গল্পঃ #শেষ_চৈত্রের_মৃদু_ছোঁয়া
লেখনীতেঃ #আফরিনা_আক্তার_সুইটি
পর্বঃ ৫৪
🚫কপি নিষিদ্ধ 🚫
গুলমার্গ হলো ভারতের কাশ্মীর উপত্যকার একটি অত্যন্ত সুন্দর পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র। এটি হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এবং বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত স্নো ডেস্টিনেশন হিসেবে পরিচিত।
গুলমার্গের বিশেষত্ব হলো এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—শীতকালে পুরো এলাকা সাদা বরফে ঢেকে যায়, আর গ্রীষ্মকালে সবুজ পাহাড় ও ফুলে ভরে ওঠে।
এখানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম উঁচু কেবল কার গুলমার্গ গন্ডোলা, যেখান থেকে পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত যাওয়া যায় এবং চারপাশের বরফঢাকা দৃশ্য দেখা যায়।
কেরালার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে প্রায় সাত ঘণ্টার ক্লান্তিকর জার্নি শেষে তারা পৌঁছে গেছে কাশ্মীরের স্বপ্নময় গুলমার্গে। চারপাশে বরফঢাকা পাহাড় আর নিস্তব্ধ প্রকৃতির মাঝে যেন এক অন্য জগতে এসে দাঁড়িয়েছে তারা।
দ্য ভিন্টেজ গুলমার্গ হলো গুলমার্গের একটি বিলাসবহুল বুটিক স্টাইলের হোটেল, যা পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে অবস্থিত
এটি মূলত কাঠের ডিজাইন ও আধুনিক লাক্সারি মিশিয়ে তৈরি, তাই ভেতরে ঢুকলেই উষ্ণ ও আরামদায়ক পাহাড়ি অনুভূতি পাওয়া যায়। শীতকালে চারপাশ বরফে ঢেকে যায় , আর জানালা দিয়ে দেখা যায় সাদা হিমালয়ের অসাধারণ দৃশ্য আর গ্রীষ্মকালে বরফের থেকে সবুজ প্রকৃতি বেশি দেখা যায়।
দ্য ভিন্টেজ গুলমার্গ হোটেলের আরামদায়ক রুমে এসে উঠতেই আইলিনের শরীরের সব ক্লান্তি যেন একসাথে ভর করে। সফরের ধকল আর ভ্রমণের দীর্ঘ পথের ক্লান্তিতে সে আর বেশি কিছু ভাবতে পারেনি—শুধু নীরবে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে। অন্যদিকে ত্রিয়াশের চোখেও ভারী ঘুম নেমে এসেছে, কিন্তু আইলিনের ঘুমের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠছে।
রাত হয়ে এসেছে। আইলিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকায় সে আর খাবারের অর্ডার দেয়নি। ফ্রেশ হয়ে এসে সে আইলিনের পাশে শুয়ে পড়ে। বাইরের পাহাড়ি ঠান্ডা বাতাস আর ঘরের নিস্তব্ধতার মাঝে ত্রিয়াশের কাছে এই মুহূর্তগুলো যেন কোনো বাস্তব পৃথিবীর অংশ নয়—বরং এক স্বপ্নের মতো, যেখানে শুধু সে আর তার প্রিয়সী আছে।
এই ভ্রমণ তার কাছে কেবল একটি সফর নয়, বরং ভালোবাসার এক নিঃশব্দ যাত্রা। প্রকৃতির রাজ্যে প্রিয় মানুষকে নিয়ে হারিয়ে যাওয়ার এমন অনুভূতি সে আগে কখনো অনুভব করেনি।
আইলিনের এলোমেলো চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে ত্রিয়াশ তার কপালে এক মৃদু চুমু এঁকে দেয়। প্রিয়সীকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে সে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমায়।
~~
সকালের স্নিগ্ধ সোনালী রোদ আস্তে আস্তে জানালার ফাঁক গলে ভেতরে এসে পড়ে আইলিনের মুখে। ঘুমের গভীরতা তখনও তার চোখে লেপ্টে আছে। রোদের উষ্ণ ছোঁয়া গাল ছুঁতেই তার কপালটা হালকা কুঁচকে ওঠে। বিরক্তির এক মিষ্টি ভঙ্গিতে সে একটু নড়ে ওঠে।
ঘুম ভাঙার ইচ্ছেটা যেন তার নেই। তাই আলতো করে পাশ ফিরেই সে ত্রিয়াশের বুকে আরও গভীরভাবে মুখ লুকিয়ে নেয়। সেখানে মাথা গুঁজে, পরিচিত সেই নিরাপত্তার উষ্ণ আশ্রয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে আবারও।
দ্য ভিন্টেজ গুলমার্গ এই হোটেলটা পাহাড়ের মাঝখানে থাকা এক শান্ত ও সুন্দর জায়গা, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য খুব কাছ থেকে অনুভব করা যায়।
এখানে দিনের বেলায় বড় কাচের জানালা দিয়ে সোনালী রোদ সহজেই রুমের ভেতরে ঢুকে পড়ে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আলোটা নরমভাবে বিছানা, দেয়াল আর পুরো ঘরকে উষ্ণ করে তোলে। মনে হয় যেন পাহাড়ি ঠান্ডার মাঝেও ঘরের ভেতর এক আরামদায়ক উষ্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
জানালার বাইরে বরফঢাকা পাহাড় আর সবুজ উপত্যকার দৃশ্য দেখা যায়, আর সেই দৃশ্যের ওপর রোদের ছোঁয়া পড়লে পুরো পরিবেশটা আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। বিকেলের দিকে সূর্যের আলো কমে গিয়ে হালকা সোনালী আভা তৈরি করে।
এখানে শুধু রোদই আসে না—রোদটা জানালার ভেতর দিয়ে ঢুকে পুরো রুমটাকে গোল্ডেন লাইট দিয়ে ভরিয়ে দেয়, যা খুবই মনোমুগ্ধকর একটা অনুভূতি দেয়।
রোদের তীব্র আলো ঘরের জানালা ভেদ করে বিছানার ওপর এসে পড়তেই ত্রিয়াশের ঘুম ভেঙে গেল। কিছুক্ষণ চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল সে, যেন বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝখানে আটকে আছে। তারপর পাশে ফিরে তাকাতেই তার ঠোঁটে এক টুকরো মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
আইলিন ঘুমিয়ে আছে তার বুকে মাথা রেখে—একেবারে শান্ত, নির্ভার। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের এক পাশে ছড়িয়ে আছে। ত্রিয়াশ আলতো করে হাত বাড়িয়ে সেই চুলের ভাজে ঠোঁট ছুঁইয়ে একটা মিষ্টি চুমু দিল।
ফোনটা হাতে নিয়ে সময় দেখে তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। বেলা অনেকটা হয়ে গেছে। রাত থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি—পেটের ভেতর সত্যি সত্যিই যেন ইদুর দৌড় শুরু হয়েছে। ক্ষুধার তীব্র অনুভূতিটাও এখন টের পাচ্ছে সে।
উঠে বসে ত্রিয়াশ। তারপর খুব সাবধানে আইলিনকে না জাগিয়ে তাকে একটু ঠিক করে শুইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আইলিন নড়েচড়ে উঠতেই চোখ মেলে তাকায়। ঘুমঘুম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কি হলো? ঘুমুতে দেন।”
ত্রিয়াশ হেসে মাথা নাড়ে।
“বেলা অনেক হয়ে গেছে। উঠো, ফ্রেশ হয়ে আসি। আজকে অনেক কিছু দেখা বাকি আছে।”
আইলিন একটু হেসে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে, তারপর আস্তে করে উঠে বসে।
দুজনেই কিছুক্ষণ পরে ফ্রেশ হয়ে প্রস্তুত হয়ে আসে। কাশ্মীরের গ্রীষ্মকাল হলেও বাতাসে এখনো এক ধরনের ঠান্ডা ছোঁয়া আছে। তাই হালকা গরমের জন্য দুজনেই পাতলা জ্যাকেট বেছে নিয়েছে।
আইলিন আজ পরেছে কটন কুর্তি, সাথে জিন্স। তার ওপর হালকা পাতলা জ্যাকেট। পায়ে ট্রেকিং জুতা, চোখে সানগ্লাস—একেবারে স্টাইলিশ এক লুক। চুলটা সে একটু গুছিয়ে বেঁধে নিয়েছে, তবুও কিছু গোছা বেরিয়ে এসে তার মুখকে আরও মায়াবী করে তুলেছে।
অন্যদিকে ত্রিয়াশ পরেছে সাধারণ টিশার্টের ওপর পাতলা জ্যাকেট। পায়ে স্পোর্টস জুতা। সেও চোখে সানগ্লাস পরে নিয়েছে।
দুজনকে পাশাপাশি দাঁড়ালে মনে হয়, তারা যেন একই গল্পের দুই চরিত্র—একই পথে হাঁটার জন্যই যেন তৈরি।
আইলিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজেকে দেখে নেয়, তারপর ত্রিয়াশের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসে।
“চলুন?”
ত্রিয়াশ মাথা নাড়ে।
“চলো। কাশ্মীর আমাদের অপেক্ষায়।”
বাইরে বের হতেই শীতল হাওয়ার একটা ঝাপটা মুখে এসে লাগে। দূরে পাহাড়ের সারি নীল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে, যেন নীরবে তাদের যাত্রা দেখছে। চারপাশে নতুন দিনের আলো, নতুন গল্পের ইঙ্গিত।
তারা সকালের নাস্তা সেরে চলে গুলমার্গ গন্ডোলা। ত্রিয়াশের সাথে আজ এই পাহাড়ের বুকে ভেসে বেড়াবে আইলিন। গুলমার্গ গন্ডোলা যেন পাহাড়ের বুকের উপর ভেসে চলা এক স্বপ্নযান। ধীরে ধীরে গন্ডোলা ওপরে উঠতে থাকে, আর নিচে ছোট হয়ে আসে সবুজ উপত্যকা, পাইন গাছ আর ঘরবাড়ি। দূরের বরফঢাকা পাহাড়গুলো তখন হাতছানি দিয়ে ডাকে।
শীতকালে চারপাশ সাদা বরফে ঢাকা থাকে। সূর্যের আলো বরফের উপর পড়ে ঝিলমিল করে, যেন পুরো পাহাড় রুপার চাদরে মোড়া। আর গন্ডোলার কাঁচের ভেতর বসে সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হয়, আপনি মেঘের দেশে হারিয়ে গেছেন।
গ্রীষ্মে দৃশ্যটা আবার অন্যরকম। পাহাড়জুড়ে সবুজ ঘাস, বুনো ফুল আর ঠান্ডা বাতাস মনকে শান্ত করে দেয়। নিচে আঁকাবাঁকা পথ আর দূরের কাশ্মীরি গ্রামগুলো ছবির মতো সুন্দর লাগে।
গন্ডোলা যত উপরে ওঠে, ততই বাতাস ঠান্ডা হয়ে আসে আর প্রকৃতির বিশালতা আরও স্পষ্ট হয়। ভয়, উত্তেজনা আর মুগ্ধতা—সব মিলিয়ে জীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে।
আইলিন প্রথমে ভয় পেলেও ত্রিয়াশকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পুরো সময়টা উপভোগ করে। প্রিয় মানুষ পাশে থাকলে ভয় কিসের, আজ কোনো ভয় ছুতে পারেনি আইলিন কে। ত্রিয়াশও মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখছে নিজের প্রিয়তমাকে।
গন্ডোলা থেকে নামতেই আইলিন যেন আনন্দে একদম ছোট বাচ্চা হয়ে গেল। চারপাশে সাদা বরফ দেখে সে দৌড়ে বেড়াতে শুরু করলো। দুই হাত ভরে বরফ তুলে হেসে হেসে ত্রিয়াশের দিকে ছুড়ে মারলো। ত্রিয়াশ কিছু না বলে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার বাচ্চামো গুলো দেখছিল ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে।
আইলিন আবার বরফ ছুড়তে গেলে ত্রিয়াশ হঠাৎ তাকে কোলে তুলে নিল। আইলিন অবাক হয়ে হেসে উঠলো। ত্রিয়াশ তাকে কোলে নিয়েই বরফের মধ্যে ঘুরতে শুরু করলো। ঠান্ডা বাতাস আর দুজনের হাসির শব্দে মুহূর্তটা আরও সুন্দর হয়ে উঠলো। ঘুরতে ঘুরতে একসময় ভারসাম্য হারিয়ে দুজনেই নরম বরফের উপর পড়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে থেকে দুজনেই খিলখিল করে হেসে উঠলো।
চারপাশটা যেন স্বপ্নের মতো সুন্দর লাগছিল। সবুজ পাইন গাছের গায়ে জমে থাকা সাদা বরফ, ঠান্ডা হাওয়া আর পাহাড়ি পরিবেশ সব মিলিয়ে জায়গাটা ছিল অসাধারণ। আইলিন কখনো বরফ ছুঁয়ে দেখছিল, কখনো চারপাশ ঘুরে দেখছিল মুগ্ধ চোখে। আর ত্রিয়াশ শুধু তার আনন্দটা দেখেই শান্তি পাচ্ছিল।
অনেকক্ষণ ঘুরাঘুরির পর তারা হোটেল রুমে ফিরে এলো। ততক্ষণে প্রায় সন্ধ্যা নেমে গেছে। বাইরে বরফঢাকা পাহাড়গুলো অন্ধকারে আরও সুন্দর লাগছিল। ক্লান্ত হলেও দুজনের মন ভরে ছিল সারাদিনের সুন্দর মূহুর্তের জন্য।
~~~~~~
নতুন দিনের সূচনা নিয়ে আরেকটা সকাল । জানালার ফাঁক গলে আসা রোদের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ঘরে। বাইরে কোথাও পাখির কিচিরমিচির, আবার দূর থেকে ভেসে আসছে মানুষের কথাবার্তার অস্পষ্ট শব্দ। সেই শব্দেই আইলিনের গভীর ঘুমটা একটু একটু করে পাতলা হয়ে এলো।
তবুও চোখ খুলতে মন চাইছিল না তার। শরীরজুড়ে এখনো ক্লান্তির আবেশ, চোখের পাতায় ঘুমের ভার। সে পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু বাইরের শব্দগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখ মেলে তাকালো।
ঘুমের রেশ তখনো পুরোপুরি কাটেনি। ঝাপসা দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চারপাশ দেখার চেষ্টা করলো সে। কিন্তু পরমুহূর্তেই সামনের দৃশ্য দেখে যেন তার সমস্ত ঘুম মুহূর্তে উড়ে গেল।
আইলিন হঠাৎ করেই লাফিয়ে উঠে বিছানায় বসে পড়লো। বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল তার চোখ।
সামনেই ত্রিয়াশ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছে। আর তার বুকের ওপর ছোট্ট ত্রিয়া গোল হয়ে শুয়ে, বাবার শার্ট মুঠো করে ধরে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ছোট্ট একটা আঙুল এখনো মুখে গুঁজে রেখেছে সে। এত শান্ত, এত মায়াময় লাগছিল দুজনকে যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আইলিন শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
তারপর হঠাৎ করেই চারপাশে চোখ বুলালো সে। পরিচিত দেয়াল দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।
এটা… তাদের ঘর!
মানে তারা বাংলাদেশে ফিরে এসেছে!
আইলিন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। এত বড় একটা পথ পাড়ি দিয়ে দেশে চলে এসেছে, অথচ সে কিছুই টের পায়নি। হয়তো পুরোটা সময় ত্রিয়াশ তাকে আগলে রেখেছিল বলেই ক্লান্তিতে এত গভীর ঘুমে ছিল সে।
কিন্তু সেই বিস্ময়ের চেয়েও বড় হয়ে ধরা দিল অন্য এক অনুভূতি। নিজের মেয়েকে এতদিন পর এভাবে বুকের সামনে দেখতে পেয়ে তার বুকটা হঠাৎ ভরে উঠলো অদ্ভুত এক শান্তিতে।
এগিয়ে গিয়ে সে ত্রিয়ার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিল। তারপর ঝুঁকে মেয়ের কপালে, গালে একের পর এক আদুরে চুমু এঁকে দিল।
মায়ের স্পর্শ পেতেই ত্রিয়ার ছোট্ট শরীরটা নড়েচড়ে উঠলো। কুঁকড়ে গিয়ে চোখ মেললো সে। অন্যদিকে আইলিনের নড়াচড়ায় ত্রিয়াশের ঘুমও ভাঙলো।
ত্রিয়া আধোঘুম চোখে কয়েক সেকেন্ড মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না সত্যিই তার মাম্মাম সামনে বসে আছে। তারপর পরমুহূর্তেই খুশিতে তার পুরো মুখটা ঝলমল করে উঠলো।
“মাম্মাম!”
খুশিতে চিৎকার করে উঠেই ছোট্ট দুটো হাত বাড়িয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরলো সে। তারপর একের পর এক ছোট ছোট চুমু এঁকে দিল আইলিনের ঠোঁটে, গালে, মুখে।
মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নিজের বুকে। যেন পৃথিবীর সমস্ত শান্তি এই ছোট্ট আলিঙ্গনের মাঝেই লুকিয়ে আছে।
পাশ থেকে ত্রিয়াশ আধোঘুম চোখে মা-মেয়ের এই মুহূর্তটা দেখছিল। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো তার। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক তৃপ্তিতে ভরে গেল।
পাঁচ-ছয় দিন পরে পরিবারের সবাইকে দেখে আইলিন ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লো। নিচে নামতেই সবাই তাকে ঘিরে ধরলো। কেউ জানতে চাইছে কোথায় কোথায় ঘুরেছে, কেউ কাশ্মীরের সৌন্দর্যের কথা শুনতে চাইছে, আবার কেউ বরফ আর গন্ডোলার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন করছে। একসাথে এত প্রশ্ন শুনে আইলিন হেসে ফেললো।
ত্রিয়াশ পাশে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে সব দেখছিল। পরিবারের মাঝে ফিরে এসে আইলিনের মুখে যে আনন্দ ফুটে উঠেছে, সেটা দেখেই তার ভালো লাগছিল।
আইলিন আপাতত কিছু না বলে ব্যাগ থেকে সবার জন্য আনা গিফট বের করতে শুরু করলো। মুহূর্তেই সবাই নিজেদের গিফট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। ছোটদের জন্য কিউট কিছু জিনিস এনেছে সে। গিফটগুলো মেরিনা বিচ থেকে ফেরার সময় সবার কথা ভেবে কিনেছিল আইলিন।
নিজেদের পছন্দের জিনিস পেয়ে সবাই খুব খুশি।
দেখতে দেখতে আরও সাতটি দিন কেটে গেল। এই ক’দিন সবাই বেশ আনন্দে আর স্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছে। বাড়ির ভেতর এখন সারাক্ষণই হাসি-ঠাট্টা, গল্প আর ছোট ছোট খুনসুটিতে ভরে থাকে। কেউ রান্নাঘরে ব্যস্ত, কেউ আবার বারান্দায় বসে আড্ডা দিচ্ছে—সব মিলিয়ে একটা সুন্দর পারিবারিক আবহ তৈরি হয়েছে।
হঠাৎ বিয়ে হওয়ায় আগে কোনো অনুষ্ঠান ঠিকভাবে করা হয়নি। তাই সবার মধ্যেই কোথাও না কোথাও একটা অপূর্ণতার অনুভূতি ছিল। সেই ভাবনা থেকেই সবাই মিলে ঠিক করেছে, খুব বড় কিছু না হলেও ঘরোয়া একটা ছোট আয়োজন করা হবে।
আগামীকালই সেই ছোট্ট অনুষ্ঠান। বাড়ির বাগানেই করা হবে পুরো আয়োজন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই বাড়িতে আলাদা একটা উৎসবের আমেজ চলে এসেছে। সাজগোজ নিয়ে উৎসাহে আলোচনা করছে। ছোটদের উচ্ছ্বাস তো আরও বেশি—তারাও পুরো পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে।
চলবে,,,,
[ বিঃদ্রঃ জনরাঃ (সামাজিক +রোমান্টিক) ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই দয়া করে রেসপন্স করবেন। দয়া করে গল্প সম্পর্কে কিছু বলেন। ]