ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ চৈত্রের মৃদু ছোঁয়া

৫২তম পর্ব

লেখক: আফরিনা আক্তার সুইটি

গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া

লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি

পর্বঃ ৫২

🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫

তামিলনাড়ু ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী, ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর রাজ্য, যা ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি বড় অংশ।মেরিনা বিচ হলো ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের চেন্নাই শহরের একটি বিখ্যাত সমুদ্র সৈকত। এটি বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ শহুরে সৈকত হিসেবে পরিচিত এবং স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও খুব জনপ্রিয়। মেরিনা বিচ বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত। প্রায় ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতটি চেন্নাই শহরের পূর্ব পাশে বিস্তৃত। সকালে ও সন্ধ্যায় এখানে মানুষের ভিড় থাকে—হাঁটা, খেলাধুলা এবং সমুদ্রের বাতাস উপভোগ করার জন্য। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য খুবই মনোমুগ্ধকর সমুদ্রের হালকা বাতাস ও ঢেউয়ের শব্দ মন ভালো করে দেয়।

মেরিনা বিচের ফাইভ-স্টার লাক্সারি এক্সপেরিয়েন্স হোটেল উঠেছে ত্রিয়াশ। কাল রাতে সরাসরি ঢাকা থেকে চেন্নাই এসে পৌঁছেছে দুই থেকে আড়াই ঘন্টার মধ্যে। কাল রাতে আইলিন মরার মতো ঘুমালেও ত্রিয়াশের দু চোখের পাতায় ঘুম ছিল না। তা-ই তো এখন প্রিয়তমার বুকে মাথা দিয়ে নিশ্চিতে ঘুমাচ্ছে। মনে হচ্ছে কতকাল ঘুমায়নি আজ শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। ত্রিয়াশের চুলের ভাজে বিলি কাটতে কাটতে আইলিনও ঘুমিয়ে পড়ে।

কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল, তা ত্রিয়াশের ঠিক মনে নেই। গভীর ঘুমের ভার যেন এখনও তার শরীরের প্রতিটি কোষে লেগে আছে। হঠাৎ মোবাইলের দিকে হাত বাড়িয়ে সময় দেখে সে চমকে উঠল—বিকেল তিনটা বেজে গেছে। সকাল থেকে ঘুমিয়ে ছিল, এতটা সময় কেটে গেছে সে টেরই পায়নি।

চোখ কচলাতে কচলাতে পাশ ফিরে তাকাতেই তার দৃষ্টি থেমে গেল। আইলিন তার বুকের ওপর গুটিসুটি মেরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শান্ত মুখটা অদ্ভুত এক মায়ায় ভেসে উঠেছে। তার এলোমেলো চুলগুলো মুখের উপর ছড়িয়ে আছে। ত্রিয়াশ হাত বাড়িয়ে সেই চুলগুলো যত্ন করে কানের পেছনে গুজে দিল, যেন ঘুম ভেঙে না যায়—একটা অদ্ভুত মায়া কাজ করছে তার ভেতর।

এরপর সে খুব আস্তে করে পাশে রাখা মোবাইলটা নিয়ে কাউকে ফোন দিল। কণ্ঠটা নিচু, সংযত, কিন্তু স্পষ্ট নির্দেশে ভরা।

“কাজটা কমপ্লিট হয়েছে তো?”

ওপাশের উত্তর শুনে সে সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নাড়িয়ে ফোন রেখে দিল। কথা শেষ করে কোনো শব্দ না করে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। কিছু সময়ের মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো, গায়ে একটা পরিপাটি গাম্ভীর্য।

ততক্ষণে আইলিন ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে। চোখ এখনো ঘুমে ভারী, চুল এলোমেলো, চারপাশে তাকিয়ে সে যেন কিছুটা বিভ্রান্ত। ত্রিয়াশ তাকে আলতো করে ঠেলে ওয়াশরুমে পাঠিয়ে দিল।

এর মাঝেই রুমে খাবার চলে এসেছে। আইলিন ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতেই দু’জন চুপচাপ একসাথে বসে খাবার খেতে শুরু করল।

খাবারের খাওয়ার মাঝেই ত্রিয়াশ আবার ফোনে ত্রিয়ার সঙ্গে কথা বলে নিল।

খাওয়া শেষ হওয়ার পর সে বিছানার ওপর রাখা একটি প্যাকেটের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ থেমে আইলিনের দিকে একবার তাকিয়ে নিল। তারপর বাইরে যাওয়ার আগে শান্ত গলায় বলল,

“বিছানায় একটা প্যাকেট রাখা আছে। রেডি হয়ে আসো, আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।”

আইলিন কিছু বলার আগেই ত্রিয়াশ আর এক মুহূর্তও দেরি না করে হোটেল রুমের বাইরে বেরিয়ে গেল।

আইলিন বিছানার উপর রাখা প্যাকেটটা খুলতেই চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ভেতরে সাজানো ছিল কয়েকটা অপূর্ব জর্জেট সিকুয়েন্সের শাড়ি। প্রতিটা শাড়ির রঙ এতটাই সুন্দর যে কোনটা পরে যাবে, সেটাই বুঝে উঠতে পারছিল না সে। এই মুহূর্তে ত্রিয়াশ পাশে থাকলে হয়তো সহজেই বলে দিত কোনটা তাকে সবচেয়ে বেশি মানাবে। নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বে যখন সে ডুবে আছে, ঠিক তখনই মোবাইলের মেসেজ টোন বেজে উঠল।

তাড়াতাড়ি ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল, ত্রিয়াশ মেসেজ করেছে,

“ভেবে পাচ্ছো না কোনটা পরবে? শোনো বউ, লাল শাড়িটাই পরে আসো।”

মেসেজটা পড়তেই আইলিনের ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে দ্রুত রেডি হতে চলে গেল। আজ চুলগুলো খোলা রেখেছে সে। সিল্কি কালো চুল কোমর ছুঁয়ে দুলছে হালকা বাতাসে। নিজেকে পরিপাটি করে আস্তে করে রুম থেকে বের হতেই দেখল, একটু সামনেই ত্রিয়াশ দাঁড়িয়ে আছে। তার নেশা ভরা দৃষ্টি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আইলিনের দিকে।

ওই চাহনিতে আইলিনের গাল লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। ত্রিয়াশ এগিয়ে এসে তার হাতটা ধরল, তারপর পাশে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। আজ ত্রিয়াশের পরনে সাদা পাতলা শার্ট আর শর্ট প্যান্ট, একদম সাধারণ সাজেও তাকে অসম্ভব আকর্ষণীয় লাগছে। আইলিন বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছিল তার দিকে। বিষয়টা ত্রিয়াশের চোখ এড়াল না। ঠোঁট কামড়ে মুচকি হেসে সে পেছন থেকে আইলিনের কাঁধে হাত রেখে নিজের বুকের সাথে আলতো করে মিশিয়ে নিল।

তারপর কানের কাছে মুখ এনে আস্তে করে বলল,

“এভাবে চো'রের মতো কেন দেখছো? আমি তো পুরোপুরি তোমার। সামনে বসে মন ভরে দেখো… আর আমাকেও তোমায় দেখতে দিও।”

ত্রিয়াশের কথায় আইলিন লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। তার হৃদস্পন্দন যেন অকারণেই দ্রুত হয়ে চলছে।

কিছু দূর এগোতেই হঠাৎ করেই ত্রিয়াশ পকেট থেকে একটি লাল রঙের নরম কাপড় বের করে আলতো হাতে আইলিনের দু’চোখ বেঁধে দিল। আচমকা এমন কাণ্ডে আইলিন চমকে উঠে দু’হাত দিয়ে চোখ ছুঁয়ে মৃদু স্বরে বলল,

“কি করছেন?”

ত্রিয়াশ তার ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে শান্ত গলায় বলল,

“হুশ… একদম কথা বলবে না। আমি যতক্ষণ না বলছি, ততক্ষণ এই বাঁধন খোলা যাবে না। শুধু আমার হাতটা ধরে এগিয়ে চলো।”

ত্রিয়াশের কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা, যেন সে আইলিনকে কোনো স্বপ্নের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আইলিন আর কোনো প্রশ্ন করল না। নিঃশব্দে নিজের হাতটা ত্রিয়াশের হাতে রেখে ধীরে ধীরে তার সাথে হাঁটতে লাগল।

চারপাশে কেবল হালকা বাতাসের শব্দ,দূরের সমুদ্রের ঢেউ আর তাদের নীরব পদচারণা—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন অবাস্তব সুন্দর লাগছিল। চোখ বাঁধা থাকায় আইলিন বুঝতেই পারছিল না তারা কোথায় যাচ্ছে। তবে ত্রিয়াশের হাতের দৃঢ় স্পর্শ তাকে অদ্ভুত এক নিরাপত্তা দিচ্ছিল।

কিছুদূর এগোতেই আচমকা ত্রিয়াশ আইলিনকে কোলে তুলে নিল। অপ্রস্তুত হয়ে আইলিন ভয়ে হালকা চিৎকার করে উঠলেও পরমুহূর্তেই দু’হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ত্রিয়াশের গলা। তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন আরও দ্রুত হতে লাগল।

ত্রিয়াশের বুকে মুখ লুকিয়ে আইলিন অনুভব করছিল তার উষ্ণ নিঃশ্বাস। বাতাসে ভেসে আসছিল ত্রিয়াশের পারফিউমের মিষ্টি ঘ্রাণ। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত নিরাপত্তা যেন এই মানুষটার বুকেই লুকিয়ে আছে।

প্রায় পাঁচ মিনিট পর ত্রিয়াশ খুব যত্ন করে আইলিনকে নিচে নামিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। আইলিন এখনো চোখ বাঁধা অবস্থাতেই নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার কৌতূহল ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা কাজ করছে—ত্রিয়াশ তাকে কোথায় এনেছে? কেন এমন রহস্য করছে?

ঠিক তখনই হঠাৎ করে তার কানে ভেসে এলো গিটারের মিষ্টি সুর। হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এক সুর…

আইলিনের নিঃশ্বাস যেন থমকে গেল। সে ভীষণ ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও চোখের বাঁধন খুলল না। কারণ ত্রিয়াশ নিষেধ করেছে। আর ত্রিয়াশের প্রতি তার বিশ্বাসটা ছিল নিঃশর্ত।

কিছুক্ষণ পর গিটারের সুরের সঙ্গে মিলিয়ে ভেসে এলো ত্রিয়াশের গভীর, মায়াভরা কণ্ঠের গান…

হয়ে আয় বন্ধুজন, হয়ে আয় না অবাধ্য মন

বেসেছি তোকেই ভালো

হয়ে যা জলপরি, আমি হব তোরই পালক

বেসেছি তোকেই ভালো

আজ হোক দিনটা তোর, আজ হোক দিন আমার

চল এভাবে বর্তে যাই বারেবার

হয়ে আয় বন্ধুজন, হয়ে আয় না অবাধ্য মন

বেসেছি তোকেই ভালো

হয়ে যা জলপরি, আমি হব তোরই পালক

বেসেছি তোকেই ভালো...

আর কৌতূহল দমাতে না পেরে আইলিন নিজের চোখের বাঁধন খুলে ফেলল।

সামনে তাকাতেই সে যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। বিস্ময়ে তার চোখ দু’টো বড় হয়ে উঠল।

তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিয়াশ—হাতে গিটার, ঠোঁটে সেই চেনা মায়াবী হাসি। তার পাশেই লাল গোলাপ দিয়ে সুন্দর করে তৈরি করা হয়েছে একটি লাভ শেপ, যেখানে ইংরেজি অক্ষরে লেখা—

“I Love You Bou”

চারপাশ জুড়ে লাল বেলুন আর তাজা ফুলের অপূর্ব সাজসজ্জা। অস্তগামী সূর্যের সোনালি আভা পুরো পরিবেশটাকে আরও বেশি স্বপ্নময় আর মনোমুগ্ধকর করে তুলেছে। যেন বাস্তব নয়, কোনো রোমান্টিক গল্পের দৃশ্য।

তাদের দু’জনকে ঘিরে আশেপাশের মানুষও মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কারো ঠোঁটে মুচকি হাসি, কারো চোখে ভালোবাসার প্রশান্তি। সত্যিই, অন্যের ভালোবাসা দেখতেও ভীষণ ভালো লাগে।

হঠাৎই আইলিনকে আরও অবাক করে দিয়ে ত্রিয়াশ একগুচ্ছ লাল গোলাপের বুকেট হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারপর সবার সামনে জোরে চিৎকার করে বলল,

“ আই লাভ ইউ সো মাচ, ইউ আর মাই এভরিথিং, আই’ম সো লাকি টু হ্যাভ ইউ অ্যাজ মাই ওয়াইফ। ”

আইলিন যেন অবাকের পর অবাক হচ্ছে। যে ছেলে ভালোবাসি একবারও বলেনি আজ এতগুলো মানুষের সামনে চিৎকার করে বলছে, সেই খুশিতে আইলিন সপ্তম আসমানে। ত্রিয়াশ তার বাম হাতের অনামিকা আঙুলে একটা ডায়মন্ডের রিং পড়িয়ে দিয়ে সেখানে চুমু খেল। আবারও আইলিনের দিকে তাকিয়ে নরম কন্ঠে বলে,

“ আমার জীবনের শেষ চাওয়াটাও তুমি। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে তোমাকে পাশে চাই—ভালো সময়ের আনন্দ ভাগ করতে আর খারাপ সময়ের ভার হালকা করতে। শেষ বয়স পর্যন্ত শুধু তোমাকেই চাই, আমার আপন ঠিকানা হিসেবে। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তুমি আমার পাশে থাকো এটাই চাই। থাকবে আমার পাশে? আই ফল ইন লাভ উইথ ইউ মোর এভরি ডে।”

আইলিনের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে, এ অশ্রু খুশির আনন্দের ভালোবাসা জয়ের। সে ঝাপিয়ে পড়ে ত্রিয়াশের বুকে টাল সামলাতে না পেরে ত্রিয়াশ বালুর মধ্যে বসে পড়ে। আইলিন তার বুকে মাথা দিয়ে একনাগাড়ে বলেই চলছে,

“ সারাজীবন এভাবেই একসাথে থাকবো। কোথাও যাবো। আপনি আমার শ্বাস প্রশ্বাসে মিশে আছেন। আমিও আপনাকে ভালোবাসি। আই লাভ ইউ। ”

তাদের গভীর ভালোবাসার মুহূর্তটা যেন চারপাশের বাতাসকেও থমকে দিয়েছিল। সেই আবেগঘন দৃশ্য দেখে আশেপাশের মানুষ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না—হঠাৎ করেই জোরে করতালির শব্দে পুরো পরিবেশ মুখরিত হয়ে উঠল।

সেই করতালির শব্দেই যেন আইলিন বাস্তবতায় ফিরে এলো। কয়েক মুহূর্ত আগে সে যে ত্রিয়াশের বুকে হারিয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ সেই অনুভূতিটা লজ্জায় রূপ নিল। সে দ্রুত ত্রিয়াশকে ছেড়ে দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার গালজুড়ে লজ্জার লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে—ঠিক যেন গোলাপের পাপড়ির মতো।

এই লজ্জায় রাঙা বউকে দেখে ত্রিয়াশ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ঠোঁট চেপে মৃদু হাসল সে। আইলিনের এই মিষ্টি লাজুকতা তার হৃদয়টা আরও গভীরভাবে ছুঁয়ে গেল।

এরপর ত্রিয়াশ উঠে দাঁড়াল। পাশের টেবিলে সাজিয়ে রাখা কেকের দিকে এগিয়ে গিয়ে সেগুলো কেটে উপস্থিত সবাইকে পরিবেশন করল। সবাই একে একে তাদের অভিনন্দন জানাতে লাগল। কেউ আনন্দে হাসছে , কারও চোখে মুখে মুগ্ধতা—সবাই যেন এই জুটির ভালোবাসায় ভেসে গেছে।

আস্তে আস্তে ভিড় কমে আসতে লাগল।

এরই মাঝে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে আসল। আকাশের গাঢ় নীল চাদরে সমুদ্র যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। দূরে জোছনার আলো পানির ঢেউয়ে লেগে চিকচিক করছে।

ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সাদা রঙের প্রাইভেট ক্রুজ তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। পুরোটা যেন স্বপ্নের মতো সাজানো

আজকের এই বিশেষ রাত তারা কাটাবে সমুদ্রের বুকের ওপর ভেসে ভেসে। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে থাকবে এই রাত।

ত্রিয়াশ আলতো করে আইলিনের হাত ধরল। কোনো কথা না বলেও সেই স্পর্শে যেন হাজারটা অনুভূতি প্রকাশ পেল। লজ্জা মেশানো হাসি নিয়ে আইলিন তার হাত শক্ত করে ধরল।

তারপর দুজন একসাথে উঠে গেল সেই সাদা ক্রুজে।

একটি বিলাসবহুল ক্রুজ শিপের ভেতরে ঢুকলেই মনে হয় যেন ভাসমান এক ছোট শহরে প্রবেশ করা হয়েছে। চারদিকে আধুনিক ডিজাইনের ছোঁয়া, ঝকঝকে আলো আর সমুদ্রের অপার নীল জল জানালার ওপাশে দোল খাচ্ছে।

ক্রুজের কেবিনগুলো অত্যন্ত আরামদায়ক, যেখানে সাদা চাদরে মোরা নরম বিছানা, সুন্দর সাজানো ইন্টেরিয়র এবং সমুদ্র দেখার জন্য ব্যালকনি আছে। সকালবেলা ঘুম ভাঙলেই চোখের সামনে দেখা যায় বিশাল নীল সমুদ্র, যা মনকে এক অন্যরকম শান্তি দেয়। এমন সুন্দর সুখময় রোমান্টিক পরিবেশে আইলিনের এক অন্যরকম ভালোলাগা শুরু হয়েছে। তার কাছে মনে হচ্ছে রুপকথার কোন এক রাজ্যে চলে এসেছে। এই পুরো ক্রুজ ত্রিয়াশ নিজে বুক করেছে এতে তার কোটি টাকা গেলেও কিছু যায় আসে না কারণ প্রিয় মানুষের জন্য সব করতে রাজি।

কেবিনে ঢুকেই আইলিন যেন মুহূর্তেই থমকে গেল। তার চোখের সামনে এক অপূর্ব দৃশ্য—সাদা চাদরে মোড়া বেড, তার ওপর ছড়িয়ে আছে হাজারো লাল-সাদা গোলাপের পাপড়ি। পুরো ঘরটা যেন ভালোবাসার কোনো স্বপ্নিল জগৎ।

বেডের মাঝখানে সুন্দর করে তৈরি করা একটি লাভ শেপ, তার ঠিক মাঝখানে লেখা T + A । চারপাশে জ্বলছে নরম ক্যান্ডেল লাইট, আর ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে পুরো কেবিনটা ভরে উঠেছে। পরিবেশটা এতটাই রোমান্টিক যে মনে হচ্ছে, এটা কোনো সাধারণ রাত নয়—তাদের জীবনের সবচেয়ে বিশেষ কোনো অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।

আইলিনের গাল হালকা লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। সে আড়চোখে একবার ত্রিয়াশের দিকে তাকাল। ত্রিয়াশ তখন নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে এক অদ্ভুত গভীরতা—যেন সে এই মুহূর্তটাকে মনে মনে ধরে রাখতে চাইছে চিরদিনের জন্য।

আইলিনের বুকের ভেতর অজানা অনুভূতি ধুকপুক করে উঠল। নিঃশ্বাস একটু ভারী লাগছে, আর হৃদয়ের ধ্বনি যেন কানে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও ভেতরের অস্থিরতা ধরা দিচ্ছিল সহজেই। ত্রিয়াশ তার কাছে এগিয়ে এসে নিজের ঠান্ডা হাত আইলিনের শাড়ি ভেদ করে উম্মুক্ত পেটে রাখল। ঠান্ডা হাতের স্পর্শে আইলিন কেঁপে উঠলো।

আইলিন এক পলক তাকাতেই চোখ নামিয়ে ফেলল, লজ্জায় তার ঠোঁট কেঁপে উঠল হালকা করে। আর ত্রিয়াশ দাঁড়িয়ে রইল ঠিক তার পেছনে।

প্রাণ ভড়ে প্রিয়তমার চুলের ঘ্রাণ নিল।

আস্তে আস্তে করে আইলিনের ঘাড় থেকে চুল সরিয়ে গভীর চুমু একে দিল। আইলিন কেঁপে উঠে ত্রিয়াশের হাত খামছে ধরে। আইলিনকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে তার অধর জোরা নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। ত্রিয়াশ যেন উন্মাদ হয়ে গেছে।

আইলিনকে পাজা কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুয়ে দিয়ে নিজেও তার ওপর ভড় ছেড়ে দেয়। শাড়ির আঁচল সরিয়ে মুখ গুঁজে দিল। আইলিন কেঁপে উঠে তার বুক ধরফরিয়ে উঠছে। নিজের অনুভূতিরা এলোমেলো ভাবে ছুয়ে যাচ্ছে।

আইলিনের কানের লতিতে গভীর ভালোবাসার স্পর্শ দিল। ত্রিয়াশের ভেজা ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে আইলিনের নিজেকে এলোমেলো লাগছে, কেমন অস্থির লাগছে। ত্রিয়াশ ফিসফিস করে বলে,

”আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনি ডিসট্যান্স বিটুইন আস। আই নিড ইউ ক্লোজ টু মাই হার্ট রাইট নাউ। ”

বলেই ত্রিয়াশ পাগলের মতো চুমু একে দিচ্ছে। আইলিনের ঠোঁটের উপর নিজের ঠোঁট রেখে গভীর কন্ঠে বলে,

”আই লাভ ইউ মোর দ্যান ওয়ার্ডস ক্যান সে”

ত্রিয়াশ আজ যেন নিজের সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিতে ব্যস্ত। তার প্রতিটি স্পর্শে, প্রতিটি নিশ্বাসে মিশে আছে গভীর মায়া আর না বলা হাজারো অনুভূতি। আইলিনও আজ নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দিয়েছে তার ভালোবাসার মানুষটার কাছে। তাদের মাঝখানে আজ কোনো দূরত্ব নেই, কোনো সংকোচ নেই—আছে শুধু একরাশ নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর একে অপরকে হারিয়ে ফেলার ভয়।

কেবিনের স্নিগ্ধ আলোয় দুজনকে যেন স্বপ্নের কোনো জগৎ থেকে উঠে আসা যুগল মনে হচ্ছে। বাইরে উত্তাল সমুদ্র নিজের ছন্দে বয়ে চলেছে, আর ভেতরে দুটো হৃদয় ধীরে ধীরে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে একে অপরের সাথে। ত্রিয়াশ আলতো করে আইলিনকে নিজের সাথে মিশে নেয়। তার উষ্ণ স্পর্শে আইলিন কেঁপে ওঠে, লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলে।

ত্রিয়াশ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার প্রিয় মানুষটার দিকে। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তটাকে সে সারাজীবনের জন্য নিজের হৃদয়ে বন্দি করে রাখতে চায়। আইলিনের কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে ভালোবাসার কথা বলে যায় সে। সেই কথাগুলো শুনে আইলিনের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে মিষ্টি হাসি।

তাদের এমন গভীর ভালোবাসা দেখে যেন চাঁদও লজ্জা পেয়ে যায়। ধীরে ধীরে সাদা মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে ফেলে সে। চারপাশে শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ আর দুজন মানুষের গভীর ভালোবাসার প্রতিধ্বনি। রাত যত গভীর হতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে তাদের অনুভূতির গভীরতা। দুজন কপোত-কপোতী যেন নিজেদের আলাদা কোনো পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছে, যেখানে ভালোবাসা ছাড়া আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।

ক্রুজটি সমুদ্রের বুক চিরে আস্তে করে এগিয়ে চলেছে নিজের ছন্দে। দূরে কালো আকাশের নিচে অসংখ্য তারার মেলা, আর সেই তারাভরা রাতের নিচে দুটো মানুষ একে অপরের হৃদয়ে আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। সময় যেন থমকে গেছে তাদের জন্য। পৃথিবীর সব শব্দ, সব ব্যস্ততা থেকে দূরে তারা হারিয়ে গেছে এক গভীর, পবিত্র আর মায়াবী ভালোবাসার ছন্দে।

চলবে,,,,,

[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। দয়া করে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন