ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ে খলনায়ক

১০ম পর্ব

লেখক: লাবিবা ওয়াহিদ

#প্রণয়ে_খলনায়ক - [১০]

লাবিবা ওয়াহিদ

[কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]

রাত চারটা বাজে বুরহান সাহেবের কল এলো ইরতেজার ফোনে। ইরতেজা ঘুমিয়েছে বেশিক্ষণ হয়নি। তবে ইতিমধ্যেই ঘুম বেশ গভীর হয়ে এসেছে৷ বাইরের বৃষ্টি হওয়ায় এই শীতল আবহাওয়া রয়েছে। আর বৃষ্টির মৌসুম মানেই চোখে ঘুম তড়পানো। বুরহান সাহেব একবার কল দিয়ে ক্ষান্ত হলেন না। আরও কয়েকবার কল দিলেন। ইরতেজা বিরক্ত হয়ে কল রিসিভ করল,

--"হ্যালো?" ঘুম কণ্ঠ।

--"কী করছ?"

--"ইউ আর সো লজিকলেস দাদু। গভীর রাতে মানুষ ঘুমাবে— কমনসেন্স। কানাডা আর এই দেশের টাইম মেইনটেইন কবে করা শিখবে?"

--"ওহ আই সি, এখন ঘুমানোর সময়? আমি তো জানতাম এখন ডিনার টাইম, লুইস আরও শিকার করতে বেরিয়েছে।"

লুইসের কথা শুনে ইরতেজার চোখের ঘুম উড়ে গেল। সে চট করে উঠে বসে বলল,

--"লুইস কোথায় আছে এখন? বিডিতে নাকি টরোন্টো?"

--"টরোন্টো আমার শান্তির জায়গা, এখন অপবিত্র হতে নয় উপভোগ করতে এসেছি— মাই ডিয়ার।"

ইরতেজা অস্ফুট স্বরে বলল,

--"লুইস দেশে?"

--"হ্যাঁ।"

--"এবারের শিকার কে?"

--"মেবি, কোনো এক বি*চ?"

ইরতেজা কপালে দুই আঙুলের বিচরণ চালিয়ে বলল,

--"এনাফ করেছ জীবনে, দাদু। এখন তো এসব থামাও, দাদী তোমার চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়ে।"

বুরহান সাহেবের কপাল কুঁচকে যায়, বিরক্ত গলায় বললেন,

--"কী এক মহিলার প্রেমে পড়লাম, শেষ বয়সে এসেও সাহসী বানাতে পারলাম না।"

--"এক্সেটলি আমার পয়েন্ট! শেষ বয়সেও এসব থামাবা না?"

--"আমি থামলে তোমরা বিপদে পড়বে, ইউ নো দ্যাট? বুরহান মিয়াজীর গায়ের এক ফোঁটা রক্ত থাকতে আমি তোমাদের কিছু হতে দেবো না।"

ইরতেজা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার দাদা যে ভীষণ ঘাউড়া টাইপের, সেটা নিয়ে কোনো কালেই সন্দেহ ছিল না৷ তাঁর সঙ্গে উলটো ঘাউড়ামি দেখিয়েও লাভ হবে না। এইযে, বুরহান সাহেবের স্ত্রী নাদিরা বিবি স্বামীকে কুকাজ করতে বারণ করায় স্ত্রীকে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর ফেরত নেননি। নাদিরা বিবি তো মাঝেমধ্যে বেফাঁস বলে ইরতেজা আর বুরহান সাহেব পুরো একই গোয়ালের গোরু। এজন্য বোধ হয় বুরহান সাহেব ইরতেজাকেই বেশি পছন্দ করেন।

বুরহান সাহেব বললেন,

--"শুনলাম কোন মেয়ের সাথে নাকি ঝামেলা চলছে?"

ইরতেজা দায় সাড়া গলায় বলল,

--"তোমার নাতনি আড়াচি। অন্য কোনো মেয়ে না। কোনোদিন ঘেঁষতে দিছ অন্য মেয়ের সাথে?"

--"তা ত দেবই না। আমার নাতনি না হলেও ভেবে দেখতাম। কিন্তু আমার বংশে কোনো ক্যারেক্টারলেসের ঠাই নেই।"

ইরতেজা শুনল।

--"আড়াচিকে ইদানীং খুব জ্বালাচ্ছ তাই না?"

--"কয়লা বানিয়ে দেবো দাদা।"

--"করার সাহস দেখিও শুধু, পিস্তল রেডি আছে তোমার জন্য।"

ইরতেজা বিরক্ত হয়ে বলল,

--"তুমি ইচ্ছে করে আমার জীবন তছনছ করতে এই মেয়েকে একই ভার্সিটিতে ভর্তি করেছ তাই না?"

--"আড়াচি তোমার ফিঁকে জীবনের একমাত্র রং।"

--"দাদীও তো তোমার জীবনের রং, তাকে এভাবে দূরে রাখছ কেন?"

--"আমার সাথে তোর কিসের লাগালাগি? আমি তোর বাপও না, দাদা হই। দাদার জীবনে ইন্টারফেয়ার করিস কোন লজিকে?"

--"তাহলে তোমারও আমার জীবনে ইন্টারফেয়ার করতে হবে না। আড়াচিকে যা খুশি করব।"

--"সে কর, কিন্তু আমার নাতনিকে যদি কোনো ভাবে কষ্ট দিস, আমি সত্যি আমার বন্দুকটা নিয়ে দেশে আসব। এবার দারুণ ইম্পোর্টেট গান পেয়েছি।"

--"রাখছি দাদা, ঘুমাতে দাও।"

--"ওহ হ্যাঁ, লুইসও মাত্র মেসেজ করল।"

--"কী?"

--"কাজ হয়ে গেছে।"

--"এই লুইসটা আবার আমার সামনে পড়বে। এই লুইসটার জন্য আমার আড়াচিকে বিয়ে করতে হয়েছে।"

--"ইউ শুড টু থ্যাঙ্ক হিম।"

ইরতেজা বিরক্ত হয়ে কল কেটে দিল। সে লুইসকে একদমই দেখতে পারে না। আস্ত হেডেক এই ছেলেটা।

---------------------------

দুইদিনে ভার্সিটিতে ছড়িয়ে পড়েছে ফার্স্ট ইয়ারের এক ফ্রেশার ইরতেজা আরদান মিয়াজীর গায়ে বমি করেছে। মৌরি নিজের ক্লাসের দিকে যাচ্ছিল, এমন সময়ই ইরতেজা আর নিহিন আর পথ আগলে দাঁড়ায়। মৌরি থমকে যায় ওদের দেখে। ইরতেজা সময় ব্যয় না করে গম্ভীর গলায় বলল,

--"এই এলাচির গার্লফ্রেন্ড, ওর নাম্বারটা দাও।"

--"কেন?"

--"বিরিয়ানি খাচ্ছিলাম, এলাচিতে কামড় লেগে মুখ তেঁতো হয়ে আছে। আমার পাতেই কেন এলাচি পড়ে তা জিজ্ঞেস করতাম।"

ইরতেজার সাথে নিহিনও ছিল। মৌরি আমতা আমতা করছে বলে নিহিন আচমকা মৌরির হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে বলল,

--"নে ভাই, নাম্বার খুঁজে নে।"

ইরতেজা মৌরির দিকে একবার তো নিহিনের দিকে তাকাল। নিহিন ইরতেজার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল,

--"আরে কেউ একজন আমাকে ছিনতাইকারী বলেছে। এজন্য আজকাল ছিনতাইকারীর সিমটমস দেখা দিচ্ছে আমার মধ্যে। এত ভাবিস না, তুই নাম্বারটা খুঁজে নে।"

বলেই নিহিন মৌরির দিকে তাকাল। মৌরি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

--"আপনি একটা চরম অসভ্য।"

--"ছিনতাইকারী কিংবা খলনায়কদের লাইসেন্সে সভ্যতা নেই, সুইটহার্ট!"

মৌরি উত্তরে কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। ইরতেজা ফোনটা ফেরত দিয়ে বলল, "পার্সোনাল কিছু দেখিনি, শুধু নাম্বারটাই নিয়েছি।"

ইরতেজা চলে গেল। নিহিন মৌরিকে আপাদমস্তক দেখলে মৌরি কিছু অস্বস্তিতে পড়ে। এটা দেখে নিহিন নাক কুঁচকে বলল,

--"তোমার মতো টিপিক্যাল মেয়েকে নিয়ে উলটা পালটা চিন্তা করার টাইম নেই আমার। আগামী কাল আমার ডেট আছে। কেন যেন ডেটটা তিন দিন পিছিয়ে গেল। যাইহোক, উইশ মি গুড লাক। বাই, কাঁদুনে মেয়ে।"

মৌরি তখন ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

--"মেয়ের হাতে ধোলানি খাবেন, ইন-শা-আল্লাহ।" শেষ শব্দটা বেশ টেনে টেনে বলল সে এবং ক্লাসে ফিরে গেল। আজ সায়েবা আসেনি, মোহ আর অধরাই আছে।

দুদিন যাবৎ সবার কানাঘুষা, হাসাহাসি কিংবা গুঞ্জন মোহ কেন যেন উপভোগ করছে। এদের খুব অহংকার। মোহ যেন ইরতেজার গায়ে নয় একদম অহংকারেই পেটের খাবার উগলে দিয়েছে। সে ভালো করেই জানে এসবে ইরতেজার তার ওপরই রাগ হচ্ছে৷ মৌরি এলো এবং সে ভীষণ ভয় পেয়ে আছে। মোহ জিজ্ঞেস করল,

--"কী হয়েছে?"

--"ইরতেজা ভাই আমার পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল।"

অধরা পাশ থেকে উত্তেজিত গলায় বলল,

--"মানে মানে? তোর কাছে এসেছে? তোর গা ধরার চেষ্টা করেছে?"

অধরার কথা শুনে মনে হলো মৌরি নিজেই লজ্জা পেয়েছে। এই মেয়েটা এত লাগামহীন কথা বলে। সে একবার মোহকে পরখ করে ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বলল,

--"না, না। ইরতেজা ভাই আমার থেকে দুই হাত দূরে ছিল।"

তারিয়া কোত্থেকে এসে বলল,

--"বাহ, ইরতেজা ভাই কয় হাত দূরে ছিল সেটাও পরখ করেছ?"

প্রতিবারের মতো অধরা এবারও বিরক্ত হলো তারিয়াকে দেখে। সে খুব করে চায় এই মেয়েটা একবার অন্তত ইরতেজাদের খপ্পরে পড়ুক। নাক অবধি ডুবিয়ে মা*%রুক ওকে। তিড়িংবিড়িং বেরিয়ে যাবে। মৌরি তারিয়ার কথাকে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে বলল,

--"ইরতেজা ভাই বলল আড়াচির নাম্বারটা দিতে।"

তারিয়া অস্ফুট স্বরে বলল, "তুমি দিয়ে দিলে?"

অধরা বলল, "তুমি যে সায়েবার নাম্বার কাশিফকে দিয়েছ?"

তারিয়া চুপসে গেল নিজের কাজে। অধরা কপাল কুঁচকে তারিয়ার দিকে তাকালেও রাগটা গিলে নিল। ইরতেজা মোহর নাম্বার নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সারাদিনেও ইরতেজার পক্ষ থেকে তার কোনো কল আসেনি, ভীষণ অবাক কাণ্ড।

মোহরা ধরতেও পারেনি, সিনিয়রদের একটা মেয়ে গ্যাং তাদের সবসময় নজরে রাখছে।

--"এই মেয়েগুলাই না?"

--"হুঁ, আমরা দুই বছরেও চেষ্টা করে ওদের কাছ ঘেঁষতে পারলাম না আর ওরা দুইদিনের কোন ক্ষেত থেকে উঠে আসা স্টুপিড ফ্রেশার্স এসে আমাদের পছন্দের মানুষকে কেড়ে নিবে? এত সোজা?"

--"আরও কয়েকটা দিন দেখি, ওদের ভালো ব্যবস্থা করব।"

--"ইয়েস, উই আর।"

পরেরদিন ছিল নিহিনের সবথেকে রাগের এবং দুঃখের দিন। সোবহান হাই তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করল,

--"কী ব্যাপার? রাগ কেন? ডেট কেমন গেল?",

--"তোর ডেটের...." নিহিন বিশ্রী একটা গালি ছাড়ল।

কাশিফ ভ্রু কুঁচকে বলল,

--"ব্যাপার কী? তোর হাতও দেখি ব্যান্ডেজ করা। কোথাও মারপিট করেছিস নাকি?"

--"এমন দেওয়া দিয়েছি, ছাগলটা এখন হাসপাতালে।"

স্বচ্ছ বলল,

--"হয়েছে কী বলবি তো।"

--"লাস্ট নাইটে এক কাজিনকে ক্লাব থেকে আনতে গেছিলাম, ছেলেটা ড্রাঙ্ক ছিল বলে ও আমাকে কল দিছে। ওখানে গিয়ে দেখি যেই মেয়ের সাথে ডেট করার কথা ছিল ওই মেয়ে চিল করতেছে।"

--"কেমন চিল?"

--"একটা ছেলের সাথে। অথচ ও আমাকে বলেছিল ওর রিলেশনশিপ নাই আজকে চার-পাঁচ মাস। কিছু দিন আগেও অন্য একটা ছেলের সাথে ছবি পেয়েছিলাম, ইগনোর করেছি। তাই বলে ডেটের আগেরদিন এসব দেখলে মাথা ঠিক থাকে?"

ইরতেজা বলল,

--"একদম কাজের কাজ করে আসছিস।"

--"হুঁ। মেয়েটারে তো ইচ্ছা করছিল জুতাই ধরে, সে এই নিহিন পাটোয়ারীকে চিট করার কথা ভাবছিল, সাহস কত বড়ো। ভাগ্যিস আমি মেয়েদের গায়ে হাত দেই না। নয়তো এটাও হসপিটালে ওর সো কোল্ড বয়ফ্রেন্ডের সাথে দুই বেড পাশাপাশি রোমান্স করত।"

নিহিনের কথা-বার্তার মাঝে সোবহান সতর্কতার সাথে কখন যে কাশিফের ল্যাপটপ নিয়ে কেটে পড়েছে কেউ টেরই পায়নি। সে মিনমিন করে বলল,

--"সরি দোস্ত, বন্ধুরা এক দুইটা কেস না খাওয়ালে প্রকৃত বন্ধু হওয়া যায় না। আমি তোর প্রকৃত বন্ধু বলেই আজ ছোটোখাটো মারাটা দিতে যাচ্ছি। আশা রাখছি মনে কিছু নিবি না।"

সায়েবা সতর্কতার সাথে কাশিফের এসাইনমেন্ট চেক করছে। সোবহান নখ কামড়াতে কামড়াতে বলল,

--"বইন প্লিজ তাড়াতাড়ি কর, ধরা খেলে কেউই আস্ত থাকব না।"

--"এত ভয় পাচ্ছ কেন? চিল! এতদিন চুপ করে এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করেছি।"

--"আজকে কিন্তু এসাইনমেন্ট জমা দেবার শেষ সময়।"

--"ওকে।"

--"আমাদেরটাও ডিলিট করবি নাকি?"

--"না। ডিল অনুযায়ী শুধুমাত্র কাশিফ ভাইয়ের এসাইনমেন্টই পুরোপুরি ডিলিট করব।"

সায়েবা যখন ডিলিট করতে নিচ্ছিল আচমকা কাশিফ ওদের এসে দেখে ফেলল। সায়েবা অডিটোরিয়ামের মাঝারি দিকের সিঁড়িতে বসা আর তার কোলে কাশিফের ল্যাপটপ। কাশিফ চোখ-মুখ গরম করে বলল,

--"কী হচ্ছে এখানে?"

সায়েবা এতটাই ঘাবড়ে যায় যে সে চট করে উঠে দাঁড়ায়, আর অসাবধানবশত কাশিফের ল্যাপটপ তার হাত থেকে পড়ে যায়। সেটা ভাঙতে ভাঙতে সিঁড়ির পেরিয়ে একদম কাশিফের পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে। সোবহান মাথায় হাত দিয়ে বলল,

--"হায় আল্লাহ, আমাদের এসাইনমেন্ট!"

কাশিফ কিড়মিড় চোখে তার ভাঙা ল্যাপটপের দিকে তাকাল। পরপর তাকাল সায়েবার দিকে। এরকম কিছু হবে সায়েবাও ভাবতে পারেনি। সে ভয়াতুর গলায় বলল,

--"স..স..সরি।"

চলবে—

বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং আপনাদের সুন্দর সুন্দর মন্তব্যের অপেক্ষায়।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন