ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ চৈত্রের মৃদু ছোঁয়া

৪৩তম পর্ব

লেখক: আফরিনা আক্তার সুইটি

গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া

লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি

পর্বঃ ৪৩

🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫

কেটে গেছে সাত দিন। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে আইলিন। এই প্রচণ্ড গরমে মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে, তবুও উপায় নেই। রুদ্র ত্রিয়াকে কোলে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু সে রাজি হয়নি মায়ের কোল ছাড়া আর কারও কাছে যাবে না।

গত সাত দিনে অনেক কিছুই বদলে গেছে। তার মধ্যে পাঁচ দিনই ত্রিয়া জ্বরে ভুগেছে। হাসিখুশি, চঞ্চল মেয়েটা যেন জ্বরে কাবু হয়ে গেছে। এই ক’দিন সে মায়ের কাছ ছাড়েনি এক মুহূর্তও।

আজ রুদ্র ত্রিয়াকে নিয়ে নিজের হাসপাতালে এসেছিল। এতদিন জ্বর কমার কোনো লক্ষণ ছিল না, তবে আজ একটু স্বস্তি মিলেছে। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে তারা এসে দাঁড়িয়েছে রাস্তার পাশে। সামনেই একটি শিশুদের পার্ক। ত্রিয়া মায়ের গলা জড়িয়ে চুপচাপ রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।

অন্যদিকে, রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে সিটে বসে ললিপপ খাচ্ছে ত্রিয়াশ। ত্রিয়াকে কথা দিয়েছে, সে আর সিগারেট খাবে না। তবে অভ্যাস তো একদিনে ছাড়ার নয়—তাই আপাতত ললিপপ দিয়েই নিজের কাজ চালাচ্ছে। চোখে সানগ্লাস পরে গাড়ি থেকে নেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, সামনে তাকাতেই তার চোখে পড়ে—ত্রিয়া কারও কোলে। সাত দিন পর মেয়েটাকে দেখে তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে ওঠে। সে হাত নেড়ে ত্রিয়াকে ইশারা করে।

ছোট্ট ত্রিয়াও একবার হাত নাড়ে, কিন্তু পরক্ষণেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। বিষয়টা ত্রিয়াশের হজম হলো না । সে চারপাশে তাকায়, রাস্তা পার হয়ে কাছে যাওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকে।

রুদ্র আর আইলিন হাঁটতে হাঁটতে আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে গেল। দুপুরের সময়, চারপাশটা যেন অদ্ভুত নিস্তব্ধ—লোকজনের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে দু-একজন মানুষ নিজের গন্তব্যের দিকে তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে যাচ্ছে, তবুও পরিবেশটা ফাঁকা, নিঃশব্দ আর অস্বস্তিকর লাগছে।

ঠিক তখনই, হঠাৎ করে আইলিনদের সামনে এসে একজন লোক দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকটা নিজের দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে আইলিনের দিকে কেমন যেন কু-দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখের সেই দৃষ্টি ছিল অশোভন। আইলিন সেই দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের মেয়েকে আরও শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল, যেন তাকে সবকিছু থেকে আড়াল করতে চায়।

লোকটা আইলিনকে আপাদমস্তক গভীরভাবে লক্ষ্য করে কটাক্ষ ভরা কণ্ঠে বলে উঠল,

“আর কতদিন এভাবে থাকবি? আমাকে বারবার ফিরিয়ে না দিয়ে চল, বিয়ে করে ফেলি। তোর সন্তান একটা বাপ পাবে, তুইও একজন স্বামী পাবি।”

এই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই রুদ্র রাগে ফেটে পড়ে চিৎকার করে উঠল,

“বাবলা, আর একটা কথা বললে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো!”

বাবলা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

“চেঁচাস না। তোর এত জ্বলে কেন রে? নাকি তুই-ই ওকে রক্ষিতা করে রাখছিস ”

কথাটা শেষ করার আগেই হঠাৎ করেই সে অনুভব করল তার নাকে প্রবল একটা ঘুষি এসে পড়েছে। মুহূর্তেই তার নাক দিয়ে র'ক্ত ঝরতে শুরু করল। সে বিস্মিত হয়ে নাকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেই কানে ভেসে এল এক গর্জনময় কণ্ঠস্বর,

“আমার ফুলের গায়ে হাত বাড়ানোর সাহস তোকে কে দিয়েছে? বল, বাস্টার্ড!”

পরিচিত সেই কণ্ঠ শুনে আইলিন চমকে উঠে তড়িঘড়ি পেছনে ফিরে তাকাল। দেখল, ত্রিয়াশ দাঁড়িয়ে আছে। তার কপালের রগ ফুলে উঠেছে, চোখে-মুখে তীব্র রাগের ছাপ, নাক লাল হয়ে আছে, আর হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ।

এত বছর পর হঠাৎ করে ত্রিয়াশকে নিজের সামনে দেখে আইলিনের বুক কেঁপে উঠল। সে অজান্তেই মেয়েকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। তার চোখে বিস্ময়, ভয় আর অজানা এক অনুভূতির মিশেল।

ওদিকে রুদ্র দৌড়ে এসে ত্রিয়াশকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বলল,

“শালা, তোর তো দেখাই মেলে না! কোথায় থাকিস?”

ত্রিয়াশ হালকা ধমকের সুরে বলল,

“নট শালা! তুই আমার বোন জামাই না—দূর হ!”

তাদের কথোপকথন শুনে সহজেই বোঝা যায়, তারা একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু এই সবকিছু যেন আইলিন ঠিকভাবে নিতে পারছে না। সে শুধু বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে, যেন ঘটনার ঘোর কাটছে না তার।

ঠিক তখনই বাবলা, নাকে হাত চেপে ধরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চিৎকার করে উঠল,

“আমার এলাকায় এসে আমাকেই মারলি? কে হয় তোর এই মেয়ে?”

“বউ, আমার বউ।”

বাবলা বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল,

“তাই নাকি? এত বছর বন্ধুর কাছে বউকে রক্ষিতা করে রাখছিলি?”

এই কথাটা যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল। মুহূর্তের মধ্যে ত্রিয়াশের মস্তিষ্ক যেন বিগড়ে গেল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না—ঝাঁপিয়ে পড়ে বাবলাকে এলোপাতাড়ি মারতে শুরু করল।

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই রুদ্র দ্রুত এগিয়ে এসে ত্রিয়াশকে টেনে সরিয়ে নিল। বাবলা র'ক্তাক্ত নাক আর ক্রোধভরা দৃষ্টি নিয়ে সেখান থেকে সরে গেল, কিন্তু তার চোখে ছিল প্রতিশোধের আগুন।

ত্রিয়াশ নিজেকে সামলে নিল। তার বুক ওঠানামা করছে, শ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। কিছুক্ষণ পর সে আবার আইলিনের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা—ভালোবাসা, অধিকার আর বহু বছরের না বলা অনুভূতির ভার।

তার বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। মনে মনে সে নিজেকেই বলল,

“আইলিন… এবার তুমি আমার বাহুবন্ধনী হবে, চিরকালের জন্য।”

আইলিনের পা দুটো যেন হঠাৎ করেই অবশ হয়ে এলো। শরীরটা কাঁপছে, মনে হচ্ছে মাটি সরে যাচ্ছে পায়ের নিচ থেকে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। কোনো রকমে ছোট্ট ত্রিয়াকে কোলে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল। তার নিঃশ্বাস ভারী, চোখে আতঙ্ক আর অজানা এক যন্ত্রণার ছাপ।

রুদ্র হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এতক্ষণ যা ঘটল, তার কিছুই যেন ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারছে না সে। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে ত্রিয়াশের মুখে আইলিনকে “বউ” বলে সম্বোধন করতে শুনে। আবার আইলিনের এমন আচমকা পালিয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে বিষয়টা তার কাছে ভীষণ অস্বাভাবিক আর ভাবনার।

হঠাৎই সে চিৎকার করে উঠল,

“আইলিন! দাঁড়া, আমার কথাটা শোন! কী হয়েছে?”

কিন্তু ততক্ষণে আইলিন চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেছে। হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এলো, শুধু রুদ্রের প্রশ্নগুলো বাতাসে ভাসতে থাকল।

রুদ্র ত্রিয়াশের দিকে তাকাল। তার চোখে প্রশ্ন, বিস্ময়, আর একরাশ কৌতূহল। ঠিক তেমনই বিভ্রান্ত দৃষ্টি নিয়ে ত্রিয়াশও তাকিয়ে আছে তার দিকে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ত্রিয়াশ কাঁপা গলায় বলে উঠল,

“আইলিন তোর কাছে আছে—তুই আমাকে আগে কেন বলিস নাই? আমি ওকে কত খুঁজেছি, জানিস?”

রুদ্র ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল,

“আইলিন তোর বউ—এটা যদি জানতাম, তাহলে কি বলতাম না?”

ত্রিয়াশের চোখে তখন অসহায়তা স্পষ্ট। সে আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। তাড়াহুড়ো করে বলল,

“আইলিন তোর কাছে কীভাবে এসেছে, সেটা আমি জানতে চাই না। আমি শুধু আমার বউ আর আমার বাচ্চাকে ফিরে পেতে চাই। এই দূরত্ব, এই বিরহ—আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমাকে ওর কাছে নিয়ে চল, প্লিজ।”

রুদ্র আর কথা বাড়াল না। বন্ধুর চোখের কষ্টটা সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। এতদিনের জমে থাকা যন্ত্রণা যেন ত্রিয়াশের প্রতিটি কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সে আলতো করে ত্রিয়াশের কাঁধে হাত রাখল এবং নরম গলায় বলল,

“দূরত্ব কতটুকু কমিয়ে দিতে পারব, জানি না। কিন্তু আইলিনের অভিমান তোকে ভাঙতেই হবে—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আমি বুঝতে পারছি, তোদের মধ্যে খুব বড় একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।”

এরপর আর দেরি করল না রুদ্র। সে ত্রিয়াশকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলল ।

দুজনের বন্ধুত্বটা এখনো আগের মতোই গভীর, কিন্তু সময় আর পরিস্থিতির কারণে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ প্রায় হয়নি বললেই চলে। দুজনই ভিন্ন পেশায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, যার ফলে দূরত্ব তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। তবুও, মাঝখানের কয়েকটা বছর তারা একেবারেই যোগাযোগবিহীন ছিল যেন অদৃশ্য দেয়াল তাদের আলাদা করে রেখেছিল।

আজ হঠাৎ করে সেই দেয়াল ভেঙে গেছে। হয়তো মহান আল্লাহর ইচ্ছাতেই যার কারণে প্রিয় মুখ গুলো চোখে সামনে।

দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে আইলিন চুপচাপ হেলান দিয়ে বসে আছে অনেকক্ষণ ধরে। ছোট্ট ত্রিয়া এখনো তার কোলে। মেয়েটার মুখে বারবার চুমু খেতে খেতে কাঁন্না ভেজা গলায় বিড়বিড় করে বলছে,

“ত্রিয়া শুধু আমার মেয়ে। আমি কাউকে ত্রিয়াকে দেবো না… ও শুধু আমার সোনা মা।”

কথাগুলো বলতে বলতে আইলিন হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। ছোট্ট ত্রিয়া কিছুই বুঝতে পারছে না—তার মা কেন এভাবে কাঁদছে। মায়ের কান্না দেখে সেও ফুপিয়ে উঠে নরম গলায় বলে,

“মাম্মা, আমি তোমার সাথেই থাকবো… তুমি কেঁদো না।”

মেয়ের কথা শুনে আইলিন তাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নেয়।

ওদিকে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে রানিয়া চৌধুরী বারবার ধাক্কা দিচ্ছেন। প্রতিটি ধাক্কার সঙ্গে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলছেন,

“আইলিন, মা, কী হয়েছে? দরজা খোলো… আমাকে বলো কী হয়েছে।”

তবুও আইলিন নিশ্চুপ হয়ে থাকে। কোনো সাড়া দেয় না।

এতক্ষণ অপেক্ষা করার পরে অবশেষে ত্রিয়াশ আর নিজেকে সামলাতে না পেরে দরজার কাছে এসে বসে নরম গলায় বলে ওঠে,

“আইলিন… দরজাটা খোলো।”

ত্রিয়াশের কণ্ঠ শুনে আইলিন কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করেই তীব্রভাবে ধুকপুক করতে শুরু করে। ত্রিয়াশ আবারও বলে,

“ প্লিজ, আমাকে আর আমার সন্তানের থেকে দূরে সরিয়ে দিও না। তোমাদের ছাড়া আমি একেবারে শূন্য, নিঃস্ব—বেঁচে থাকাটাই যেন অর্থহীন হয়ে গেছে । আমি আর কোনো শাস্তি চাই না, আর নিতে পারছি না…

আমি হাতজোড় করে বলছি—আমাকে একবার সুযোগ দাও সব খুলে বলার। তোমার সব ভুল ধারণা ভেঙে দিবো। আমার প্রতিটা কথা তুমি শুনে দেখো, তারপর তুমি যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমি মেনে নেব। দরজাটা একবার খুলে দাও… আমাদের সম্পর্কটা যেন এভাবে ভেঙে না যায়। আমি এখনো বিশ্বাস করি, আমরা চাইলে সব ঠিক করা সম্ভব। ”

আইলিন দরজায় মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে,আর দরজার ওপাশে ত্রিয়াশ।

চলবে,,,,,,

[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। দয়া করে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন