গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ৪০
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
“এই অন্ধকার রাতে বিষণ্ন মন নিয়ে আজও তারই কথাই ভাবছিস। তাহলে কেন দূরত্ব বাড়ালি?”
একটু থেমে, ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়ায়। তারপর আবার বলে ওঠে,
“যাকে ভুলতে পারছিস না, যাকে ছাড়া থাকতে এত কষ্ট হয়, তাহলে কেন চলে এলি? নিজের জায়গাটা কেন আঁকড়ে ধরলি না? এমনও তো হতে পারে—চোখের দেখা সবসময় ঠিক হয় না। তুই হয়তো একটা ভুলকে সত্যি ভেবে দূরে সরে এসেছিস। নিজের অধিকার আদায় করে নে… ফিরে যা।”
“তাড়িয়ে দিচ্ছো? আমি কি খুব বেশি খাই?”
রুদ্র একটু বিরক্ত হয়ে বলে,
“উফফ, আইলিন! আমি সে কথা বলিনি। আমি চাই তোর সন্তান বাবার আদর থেকে বঞ্চিত না হোক। একটা সন্তানের পাশে বাবার উপস্থিত খুব জরুরি।”
কঠিন, অকপট স্বরে আইলিন উত্তর দেয়,
“লাগবে না বাবার আদর। আমি আমার সন্তানকে একাই বড় করবো। তুমি সমাজের ভয় করছো? শোনো, সমাজ সমালোচনা করবেই। কিন্তু একবেলা না খেয়ে থাকলে দেখবে—কেউ তোমার দিকে ফিরে তাকাবে না।”
রুদ্র শান্তভাবে বলে,
“সমাজের কথা ভাবলে তোকে আমাদের কাছে রাখতাম না। দেখ, তোর অনেক শখ-আহ্লাদ আছে। তাই চাই তুই তোর স্বামীর কাছে ফিরে যা।”
আইলিন কষ্ট পেয়ে বলে,
“আমি যদি তোমার নিজের বোন হতাম, তাহলে কি এভাবে বলতে পারতে?”
আইলিনের এই অবস্থায় রুদ্র আর কথা বাড়ায় না। সে পরিস্থিতিকে জটিল করতে চায় না। একজন ডাক্তার হিসেবে সে জানে, গর্ভাবস্থায় মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক অনেক পরিবর্তন হয়—অনেক চাওয়া-পাওয়াও তৈরি হয়। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে নরম গলায় বলে,
“এখন চুপচাপ ঘুমা। আমার ভাগ্নে বা ভাগ্নিকে এত রাত জাগিয়ে রাখিস না, ঠান্ডা লেগে যাবে।”
রুদ্রের কথা শুনে আইলিন ফিক করে হেসে ফেলে,
“ভাইয়া, বেবি তো এখনো পেটের ভেতরে! ঠান্ডা লাগবে কী করে?”
রুদ্রও মুচকি হেসে বলে,
“তোর ঠান্ডা লাগলে ওরও লাগবে। আর হ্যাঁ, তোর জন্য ফুচকা আনা হয়েছে।”
আইলিনের চোখ জ্বলে ওঠে,
“সত্যি?”
“হুম।”
নিজের একটু উঁচু হওয়া পেটের ওপর হাত রেখে আনন্দে প্রায় দৌড়েই চলে যায় আইলিন। তাকে এভাবে ছুটতে দেখে রুদ্র গলা উঁচু করে বলে,
“সাবধানে যা! পড়ে গিয়ে যেন ব্যথা না পাস!”
।
।
নিলয় আজও অফিস থেকে একটু দেরিতে বাড়ি ফিরল। ইদানীং কাজের চাপ এতটাই বেড়েছে যে সময়মতো ফেরা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। সারাদিন অফিসের ব্যস্ততা আর বাড়িতে ফিরে এক ধরনের শূন্যতা—সব মিলিয়ে তার জীবনটা যেন ক্লান্ত আর বিষণ্ন হয়ে গেছে। আইলিনকে ছাড়া এই বাড়িটা এখন কেমন যেন নির্জীব লাগে।
ঘরে ঢুকে নিলয় দেখল, আইরা নেই। বিছানায় তাদের ছয় মাসের ছেলে নির্ঝর শান্তভাবে ঘুমিয়ে আছে, মুখে একটি আঙুল দিয়ে। ছোট্ট ছেলেটা দিন দিন বড় হয়ে উঠছে। নিলয় আস্তে করে ব্লেজার খুলে খাটের পাশে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে ছেলের কাছে গিয়ে কপালে একটি চুমু খেল।
নিঃশব্দে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই তার চোখে পড়ল আইরাকে। সে উদাস হয়ে দূরে তাকিয়ে আছে। নিলয় কাছে গিয়ে আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখতেই, প্রিয় মানুষের স্পর্শে আইরা হঠাৎই তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে বলতে লাগল,
“কত দিন হয়ে গেল আমার সোনা বোনুর মুখটা দেখি না… আমার ছোট বোনটা মা হতে যাচ্ছে… অথচ আমি তার পাশে থাকতে পারছি না… তার কোনো যত্ন নিতে পারছি না…!”
কান্নার কারণে তার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, শ্বাস ভারী হয়ে আসছে।সে আবার বলল,
“আমার বোনটা কবে এত পাষাণ হয়ে গেল, বলো তো? ওর কি আমাদের কথা একবারও মনে পড়ে না?”
নিলয় নিঃশব্দে শুনতে থাকল। তার নিজের বুকের ভেতরেও যেন জমে থাকা কষ্টগুলো নড়েচড়ে উঠছে। গত ছয় মাস ধরে এই একই যন্ত্রণা, একই অপেক্ষা, একই না-পাওয়া—সবকিছু এই বাড়ির মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছে।
কিন্তু আইরাকে শান্তনা দেওয়ার মতো কোনো শব্দ তার কাছে নেই। কিছু ব্যথা আছে, যেগুলো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না—শুধু অনুভব করা যায়।
আইরা নাক টেনে আবার বলতে শুরু করল,
“ও কত এক্সাইটেড ছিল খালামনি হবে বলে… কত স্বপ্ন দেখেছিল… কিন্তু সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। নির্ঝর পৃথিবীতে এলো, আর আইলিন হারিয়ে গেল…!”
তার কণ্ঠ আরও ভেঙে এল।
“আমার অভিমানী বোনটা কোথায় আছে, কেমন আছে—আমি কিছুই জানি না… আমি জানি, একটা মেয়ের প্রেগনেন্সির সময় কতটা শারীরিক আর মানসিক পরিবর্তন আসে… এই অবস্থায় ও কোথায় আছে, কীভাবে আছে—আল্লাহই ভালো জানেন…”
এরপর আর নিজেকে সামলাতে পারল না আইরা। হঠাৎ করেই সে শব্দ করে ডুকরে কেঁদে উঠল।
নিলয় তাকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। যেন নিজের সবটুকু উষ্ণতা দিয়ে তাকে আগলে রাখতে চায়।
তার নিজের চোখেও জল চলে এল। ত্রিয়াশের কথা ভেবে ছেলেটা দিন দিন কতোই পাগলামো করছে। একফোঁটা নোনতা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল আইরার চুলের ভাঁজে।
রাতের অন্ধকারে, দু’জন মানুষ একে অপরকে আঁকড়ে ধরে রইল। হারিয়ে যাওয়া একজনের অপেক্ষায়, আর না বলা হাজারটা কষ্ট বুকে নিয়ে।
~~~~~~
বিশাল এক কক্ষে, মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত কাঁচে ঘেরা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিয়াশ। এক হাত ঢুকানো পকেটে, আর অন্য হাতে ধরা জ্বলন্ত সিগারেট। কাঁচের ওপারে দূরে ছুটে চলা গাড়িগুলোর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। কপালে ভাঁজ পড়ে আছে—স্পষ্ট বোঝা যায়, তার মনে চলছে অসংখ্য হিসাব-নিকাশ, অগণিত ভাবনা।
তার ঠিক পেছনেই নীরবে দাঁড়িয়ে আছে শেখর। অনেকক্ষণ ধরে সে ত্রিয়াশকে দেখছে, কিন্তু কিছু বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছে। ভয়, দ্বিধা আর অজানা আশঙ্কা তাকে পিছু টেনে ধরছে। তবুও নিজের ভেতরের দ্বিধা দূরে সরিয়ে অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে বলে উঠল,
“স্যার, আজ আপনার ফ্লাইট আছে। আপনাকে বাংলাদেশ যেতে হবে।”
ত্রিয়াশ কোনো সাড়া দিল না। একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল, যেন কথাগুলো তার কানে পৌঁছায়নি। শেখর একটু ইতস্তত করে আবার ডাকল,
“স্যার...”
হালকা গলায় ত্রিয়াশ জবাব দিল, “হুম... সব ব্যবস্থা করো। কয়টার ফ্লাইট?”
“রাত আটটার,”
দ্রুত উত্তর দিল শেখর। ত্রিয়াশ সিগারেটের শেষ টান দিয়ে সেটি নিচে ফেলে দিল। ধোঁয়ার শেষ কুণ্ডলীটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল বাতাসে। শেখর নিজের কাজে ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল, ঠিক তখনই ত্রিয়াশ আবার তাকে ডেকে উঠল,
“শেখর।”
স্যারের ডাক শুনে থেমে গেল সে। আজ ত্রিয়াশের কণ্ঠে অদ্ভুত এক শান্ত সুর—যা শেখরের কাছে একেবারেই অচেনা লাগল।
শেখর হঠাৎ থেমে দাঁড়াল। সামনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এসে ত্রিয়াশ ফিরে তাকাল তার দিকে। চোখে থাকা সানগ্লাসটা নামিয়ে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বলল,
“কখনো প্রেমে পড়েছো?”
প্রশ্নটা যেন একেবারেই অপ্রত্যাশিত। ত্রিয়াশের মুখে এমন কথা শেখর আগে কখনো শোনেনি। গত চার বছর ধরে সে ত্রিয়াশের ছায়াসঙ্গী—তার বাবার কোম্পানিতে অনেক আগে থেকেই কাজ করলেও ত্রিয়াশের সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠভাবে রয়েছে এই চার বছর। এই সময়ের মধ্যে ত্রিয়াশকে সে খুব কাছ থেকে দেখেছে, বুঝেছে, জেনেছে।
ত্রিয়াশের জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়—আইলিন। চার বছর আগে আইলিন তাকে ছেড়ে চলে যায়। সেই ভাঙনের পর থেকেই ত্রিয়াশ বদলে যায়। সাড়ে তিন বছর আগে সে আমেরিকায় চলে আসে , আর তারপর থেকে নিজেকে পুরোপুরি ব্যবসার মধ্যে ডুবিয়ে রাখে। অনুভূতি, ভালোবাসা সবকিছু যেন সে চাপা দিয়ে রাখে কাজের আড়ালে। আজ সে একজন সফল,বিজনেস ম্যান, কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা ঠিক আগের জায়গাতেই আটকে আছে।
ত্রিয়াশের প্রশ্নে শেখর কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নেড়ে ধীরে বলে,
“না, স্যার।”
ত্রিয়াশ আবার সানগ্লাসটা চোখে তুলে নেয়। ঠোঁটের কোণে হালকা এক তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে। সে শান্ত গলায় বলে,
“পরিও না প্রেমে—প্রেম মানেই অসুখ, যার কোনো ওষুধ নেই, আছে শুধু অপেক্ষা।
ঠিক তখনই ইউভি রুমে ঢুকতে ঢুকতে কথাটা শুনে বলল,
“আজও তো তারই অপেক্ষায় আছিস?”
ত্রিয়াশ এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে বলে,
“হুম… চার বছর ১৪৬০ দিন, ২১,০২,৪০০ মিনিট, ১২,৬১,৪৪,০০০ সেকেন্ড… আজও আমি তারই অপেক্ষায় বাঁচি ।”
ত্রিয়াশ অফিস রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। যতক্ষন দেখা গেল ইউভি তাকিয়ে রইল, শেখর ইউভির দিকে এগিয়ে এসে বলে,
“ এই ছোট্ট পৃথিবীতে তো মানুষের সাথে মানুষের হাজার বার দেখা হয় তাহলে স্যারের সাথে কেন ম্যামের দেখা হচ্ছে না?
“ নিজ থেকে হারিয়ে যাওয়া জিনিস কখনো খুজে পাওয়া যায় না। ”
“ কেউ পাক বা না পাক, স্যার যেন তার ভালোবাসা ফিরে পায়। ”
ইউভি আর কথা বাড়াল না নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সেও চায় ত্রিয়াশ তার ভালোবাসার মানুষ কে খুঁজে পাক।
ত্রিয়াশ হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখলো। সেখানে আইলিনের একটি ছবি ওয়ালপেপার হিসেবে ভেসে উঠেছে। ছবিটা দেখে তার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগলো, কিন্তু গভীর সাথে যন্ত্রণা মেশানো ।
স্ক্রিনের তারিখ দেখে সে বুঝলো, এখন এপ্রিল মাস। অর্থাৎ বাংলা মাসের শেষ দিক, চৈত্রের শেষ সময় চলছে।
ত্রিয়াশ গাড়িতে গিয়ে বসে স্টিয়ারিং হুইল ঘুরাতে ঘুরাতে নিজের মনে বিড়বিড় করতে লাগলো।
“প্রথম ভালোবেসে , প্রথম ছুঁয়েছি। শেষ চৈত্রের নিঃশ্বাসে ভেজা বিকেলে, তাই নাম দিয়েছিলাম সেই স্পর্শকে #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া। তুমি-হীন কত
চৈত্র পুড়ে গেল, পলাশ ঝরল, আমিও ঝরলাম ভেতরে, আজও কি শেষ চৈত্র এলে
একটিবারও কাঁপে না তোমার মনে—আমার নাম?”
চলবে,,,,
[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। আমি সম্পন্ন নতুন লিখি সে হিসাবে কেমন লিখি ছোট করে মন্তব্য করবেন। দয়া করে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। ]