গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ৪৫
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা ঠান্ডা বাতাস ঘরে প্রবেশ করছে। রাতভর বৃষ্টির পর ভোরের এই শীতল হাওয়া যেন পুরো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে আছে। সময় এখন সকাল সাড়ে সাতটা। ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শে আইলিনের ঘুম ভেঙে যায়। কুঁকড়ে গিয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করছিল, হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে।
বাম পাশে তাকিয়ে দেখে, ত্রিয়াশের বুকে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট ত্রিয়া। সেই দৃশ্য দেখে আইলিনের চোখ জুড়িয়ে যায়। ঘুমন্ত বাবা-মেয়ের মায়াময় মুহূর্তে তার চোখের কোণে বালুকণার মতো চিকচিক করে ওঠে নোনাপানি ।
গতরাতে অনেক চেষ্টা করেও ত্রিয়াশকে পাঠাতে পারেনি সে। তার উপর ত্রিয়ার আবদার—আজ রাতে সে বাবার সাথেই ঘুমাবে। মেয়ের ইচ্ছার কাছে হার মেনে আইলিন আর জোর করেনি। হয়তো সেই কারণেই এমন সুন্দর এক সকাল উপহার হিসেবে পেয়েছে সে।
আস্তে করে উঠে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করে দেয় আইলিন। তারপর আলতো করে বাবা-মেয়ের গায়ে কাঁথা টেনে দিল। সাবধানে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, যেন তাদের ঘুম না ভাঙে।
এখনও বাড়ির আর কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। নিজের জন্য এক কাপ চা বানাতে সে রান্নাঘরের দিকে যায়। ঠিক তখনই রুদ্র এসে দেখে আইলিন চা বানাচ্ছে। এগিয়ে এসে বলে,
“চা বানাচ্ছিস?”
আইলিন হালকা হেসে উত্তর দেয়, “হুম, তুমি খাবে?”
রুদ্র বলে, “আচ্ছা, দিয়ে যাস। আমি ড্রয়িংরুমে যাচ্ছি।”
রুদ্র চলে যায়। আইলিন আবার নিজের মতো করে চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
দুই কাপ চা বানিয়ে আইলিন এসে এক কাপ রুদ্রের দিকে বাড়িয়ে দিল। নিজে সিঙ্গেল সোফায় বসে পড়ে। রুদ্র চায়ের কাপে চুমুক দিল। আইলিন রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
“ উনি যে তোমার বন্ধু আগে বলো নাই কেন? ”
“ তোর উনিই যে আমার বন্ধু আগে জানতামই নাই। ”
“ যোগাযোগ হয়নি। ”
“ না, চেষ্টা করেছি প্রতি বারই ব্যর্থ হয়েছি। ”
রুদ্র চায়ের কাপটা সেন্টার টেবিলে রেখে দিল। সরাসরি আইলিনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
“ ত্রিয়াশের সাথে ফিরে যাবি না?
আইলিন নিশ্চুপ হয়ে আছে। রুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“ভুল বোঝাবুঝির খেলায় আর জড়াস না। সব ভুলগুলো ঠিক করে নিয়ে নতুন করে সংসার গড়।”
আইলিন রুদ্রের কথা উপেক্ষা করে নিজেই বলে উঠে,
“ রুদ্র ভাই, সংসার করবে কবে? ”
রুদ্র আয়েশি ভঙ্গিতে সোফায় হেলান দিয়ে বসে বলে,
“ তোর কোনো ননদ থাকলে আমায় দিতে পারিস। ভেবে দেখবো সংসার করা। ”
রুদ্রের কথা শুনে আইলিন ফিক করে হেসে ফেলে। হাসতে হাসতে বলে,
“ আচ্ছা... ভেবে দেখবো। ”
আইলিন হাসতে হাসতে চায়ের কাপ দুটো রান্না ঘরে নিয়ে যায়।
~~~
বৃষ্টি নেই, তবু পরিবেশে এক ধরনের গুমোট ভাব। আকাশ জুড়ে কালো মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। এমন দিনে সমুদ্রপাড়ের আবহাওয়া টা যেন আরও অন্যরকম হয়ে ওঠে। চারপাশে লোকসমাগম কম, নিস্তব্ধতা যেন আরও গভীর। বালুর ওপর দিয়ে হাঁটছে শাওন। অজান্তেই বারবার নিজের নখ কামড়াচ্ছে সে। গতকাল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ত্রিয়াশ হোটেল রুমে ফেরেনি। কোথায় গেছে, কোনো খবর নেই। কয়েকবার ফোন করেছিল শাওন—প্রথমে রিং হলেও পরে ফোন পুরোপুরি বন্ধ।
অচেনা এই জায়গায় ত্রিয়াশ কোথায় যেতে পারে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না শাওন। বাড়িতে জানাবে কি না, এই দ্বিধায় ভুগতে ভুগতে সে অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ কারও সঙ্গে ধাক্কা লেগে নিচে পড়ে যায়। ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে যায় তার। রাগে কিছু বলতে যাবে, এমন সময় সামনে তাকিয়ে দেখে—একটা মেয়ে তার মতোই কোমড়ে হাত চেপে ধরে বসে আছে। মেয়েটি রাগী গলায় বলে ওঠে,
“চোখে দেখে হাঁটতে পারেন না? চোখ কি বাসায় রেখে আসছেন?”
শাওনও ছাড় দেওয়ার পাত্র নয়। সে জবাব দেয়,
“আপনার চোখ যখন ছিল, আপনি দেখলেন না কেন? যত্তসব ফাউল !”
“এই, আপনি আমাকে ফাউল বললেন? সাহস তো কম না!”
“আপনি শুধু ফাউল না, সাথে বাচালও বটে।”
“আপনি একটা রাম ছাগল!”
“আপনি ছাগলি!”
শাওন উঠে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের বালি ঝাড়তে ঝাড়তে বলে,
“সরুন, স্যারকে খুঁজতে হবে।”
মেয়েটি বিরক্ত হয়ে বলে,
“একটা হাঁদারাম!”
শাওন ফিরে তাকিয়ে বলে,
“এই, কী বললেন?”
“সরুন, আমাকেও ভাই আর ভাবিকে খুঁজতে হবে।”
হঠাৎ শাওন মেয়েটার হাত চেপে ধরে বলে,
“আপনি আমাকে হাঁদারাম বললেন কেন? এমন হ্যান্ডসাম ছেলে কখনো দেখেছেন?”
মেয়েটি হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলে,
“পাদের হ্যান্ডসাম! হাত ছাড়ুন।”
ঠিক তখনই মেয়েটার ভাই-ভাবি এসে পড়ে। নিজের বোনকে অচেনা ছেলের সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে ওঠে,
“কি হয়েছে, রিদিশা?”
রিদিশা কিছু বলার আগেই শাওন বলে,
“তেমন কিছু না, আমি যাচ্ছি।”
শাওন চলে যেতে উদ্যত হলে পিছন থেকে ডাকা হয়,
“এই যে শুনুন, আপনাকে চেনা চেনা লাগছে। কোথাও দেখেছি মনে হয়।”
রিদিশা এগিয়ে এসে বলে,
“ভুল ভাবছো হয়তো ভাইয়া। তুমি তাকে চিনবে কি করে? ”
শাওন জিজ্ঞেস করে,
“কোথায় দেখেছেন?”
“আপনি কি ত্রিয়াশ ভাইয়ের পিএ?”
শাওন একটু ভেবে উত্তর দেয়,
“হ্যাঁ। আমি স্যারকে খুঁজছি। হঠাৎ উনার সঙ্গে ধাক্কা লেগে এই ঝামেলা হলো। আপনি কি রহিম চাচার ছেলে রাফসান? স্যারের মুখে অনেক শুনেছি এই নাম ।”
এরপর তারা স্বাভাবিক হয়ে কথা বলতে থাকে। জানা যায়, রাফসান তার স্ত্রী ও বোনকে নিয়ে সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে এসেছে। গতকালই তারা এখানে পৌঁছেছে। রাফসান তার ক্লাসমেট রাহিকে বিয়ে করেছে, তাদের ছোট্ট সংসারও বেশ সুখের।
কথা বলতে বলতে তারা এক ছাউনির নিচে গিয়ে বসে। কিছুক্ষণ পর রিদিশা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
“আইলিন ভাবি কোথায় আছে, জানেন?”
শাওন মাথা নাড়িয়ে বলে,
“না। কাল থেকে স্যারও কোনো হদিস নেই। ফোনও বন্ধ।”
রাফসান উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে,
“নেই মানে? কোথায় গেছে?”
শাওন অসহায়ভাবে বলে,
“জানি না…”
ত্রিয়াশের হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া নিয়ে সবার মনে দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে। কী হয়েছে, কোথায় আছে —এই অজানা আশঙ্কায় যেন তাদের মাথা ফেটে যাচ্ছে।
~~~
অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠেছিল ত্রিয়াশ। তারপর থেকে মেয়ের সঙ্গে খেলতেই ব্যস্ত—মেয়েটা যেন বাবাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে চায় না। এদিকে অনেক আগে থেকেই আইলিনের রান্না শেষ, তাই সবাই একসঙ্গে ডাইনিং টেবিলে বসেছে।
আইলিন মেয়ের জন্য কাটা বেছে মাছ দিয়ে ভাত মেখে খাওয়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সে কিছুতেই রাজি নয়। তার একটাই জেদ—সে খাবে শুধু পাপার হাতেই। মেয়ের এই জেদ দেখে আইলিন আস্তে করে বলল,
“চব্বিশ ঘণ্টাও হয়নি বাবাকে পেয়েছে, এর মধ্যেই মাকে ভুলে গেছে! মীরজাফর।”
কথাটা আস্তে বলা হলেও ত্রিয়াশের কানে এড়ায় না। ঠোঁটের কোণে হালকা এক বাকা হাসি রেখে সে মেয়েকে মাছের কাঁটা বেছে খাওয়াতে থাকে। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে রুদ্রও ত্রিয়াশের সঙ্গে টুকটাক গল্পে মেতে ওঠে।
আইলিন চুপচাপ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ত্রিয়ার চোখে-মুখে ঝুলে থাকা উজ্জ্বল হাসিটা দেখে হঠাৎ তার নিজের বাবার কথা মনে পড়ে যায়। সবার অগোচরে সে নিজের ঘরে চলে আসে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে বাবার ছবি দেখতে থাকে। হঠাৎই চোখে পড়ে আরেকটা ছবি। তার আর পৃথার একসঙ্গে তোলা, হাস্যোজ্জ্বল একটি মুহূর্ত। দু’জনেই একে অপরের বেনী ধরে হাসছে।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে আইলিন মনে মনে বলে ওঠে,
“পৃথা বেবি, কেমন আছিস? আমায় ক্ষমা করিস। আমরা তো কথা দিয়েছিলাম—কখনো কাউকে ছেড়ে দূরে কোথাও যাব না। কিন্তু আমি আমার কথা রাখতে পারিনি…”
খাওয়াদাওয়া শেষ করে রুদ্র হসপিটালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। আজ তার সার্জারী আছে। রাত্রিও নিজের বান্ধবীর সঙ্গে বাইরে গেছে। রানিয়া চৌধুরী নিজের ঘরে চলে গেছেন। আইলিন এখনো নিজের ঘরেই আছে। ত্রিয়া খাওয়া শেষ করেই অনেকক্ষণ আগে কোথায় যেন চলে গেছে।
ত্রিয়াশ খাওয়া শেষ করে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলে ঘরে ফিরে আসে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে ত্রিয়াকে খুঁজতে থাকে, কিন্তু কোথাও তাকে দেখতে পায় না। ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে আইলিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তবুও ত্রিয়ার কোনো খোঁজ নেই। হঠাৎ করেই তার মনটা অস্থির হয়ে ওঠে।
ফোনটা পকেটে রাখতে রাখতে সে ঘরে ঢুকতেই আচমকা ত্রিয়া দরজার আড়াল থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে বলে ওঠে, “ভাউ!”
মেয়েটা তাকে ভয় দেখাতে চাইলেও ত্রিয়াশ আসলে ভয় পায় নাই। তবুও মেয়ের সামনে ভয় পাওয়ার ভান করে মেঝেতে বসে পড়ে। ত্রিয়া এই কাণ্ড দেখে সে খিলখিল করে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। ত্রিয়াশও মেয়েকে বুকের মধ্যে টেনে নেয়।
ত্রিয়া বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আনন্দে বলে, “ত্রিয়াকে পাপা ভয় পায়! কী মজা!”
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আইলিন পুরো দৃশ্যটা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। ত্রিয়াশ মেয়েকে কোলে নিয়ে আইলিনের পাশে এসে দাঁড়িয়ে নরম স্বরে বলে, “অভিমান কমেছে?”
“.(......)
“ কথা বলবে না। এটাই কি তাহলে আমার শাস্তি? "
“ (.........)
“ ফিরে চলো, সবার মতো আমাদেরও একটা সংসার হোক। এভাবে মুখ ফিরিয়ে থেকো না। ”
আইলিন নিঃশব্দে বাইরে তাকিয়ে আছে। ত্রিয়া পাপার কোলে থেকে নেমে রানিয়া চৌধুরীর কাছে গেলো। দাদুর সাথে খেলবে, সারাদিন মেয়েটা দৌড়ঝাঁপ করে বাড়ি টা মাতিয়ে রাখে।
ত্রিয়াশ আইলিনের আরেকটু কাছে এসে বলে,
“ কতো কতো যন্ত্রণা দিয়েছো সেই সব সুদে আসলে ফিরিয়ে দিলে সইতে পারবে। ”
ত্রিয়াশের এমন কথা শুনে আইলিনের বুকের মধ্যে ধক করে উঠে। কি বলতে চাই? কিসের যন্ত্রণা দিতে চায়? আইলিন শক্ত করে ওড়নার কোণা চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ত্রিয়াশ বলে উঠে,
“কেন তুমি এত নীরব হয়ে আছো? তোমার এই চুপচাপ থাকা আমাকে আরও বেশি কষ্ট দেয়।”
একটু থেমে আবারও বলে,
“বিনা দোষে তুমি আমাকে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা উপহার দিয়েছো। এটা শুধু দূরে চলে যাওয়া নয়, বরং অকারণে ভেঙে দেওয়া এক বিশ্বাসের গল্প। আমি কখনো ভাবিনি, কোনো অপরাধ না করেও এমন শাস্তি পেতে হবে।”
আইলিন মাথা নিচু করে আছে। কি বলবে বুঝতে পারছে না। হয়তো কোনো সাহসও পাচ্ছে না। আইলিন মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইলো। রাগ লাগছে, ভীষণ রাগ লাগছে ত্রিয়াশের। তবুও নিজের কন্ট্রোল করে রাখছে, সে চায়না আইলিনের ওপর রাগ দেখাতে। যতই হোক প্রিয়তমা। ত্রিয়াশ জানে ধমকে নয় ভালোবেসে অভিমান ভাঙাতে হবে। ত্রিয়াশ নিজের চুলে হাত দিয়ে ব্রাশ করে বলে উঠে,
“ যতই মুখ ফিরিয়ে রাখো, দূরে দূরে থাকো দিন শেষে আমাকে সহ্য করার জন্য প্রস্তুত থেকো। ”
কথা শেষ করে ত্রিয়াশ হনহনিয়ে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আইলিন ফিরে দেখে ত্রিয়াশ মেন দরজা পেরিয়ে গেছে।
চলবে,,,,
[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। দয়া করে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। ]