ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ চৈত্রের মৃদু ছোঁয়া

৩৯তম পর্ব

লেখক: আফরিনা আক্তার সুইটি

গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া

লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি

পর্বঃ ৩৯

🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫

রাত ১১টা ৪৫ মিনিট। আকাশ জুড়ে ভারী মেঘের স্তর, যেন অল্প সময়ের মধ্যেই বৃষ্টি নেমে আসবে। চারপাশে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা—নির্জন রাস্তা, দূরে কোথাও ক্ষীণ আলো, আর তার মাঝখানে একা গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে ত্রিয়াশ। স্টিয়ারিং ধরে আছে ঠিকই, কিন্তু মন যেন কোথাও নেই। এক হাত দিয়ে বারবার চোখের পানি মুছে নিচ্ছে, তবুও সেই জল থামছে না।

সকালে ইউভি আর নিভান তার সাথে ছিল। অনেকবার জোর করেছিল রাতে তার সাথে থাকতে, কিন্তু ত্রিয়াশ কাউকে পাশে চায়নি। নিজের ভাঙাচোরা অনুভূতিগুলো কাউকে দেখাতে তার অস্বস্তি হচ্ছিল। তাই একরকম জোর করেই তাদের পাঠিয়ে দিয়েছে।

তারপর থেকে সে একা। আর এই একাকীত্বকে ঢাকতে সে বেছে নিয়েছে অ্যালকোহল। অনেকক্ষণ ধরে ড্রিংক করেছে, এমনকি এখনো গাড়ি চালাতে চালাতেই পান করছে। যেন প্রতিটি চুমুকে বুকের ভেতরে জমে থাকা কষ্টটুকু একটু করে কমে যাবে। কিন্তু কষ্ট কি এত সহজে কমে? বরং তা আরও ঘনীভূত হয়ে বুকের ভেতরে জমে আছে।

আজ ত্রিয়াশ নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে করছে। সবকিছু যেন এলোমেলো ভাবনা, অনুভূতি, স্মৃতি

কিছুই গুছিয়ে নিতে পারছে না। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে সে।

হঠাৎ করেই সে একটি ফাঁকা জায়গায় গাড়ি থামায়। চারপাশে কেউ নেই, শুধু নীরবতা আর দূরে মেঘের গর্জন।গাড়ির শব্দ বন্ধ করতেই নিস্তব্ধতা আরও গভীর হয়ে ওঠে।

ত্রিয়াশ হঠাৎ স্টিয়ারিং হুইলে সজোরে আঘাত করে। সেই আঘাতে যেন তার ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভ, রাগ আর যন্ত্রণার বিস্ফোরণ ঘটে। তারপর দুই হাত দিয়ে নিজের চুল শক্ত করে চেপে ধরে। মাথা নিচু করে বসে থাকে কিছুক্ষণ।

চোখ বেয়ে গরম নোনাপানি গড়িয়ে পড়তে থাকে অবিরত। সেই কান্নায় আছে হারানোর বেদনা, অপূর্ণতার আক্ষেপ, আর এক অদৃশ্য শূন্যতার ভার। সে চিৎকার করে কাঁদতেও পারছে না শুধু নিঃশব্দে ভেঙে পড়ছে।

বাইরে হালকা বাতাস বইতে শুরু করেছে। মেঘ আরও ঘন হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আকাশও যেন ত্রিয়াশের মতোই ভারী হয়ে আছে কোনো এক অজানা কষ্টে। আর হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে, সবকিছু ভিজিয়ে দেবে… ঠিক যেমন ত্রিয়াশের ভেতরটা ইতিমধ্যেই ভিজে গেছে অশ্রুতে।

গাড়ির সিটের সাথে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলে ত্রিয়াশ,

“ভালোবাসার বিষ ছড়িয়ে দিয়ে কেন তুমি দূরে সরে গেলে? তুমি কি জানো, সেই বিষই এখন আমার জীবনের একমাত্র আশ্রয় হয়ে উঠেছে। আমি সেই ভালোবাসার বিষই পান করতে চাই—যত কষ্টই থাকুক, যত যন্ত্রণা থাকুক, সব কিছুর বিনিময়ে হলেও আমি শুধু তোমাকেই চাই।

তোমাকে ছাড়া একটি রাত ইতিমধ্যেই পাড় করে ফেলেছি, আর সেই এক রাতই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে তুমি ছাড়া প্রতিটি মুহূর্ত কতটা অসহনীয়, কতটা শূন্যতায় ভরা। আমি আর কোনো রাত একা কাটাতে চাই না, চাই না এই নির্জনতা, এই নিঃসঙ্গতার ভার বহন করতে।

ফিরে আসো… আমার জীবনে আবার আলো হয়ে ফিরে আসো। এই বুকের ভেতর জমে থাকা হাহাকার, এই অজস্র না বলা কষ্ট—সবকিছু তোমার একটুখানি স্পর্শেই মুছে যেতে পারে। আমাকে আরেকবার সুযোগ দাও, তোমাকে এক চিলতে ভালোবাসার স্পর্শ দিতে দাও।

আমি জানি, ভালোবাসা কখনো সহজ নয়—তবুও আমি প্রস্তুত সব কিছু সহ্য করতে, শুধু তোমাকে পাশে পাওয়ার জন্য। ফিরে আসো, আর একবার আমার পৃথিবীটা পূর্ণ করে দাও।”

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ত্রিয়াশ হঠাৎই ভেঙে পড়ল। ঝড়ের মতো চোখের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল গাল বেয়ে। ভালোবাসার যন্ত্রণা যে কতটা অসহায় করে দিতে পারে, তা সে এখন প্রতি ন্যানো সেকেন্ডে অনুভব করছে।

নিজের ভেতরের সেই তীব্র যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে আবারও ঢকঢক করে অ্যালকোহল পান করল সে। ঠিক তখনই পাশেই রাখা ফোনটা বারবার বেজে উঠতে লাগল। অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল—ইউভি কল করছে। কিন্তু সে আর ধরল না; ফোনটাকে সেভাবেই ফেলে রেখে দিল পাশে।

আবার চোখ বন্ধ করে, ভাঙা কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,

“তোমার পেটে আমার অস্তিত্ব বড় হবে… সেই অনুভূতি আমাকে একবার অনুভব করতে দাও। ফিরে আসো, আইলিন… ফিরে আসো।”

আকাশের কালো মেঘ ক্রমেই আরও ঘন হয়ে উঠছে—মনে হচ্ছে এই বুঝি ঝড় নেমে আসবে। অথচ ত্রিয়াশের মধ্যে তার কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই। হঠাৎ চারপাশে এলোমেলো বাতাস বইতে শুরু করল। সে গাড়ির ভেতরে চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে বসে আছে। বাইরে হালকা হালকা বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে, যেন প্রকৃতিও কোনো অদৃশ্য শূন্যতার কথা বলছে।

মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ পড়তেই সময়টা দেখল—১২টা ২০। এর মানে আরেকটা দিন শেষ হয়ে গেল, সাথে ফুরিয়ে গেল একটি পুরো বাংলা বছরও। নিঃশব্দেই শুরু হয়ে গেল বৈশাখ মাস। ত্রিয়াশ ধীরে ধীরে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলল। বুকের ভেতর কেমন অস্থিরতা জমে আছে, যেন কিছু একটা হারিয়ে গেছে, সত্যিই হারিয়েছে যা এই মূহুর্তে তার কাছে নেই।

সে গ্যালারি খুলে আইলিনের একটি ছবি বের করল। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। ছবিটার ভেতর যেন তার সব অনুভূতি, সব না বলা কথা আটকে আছে। মৃদু স্বরে, ছবির সাথে কথা বলল,

“শেষ চৈত্রের সন্ধ্যা পেরিয়েছে, রঙে রঙে আকাশ খেলে, কিন্তু আমার চোখে শুধু তোমার অভাব ঝরে।

~~

সময় বহমান, নদীর স্রোতের মতোই থেমে থাকে না কখনো। দিন, মাস, বছর কিভাবে যে নিঃশব্দে পেরিয়ে যায়, তা বোঝা সত্যিই কঠিন। সুখের মুহূর্তগুলো যেন ডানায় ভর করে উড়ে যায়, আর দুঃখের দিনগুলোও চলে যায় ঠিকই, তবে রেখে যায় বুকভরা যন্ত্রণা আর না বলা কষ্টের ভার। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না, অথচ মানুষ অপেক্ষা করতে জানে—কখনো প্রিয়জনের জন্য, কখনো কোনো অসমাপ্ত স্বপ্নের জন্য। চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে, যদি এক ফোঁটা আশার বৃষ্টি নামে।

এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ ছয়টি মাস। এই ছয় মাসে ত্রিয়াশের জীবনে সুখ যেন একেবারেই অনুপস্থিত ছিল। থাকবেই বা কীভাবে? যার উপস্থিতিতে তার পৃথিবী আলোকিত হতো, সেই মানুষটিই তো তাকে ছেড়ে চলে গেছে। আইলিনের অনুপস্থিতি তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে বিষণ্ন করে তুলেছে। এই ছয় মাসে সে একটাই কাজ করেছে—আইলিনকে খুঁজেছে। শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, পরিচিত-অপরিচিত সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছে, কিন্তু কোথাও তার দেখা মেলেনি।

রাতের গভীর নীরবতায় তার ঘরের এক কোণে মৃদু আলো জ্বলছে। খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে ত্রিয়াশ। তার হাতে ধরা অ্যালকোহলের বোতল—যা এই কয়েক মাসে তার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। যেন কষ্ট ভুলে থাকার একমাত্র উপায় এটাই। চোখের নিচে কালি, মুখে ক্লান্তির ছাপ, আর চোখ দুটো ভেজা অবিরাম অশ্রুধারায়।

আইলিন চলে যাওয়ার পর তার স্বভাব পুরোপুরি বদলে গেছে। একসময় যে মানুষটি শান্ত, স্থির ও দায়িত্বশীল ছিল, সে এখন আরও গম্ভীর খিটখিটে মেজাজের হয়ে উঠেছে। এতটাই পরিবর্তন এসেছে তার মধ্যে যে সে নিজের প্রিয় পেশা ভার্সিটির প্রফেসরের চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছে। তবে চাকরি ছাড়ার আগে সে শেষবারের মতো পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছিল আর আইলিনও তার কথা রেখেছিল; ত্রিয়াশের সাবজেক্টে সে ভালো নম্বর পেয়েছিল। এই ছোট্ট অর্জনটুকুই হয়তো ত্রিয়াশের ভাঙা মনকে সামান্য সান্ত্বনা দিয়েছিল, কিন্তু আইলিনের অনুপস্থিত তাকে কুড়ে কুড়ে শেষ করছে। ভালোবাসা ঘৃণা করে বলা ছেলেটা আজ ভালোবাসার কাঙ্গাল।

এখনও ত্রিয়াশ বুকে আগলে রেখেছে আইলিনের একটি শাড়ি—যেন সেটাই তার কাছে আইলিনের শেষ স্মৃতি, শেষ স্পর্শ। শাড়িটিকে আঁকড়ে ধরে সে কাঁদছে, যেন সমস্ত দুঃখ অশ্রুর সাথে বেরিয়ে আসতে চায়, কিন্তু তবুও বুকের ভেতরের শূন্যতা পূরণ হয় না।

দরজার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে নাহিদ মির্জা এবং তিশা বেগম। কয়েকমাস হলো দেখে আসছে আর সহ্য হয় না। তিশা বেগম বাইরে থেকে শক্ত থাকার চেষ্টা করেন, ছেলের সাথে কথা বলেন না, কিন্তু মায়ের হৃদয় কি আর এত সহজে শক্ত থাকে? ভেতরে ভেতরে তিনি ছেলের কষ্টে পুড়ে যাচ্ছেন। তার চোখ ভিজে উঠেছে অশ্রুতে, ছলছল দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে আছেন নিজের সন্তানের দিকে। একজন মায়ের অসহায়তা আর গভীর মমতার নিঃশব্দ প্রকাশ।

তিশা বেগম চোখের পানি মুছে নাহিদ মির্জার হাত শক্ত করে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“ত্রিয়াশের বাবা, আমাদের ছেলেটাকে বাঁচাও। ওকে কোথাও দূরে নিয়ে চলো। এভাবে আর কতদিন? ওকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনো।”

নাহিদ মির্জা শান্তভাবে তিশা বেগমের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে সান্ত্বনার স্বরে বলল,

“ আমি বাবা হয়ে কিছুই করতে পারছি না। এবার আমি ভেবেছি, ত্রিয়াশকে আমার ব্যবসার কাজে ব্যস্ত রাখব। হয়তো কাজের ভেতরে ডুবে থাকলে ও কিছুটা হলেও এই যন্ত্রণা ভুলতে পারবে।”

কথাগুলো বলেই নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলো এরপর নিঃশব্দে চলে গেল নিজেদের ঘরে।

ত্রিয়াশ একটার পর একটা সিগারেট শেষ করে চলেছে। ঘরের মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে আছে খালি অ্যালকোহলের বোতল আর আধখাওয়া সিগারেটের অবশিষ্টাংশ। যেন তার ভেতরের বিশৃঙ্খলারই প্রতিচ্ছবি। ধোঁয়ায় ভরা ঘরটায় শ্বাস নেওয়াটাও ভারী হয়ে উঠেছে, তবু সে থামছে না।

চোখ বন্ধ করে সে বিড়বিড় করে বলতে থাকে,

“তোর ভালোবাসার বিষ আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে গেছে… এখন আর বাঁচা-মরার তফাৎ বুঝি না। তুই নেই, তবু তোরই যন্ত্রণা আমার সবচেয়ে আপন হয়ে রয়ে গেছে।”

তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে এক ব্যথাতুর হাসি। সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে থাকে অসহায়তা, অভিমান আর ভাঙা বিশ্বাসের স্তূপ। আবারও সে বলে ওঠে,

“তুই বড়ই বেইমান, আইলিন… এই বেইমানির হিসাব তুলে রাখলাম।”

এতো ড্রিংক করায় ঝিমিয়ে পড়া শরীরটা আর সামলাতে পারে না সে। ডুলতে ডুলতে হঠাৎই মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে যায়। চারপাশটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে। তার হাত অসাবধানতাবশত পাশে পড়ে থাকা রিমোটে লেগে যায়।

হঠাৎ করেই ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে সাউন্ড বক্সে একটা গান বেজে ওঠে,

°°°°° আমার আগুনের ছাই জমে জমে °°°°°

কত পাহাড় হয়ে যায়।

আমার ফাগুনেরা দিন গোনে গোনে

আর উধাও হয়ে যায়।

♬ ♪ ♬

আমার আগুনের ছাই জমে জমে

কত পাহাড় হয়ে যায়।

আমার ফাগুনেরা দিন গোনে গোনে

আর উধাও হয়ে যায়।

যত পথের বাঁধা, সবই তো কালো সাদা।

কবে ঠিকানা পেয়ে হবে রঙিন

চেনা নামেরই ডাকে, আমি কি পাবো তাকে

কবে রে আসবে সে রোদেলা দিন

ও..............ও.............ও

চলবে,,,

[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। দয়া করে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। আমি নবীন লেখিকা আপনাদের ভালোবাসা আমার প্রেরণা। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন