ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ চৈত্রের মৃদু ছোঁয়া

৩৮তম পর্ব

লেখক: আফরিনা আক্তার সুইটি

গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া

লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি

পর্বঃ ৩৮

🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫

ভোরের নরম আলো ধীরে ধীরে চারপাশ আলোকিত করে তুলছে। রাতের ভয়াল ঝড় থেমে গেছে, কিন্তু তার চিহ্ন এখনও স্পষ্ট—বাগানের নানা জায়গায় কাঁদা জমে আছে, ছোট ছোট গর্তে পানি থমকে রয়েছে। কিছু চিকন গাছ ঝড়ে হেলে পড়েছে, যেন ক্লান্ত শরীরে বিশ্রাম নিচ্ছে। এই নিস্তব্ধতার মাঝেই দূর থেকে ভেসে আসছে চড়ুই পাখির কিচিরমিচির ডাক। তারা নতুন দিনের খোঁজে, নিজেদের গন্তব্যে ছুটে চলছে খাবারের আশায়।

প্রকৃতি যেন নতুন করে শুরু করছে, কিন্তু মির্জা বাড়ির ভেতরে সেই নতুন দিনের কোনো ছোঁয়া নেই। ড্রয়িংরুমে এখনো সবাই আগের মতোই বসে আছে। কারও চোখে একফোঁটা ঘুম নেই—চোখে শুধু দুশ্চিন্তা আর অজানা আশঙ্কার ছায়া।

ত্রিয়াশকে কেউ এক চুলও সরাতে পারেনি। তার হাত-পায়ে শুকনো রক্তের দাগ, মুখে ক্লান্তি আর অবসাদের ছাপ। সে ঝিম মেরে বসে ছিল। হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়ে গেল—ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তিশা বেগমের দিকে তাকালো। এক মুহূর্তও দেরি না করে হাটু গেড়ে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে তিশা বেগমের পা জড়িয়ে ধরল। অসহায়, কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগল—

“মা… ও মা… সেই প্রথম দিনের মতো আইলিনকে এনে দাও। আমি ওকে ছাড়া কীভাবে থাকব? দেখো, আমার বুক কেমন কাঁপছে… আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। কতক্ষণ হয়ে গেল, আমি ওকে দেখিনি…”

কথাগুলো বলেই সে ভেঙে পড়ল। চোখ থেকে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। কে বলে পুরুষ মানুষ কাঁদে না? তারাও তো মানুষ—রক্ত-মাংসে গড়া। প্রিয় কিছু হারানোর ভয়ে, গভীর ভালোবাসার টানে তারাও ভেঙে পড়ে, কাঁদে।

তিশা বেগম নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। যখন সবাই ত্রিয়াশকে দোষারোপ করছিল, তখন বাগানের সিসিটিভি ফুটেজে প্রমাণ হয়েছে—ত্রিয়াশের কোনো দোষ ছিল না। সবটাই ছিল এক ভুল বোঝাবুঝি। তবুও মায়ের মন যেন আজ দ্বিধায় ভরা। তিনি জানেন ছেলে নির্দোষ, কিন্তু কষ্ট আর অভিমানের দেয়াল ভেঙে তার প্রতি মমতা প্রকাশ করতে পারছেন না।

স্থির কণ্ঠে তিনি বললেন—

“খুব শখ করে তোমার জন্য আইলিনকে এই বাড়িতে এনেছিলাম। তুমি আমাদের খুব আদরের সন্তান। বিয়ের পাঁচ বছর পরেও যখন আমাদের ঘরে কোনো সন্তান আসেনি, তখন কত কান্না করেছি, তা কেউ জানে না। এরপর তোমার চাচ্চু বিয়ে করল, আর এক বছরের মধ্যেই তাদের ঘর আলো করে এলো নিলয়। আমি বড় বউ হয়েও তখন নিঃসন্তান… সেই কষ্টটা শুধু আমিই জানি।

নিলয়ের দুই বছর হতে না হতেই তুমি আমার কোল আলো করে এলে। সে কী আনন্দ! খুশিতে আমি দুই দিন কেঁদেছিলাম। এরপর নিভান, নিয়তি—সবাই এলো, কিন্তু তোমার মতো করে আর কাউকে নিয়ে আমি এতটা খুশি হইনি। তুমি আমার সবচেয়ে আদরের সন্তান।

আমি তোমার জন্য একটা সংসারী মেয়ে চেয়েছিলাম। তাই আইলিনের সাথে তোমার বিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, একদিন না একদিন তুমি তাকে ভালোবেসে আপন করে নেবে। দেখো, শেষমেশ তুমি তাকে ভালোবেসেছ… কিন্তু খুব দেরিতে।

আমি তোমাকে এত কথা বলছি একটা কারণেই—আমি আবারও চাই, তুমি আইলিনকে ফিরিয়ে নিয়ে আসো। আর যদি তা না পারো… তাহলে আমি তোমার সাথে আর কোনোদিন কথা বলব না।”

এই কথাগুলো শুনে ত্রিয়াশ অবাক হলো না। যেন সে আগেই জানত, এমন কিছুই ঘটবে। তার মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই—সব অনুভূতি যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। তিশা বেগমও একটু দূরে সরে দাঁড়ালেন, বুকের ভেতর হাজার টন পাথরের চাপ নিয়ে।

হঠাৎ করেই ত্রিয়াশ উঠে দাঁড়াল। কোনো কথা না বলে দ্রুত সদর দরজা পেরিয়ে বাইরে চলে গেল। তার পিছু পিছু ইউভিও ছুটে গেল—এই অবস্থায় তাকে একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়।

এদিকে সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছে আইরা। যে কোনো সময় তার পেইন শুরু হতে পারে। বোনের চিন্তায় কাঁদতে কাঁদতে তার শরীর ভেঙে পড়েছে, বারবার হিচকি উঠছে। তবুও সে নিজেকে সামলে হাঁটার চেষ্টা করছিল। কিন্তু শরীর আর সায় দিচ্ছিল না।

হঠাৎ করেই ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল সে। পেটে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়ে চিৎকার করে উঠল।

আইরার সেই আর্তনাদ যেন সবাইকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। সবাই ছুটে এলো তার কাছে। নিলয় তাড়াতাড়ি আইরার মাথা নিজের বুকে তুলে নিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

“কিছু হবে না… আমরা এখনই ডাক্তারের কাছে যাবো। নিভান, তাড়াতাড়ি গাড়ি বের কর!”

এদিকে আইরার প্রচুর র'ক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে বড় কিছু ঘটে যেতে পারে। আইরা কষ্টে, ঘনঘন শ্বাস নিতে নিতে বলল,

“আমি… আমি সহ্য করতে পারছি না… তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চলো। আমার বাচ্চা কে বাচাও। ”

এক মুহূর্ত দেরি না করে নিলয় তাকে কোলে তুলে নিল। তারপর দ্রুত হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটে গেল। তার সাথে বাড়ির সবাই বেরিয়ে পড়ল। শুধু তিশা বেগম রয়ে গেলেন, পাশে জড়িনাকে নিয়ে।

ঘরটা হঠাৎ করেই শূন্য হয়ে গেল। তিশা বেগম দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলেন—

“আল্লাহ… এ কেমন পরীক্ষা নিচ্ছো? কেন আমাদের সুখের সংসারে এমন বিষাদের ছায়া নামিয়ে দিলে?”

ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু মির্জা বাড়ির ভেতর যেন এখনো অন্ধকার—দুঃখ, অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার ভারে ভারী হয়ে আছে প্রতিটি মুহূর্ত।

সেই কখন থেকে অপারেশন থিয়েটারের সামনে পায়চারি করছে নিলয়। উদ্বেগে তার বুকটা ধড়ফড় করছে, শরীর ঘামে একাকার। সময় যেন থেমে গেছে—প্রতিটা সেকেন্ড তার কাছে একেকটা অনন্তকাল। মনে মনে বারবার একটাই প্রার্থনা করছে সে—আইরা এবং তাদের অনাগত সন্তান, দুজনেই যেন সুস্থভাবে এই পৃথিবীতে আসে।

জীবনে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে নিলয়, কিন্তু আজকের মতো এতটা অসহায়, এতটা অস্থির সে আগে কখনো অনুভব করেনি। আইরাকে হারানোর ভয় তার ভেতরটাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, যেন এই দরজার ওপাশেই তার পুরো পৃথিবী আটকে আছে।

হঠাৎ করেই অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা নিভে গেল। নিলয়ের বুকের ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দরজা খুলে একজন ডাক্তার বের হলেন, সঙ্গে একজন নার্স। নিলয় প্রায় দৌড়ে গিয়ে ডাক্তারের সামনে দাঁড়াল। কণ্ঠ কাঁপছে, চোখে উৎকণ্ঠা স্পষ্ট—

“ডাক্তার, আমার বউ কেমন আছে?”

ডাক্তার হালকা হাসলেন এবং বললেন,

“কংগ্র্যাচুলেশন, মিস্টার নিলয়। আপনি একটি ছেলে সন্তানের বাবা হয়েছেন।”

চারপাশে যেন আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। পরিবারের সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। মুনিরা বেগম নাতিকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিলেন। একে একে সবাই শিশুটিকে কোলে নিল, আদর করল,দোয়া করল।

কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও নিলয় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে খুশির চেয়ে উদ্বেগই বেশি। সে তার ছেলেকে একবারও দেখল না, কোলে নেওয়ার চেষ্টাও করল না। তার সমস্ত চিন্তা, সমস্ত অনুভূতি আটকে আছে শুধু একজন মানুষকে ঘিরে—আইরা।

সে আবারও ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“আমার বউ কেমন আছে?”

ডাক্তার এবার একটু গম্ভীর হয়ে তার দিকে তাকালেন, তারপর আশ্বস্ত করে বললেন,

“পেশেন্ট আউট অফ ডেঞ্জার। আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে তার জ্ঞান ফিরে আসবে।”

এই কথাটা শুনেই যেন নিলয়ের বুকের ভেতর জমে থাকা বিশাল এক পাথর নেমে গেল। সে গভীর একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ—মনে মনে শুধু ধন্যবাদ জানাল সৃষ্টিকর্তাকে।

তবুও তার মন পুরোপুরি হালকা হলো না। কোথাও একটা কষ্ট রয়ে গেল। ত্রিয়াশের কথা মনে পড়তেই বুকটা আবার ভারী হয়ে উঠল। ভাইটা যে ভেতরে ভেতরে কতটা কষ্ট পাচ্ছে, তা নিলয় খুব ভালো করেই জানে।

~~

চোখ দুটো খুলতে চেয়েও যেন খুলতে পারছে না সে। পাতার ওপর যেন অদৃশ্য কোনো ভার চেপে বসে আছে। অনেক কষ্টে, জোর করে অবশেষে চোখ মেলে তাকাল। দৃষ্টি ঝাপসা, মাথাটা ভীষণ ভারী লাগছে, যেন কেউ ভেতর থেকে টেনে ধরছে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গে অদ্ভুত এক ব্যথা—নড়তে গেলেই যেন সেই ব্যথা আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

তবুও ধীরে ধীরে পিটপিট করে চারপাশে তাকাতে লাগল সে। কোথায় আছে, কীভাবে এখানে এলো—কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছে না। চোখটা একটু পরিষ্কার হতেই বুঝতে পারল, এটা তার পরিচিত কোনো জায়গা নয়। এই ঘর, এই পরিবেশ—সবই অচেনা, অজানা।

ধীরে ধীরে উঠে বসার চেষ্টা করল। মাথাটা ধরে রাখল দুই হাতে, যেন স্মৃতিগুলোকে জোর করে টেনে বের করতে চায়। কিন্তু সবকিছু এলোমেলো। কিছুই স্পষ্ট নয়। কী হয়েছিল গতকাল রাতে?

হঠাৎই কিছু টুকরো টুকরো স্মৃতি মাথায় ভেসে উঠল।

গত রাতের…

কান্নায় ভেঙে পড়া এক মেয়ে… বাড়ির মেইন গেট পেরিয়ে বেরিয়ে যাওয়া…হ্যাঁ, আইলিন।

গত রাতে অসহ্য কষ্টে ভেঙে পড়েছিল সে। যাকে সে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে, যার সন্তানের মা হতে চলেছে—সেই মানুষটিকেই অন্য এক মেয়ের সঙ্গে দেখে ফেলে। সেই দৃশ্যটা যেন তার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধেছিল। এমন আঘাত কোনো মেয়েই সহজে সহ্য করতে পারে না। আইলিনও পারেনি।

কান্না করতে করতে, কোনো কিছু না ভেবেই, দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—কোনো কিছুতেই তার হুশ ছিল না। শুধু বুকভরা কষ্ট আর চোখভরা জল নিয়ে ছুটে চলেছিল অজানা পথে।

রাতের রাস্তায় তখন গাড়ির শোঁ শোঁ শব্দ। আলো-আঁধারিতে ছুটে চলা যানবাহন। অথচ আইলিন ছুটছিল মাঝ রাস্তা দিয়ে, নিজের জীবনের ঝুঁকির কথা একবারের জন্যও ভাবেনি। যেন তার ভেতরের যন্ত্রণা বাইরের সব বিপদকে মুছে দিয়েছিল।

হঠাৎ—একটা তীব্র আলো তার চোখে এসে পড়ল।

সে থেমে গেল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মাঝ রাস্তায়। সামনে থেকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছিল একটি গাড়ি। আলোয় চোখ ঝলসে যাওয়ায় সে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। পরের মুহূর্তেই—ধাক্কা। গাড়িটা এসে তাকে আঘাত করল।

সবকিছু যেন মুহূর্তেই থেমে গেল।

গাড়ির দরজা খুলে তাড়াহুড়ো করে নেমে এল দুজন মানুষ—একজন লম্বা গড়নের পুরুষ, আরেকজন মধ্যবয়সী মহিলা। তারা ছুটে এল আইলিনের দিকে।

কিন্তু আইলিন আর কিছু দেখার মতো অবস্থায় ছিল না। চোখের সামনে সবকিছু ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে গেল। শরীর নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে।

তারপর…শুধুই অন্ধকার। এরপর আর কিছুই মনে নেই তার।

আইলিন বিছানার কোণে চুপচাপ বসে ছিল। তার চোখে যেন এখনো লেগে আছে গত রাতের ভয়াবহ স্মৃতিগুলো। বারবার সেই মুহূর্তগুলো মনে পড়ছে, আর বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে উঠছে। চারপাশটা নিরব, শুধু তার নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দই যেন ঘরের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিচ্ছে।

হঠাৎ করেই দরজার কাছে হালকা একটা শব্দ হলো। কেউ যেন ঘরে প্রবেশ করল। আইলিন চমকে উঠে সেদিকে তাকালো। দেখতে পেল, মাঝবয়সী এক ভদ্রমহিলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে এক মৃদু, শান্ত হাসি। সেই হাসিটা অদ্ভুতভাবে আশ্বস্ত করার মতো।

মহিলাটি ধীরে ধীরে আইলিনের দিকে এগিয়ে এলেন। কাছে এসে খুব স্নেহের সঙ্গে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। সেই স্পর্শে আইলিন যেন কিছুটা অবাক, কিছুটা অচেনা এক উষ্ণতা অনুভব করল।

মহিলাটি নরম কণ্ঠে বললেন,

“এখন কেমন লাগছে, মা? তুমি রাতের বেলায় একা একা এভাবে দৌড়াচ্ছিলে কেন?”

আইলিন কিছু বলল না। তার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। যেন সে এখনো পুরোপুরি নিরাপদ অনুভব করতে পারছে না। বিষয়টা বুঝতে পেরে মহিলাটি আবারও কোমল স্বরে বললেন,

“ভয় পেও না। আমি রানিয়া চৌধুরী।”

নামটা শুনেও আইলিন চুপ রইল। ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে আরও দু’জন ভেতরে ঢুকল। আইলিন তাদের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুটা বিস্মিত হয়ে। তা দেখে রানিয়া চৌধুরী হেসে বললেন,

“ওরা আমার ছেলে-মেয়ে। ও রুদ্র, আর ও রাত্রি।”

রুদ্র আর রাত্রি দুজনেই শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের চোখেও কৌতূহল, তবে কোন রকম অস্বস্তি নেই।

রানিয়া চৌধুরী আবার আইলিনের দিকে ফিরে বললেন,

“তোমার নাম কী? আর ঠিকানাটা বলো, তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। এই অবস্থায় এভাবে বাইরে থাকা একদমই ঠিক না।”

“এই অবস্থায়” কথাটা শুনে আইলিন হঠাৎ চমকে উঠল। তার চোখ বড় হয়ে গেল। সে ভেতরে ভেতরে আতঙ্কিত হয়ে ভাবতে লাগল—ওরা কীভাবে জানল সে প্রেগনেন্ট?

তার মনের প্রশ্নটা যেন বুঝতে পেরে রানিয়া চৌধুরী হালকা হেসে বললেন,

“ভাবছো, আমরা জানলাম কীভাবে? রুদ্র একজন ডাক্তার। ওই তো তোমার ট্রিটমেন্ট করছে।”

এই কথা শুনেই আইলিন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বুক ভেঙে কান্না চলে এল। সে ডুকরে উঠে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“আমার কেউ নেই… আমি কোথাও যাবো না…”

তার এই কথায় ঘরে এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল। রুদ্র আর রাত্রি একে অপরের দিকে তাকাল, যেন পরিস্থিতিটা বুঝে উঠতে চেষ্টা করছে। কিন্তু রানিয়া চৌধুরীর চোখে ছিল গভীর মমতা।

তিনি ধীরে ধীরে আইলিনের পাশে বসে নরম গলায় বললেন,

“কেন যেতে চাও না, মা?”

আইলিন চোখ মুছতে মুছতে কষ্টভরা কণ্ঠে বলল,

“যদি ভালোবাসার মানুষটাই ছলনা করে… তাহলে কোথায় যাবো? কার কাছে ঠাঁই হবে আমার?”

এই কথার মধ্যে যে ভাঙা বিশ্বাস আর অসহায়তা লুকিয়ে ছিল, তা সহজেই বোঝা যাচ্ছিল। রানিয়া চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তিনি আর কোন প্রশ্ন করলেন না, কোন চাপও দিলেন না। শুধু নীরবে মেয়েটার পাশে বসে রইলেন, যেন তার নীরব উপস্থিতিই আইলিনকে ভরসা দিচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর তিনি খুব যত্ন করে আইলিনকে খেতে দিলেন। নিজ হাতে মুখে তুলে খাওয়াতে লাগলেন। আইলিন প্রথমে একটু সংকোচ বোধ করলেও পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল। সেই আদর, সেই যত্ন—সবকিছু মিলিয়ে তার মনে হচ্ছিল, অনেকদিন পর যেন কেউ তাকে আপন করে দেখছে।

রানিয়া চৌধুরীর সেই স্নেহভরা আচরণে আইলিনের চোখ আবার ভিজে উঠল, তবে এবার সেটা কষ্টের কান্না নয়—একটা অদ্ভুত শান্তির অনুভূতি মিশে আছে তাতে। যেন বহুদিন পর সে মায়ের মতো কারো স্নেহ স্পর্শ পেল।

চলবে,,

[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। দয়া করে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন