গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ৪৯
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
প্রায় আধঘণ্টা ধরে পুরো বাড়িটা যেন এক অদ্ভুত নীরবতায় ডুবে আছে। হাসপাতাল থেকে ফিরে সবাই সরাসরি ড্রয়িংরুমে এসে বসেছে, অথচ কারও মুখে কোনো কথা নেই।
সোফার একপাশে চুপচাপ বসে আছেন রানিয়া চৌধুরী। তাঁর ডান পাশে বসে আছে রুদ্র— গম্ভীর, নিশ্চুপ, মাথা নিচু করে। সিঙ্গেল সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে ত্রিয়াশ। শরীরের ক্ষতস্থানগুলো এখনও যন্ত্রণায় কাঁপছে, তাই মুখেও স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। বাকিরা কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে।
ইউশা আর ত্রিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের পাশে বসে নিশি নিঃশব্দে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আর এদিকে রাত্রির অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। নিজের ঘর থেকে বারবার ড্রয়িংরুমে উঁকিঝুকিঁ দিচ্ছে । ভয়ে বারবার নখ কামড়াচ্ছে, কখনো বসছে, কখনো উঠে পায়চারি করছে। মনে হচ্ছে, এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি পাচ্ছে না। পাবেই বা কীভাবে?
তার মা আর ভাই আজ তার আর নিভানের সম্পর্কের কথা জেনে গেছে।
ঘরের দরজার পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস আটকে সব কথা শোনার চেষ্টা করছে রাত্রি। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে সে। অবশেষে দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে ত্রিয়াশ মুখ খুলল। নরম অথচ ক্লান্ত কণ্ঠে সে বলল,
“তোর এই গম্ভীর মুখের কারণ বুঝি রাত্রি । কিন্তু একটা কথা বল তো… রাত্রি কি নিভানের সঙ্গে ভালো থাকবে না? ভাই বলে ওর পক্ষ নিচ্ছি না। তুই তো ছোটবেলা থেকে নিভানকে দেখে আসছিস। ও কেমন ছেলে, সেটা তো তোর অজানা না। তোর কি সত্যিই কোনো আপত্তি আছে ওদের সম্পর্ক নিয়ে?”
রুদ্র কোনো উত্তর দিল না। গম্ভীর মুখে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছে, ভেতরে ভেতরে গভীর কোনো যুদ্ধ চলছে তার। নীরবতা ভাঙল ইউভি।
“তুই চুপ করে থাকলেও রাত্রি নিভানেরই হবে, আর না থাকলেও হবে।”
ত্রিয়াশ আবার শান্ত গলায় ডাকল,
“রুদ্র?”
ধীরে মাথা তুলল রুদ্র। চোখ দুটো লালচে, ক্লান্ত। কিন্তু সেই ক্লান্তির মাঝেও ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড ত্রিয়াশের দিকে তাকিয়ে থেকে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর সোফার পেছনে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল কিছুক্ষণ।
পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে রাত্রি নিঃশ্বাস বন্ধ করে আছে। তার মনে হচ্ছে, এই কয়েকটা মুহূর্তই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তের সময়।
অবশেষে রুদ্র শান্ত গলায় বলল,
“আমি কি একবারও বলেছি আমি মানছি না?”
সবাই খানিকটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
রুদ্র এবার সোজা হয়ে বসল। ধীরে বলল,
“নিভানকে আমি ছোট থেকে চিনি। ও খারাপ ছেলে না। বরং রাত্রিকে ভালো রাখার জন্য যা যা দরকার… ও সব করবে। সেটা আমি জানি।”
ত্রিয়াশ ভ্রু তুলে তাকাল।
“তাহলে সমস্যা কোথায়?”
রুদ্র চোখ বন্ধ করল আবার। গলায় এবার কষ্ট স্পষ্ট।
“সমস্যা অন্য জায়গায়, ভাই। ত্রিয়াশ আইলিন আর ত্রিয়াকে নিয়ে চলে যাবে। রাত্রিও একদিন চলে যাবে। তারপর আমি কীভাবে থাকব? আমাকে কে ‘ভাইয়া’ বলে ডাকবে? কে ‘বাবাই’ বলবে? আমি যে ত্রিয়া মামণিটাকে খুব মিস করব…”
কথাগুলো বলতে বলতেই রুদ্রের কণ্ঠনালী ভেঙে এলো।
তার এমন অসহায় কণ্ঠ শুনে সবার চোখ ভিজে উঠল। রানিয়া চৌধুরী মুখ ফিরিয়ে চোখ মুছলেন।
রুদ্র নিজেকে সামলে আবার বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে… এখন কী চাস? ঢাকায় ফিরে রাত্রি আর নিভানের বিয়ের তোড়জোড় শুরু হবে, তাই তো?”
নিভান এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। এবার হঠাৎ তিন কদম এগিয়ে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“ভাইয়া… আমি আজই রাত্রিকে বিয়ে করতে চাই।”
মুহূর্তেই পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
সবাই বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে নিভানের দিকে।
ত্রিয়াশের ঠোঁটে স্মিথ হাসি ফুটল। ভাইটা যে ভালোবাসার মানুষটাকে এক মুহূর্তের জন্যও দূরে রাখতে চায় না, সেটা বুঝতে তার বাকি রইল না।
সে নড়ে বসে ইউভির দিকে তাকাল।
“ইউভি, কাজি ডাক। আজকেই বিয়ে হবে।”
ইউভি একটু ইতস্তত করে বলল,
“কিন্তু মামনি, মামু… ওরা ছাড়া”
ত্রিয়াশ এবার দৃঢ় গলায় থামিয়ে দিল,
“তোকে যা বলেছি, তাই কর।”
ইউভি আর কথা বাড়াল না। শাওনকে ইশারা করতেই সে দ্রুত কাজি আনতে বেরিয়ে গেল।
এদিকে রানিয়া চৌধুরী উঠে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। এত বড় একটা মুহূর্ত, কিছু না রান্না করলে কি চলে? তাঁর পেছন পেছন আইলিনও চলে গেল সাহায্য করতে।
ড্রয়িংরুমে আবার খানিকটা নীরবতা নেমে এলো।
হঠাৎ রুদ্র ত্রিয়াশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“দুটো বোন দিচ্ছি… তার বিনিময়ে কিছু দিবি না?”
ত্রিয়াশ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কি চাস?”
রুদ্র ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
“তোর বোনকে। আমার বোন দিলাম, তোর বোনকে নিব।”
কথাটা শুনে ত্রিয়াশ একেবারে থমকে গেল। অবাক চোখে একবার নিয়তির দিকে তাকাল সে। ছোট্ট বোনটা কবে যে এত বড় হয়ে গেছে, বুঝতেই পারেনি।
বাহুর ব্যথা উপেক্ষা করে ত্রিয়াশ ধীরে বলল,
“ঢাকায় ফিরে এ ব্যাপারে বাবার সঙ্গে কথা হবে। চিন্তা করিস না।”
রুদ্র এবার একটু সামনে ঝুঁকে শান্ত গলায় বলল,
“সংসার করব… ভালোবাসব… তোদের কাছে যেমন আদরে থেকেছে, তার থেকেও বেশি আগলে রাখব। আমার নামে লিখে দিয়ে যা।”
রুদ্রের কথাগুলো শুনে ত্রিয়াশ যেন কিছুক্ষণের জন্য ভাষা হারিয়ে ফেলল। পুরো ড্রয়িংরুম আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু সবার চাপা নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এ কেমন পরিস্থিতি।
——
বিশ মিনিটের মধ্যেই শাওন কাজি সাহেবকে নিয়ে আসে। পুরো পরিবেশটাতে যেন এক অদ্ভুত চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। মওলবি সাহেব মুখ গোমড়া করে সোফায় বসে আছেন, সামনে বিয়ের নানা কাগজপত্র ছড়িয়ে রাখা। পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলে যাবে, কেউ হয়তো ভাবতেও পারেনি।
শেষমেশ ত্রিয়াশ তার বন্ধুর কথা রাখল। সিদ্ধান্ত নিল, আজই নিয়তির বিয়ে রুদ্রের সঙ্গে দেবে। নিয়তি ভয়ে বারবার ত্রিয়াশের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছিল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলছিল,
“ভাইয়া, আমি তোমাদের সাথেই থাকব। আমি বিয়ে করব না।”
ইউভি এই বিয়ের ব্যাপারে আপত্তি করেছিল, কিন্তু ত্রিয়াশ নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিল। অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে সে নিয়তিকে শান্ত করল। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত নিয়তি সব মেনে নিল। অবশ্য রুদ্রকে তার অপছন্দ নয়— সবদিক থেকেই সে যথেষ্ট ভালো। হঠাৎ করেই বিয়ের কথা শুনে মেয়েটা শুধু ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
কারও পোশাক বদলানোরও সুযোগ হয়নি। সবাই যেমন ছিল, তেমনভাবেই বসে রইল। কাজি সাহেব দোয়া-দরুদ পড়ে প্রথমে রাত্রি ও নিভানের বিয়ে পড়ালেন। এরপর সম্পন্ন হলো রুদ্র ও নিয়তির বিয়ে।
বিয়ে শেষ হতেই নিয়তি গিয়ে আইলিনকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। আইলিন স্নেহভরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। কাজি সাহেব তখনও বসে ছিলেন। চারপাশে একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
“আর কারও বিয়ে পড়াতে হবে নাকি?”
সঙ্গে সঙ্গেই ত্রিয়াশ বলে উঠল,
“জি, আমার আর আমার বউয়ের বিয়েটাও আবার পড়িয়ে দিন।”
অগত্যা কাজি সাহেব আবারও বিয়ে পড়ানোর প্রস্তুতি নিলেন। এদিকে শাওন ধীরে ধীরে রিদিশার পাশে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“আপনার যন্ত্রণার কারণ হতে চাই, ঝগড়ার সঙ্গী হতে চাই। বিয়ে করবেন আমায়?”
কথাগুলো শুনে রিদিশার পুরো শরীর যেন কেঁপে উঠল অজানা এক অনুভূতিতে। অন্যদিকে আইলিন আর ত্রিয়াশও নতুন করে আবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলো।
হঠাৎ শাওন গলা পরিষ্কার করে সবার সামনে বলল,
“আমি রিদিশাকে বিয়ে করতে চাই।”
মুহূর্তের মধ্যে সবাই আবারও অবাক হয়ে গেল। আজ যেন একের পর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে তারা। শাওন এগিয়ে গিয়ে রাফসানের সামনে দাঁড়াল।
“আপনি আমার বড় ভাইয়ের মতো। আপনার কাছে রিদিশার হাত চাইছি। আমায় কি সেই দায়িত্বটা দেবেন?”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে রাফসান শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আমার বোনটাকে ভালোবেসে আগলে রাখবে তো?”
শাওনের চোখে তখন ছিল নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি। এরপর তাদের দুজনের বিয়েও সম্পন্ন হলো।
রাত তখন অনেক গভীর। কাজি সাহেব বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। সবাই রাতের খাবার শেষ করে নিজ নিজ ঘরে ফিরে গেছে। অসুস্থ থাকায় ত্রিয়াশ খুব দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়েছে। আর তার পাশেই বসে আছে আইলিন। নিঃশব্দে, একদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে ঘুমন্ত ত্রিয়াশের মুখের দিকে— যেন এই শান্ত মুহূর্তটুকু সে নিজের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য ধরে রাখতে চায়।
~~~~
সকাল আটটা বাজে। ঘরের সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। আজ সকাল নয়টার মধ্যেই সবাই মিলে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে। চারদিকে ব্যস্ততার আমেজ, কিন্তু সেই ব্যস্ততার মাঝেও এক কোণে যেন শান্ত, ভালোবাসায় ভরা একটা ছোট্ট পৃথিবী গড়ে উঠেছে।
ত্রিয়াশের ঘুম ভেঙেছে অনেক আগেই। খাটের হেডবোর্ডে আধশোয়া হয়ে নিশ্চুপ বসে আছে সে। তার বুকজুড়ে আরাম করে শুয়ে আছে ছোট্ট ত্রিয়া। মুখে ফিডার, চোখেমুখে প্রশান্তি। একটু আগেই আইলিন ফিডারটা হাতে ধরিয়ে দিয়েছে।
ত্রিয়া একবার ফিডারে দুধ খাচ্ছে, আবার পরক্ষণেই পাপার গালে টুপটাপ চুমু খাচ্ছে। তার ছোট্ট ঠোঁটে লেগে থাকা দুধ ত্রিয়াশের গাল আর মুখে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাতে ত্রিয়াশের বিন্দুমাত্র বিরক্তি নেই। বরং সে যেন এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো বুকভরে উপভোগ করছে।
আইলিন নীরবে খাবার এনে পাশে বসলো। রুটির টুকরো ছিঁড়ে আলতো করে ত্রিয়াশের মুখের সামনে ধরতেই ত্রিয়াশ মৃদু হেসে খাবার মুখে নিল।
কিন্তু ত্রিয়া খাওয়ার মাঝেও বারবার পাপাকে চুমু খেয়ে চলেছে। সেটা দেখে আইলিন হালকা ধমকের সুরে বলল,
“ত্রিয়া, খাওয়ার মাঝে এমন করতে হয় না। তুমি সরো, পাপা ব্যথা পাবে।”
কথাটা শুনেই ত্রিয়াশ ত্রিয়াকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে নিল। তারপর গম্ভীর অথচ আদুরে কণ্ঠে বলল,
“আমার মেয়েকে ধমকাবে না। খাবার সরাও, আর খাবো না।”
আইলিন আর কিছু বলল না। চুপচাপ খাবার নিয়ে সরে গেল।
ত্রিয়া তখন মুখ থেকে ফিডারটা বের করে ছোট্ট গলায় ডাক দিল,
“পাপা…”
ত্রিয়াশ সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল,
“হু…”
ত্রিয়া কাটা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে মায়াভরা গলায় বলল,
“ব্যাথা…”
“হু…”
তারপর ছোট্ট মেয়েটা আলতো করে ত্রিয়াশের কাটা স্থানে একটা চুমু দিল। যেন নিজের ছোট্ট ভালোবাসা দিয়ে সব ব্যথা দূর করে দিতে চায়। এরপর মুখ তুলে নিজের নরম ছোট ছোট হাত দিয়ে ত্রিয়াশের পুরো মুখটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল। হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল সে।
“আমার পাপা সুন্দর।”
ত্রিয়াশ মুগ্ধ হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কপালে চুমু খেয়ে নরম স্বরে বলল,
“আমার আম্মাজান তো রাজকন্যা… আমার ছোট্ট প্রিন্সেস।”
পরপর তিনটা গাড়ি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। আজ তারা কক্সবাজার থেকে ফিরছে—দীর্ঘ, ক্লান্তিকর একটা দিনের শেষে। এত কিছু ঘটে গেছে, অথচ বাড়ির কেউ এখনো কিছুই জানে না। তাদের ফিরতে ফিরতে হয়তো গভীর রাত হয়ে যাবে।
গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে ত্রিয়াশ। তার বুকের সঙ্গে আলতো করে লেপ্টে আছে ত্রিয়া। মেয়েটা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। চারপাশে এক ধরনের নীরবতা, শুধু গাড়ির চলার শব্দ আর মাঝেমধ্যে বাতাসের চাপা শোঁ শোঁ আওয়াজ।
আইলিন একটু অস্থির ভঙ্গিতে নড়েচড়ে বসে মিনমিন করে বলল,
“শুনছেন…?”
ত্রিয়াশ চোখ না খুলেই জবাব দিল,
“হু…”
“খারাপ লাগলে ত্রিয়াকে আমার কাছে দেন।”
ত্রিয়াশ একবার নিচের দিকে তাকিয়ে মেয়েটাকে আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“থাক না…”
তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত মায়া। যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা ত্রিয়ার জন্য তার বুকটাই।
আইলিন আর কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইল তাদের দিকে।
হঠাৎ ড্রাইভিং করতে করতেই ইউভি বলে উঠল,
“মামু, মামনি কি ওদের বিয়ে মেনে নিবে?”
গাড়ির ভেতর মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো। তারপর ত্রিয়াশ ধীরে, খুব শান্ত স্বরে বলল,
“কেন নিবে না? প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে তার ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে থাকার।”
তার কথায় যেন একরাশ ভরসা মিশে ছিল।
সামনের সিটে বসে থাকা নিশি উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে উঠল,
“বড় বাবা আর বড় মা আজকে সারপ্রাইজের ওপর সারপ্রাইজ পাবে!”
ইউভি ড্রাইভিংয়ে মন দিয়েই হেসে বলল,
“মামনি তো বলেছে, ঝাঁটা নিয়ে অপেক্ষা করবে!”
তার কথা শুনে সকলে মুখ টিপে হাসছে
~~~
রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে। চারদিকে গভীর নিস্তব্ধতা, যেন পুরো শহর ঘুমে ডুবে আছে। ঠিক সেই সময় এক নাগাড়ে বাড়ির কলিং বেল বেজে উঠতে লাগলো। নিরব রাতের বুক চিরে আসা সেই তীক্ষ্ণ শব্দে পুরো বাড়ি যেন কেঁপে উঠলো।
মাত্রই রান্নাঘরে ঢুকেছিলেন মুনিরা বেগম। ইদানীং কোমরের ব্যথাটা অনেক বেড়েছে। তাই ব্যথায় একটু সেঁক দেবেন বলে গরম পানি বসিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ এমন অবিরাম কলিং বেলের শব্দে তাঁর বুক ধক করে উঠলো। এত রাতে কে আসতে পারে?
শব্দ শুনে ঘুম জড়ানো চোখে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন নাহিদ মির্জা আর তিশা বেগমও। চারপাশে অদ্ভুত এক অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়েছে। নাহিদ মির্জা ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজার হাতলে হাত রাখতেই তাঁর বুকের ভেতরটা অকারণে কেঁপে উঠলো।
দরজা খুলতেই তিনি যেন পাথর হয়ে গেলেন।
চোখ বড় বড় করে সামনে তাকিয়ে রইলেন। যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে আইলিন— কোলে ছোট্ট ত্রিয়াকে নিয়ে। আর তার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে ত্রিয়াশ। মুখভর্তি সেই চিরচেনা, প্রশান্ত এক হাসি— যেন পৃথিবীর সব যুদ্ধ জিতে ফিরে এসেছে।
নাহিদ মির্জা কয়েকবার চোখ কচলালেন। তবুও দৃশ্যটা বদলালো না। কখনও কখনও মানুষ নিজের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কিছু পেয়ে গেলে কয়েক মুহূর্তের জন্য বোবা হয়ে যায়। নাহিদ মির্জার অবস্থাও ঠিক তেমন।
ত্রিয়াশ মৃদু হেসে বললো,
“ভেতরে ঢুকতে দিবে না?”
কথাটা শুনে যেন নাহিদ মির্জার হুঁশ ফিরলো। তিনি দ্রুত সরে দাঁড়ালেন। তারপর একে একে সবাই ড্রয়িংরুমে এসে জড়ো হতে লাগলো। পুরো ঘর ভরে গেল বিস্মিত, অবিশ্বাসী মুখে। কেউ যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।
ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে এলো আইরা। আইলিনকে দেখামাত্র আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। দৌড়ে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে। এতদিনের জমে থাকা শূন্যতা যেন এক মুহূর্তেই কান্না হয়ে বেরিয়ে এলো।
আইরার হঠাৎ জড়িয়ে ধরায় ঘুম ভেঙে গেল ছোট্ট ত্রিয়ার। আপাতত সে রুদ্রের কোলে। আধো ঘুমে বিস্মিত চোখে চারপাশে তাকাতে লাগলো। এই বাড়ির কাউকেই সে চিনতে পারছে না। অচেনা এতগুলো মুখ তার কৌতূহলী চোখে ভেসে উঠছে একের পর এক।
অনেকদিন পর যেন মির্জা বাড়িটা আবার হেসে উঠেছে। চারদিকে এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়লো। নিঃশব্দ দেয়ালগুলোও যেন আজ আনন্দে ভরে উঠেছে।
তবে সবার আনন্দের মাঝেও এক কোণে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন তিশা বেগম।
আইলিনকে দেখেও তিনি এগিয়ে এলেন না। বুকভরা অভিমান তাকে আটকে রেখেছে। চোখে হাজারো অনুভূতি জমে থাকলেও মুখে কোনো কথা নেই। শুধু দূর থেকে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলেন— যেন নিজের ভেতরের ঝড় কাউকে বুঝতে দিতে চান না।
চলবে,,,,,
[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। দয়া করে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। ]