ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ চৈত্রের মৃদু ছোঁয়া

৪২তম পর্ব

লেখক: আফরিনা আক্তার সুইটি

গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া

লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি

পর্বঃ ৪২

🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫

সূর্য যখন পৃথিবীতে তার কোমল আলোর রশ্মি ছড়িয়ে দেয়, তখন প্রকৃতি এক অপার সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। লাল আভায় রাঙা হয়ে ওঠা আকাশ যেন নতুন দিনের এক মায়াবী বার্তা নিয়ে আসে। ধীরে ধীরে সূর্য যখন দিগন্ত ভেদ করে পৃথিবীর বুকে উঁকি দেয়, সেই দৃশ্য চোখ ও মন দুটোকেই শান্ত করে যায় ।

সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করছিল ত্রিয়াশ। অনেকদিন পর সে যেন আবার প্রকৃতির মাঝে নিজেকে খুঁজে পেল। ঢেউগুলো বারবার এসে তার পা ছুঁয়ে যাচ্ছিল, আর সমুদ্রের কলকল ধ্বনি যেন তার অন্তরের গভীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। আরেকটা নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সে এখানে এসেছে, বুকের ভেতর জমে থাকা আইলিন নামের সেই ব্যথাকে একটু প্রশমিত করতে। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,

“আইলিন, ভালোবেসেছিলাম, তুমি জানো না,

ভুল বোঝার ছায়ায় দূরে সরে গিয়েছো, হৃদয় কাঁদে আজও।”

হাঁটতে হাঁটতে ত্রিয়াশ একটু সমুদ্র থেকে দূরে চলে এলো। পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে ধরাল। ধোঁয়ার সাথে যেন সে তার কষ্টগুলো উড়িয়ে দিতে চাইছিল। হঠাৎ অসাবধানতাবশত কারও সঙ্গে ধাক্কা লেগে যায় । নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে, একটি ছোট মেয়ে মাটিতে পড়ে আছে, ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেছে।

ত্রিয়াশ তাড়াতাড়ি সিগারেটটা ফেলে দিয়ে মেয়েটিকে তুলে নিল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

“সরি, সরি… ব্যথা পেয়েছো?”

মেয়েটি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“পঁচা লোক, ফেলে দিছে!”

ত্রিয়াশ হালকা লজ্জা পেয়ে নিজের এক কান ধরে বলল,

“এই যে, সরি!”

তার এই কাণ্ড দেখে মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই নিষ্পাপ হাসি দেখে ত্রিয়াশ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার মনে ভেসে উঠল কিছু বিষণ্ণ স্মৃতি—তার জীবনেও তো এমন একটি ফুটফুটে বাচ্চার হাসি থাকার কথা ছিল।

সেই ভাবনা তার বুকের ভেতরটা আবার কেমন করে তুলল, তবে এই ছোট্ট হাসিটুকু যেন মুহূর্তের জন্য হলেও তার ব্যথাকে একটু হালকা করে দিল।

ত্রিয়াশ মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছোট্ট মেয়েটার দিকে। মেয়েটার সামনে গিয়ে সে দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। দু’হাত দিয়ে আলতো করে মেয়েটার দুই গাল ছুঁয়ে, নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

“তোমার নাম কী?”

“ত্রিয়া।”

“ত্রিয়া…” নামটা যেন ত্রিয়াশের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন তুলে দেয়। নিজের নামের সাথে এমন অদ্ভুত মিল। এটা কি কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো অজানা গল্প? সে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকে ত্রিয়ার দিকে। ভালো করে লক্ষ্য করে নাকের ডগায় বাদামি রঙের ছোট্ট তিল, আর বাম চোখের পাশে আরেকটি ক্ষুদ্র তিল। অজান্তেই নিজের মুখের সেই একই জায়গাগুলোতে হাত বুলিয়ে নেয় ত্রিয়াশ।

গায়ের রঙও যেন একরকম, শুধু ত্রিয়া একটু বেশি উজ্জ্বল দুধে আলতার মতো কোমল।

ত্রিয়াশের বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা জন্ম নেয়। শুকনো ঢোক গিলে সে কাঁপা গলায় আবার জিজ্ঞেস করে,

“এখানে কার সাথে এসেছো?”

ত্রিয়া নির্দ্বিধায় বলে,

“মাম্মা, বাবাই আর মিমির সাথে।”

উত্তরটা শুনে ত্রিয়াশের ভেতরের অদ্ভুত আশাটা যেন হঠাৎ করেই নিভে যায়। তবুও মুখে হাসি ধরে রেখে সে আবার প্রশ্ন করে,

“তুমি কার মতো হয়েছো?”

ত্রিয়া পাশের একটা পাথরের ওপর বসে পড়ে, মুখটা একটু ভারী করে বল,

“জানি না।”

একটু থেমে আবার কৌতূহলী চোখে ত্রিয়াশের দিকে তাকিয়ে বলে,

“তোমার নাম তো বললে না!”

ত্রিয়াশ হালকা হেসে ফেলে। সেই হাসির আড়ালে কত অজানা অনুভূতি লুকিয়ে রেখে সে বলে,

“আমার নাম ত্রিয়াশ।”

নামটা শুনে ত্রিয়া কয়েক সেকেন্ড ভেবে হঠাৎ লাফিয়ে উঠে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে,

“তোমার নাম আমার নামের সাথে মিল আছে!”

এই সময় দূর থেকে ত্রিয়াকে খুঁজতে খুঁজতে রাত্রি এসে পৌঁছায়। ত্রিয়াকে এক অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বলতে দেখে সে একটু উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে আসে বলে,

“মিমি কে রেখে এখানে কেন এসেছো? মাম্মা না বলেছে, অপরিচিত কারো সাথে কথা বলবে না?”

রাত্রি এগিয়ে এসে ত্রিয়াকে কোলে তুলে নেয়। ত্রিয়া রাত্রির কোল থেকে নিষ্পাপ কণ্ঠে বলে,

“আমরা তো পলিচিত হচ্ছিলাম!”

“মা, পলিচিত না, পরিচিত।”

এরপর রাত্রি ত্রিয়াকে নিয়ে হাঁটা শুরু করে। কিন্তু ত্রিয়া কোলের ভেতর ছটফট করতে করতে বলে—

“আমি বিদায় নিয়ে আসি!”

কথা শেষ করেই সে কোল থেকে নেমে দৌড়ে আবার ত্রিয়াশের কাছে ফিরে আসে। ছোট্ট হাত দিয়ে ত্রিয়াশের হাতটা ধরে হাসিমুখে বলে,

“তোমার আর আমার নাম মিল আছে, তাই তুমি আমার ভালো আঙ্কেল।”

ত্রিয়াশের চোখ ভিজে ওঠে অজান্তেই। সে আলতো করে ত্রিয়ার গালে একটা চুমু দেয়।

ত্রিয়া হঠাৎ ত্রিয়াশের কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব গোপন ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলে,

“আর ওই পচা জিনিস খেও না।”

প্রথমে ত্রিয়াশ বুঝতে পারে না। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তার মনে পড়ে যায় সিগারেটের কথা।

সে হালকা হেসে মাথা নাড়িয়ে বলে,

“ঠিক আছে, খাবো না।”

ত্রিয়া খুশি মনে বিদায় নেয়। তারপর রাত্রির হাত ধরে দূরে চলে যায়। ত্রিয়াশ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ ত্রিয়ার চলে যাওয়া পথের দিকেই স্থির হয়ে থাকে, আর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা আর বাবা বাবা অনুভূতির ঢেউ উঠতে থাকে।

~~~

অনেকক্ষণ আগেই ইউভি, নিলয় আর নিভান বাড়িতে ফিরে এসেছে। কিন্তু যার জন্য সবাই এতদিন ধরে অপেক্ষা করছিল—ত্রিয়াশ—সে আজও ফিরল না। তিশা বেগম অনেক আশা নিয়ে বসেছিলেন, এতদিন পর ছেলেকে একবার চোখ ভরে দেখবেন। কিন্তু সেই আশা পূরণ হলো না। এমনিতেই তার ওপর রাগ জমে ছিল, আজ তার সঙ্গে যুক্ত হলো গভীর অভিমান। ভারী মন নিয়ে তিনি নিজের ঘরে চলে গেলেন।

একসময় যে বাড়িতে হাসি-আনন্দের রেশ লেগে থাকত, এখন সেখানে যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা। আগের মতো আর প্রাণ নেই, নেই সেই উচ্ছ্বাস।

এদিকে আইরা তার ছেলে নির্ঝরকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। ছেলেটা দিন দিন বেশ দুষ্টু হয়ে উঠছে। তাকে সামলাতেই আইরার সারাদিন কেটে যায়।

বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে ইউভি, কোলে তার ছোট্ট মেয়ে ইউশা। বাবার কোলে চুপটি করে বসে আছে ইউশা, যেন চারপাশের নিস্তব্ধতা সেও অনুভব করছে। ঠিক তখনই নিশি এসে ইউভির পাশে দাঁড়াল। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ধীর গলায় বলল,

“ছোট ভাবি চলে না গেলে, আজ হয়তো এই বাড়ির পরিবেশটাই অন্যরকম হতো…”

কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলল,

“ত্রিয়াশ ভাইয়ারও হয়তো একটা ভরা সংসার থাকত। বলো তো ইউভি, আমরা কি কোনোদিন আইলিন ভাবিকে খুঁজে পাবো না?”

ইউভি মৃদু স্বরে উত্তর দিল,

“উপরওয়ালা চাইলে অবশ্যই একদিন খুঁজে পাবো।”

তারপর দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসে যেন জমে থাকা না বলা অনেক কথার ভার। আইলিনকে হারিয়ে এই বাড়ির কেউই আর আগের মতো নেই। সে কোথায় আছে, কেমন আছে—কেউ জানে না। অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষা মিলিয়ে সবার হৃদয়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর শূন্যতা।

নিশি আবার কাঁপা গলায় বলল,

“আমাদের তো হয়তো একটা ভাতিজা বা ভাতিজি হয়েছে… ছোট্ট তোতাপাখির মতো কটুকটু করে কথা বলে…”

এই কথা বলতেই তার চোখ ভিজে উঠল। আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। ইউভি তাকে নিজের বুকে টেনে নিল, নিঃশব্দে সান্ত্বনা দিতে লাগল।

ভাতের থালা সামনে নিয়ে অঝোরে কাঁদছেন মাহিরা বেগম। নতুন কিছু নয়—গত চার বছর ধরে এভাবেই চলছে। আফজাল হোসেন এবার বিরক্ত হয়ে পড়লেন। কণ্ঠে সামান্য বিরক্তি মিশিয়ে বললেন,

“আহ, আর কতবার বলব—ভাতের থালা সামনে নিয়ে কাঁদতে হয় না। কেন এমন অবুঝের মতো আচরণ করছো?”

মাহিরা বেগম ভাঙা গলায় উত্তর দিলেন,

“আমি মা, তাই আমি বুঝি সন্তান হারানোর বেদনা।”

কথাটা শুনে আফজাল হোসেনের বুকটা হালকা কেঁপে উঠল। কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,

“কষ্ট কি শুধু মায়েরা পায়? বাবারা পায় না? তোমরা মায়েরা অন্তত কান্নার মাধ্যমে কষ্টগুলো বের করে দিতে পারো… কিন্তু আমরা বাবারা? আমরা কাকে বলবো আমাদের বুকভাঙা কথাগুলো?”

মাহিরা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বললেন,

“আইলিনের রাগ হয়েছে, অভিমান জমেছে—তবুও তো আমাদের কাছে আসতে পারত। কেন এভাবে দূরে হারিয়ে গেল? আমার সোনা বাচ্চাটা এখন কেমন আছে?”

এরপর আর কিছু বলতে পারলেন না তিনি। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। আফজাল হোসেনের কাছেও কোনো সান্ত্বনার কথা নেই—নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া। চারটা বছর ধরে নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে, এমন না মেয়ে হারানোর যন্ত্রণা তার হয় না, তারও হয় সে তো বাবা।

~~

আইলিন ভাত মেখে ত্রিয়াকে খাওয়াচ্ছে। প্রতিটা লোকমা মুখে তুলে দিয়ে সে মিষ্টি করে বলছে—“এটা বাবার, এটা মাম্মার, এটা মিমির, এটা বাবাইয়ের, এটা দাদুর…” এভাবে গল্প করতে করতেই খাওয়ানো চলছিল। খাওয়া প্রায় শেষ, আর মাত্র এক লোকমা বাকি। ত্রিয়া সেই লোকমাটা মুখে দেওয়ার আগে হঠাৎ বলে উঠল,

“এটা ভালো আঙ্কেলের।”

ত্রিয়ার কথা শুনে আইলিন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে না, এই ‘ভালো আঙ্কেল’ আবার কে! কৌতূহল সামলাতে না পেরে মেয়েকে জিজ্ঞেস করল,

“মা, ভালো আঙ্কেল কে?”

এসময় রাত্রি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আপেলে কামড় বসিয়ে হেসে বলল,

“আর বলো না! তোমার মেয়ে আজ সমুদ্র দেখতে গিয়ে কাকে যেন ভালো আঙ্কেল বানিয়ে ফেলেছে।”

ত্রিয়াকে আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই রানিয়া চৌধুরী হাতে কয়েকটা ছবি নিয়ে এসে বললেন,

“দেখ তো, রুদ্রের সঙ্গে কোন মেয়েটা ভালো মানাবে।”

আইলিন আর রাত্রি ছবিগুলো মন দিয়ে দেখতে লাগল। বেশিরভাগই মোটামুটি ভালোই। কিন্তু রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,

“মা, তোমাকে কতবার বলেছি—এভাবে মেয়ে দেখতে হবে না। সময় হলে আমিই বলব।”

রানিয়া চৌধুরী হাল ছাড়ার পাত্রী নন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

“সময় কবে হবে? তুই বুড়ো হলে? দেখিস, তোর সময় হতে হতে আমাদের ত্রিয়া বড় হয়ে যাবে। তখন সবাই বলবে—মেয়ের বাবাই তো অবিবাহিত!”

রুদ্র বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“উফ মা! বলছি তো, সময় মতো বউ আনব।”

ঠিক তখনই ত্রিয়া এটো মুখে দৌড়ে এসে রুদ্রকে বলল,

“তুমি বিয়ে করো না, তাই তোমার বউ কান্না করে!”

ত্রিয়ার এমন পাকনা কথা শুনে ঘরে থাকা সবাই হেসে উঠল। আর রুদ্রও না হেসে পারল না, সে ত্রিয়ার সেই এটো মুখেই ভালোবাসায় ভরা একটা চুমু দিয়ে দিল।

চলবে,,,

[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। দয়া করে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন