাড়াতাড়ি আসো!”

ত্রিয়াশের এমন অস্বাভাবিক ডাক শুনে আইরা ও নিয়তি বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকালো। হঠাৎ কী এমন ঘটলো? কেন সে এভাবে ডাকছে? কিছুই তাদের মাথায় ঢুকলো না।

ত্রিয়াশের চিৎকারে বাড়ির সবাই দ্রুত ড্রয়িংরুমে জড়ো হলো। ইউভিও নিজের বাসর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো বিষয়টা বোঝার জন্য। তিশা বেগম লক্ষ্য করলেন, ত্রিয়াশ ভীষণভাবে হাঁপাচ্ছে, তার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,

“কি হয়েছে? এভাবে চিৎকার করছিস কেন?”

ত্রিয়াশ কয়েকবার ঢোক গিলে, নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

“মা… আইলিন কোথায়?”

তার এই প্রশ্নে উপস্থিত সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। প্রশ্নটা যেন কারো কাছেই বোধগম্য হলো না। নাহিদ মির্জা এগিয়ে এসে কিছুটা কঠোর স্বরে বললেন,

“কি বলতে চাও তুমি? ‘আইলিন কোথায়’ মানে কী? এতো রাতে সে যাবে কোথায়? ঘরে খুঁজে দেখেছো?”

ত্রিয়াশ উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে উত্তর দিল,

“প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে খুঁজছি… ফোন ধরছে না, মেসেজও দেখছে না।”

এই কথা শুনে সবাই যেন হতভম্ব হয়ে গেল। দেড় ঘণ্টা ধরে আইলিন নিখোঁজ! এটা কীভাবে সম্ভব? কেউই যেন বিষয়টা বিশ্বাস করতে পারছিল না।

ঠিক তখনই, আগের দিন যিনি ত্রিয়াশের কাছে আইলিনের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন, সেই মহিলা সামনে এগিয়ে এসে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,

“নাটক করছো? ছিঃ! তোমাকে আমি ভালো ভেবেছিলাম। এখন বউয়ের জন্য এত দরদ উথলে পড়ছে?”

ত্রিয়াশ রাগে ফেটে পড়ে চিৎকার করে বলল,

“আপনি কী বলতে চাইছেন?”

মহিলাটি ঠান্ডা কিন্তু কটাক্ষভরা কণ্ঠে বললেন,

“কি আর বলবো! নিজেরই লজ্জা লাগছে বলতে। তবুও বলা উচিত। আমি নিজ চোখে দেখেছি—তুমি আর তোমার কাজিন লিসা একে অপরকে কিস করছিলে। শুধু আমি একা না, তোমার বউ আইলিনও সেটা দেখেছে। এরপর দেখলাম মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে গেটের দিকে চলে গেল। তারপর আমি সেখান থেকে চলে আসি। এরপর আর খেয়াল করিনি।”

এই কথা শোনামাত্র পরিবেশ যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠলো। তিশা বেগম প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ত্রিয়াশের গালে একটি জোরে থাপ্পড় মারলেন। ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে তিনি চিৎকার করে বললেন,

“মির্জা বাড়ির সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চাও!”

ত্রিয়াশও আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলো না। ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলল,

“প্লিজ, শাট আপ! পুরো ঘটনা না জেনে কোনো মন্তব্য করা ঠিক না!”

ইউভি মহিলার উদ্দেশ্যে অবাক কণ্ঠে বলল,

“এসব কী বলছেন? বাগানের দক্ষিণ পাশে তো সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল—ত্রিয়াশ আইলিনকে প্রপোজ করবে বলে! কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ কী হয়ে গেল?”

পেছন দিক থেকে আরেকটি তীক্ষ্ণ কণ্ঠ ভেসে এলো,

“হবে না কেন? বাড়িতে দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষলে এমনই তো হবে!”

সবার দৃষ্টি ঘুরে গেল সেই দিকে। দেখা গেল, মুনিরা বেগম লিসার হাত শক্ত করে টেনে তাকে নিয়ে আসছেন। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে এসে তিনি যেন রাগে-ক্ষোভে অন্ধ হয়ে গেলেন। হঠাৎ করেই লিসাকে ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে দিলেন।

মুনিরা বেগম তিশা বেগমের দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,

“আপা, আমি তো আগেই বলেছিলাম—এই মেয়েটাকে বাড়ি থেকে বের করে দাও। না হলে সংসারে অশান্তি হবে। দেখলেন তো, ঠিক তাই হয়েছে!”

তিশা বেগম ভ্রু কুঁচকে কড়া গলায় বললেন,

“কি বলতে চাইছিস? পরিষ্কার করে বল!”

মুনিরা বেগম এবার লিসার দিকে তাকিয়ে কিছুটা চিৎকার করেই বললেন,

“তোমরা কি ভুলে গেছো? এই মেয়েটা ত্রিয়াশকে বিয়ে করার নাম করে কোনো এক ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল! তোমাদের মনে একবারও প্রশ্ন জাগেনি—সেই ছেলে এখন কোথায়? আসলে ওই ছেলে আর এই মেয়ে মিলে আমাদের পরিবার ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে! ওরা চায় আমাদের সব সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে, আমাদের রাস্তায় নামিয়ে দিতে—বিশেষ করে ত্রিয়াশের ক্ষতি করতে। আর এসব কথা আমি নিজের কানে শুনেছি—লিসা কারও সঙ্গে কথা বলছিল!”

মুনিরা বেগমের কথা শুনে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে গেল। মুহূর্তেই পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল সন্দেহ আর রাগে। তিশা বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। রাগে-ক্ষোভে তিনি লিসার গালে পরপর চারটি থাপ্পড় মারলেন।

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তিনি চিৎকার করে বললেন,

“বের হয়ে যা আমার সংসার থেকে! তোকে আমি বুকে জায়গা দিয়েছিলাম, আর তুই সেই বুকেই ছুরি মারলি!”

লিসা গালে হাত দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে কাঁপা গলায় বলল,

“মামনি, আমাকে মাফ করে দাও…”

তিশা বেগম মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কঠোর স্বরে বললেন,

“আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ!”

এই সময় ত্রিয়াশ দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে লিসার সামনে দাঁড়াল। তার চোখে ছিল আগুনের মতো রাগ। সে কোনো কথা না বলেই লিসার দুই গালে পরপর থাপ্পড় মারল। তারপর তার গলা চেপে ধরে গর্জে উঠল,

“বল! আইলিন কোথায়?”

লিসা আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বলল,

“আ… আমি জানি না…”

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছিল। ঠিক তখনই ইউভি ছুটে এসে ত্রিয়াশকে জোর করে সরিয়ে দিল। সুযোগ পেয়ে লিসা কোনো রকমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। লজ্জা আর অপমানে তার বাবা-মাও নীরবে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা নেমে এলো চারপাশে। ইউভি ত্রিয়াশের কাঁধে হাত রেখে শান্তভাবে বলল,

“চল, আমরা আইলিনকে খুঁজতে যাই।”

ঠিক তখনই নাহিদ মির্জা ত্রিয়াশের কাছে এসে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলেন,

“তোমার হাতে কিসের পেপার ?”

ত্রিয়াশ ধীরে ধীরে হাতে থাকা পেপার গুলোর দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে একটুকরো কষ্টমিশ্রিত হাসি ফুটে উঠল। চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠেছে। কাঁপা গলায় সে বলল,

“আ… আইলিনের প্রেগনেন্সি রিপোর্ট… আমি… আমি বাবা হতে যাচ্ছি…”

এত বড় সুখবর শোনার পরও যেন কারও মুখে হাসি ফুটল না। কারণ, যাকে ঘিরে এই আনন্দ—সেই আইলিনই এখন নিখোঁজ। সে কোথায় আছে, কেমন আছে—কেউ জানে না। সবার মনে শুধু অস্থিরতা ঘিরে আছে।

~~~

রাত প্রায় শেষ প্রহর। চারদিক নিস্তব্ধ, অথচ সেই নিস্তব্ধতাকে ভেঙে বাইরে তাণ্ডব চালাচ্ছে ঝড়-বৃষ্টি। আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ ঝলকাচ্ছে, আর তার পরপরই ভেসে আসছে মেঘের গর্জন। এমন এক অস্থির, ভীতিকর রাতে জড়িনা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে জানালার কপাটগুলো শক্ত করে বন্ধ করে দিল, যেন বাইরের সেই তাণ্ডবকে কিছুটা হলেও আটকে রাখা যায়।

বাড়ির ড্রয়িংরুমে সবাই এলোমেলোভাবে বসে আছে। কারও চোখে ঘুম নেই, কারও মনে শান্তি নেই। সবার মুখে একই উদ্বেগ—আইলিন কোথায়?

ইউভি আর ত্রিয়াশ একসাথে বের হয়েছে আইলিনকে খুঁজতে। অন্যদিকে নিলয় আর নিভান অন্য রাস্তায় গেছে, যদি কোথাও তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টির এই ভয়ংকর রাতে বাইরে থাকা যে কতটা কঠিন, তা ভেবে তিশা বেগমের বুকটা কেঁপে উঠছে বারবার।

এদিকে আইলিনের মা, মাহিরা বেগম, মেয়ের চিন্তায় একেবারে ভেঙে পড়েছেন। কান্না করতে করতে তার অবস্থা প্রায় অস্থির। কতক্ষণ আগে তারা সবাই আইলিনকে খুঁজতে বের হয়েছে, কিন্তু এখনও কেউ ফিরে আসেনি—এই দুশ্চিন্তায় যেন তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠছে বারবার—মেয়েটা কোথায়? কেমন আছে?

হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। সেই শব্দ যেন সবার বুকের ধুকপুকানি আরও বাড়িয়ে দিল। মুনিরা বেগম আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে গেলেন দরজার দিকে। দরজা খুলতেই তিনি দেখলেন—চারজন দাঁড়িয়ে আছে, পুরো ভিজে, কনকনে ঠান্ডায় কাঁপছে। তাদের চেহারায় ক্লান্তি, হতাশা আর এক অদ্ভুত শূন্যতা।

তিনি দ্রুত এদিক-সেদিক তাকালেন। কিন্তু না—আইলিন নেই।

মাহিরা বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ছুটে এসে ত্রিয়াশের হাত আঁকড়ে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বললেন,

“আ... আমার আইলিন কোথায়? ওকে সাথে করে নিয়ে আসোনি?”

ত্রিয়াশ যেন পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ ফাঁকা, মুখে কোনো কথা নেই। বাইরের ঝড়ের তাণ্ডবের চেয়েও ভয়ংকর ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার মনের ভেতর।

হঠাৎ সে হাটু ভেঙে মেঝেতে বসে পড়ল। দু’হাতে নিজের চুল আঁকড়ে ধরে যন্ত্রণাভরা কণ্ঠে বলে উঠল,

“বাবা... আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি দম নিতে পারছি না। ওই মেয়েটাকে এনে দাও... আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি...”

ছেলের এই অসহায় আর্তনাদ নাহিদ মির্জার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। কিন্তু তিনি জানেন—যে মানুষ নিজের ইচ্ছায় হারিয়ে যায়, তাকে কি এত সহজে খুঁজে পাওয়া যায়? তবুও যদি তার সাধ্য থাকত, তিনি ছেলের জন্য পৃথিবীর সবকিছু উল্টে দিতেন।

হঠাৎ ত্রিয়াশ উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন একরাশ উন্মাদনা। সে ড্রয়িংরুমের টেবিলের ওপর রাখা সবকিছু ছুড়ে ফেলতে লাগল। একে একে সবকিছু ভেঙে যাচ্ছে। সিঁড়ির পাশে রাখা বড় ফুলদানিটাও তার হাত থেকে রক্ষা পেল না—এক আঘাতে সেটাও চুরমার হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।

পুরো ড্রয়িংরুম যেন মুহূর্তে এক অদৃশ্য ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।

ত্রিয়াশ ভাঙছে, চিৎকার করছে, আর বুকফাটা কণ্ঠে বলছে,

“আমার সন্তানের থেকে কেন দূরে সরিয়ে দিলি? আমি তোকে ভালোবাসি... এত ভালোবাসি! কেন আমাকে একা করে দিলি? কেন?”

আইলিনের বাবা আফজাল হোসেন ভারী কণ্ঠে ত্রিয়াশের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তুমি আমার মেয়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে বড্ড দেরি করে ফেলেছো। জানো, আমার মেয়েটা ভীষণ অভিমানী ছিল। কিন্তু আজ… আজ শুধু তোমার কারণেই আমি আমার মেয়েকে হারালাম। একটা বাবার কষ্ট তুমি কখনোই বুঝবে না।”

তার কণ্ঠে জমে থাকা অভিমান আর অসহায়তা যেন পুরো ড্রয়িংরুম ভারী করে তুলল। কথাগুলো শেষ হতেই চারপাশে নেমে এলো এক গভীর নীরবতা।

সঙ্গে সঙ্গে ত্রিয়াশ ভাঙা গলায় বলে উঠল,

“আপনার মেয়েও তো আমার সন্তান নিয়ে চলে গেল! বাবা হওয়ার অনুভূতিটা পর্যন্ত আমাকে অনুভব করতে দিল না। কেন বুঝল না আপনার মেয়ে? আমি যদি ভুল করে থাকি, আমাকে শাস্তি দিক—মারুক, বকুক… কিন্তু কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেল?”

তার চোখে তখন অঝোরে জল ঝরছে। কেউ কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। চারপাশের সবাই শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে, চোখের পানি লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

যে ছেলেটা নিজের কষ্ট চেপে রেখে কখনো কিছু বলেনি, আজ সে ভেঙে পড়েছে একেবারে অসহায় মানুষের মতো। তার সমস্ত শক্তি, অহংকার, জেদ—সবকিছু যেন মুহূর্তেই হারিয়ে গেছে। এখন তার শুধু একটাই চাওয়া—তার বউকে ফিরে পাওয়া।

হঠাৎ করেই ত্রিয়াশ সামনে থাকা সেন্টার টেবিলের কাচে জোরে আঘাত করে। কাচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সে চিৎকার করে ওঠে,

“আমার ওকেই লাগবে… প্লিজ বাবা, ওকে এনে দাও!”

তার কণ্ঠে এমন আকুতি, এমন ভাঙন—যা শুনে পাথরও গলে যেতে পারে।

ভাঙা কাচের টুকরোর মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সে। তার হাত-পা র'ক্তা'ক্ত হতে থাকে, কিন্তু সে যেন কিছুই অনুভব করছে না। ইউভি আর নিভান দৌড়ে এসে তাকে ধরে ফেলে, শান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু ত্রিয়াশ তখন নিজের মধ্যে নেই—সে শুধু পাগলের মতো ছটফট করতে থাকে।

ঠিক সেই সময় দূর থেকে ভেসে আসে ভোরের আজানের সুর। আরেকটা দিনের সূচনা নিয়ে।

এক সময় যে বাড়িতে হাসি, আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরে থাকত, সেই বাড়িটাই মুহূর্তের মধ্যে বিষাদের গভীর ছায়ায় ঢেকে গেছে।

একটি সুখী পরিবার, এক নিমিষেই ভেঙে পড়েছে।

চলবে,,

[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। দয়া করে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন