তিথি বিরক্তির স্বরে বলে,
—“এই যে! রাস্তা কি আপনার একার নাকি? আমি তো মানুষ—স্পিড ব্রেকার না!”
আহনাফ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে লজ্জা সহকারে বলল,
—“সরি,আমি দেখি নি। তুমি ঠিক আছো তো?”
তিথি হেসে ঠোঁট কামড়ে উত্তর দিল—
—“আমি গলেই পানি হয়ে গেছি… আর আপনি বললেন, আমি ঠিক আছি কি না!”
তিথির চটপটে স্বভাব দেখে রোনা হেসে বলে উঠল,
—“তুমি তো খুব ফানি! নামটা কী তোমার, পিচ্চি?”
তিথি চোখ বড় বড় করে বলল,
—“আমি পিচ্চি না, তিথি হো মে!”
সাদ্দাম হাসতে হাসতে যোগ করল,
—“হুম… !”
আহনাফ এবার একটু আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—“তুমি প্রিয়ার কী হও, তিথি?”
তিথি এবার পুরো দুষ্টু ভঙ্গিতে হাসল।
—“প্রিয়ার বড় ভাবী আমি… আর সম্পর্ক অনুযায়ী আমি তো আপনাদেরও ভাবী লাগি!”
রোনার হাসিতে ফেটে পড়ল।
—“হাহাহা! তুমি এত দুষ্টু হতে পারো! আমাদের বন্ধুদের কেউ তো বিয়েই করেনি, তো ভাবী কোত্থেকে আসবে?”
সাদ্দাম কপালে হাত দিয়ে বলল,
—“হুম… আমি এখন বুঝলাম, এই মেয়েটা একদম ঝামেলার প্যাকেজ!”
আহনাফ একটু কপাল ভাঁজ করে, চোখে মৃদু হাসি নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল—
—“তো… প্রিয়ার ভাবী, যদি একটু কষ্ট করে আমাদের সেই ভাইয়ের নামটা বলতেন যার সাথে আপনার বিয়ে হয়েছে?”
তিথি হঠাৎ থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।সে জানে এরা কাবিরের কলেজ ফ্রেন্ড ছোটবেলায় প্রমার সাথে খেলতে আসার সময় কয়েক দেখেছিলো এদের কাবিরের সাথে। সে বুঝতে পারল এরা কাবিরের কাছের বন্ধু হলেও কাবির তার বিয়ের কথা কাউকে জানায়নি। সে ফোন বের করে কিছুক্ষণ স্ক্রোল করে কাবিরের সাথে তার একটি ছবি বের করল।
চোখে দুষ্টুমিমাখা ঝলক নিয়ে বলল।
—“দেখুন… ওনিই আমার স্বামী!”
আহনাফ ছবিটা দেখার পর মুহূর্তেই পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। ওর মুখের চওড়া হাসিটা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে সেখানে এক বিষণ্ণ মেঘ জমা হলো। আহনাফ যে মনে মনে তিথিকে পছন্দ করতে শুরু করেছে, সেটা রোনা আর সাদ্দাম বুঝতে পারলেও কাবিরের নামটা শোনার পর তাদের আকাশ থেকে পড়ার দশা হলো।
সাদ্দাম বুক ফাটানো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাটকীয় ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়াল।
সে নিজের হার্টের ওপর হাত রেখে তিথির দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল—
—“না! এ আমি কী দেখলাম! কাবির যে কি না আমাদের গ্রুপের সবচাইতে ইন্ট্রোভার্ট আর বেরসিক ছেলে, সে কি না শেষমেশ আমাদের কাউকে না জানিয়ে এমন চটপটে একটা মেয়েকে বিয়ে করে ফেলল ? ভাবি, আপনি আমাদের বুকটা একদম ভেঙে চুরমার করে দিলেন।”
রোনা তিথির হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে এমনভাবে কান্নার ভান করল যেন বিশাল কোনো শোক সংবাদ পেয়েছে।
সে হাসতে হাসতে ফুঁসিয়ে বলল—
—“তিথি, তুমি এটা কীভাবে পারলে? আমরা ভাবলাম আহনাফ আর তোমার মধ্যে কিছু একটা জমবে, আর তুমি কি না ওই রোবট কাবিরটাকে বেছে নিলে?”
পুরো আড্ডায় হাসির রোল পড়ে গেল। সাদ্দাম আর রোনা মিলে আহনাফকে নিয়ে এমনভাবে মজা শুরু করল যে আহনাফ বেচারা মুখ লুকানোর জায়গা পাচ্ছিল না। বন্ধুদের এই হাসি-ঠাট্টার আড়ালে আহনাফের মনের কোণে জমা হওয়া সূক্ষ্ম ভালোলাগাটা যেন সেখানেই চাপা পড়ে গেল।
হটাৎ তিথির মাথাটা ঘুরে উঠল। এত মানুষের ভিড় আর কোলাহল তার সহ্য হচ্ছিল না।
সে হালকা হাসি ঝুলিয়ে সবার দিকে তাকাল।
—“আচ্ছা, তোমরা এনজয় করো। আমার একটু জরুরি কাজ আছে,”
বলেই সে আর পেছনে তাকাল না।
তিথি ভিড়ের ফাঁক গলে সরে পড়ল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে সে গভীর শ্বাস নিল। হিজাব পরা থাকায় মাথায় তার প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। কোনোমতে করিডোরে এসে সে প্রমার রুমটা খুঁজছিল। কিন্তু ক্লান্তিতে প্রথম না শেষের রুম—সেটা গুলিয়ে ফেলল সে।
শেষের রুমটার সামনে দাঁড়িয়ে সে এলোমেলো মস্তিষ্কে একটা কমন পাসওয়ার্ড ১৬৩৪ চাপল। লক খোলার সাথে সাথে দরজার ওপাশে একরাশ নীরবতা। ঘরটা বাইরের কোলাহল থেকে একদম আলাদা—শান্ত, ঠান্ডা, আর অদ্ভুতভাবে নিরাপদ। তিথি দ্রুত দরজা বন্ধ করে দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিল।
হিজাবটা একটু ঢিলা করে গভীর নিশ্বাস ছাড়ল।
—“আল্লাহ… বাঁচলাম,” ফিসফিস করে বলল সে।
কিন্তু সেই স্বস্তির মাঝেই সে আয়নার সামনে দাঁড়াতে যাবে, ওমনি ওয়াশরুম থেকে শুধু টাওয়াল পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলো কাবির রহমান কায়নাত। চুলে জলবিন্দু, সারা গায়ে জলকণা। নিজের ঘরে কোনো নারীর অস্তিত্ব অনুভব করে কাবির থমকে দাঁড়াল। তার দু চোখ যেন বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হতে চাইল। নিজের দু চোখকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না—তার এই গোপন আশ্রয়ে মেয়েটা ঠিক কীভাবে ঢুকে পড়ল!
*********
নায়ক কাবির রহমান কায়নাত (২৭)। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ময়মনসিংহ শহরে। সাবেক ছাত্র,ময়মনসিংহ সরকারি কলেজ।
"৫ ফুট ১১ ইঞ্চির দীর্ঘদেহী কাবিরের পরনে সবসময় সেই চিরচেনা ব্ল্যাক শার্ট আর হোয়াইট প্যান্ট থাকে। কনুই পর্যন্ত গুটানো হাতা আর কবজিতে থাকা কালো ঘড়িটা তার সৌন্দর্যকে যেন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তার তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি আর মুখের হালকা চাপ দাড়ি যে কাউকেই ভাবিয়ে তুলতে বাধ্য। বাংলাদেশ থেকে স্কলারশিপ নিয়ে ইতালির পলিটেকনিকো ডি মিলানো থেকে ডেটা সায়েন্স ও স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট-এ ব্যাচেলর ও মাস্টার্স শেষ করে।"
পরিবারের আড়ালে পাঁচ বছর আগে কাবির এক আন্ডারগ্রাউন্ড হ্যাকিং প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার নজর কাড়েন এবং পড়াশোনার ৫ বছরেই তাদের ব্লাক-বক্স প্রটোকলের অধীনে দুর্ধর্ষ এজেন্ট হিসেবে গড়ে ওঠে।সে একজন তুখোড় আন্ডারগ্রাউন্ড এজেন্ট, যে পর্দার আড়ালে থেকে ডিজিটাল অপরাধ দমন করে। তার এই দ্বিতীয় জীবনের খবর তার পরিবার কিংবা বিশ্বের কেউ জানে না।
আলতাফ রহমান কাবিরকে খরচ দিতে চাইলে যে স্কলারশিপের টাকাতেই তার সব হয়ে যাচ্ছে এটা বলতো,অথচ গোপনে সে এ কাজ করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করত। তার এই ব্ল্যাক-বক্স প্রটোকলের অধীনে কাজ করার বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ গোপন রাখতো সবার কাছ থেকে।
বর্তমানে দুমাস ধরে কাবির ইতালির একটি বড় কোম্পানি দ্য আরশাদ এন্টারপ্রাইজ এই কোম্পানির
মূল কাজ বড় বড় ভবন নির্মাণ ও জমি কেনাবেচার ব্যবসা। কাবিরের মূল লক্ষ্য আরশাদ চৌধুরীর ইতালির বিশাল মাফিয়ার সাম্রাজ্যের সাথে তার কোম্পানির কোনো অবৈধ পথে চালনা করছে কী না তা বের করা।
★
দীর্ঘ ছয় বছর পর আজ কাবির দেশে ফিরেছে। ছোট্ট তিথি এখন ১৭ বছরের এক সুন্দরী তরুণী। তার চঞ্চলতা কমেনি, বরং বেড়েছে। সে এখন আর সেই অবুঝ মেয়েটি নেই সে এখন পাল্টা জবাব দিতে জানে।
#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট২
#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
চলবে............