গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ৫৩
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
সকাল সাড়ে আটটা বাজে, ক্রুজ থেকে তারা কিছুক্ষণ আগেই হোটেলে এসে পৌঁছেছে। ত্রিয়াশ মাত্র ফ্রেশ হয়ে বের হলো। আইলিনের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। তাকে আজ অন্য রকম সুন্দর লাগছে। হলুদ রঙের জর্জেট সিকুয়েন্স শাড়িতে বেশ সুন্দর লাগছে। আইলিন ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে ভেজা চুল মুছতে ব্যস্ত । ত্রিয়াশ এক পা দুই পা করে এগিয়ে এসে আইলিনের হাত থেকে টাওয়াল নিয়ে নিজেই মুছে দিল সাথে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুলগুলো শুকিয়ে দিল। এই যত্নে এই ভালোবাসায় আইলিন বরাবরই মুগ্ধ। ত্রিয়াশ হলুদ সাদা চেক চেক শার্ট পড়লো আইলিনের সাথে কিছুটা মিল রেখে। চুল সেট করতে করতে বলে,
“ সবকিছু ঘুছিয়ে নিয়েছো? এখন আমরা বের হবো।”
আইলিন কিছু বললো না শুধু মাথা নাড়ালো। কাল রাতের কথা মনে হতেই সে বারংবার লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। এ-র মধ্যে ত্রিয়ার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলে নিল তারা দুজনেই। মেয়েটা রুদ্র আর ইউভির সাথে পুরো ঢাকা শহর ঘুরতে ব্যস্ত। আবার ফোনের ওপাশ থেকে কি সুন্দর করে বলল,
“ উফফ পাপা আমাকে নিয়ে ভেবো না। তুমি মাম্মাম কে ভালোবেসে দাও। ”
মেয়ের কথা শুনে ত্রিয়াশ শুধু হেসেছে। কথা বলার মাঝে তারা খেয়ে নিয়েছে। এখন তারা কেরাল যাবে। আগে থেকেই ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মেরিনা বিচ থেকে কেরাল পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাদের তিন চার ঘন্টা লেগেছে। কেরালা এমন একটি অসাধারণ রাজ্য, যেখানে প্রকৃতি যেন নিজের সমস্ত সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে। এখানে একদিকে উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি, অন্যদিকে শান্ত নদী ও বিস্তৃত ব্যাকওয়াটারের জাল—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক স্বপ্নের মতো পরিবেশ। সবুজে ঘেরা চা-বাগানের ঢেউ খেলানো পাহাড়, নারকেল গাছের সারি, আর দূরে নীল সমুদ্রের বিশালতা—সবকিছু মিলে কেরালাকে এক অনন্য রূপ দিয়েছে।
সকালবেলায় কুয়াশার চাদরে মোড়া পাহাড়, দুপুরে নদীর শান্ত জলধারা, আর বিকেলে সমুদ্রের তীরে সূর্যাস্তের লাল আভা—এই দৃশ্যগুলো যেন প্রতিটি মুহূর্তকে আরও বেশি জীবন্ত করে তোলে। এখানকার বাতাসে আছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যা মনকে শান্ত করে তোলে।
কেরালার গ্র্যান্ড ক্লিফ রিসোর্টে কিছুক্ষণ আগে চলে এসেছে। গ্র্যান্ড ক্লিফ রিসোর্ট, কেরালার মুন্নার পাহাড়ি অঞ্চলের একটি অত্যন্ত বিলাসবহুল রিসোর্ট, যা তার মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শান্ত পরিবেশের জন্য বিখ্যাত।
এটি পাহাড়ের ঢালে এমনভাবে তৈরি, যেন চারপাশে শুধু সবুজ চা-বাগান, কুয়াশায় ঢাকা পাহাড় আর নীল আকাশের মিশেল দেখা যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠলে জানালা খুললেই চোখে পড়ে মেঘের ভেতর হারিয়ে যাওয়া পাহাড়—যেটা সত্যিই স্বপ্নের মতো অনুভূতি দেয়।
রিসোর্টটির ইনফিনিটি পুল থেকে পুরো উপত্যকার দৃশ্য দেখা যায়, যা সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের সময় আরও বেশি মনোরম হয়ে ওঠে। রুমগুলো আধুনিক ও আরামদায়ক, অনেক রুমেই প্রাইভেট ব্যালকনি আছে, যেখান থেকে সরাসরি প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
রিসোর্টে এসে এক মুহূর্তও রেস্ট নেওয়ার কথা মাথায় আনলো না । ঘুরতে এসে যদি বিছানায় শুয়েই সময় কাটাতে হয়, তাহলে আর ভ্রমণের আসল আনন্দটাই বা কোথায়? সেই ভাবনাই যেন দু’জনকে আরও বেশি উচ্ছ্বসিত করে তুলল।
খাওয়া-দাওয়া সেরে দেরি না করে তারা বেরিয়ে পড়ল ভিরিপারা জলপ্রপাতের উদ্দেশ্যে। পথের প্রতিটি বাঁক, সবুজের ছায়া, আর দূর থেকে ভেসে আসা পাহাড়ি বাতাস—সবকিছুই যেন তাদের ভ্রমণের আনন্দকে আরও গভীর করে তুলছিল।
আইলিনের চোখে তখন অন্যরকম এক ঝিলিক। প্রকৃতি তার সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আপন জগত। সবুজ পাহাড়, ঝর্ণার কলতান, আর মুক্ত আকাশ—এসবের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতেই সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তাই জলপ্রপাতের নাম শুনেই তার ভেতরে যেন আলাদা এক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
ভিরিপাড়া জলপ্রপাত হলো মুন্নারের একেবারে অরণ্যঘেরা, শান্ত আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত। রিসোর্ট থেকে খুব কাছেই এই জলপ্রপাতের অবস্থান। রিসোর্ট থেকে কিছুক্ষণ গাড়ি চালিয়ে গেলেই চারপাশে ঘন সবুজ বন, চা বাগান আর পাহাড়ি পথের ভেতর দিয়ে হঠাৎ করেই শোনা যায় পানির গর্জন—যেন প্রকৃতি নিজেই গান গাইছে।
ঝর্ণার পানি পাথরের উপর দিয়ে ধাপে ধাপে নেমে আসে, তৈরি করে ছোট ছোট জলধারা আর প্রাকৃতিক পুল। বর্ষাকালে এর রূপ আরও তীব্র ও জীবন্ত হয়ে ওঠে—পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে পানি ছড়িয়ে পড়ে সাদা ফেনার মতো, আর চারপাশটা ভিজে যায় ঠান্ডা কুয়াশার মতো পরিবেশে।
ত্রিয়াশ আপনমনে গাড়ি চালাচ্ছিল। জানালার বাইরে পাহাড়ি পথের নীরব সৌন্দর্য ভেসে আসছে তার চোখে, কিন্তু মনটা যেন কোথাও থেমে আছে—আইলিনকে ঘিরেই তার ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। পাশে বসে আইলিন তখন ব্যস্ত পৃথার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে। ফোনের ওপাশ থেকে পৃথার দুষ্টু দুষ্টু কথায় বারবার লজ্জায় লাল হয়ে উঠছিল আইলিন। কখনো হাসি চাপা দিচ্ছে, কখনো আবার চোখ কুঁচকে বলছে,“থাম তো!” কিন্তু পৃথা থামার পাত্রী নয়, আরও বেশি করে মজা করছে।
এভাবেই হাসি-ঠাট্টা, দুষ্টুমির ভেতর দিয়ে তারা পৌঁছে যায় গন্তব্যে। গাড়ি থামতেই ত্রিয়াশ পার্কিং করে নীরবে নেমে পড়ে, আর আইলিনও ফোন রেখে চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। মুহূর্তেই তাদের সামনে খুলে যায় এক অপূর্ব দৃশ্য—পাহাড়ের গা বেয়ে ঝর্ণার জল নেমে আসছে অবিরাম, সাদা ফেনার মতো ছড়িয়ে পড়ছে পাথরের গায়ে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য যেন এক অদ্ভুত শান্তি এনে দেয় চারপাশে।
আইলিন আর দেরি না করে এগিয়ে যায় পানির কাছে। পাথরের উপর বসে সে পা ডুবিয়ে দেয় ঠান্ডা স্রোতের ভেতর। শাড়ির নিচের অংশ একটু একটু করে ভিজে যেতে থাকে, তবুও তার কোনো খেয়াল নেই। চোখে তার একরাশ মুগ্ধতা—সে যেন হারিয়ে গেছে ঝর্ণার শব্দে, পানির ছন্দে, আর পাহাড়ের নিরবতায়।
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ত্রিয়াশ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। বুকে হাত গুঁজে, গভীর দৃষ্টিতে সে শুধু দেখছে তার প্রিয় মানুষটিকে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার সেই চাহনি যেন শব্দহীন এক ভালোবাসার ভাষা বলে দিচ্ছে। হঠাৎ ত্রিয়াশকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আইলিন ভ্রু উঁচু করে ইশারায় জিজ্ঞেস করে—“কি হয়েছে?”
ত্রিয়াশ হালকা মাথা নাড়িয়ে বোঝায়—“কিছু না।”
আইলিন তখন দুষ্টুমি চাপতে না পেরে হাতের পানি তুলে ত্রিয়াশের মুখে ছিটে মারে। মুহূর্তেই খিলখিল করে হেসে ওঠে সে, যেন পুরো পাহাড় তার হাসিতে জেগে উঠল। ত্রিয়াশও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে-ও মুঠো করে পানি তুলে আইলিনের দিকে ছুড়ে মারে। প্রিয়সীর দুষ্টুমি নিজেও শায় জানায়।
পাথরের উপর শান্তভাবে শুয়ে আছে ত্রিয়াশ। প্রকৃতির নিস্তব্ধতার মাঝে তার মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তার বুকের ওপর সোজা হয়ে, আরাম করে মাথা রেখে শুয়ে আছে আইলিন। দুজনেরই শরীর আর পোশাকে হলুদের কোমল আভা লেগে আছে—মনে হচ্ছে তারা যেন এই প্রকৃতিরই অংশ হয়ে গেছে।
চারপাশে পাহাড়ের ভাঁজ বেয়ে নেমে আসা ঝর্ণার শব্দে পুরো পরিবেশটা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। স্বচ্ছ পানি পাথরের গা ঘেঁষে বয়ে যাচ্ছে, আর সেই ঠান্ডা ছোঁয়া বারবার তাদের শরীরে এসে লাগছে। সূর্যের আলো ঝর্ণার পানিতে পড়ে চিকচিক করছে, চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে সোনালি আভা। সেই আলো আর পানির মিলনে ত্রিয়াশ আর আইলিনকে মনে হচ্ছে যেন তারা প্রকৃতিরই অংশ হয়ে গেছে—হলুদাভ রঙের এক স্বপ্নিল জগতে হারিয়ে যাওয়া দুটি মানুষ।
প্রকৃতির এই শীতল স্পর্শে দুজনের নীরব মুহূর্তটা আরও গভীর আর মায়াবী হয়ে উঠেছে।
ত্রিয়াশের বুকে মাথা রেখে শান্ত গলায় আইলিন হঠাৎ বলে উঠল,
“শুনছেন?”
ত্রিয়াশ কোমল স্বরে উত্তর দিল, “হুঁ।”
আইলিন একটু থেমে আবার বলল,
“বাংলাদেশ ফিরে আপনি ভার্সিটির জবটা করবেন।”
ত্রিয়াশ কোনো উত্তর দিল না। সে চুপ করে রইল। তার নীরবতার মধ্যে যেন একটা গভীর ভাবনা কাজ করছিল। আইলিন কী চায়? কেন চায়? সবটা সে বোঝার চেষ্টা করছিল, শুধু অনুমান নয়, নিশ্চিত হতে চাইছিল তার অনুভূতি।
আইলিন আবার একই স্বরে, আরও পরিষ্কার করে বলল,
“ভার্সিটির জবটা আপনার খুব শখের ছিল। আপনি ওটা আবার করবেন।”
“তুমি সিউর?”
“হুম,” আইলিন ছোট করে কিন্তু দৃঢ়ভাবে উত্তর দিল।
এরপর সে একটু নরম গলায় নিজের মতো করে বলতে লাগল,
“ভার্সিটি থেকে রি-অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার এসেছে। আপনাকে আবার জয়েন করতে বলা হয়েছে। তাহলে লেটারটা ড্রয়ারে ফেলে রাখছেন কেন?”
“তুমি কী চাও?”
আইলিন এক মুহূর্তও না ভেবে উত্তর দিল,
“আমি চাই আপনি করেন।”
ত্রিয়াশ হালকা নিশ্বাস ফেলে, একটুখানি হাসির আভাস নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, ঘরণী।”
আইলিন জানে, ত্রিয়াশের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল এই লেকচারার জীবন এটা তার শখের চাকরি। যেখানে সে নিজের জ্ঞান ভাগ করে নিতে পারত।
ঘুরতে আসার আগেই আইলিন ড্রয়ারে পড়ে থাকা রি-অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দেখে ফেলেছিল। তখনই তার মনে হয়েছিল, ত্রিয়াশ যেন আবার নিজের জায়গায় ফিরে যায়—যেখানে সে সত্যিই নিজেকে খুঁজে পায়।
~~~
ভিরিপাড়া জলপ্রপাত থেকে ফিরে আসার পর যেন ক্লান্তিটুকুও তাদের ভালোবাসার কাছে হার মেনে গেল। হোটেলে ফিরে দুজনেই ফ্রেশ হয়ে নিল, তারপর শান্তভাবে রাতের খাবার শেষ করলো। বাইরে তখন রাত নেমেছে, পাহাড়ি শহরের আলো ঝলমলে রূপ যেন অন্য এক পৃথিবীর গল্প শোনাচ্ছে।
আইলিন হোটেল রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে সেই রাতের শহর দেখছিল। ঠান্ডা বাতাস তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছিল বারবার। ঠিক তখনই নীরবে এসে তার পাশে দাঁড়ালো ত্রিয়াশ। কোনো শব্দ না হলেও আইলিন বুঝে গেল সে এসেছে। সেই চেনা পারফিউমের ঘ্রাণ, সেই পরিচিত উপস্থিতি—সবকিছুই তার হৃদয় চিনে নিয়েছে বহু আগেই।
ত্রিয়াশ পেছন থেকে আলতো করে আইলিনকে জড়িয়ে ধরলো। নিজের থুতনি রাখলো তার ঘাড়ে। তারপর খুব ধীরে, গভীর ভালোবাসা মিশিয়ে ফিসফিস করে বললো,
“ভালোবাসি… ভালোবাসি… খুব ভালোবাসি। আবারও আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবলেও কিন্তু মে'রে দিবো।”
ত্রিয়াশের কথায় আইলিনের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। সে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে ত্রিয়াশের গলা জড়িয়ে ধরলো। মায়াভরা চোখে তাকিয়ে বললো,
“যদি কোনোদিন অন্য মেয়ের সঙ্গে দেখি, তাহলে কিন্তু সত্যিই ছেড়ে চলে যাবো। আর ফিরবো না আপনার নীড়ে।”
ত্রিয়াশ হালকা হেসে তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো,
“মিসেস মির্জা, আপনাকে ছাড়া কাউকে কোনোদিন মনেই ধরেনি। অন্য মেয়ের কথা ভাবাটাও অসম্ভব। এক বাচ্চার মা তো বানিয়েছি, ভবিষ্যতে আরও বানাবো। এখনো বুঝতে পারেন না কতটা ভালোবাসি আপনাকে?”
লজ্জা মাখা হাসি দিল আইলিন। তারপর পায়ের পাতায় ভর দিয়ে একটু উঁচু হয়ে ত্রিয়াশের নাকের ডগায় ছোট্ট করে চুমু খেল। এরপর কপালেও ভালোবাসার স্পর্শ এঁকে দিল। ত্রিয়াশের চোখের গভীরে তাকিয়ে নরম স্বরে বললো,
“ভালোবাসি, ত্রিয়ার বাবা। এখন আমার একটা চাওয়া পূরণ করবেন?”
“কি চাই?”
“ছোট্ট একটা ত্রিয়াশ।”
ত্রিয়াশ মৃদু হেসে তার এলোমেলো চুল সরিয়ে দিল।
“আগে নিজের যত্ন নিন ম্যাম, তারপর না হয় সব হবে।”
“দিবেন কি না বলেন?”
“দিবো… সময় হলে সবই দিবো।”
কথাগুলো শুনে আইলিন শান্ত হয়ে ত্রিয়াশের বুকে মাথা রেখে লেপ্টে রইলো। যেন এই বুকটাই তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। সে মনের সুখে ত্রিয়াশের গায়ের ঘ্রাণ নিচ্ছিল। ত্রিয়াশও আদরে তার চুলের ভাজে চুমু দিল।
আইলিন তখন বিড়ালছানার মতো মুখ তুলে নরম গলায় বললো,
“এরপর কোথায় যাবো আমরা?”
ত্রিয়াশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আকাশের দিকে তাকালো। তারপর স্বপ্নমাখা কণ্ঠে বললো,
“কাশ্মীর… তারপর একদিন আমাদের আদুরে আন্ডা বাচ্চাদের নিয়ে মক্কায় যাবো।”
আইলিনের চোখ মুহূর্তেই আনন্দে চকচক করে উঠলো।
“সত্যি? আমি ভীষণ খুশি…”
এরই মাঝে ত্রিয়াশের ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে রুদ্রের নাম। নামটা দেখেই ত্রিয়াশ বুঝে গেল, ফোনের ওপাশে নিশ্চয়ই তাদের ছোট্ট রাজকন্যা ত্রিয়া আছে। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একচিলতে হাসি ফুটে উঠলো তার। দ্রুত কল রিসিভ করে ফোনটা কানে দিতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো ছোট্ট, মিষ্টি একটা কণ্ঠ,
“পাপা…”
ত্রিয়াশের চোখ-মুখ নরম হয়ে এলো। শান্ত স্বরে জবাব দিল,
“হুম, মা…”
ত্রিয়া গলা জড়িয়ে ধরা আবদারের মতো করে বললো,
“মিস করি…”
মেয়ের কণ্ঠে লুকিয়ে থাকা অভিমান আর ভালোবাসা যেন সরাসরি এসে লাগলো ত্রিয়াশের বুকে। সে মৃদু হেসে বললো,
“আমিও তোমাকে খুব মিস করি সোনা। খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবো।”
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আইলিনও আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না। সে তাড়াতাড়ি ফোনের কাছে এসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“মা, খেয়েছো?”
ত্রিয়া ছোট্ট করে উত্তর দিল,
“হুম…”
ঠিক তখনই ত্রিয়ার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিল নিয়তি। হাসতে হাসতেই বললো,
“কোনো চিন্তা করো না তোমরা। আমরা থাকতে ত্রিয়া মায়ের অযত্ন হবে না। আমাদের বাড়ির প্রিন্সেস বলে কথা!”
তার কথা শেষ হতেই পাশে থাকা রাত্রি দুষ্টুমি মাখা গলায় বলে উঠলো,
“তোমার মেয়ে কাল কি করেছে জানো?”
আইলিন সঙ্গে সঙ্গে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কি করেছে?”
ফোন তখন লাউডস্পিকারে দেওয়া। সবাই কিছু বলার আগেই ত্রিয়া নিজেই তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
“পাপা…”
ত্রিয়াশ মুগ্ধ গলায় সাড়া দিল,
“হুম, মা…”
ত্রিয়া এবার গর্বিত ভঙ্গিতে বললো,
“আমি বলেছি, এই! আমার দাভাইয়ের গায়ে হাত দিলে তুলে আছাড় মারবো!”
ত্রিয়ার মুখে এমন কথা শুনে মুহূর্তেই ওপাশে সবাই খিলখিল করে হেসে উঠলো।
ত্রিয়াশ আর আইলিন দুজনেই কিছুক্ষণ অবাক হয়ে রইলো। তারা ঠিক বুঝতেই পারছে না ঘটনা কি!
হাসতে হাসতেই রুদ্র ব্যাখ্যা দিল,
“কাল আমরা ঘুরতে বের হয়েছিলাম না? সেখানে একটা বাচ্চা নির্ঝরের গেঞ্জি ধরে টান দিয়েছিল। আর তখনই তোমার মেয়ে এই ডায়লগ মেরে বসে!”
কথাটা শুনে এবার ত্রিয়াশ আর আইলিনও হেসে ফেললো।
এরপর আরও কিছুক্ষণ হাসি-তামাশা, দুষ্টুমি আর গল্প চললো। দূরে থেকেও যেন পরিবারের উষ্ণতা ঠিকই অনুভব করছিল তারা। একসময় সবার সঙ্গে কথা শেষ করে কলটা কেটে দেওয়া হলো।
ফোন কেটে যাওয়ার পরও ত্রিয়াশ আর আইলিনের ঠোঁটে হাসি লেগেই রইলো। মেয়ের মিষ্টি কথাগুলো যেন এখনও কানে বাজছে।
চলবে,,
[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। দয়া করে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। ]