তিথির হাঁটু সমান লম্বা ঘন চুল বার বার তার শরীরে বারি খাচ্ছে। বড় বড় চোখ করে আয়নায় খুব মনোযোগ দিয়েই নিজেকে হিজাবটা ওড়নার মতো গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছে।তিথির পরা লং গাউনটা সাদা আর হালকা কালো ফ্লোরাল ডিজাইন দিয়ে ডেকোরেট করা। গলার ডিজাইনটি ছিল নরম গোলাকার, আর স্লিভগুলো ছিল হালকা ফ্লেয়ার করা।কোমর অংশে হালকা টেইলরিংয়ে ড্রেসটি শরীরের আকারকে সুন্দরভাবে ধরে রেখেছে।ঠোঁটে গোলাপী লিপবাম।গালে ব্লাস দেওয়ায় মুখে হালকা চিকচিক করছে।পরিপাটি করে আইলেনার দেওয়া।মেচিং কানের দুল।গলায় সিম্পল টি লেটার পেনডেন্ট।হাত দিয়ে চোখের সামনে এসে পরা চুল বার বার সরিয়ে দিচ্ছে।
ঘোর লাগানো দৃষ্টিতে তিথিকে কাবির দেখতে থাকে।ঘরে পিনপিন নিরবতা, দু জন সত্তার মধ্যে একজন নিজের চোখের তৃষ্ণা মেটাতে ব্যস্ত অপরজন নিজেকে দেখতে ব্যস্ত। কাবির ধীর পায়ে তিথির দিকে যেতে থাকে।
কাবির মনেমনে বলে,
—“কে এই মেয়ে? এর শান্ত উপস্থিতি কেন আমাকে এভাবে টেনে ধরছে? আজ রাতে একে আমার থেকে সহজে যেতে দিচ্ছি না।”
মনে হচ্ছে কোনো অদ্ভুত শক্তি কাবিরকে তিথির দিকে টানছে।কাবির এখনও তিথিকে চিনতে পারেনি। কাবির তিথির ঠিক পিছন দাড়ায়।তিথির পিঠ কাবিরের বুক থেকে কয়েক ইঞ্চি দুরে। কাবির একটু ঝুঁকে তিথির কানের কাছে মুখ রাখে। তিথি তখনও কাঁধের দু পাশে রাখা হিজাবে পিন লাগায়।
কাবির নিজের উপস্থিতি জানান দিতে।
—“আমার রাজ্যে অনুমতি ছাড়া ঢোকা যতটা সহজ, বের হওয়া ততটাই অসম্ভব। যেহেতু ভুলটা করেই ফেলেছ,আজ রাতটা আমার বন্দিশালাতেই কাটুক তোমার। দেখি, তোমার এই মায়াবী চেহারার আড়ালে আর কতটুকু সাহস লুকিয়ে আছে!”
তিথি: (ভয়ার্ত কণ্ঠে, মনে মনে)"কাবির ভাইয়া? আপনি.. আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি তিথি! কিন্তু আপনার চোখে এই হিংস্রতা কেন? আপনি কেন এমন অচেনা মানুষের মতো কথা বলছেন?"
কাবির তিথির নীরবতা দেখে আরও কঠোর স্বরে।
—"কী হলো? কথা বলছো না কেন? আমার চোখের দিকে তাকাও। আজ রাতটা তোমার জন্য অনেক দীর্ঘ হতে চলেছে। তোমার এই ভয় পাওয়া মুখটা আমাকে আরও বেশি প্রলুব্ধ করছে।"
তিথি কাঁপা কাঁপা গলায়।
— "কা... কাবির ভাইয়া, প্লিজ... আমাকে যেতে দিন।"
কাবির একটু অবাক হয়ে, কিন্তু পরক্ষণেই তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে।
— "তুমি আমার নাম জানলে কীভাবে? যাই হোক, একবার যখন এই ঘরে ঢুকেছো, তখন শাস্তি না নিয়ে বের হওয়া অসম্ভব।একরাতের জন্য কত নিবে বলো দশ লাখ...বারো লাখ......।"
কাবিরের শেষ কথাগুলো যেন তিথির কানে তপ্ত সীসার মতো বিঁধল। এক রাতের জন্য টাকার প্রস্তাব শুনে তার আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত লাগল।মেনে নিলাাম কাবির ভাইয়ার সাথে তার ছোটবেলায় বিয়ে হয়েছিলো। তাই বলে তার পরিচিত সেই মার্জিত কাবির ভাইয়া আজ এমন এক পশুতে পরিণত হবে,তা সে কল্পনাও করতে পারেনি।তিথির সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। তার দু চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল।
সে কান্নায় ভেঙে পড়ে অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল।
—“থামুন! আপনার প্রতিটি শব্দ বিষের মতো আমার কানে বিঁধছে। ভাবতেও ঘৃণা হচ্ছে যে আপনার মতো একজন নিচ মানসিকতার মানুষকে আমি এতদিন শ্রদ্ধা করে এসেছি। আমার আত্মসম্মান কি আপনার কাছে দশ-বারো লাখ টাকার চেয়েও সস্তা?”
সে দু হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কান্নার শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। সে কোনোমতে দেয়াল ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু ভয়ের চোটে তার পা দুটো যেন অবশ হয়ে আসছিল। কাবিরের এই হিংস্র চাউনি আর কুৎসিত প্রস্তাব তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত করে দিচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল না, এই অন্ধকার থেকে সে কীভাবে মুক্তি পাবে।
তিথির কান্নায় ভেজা কণ্ঠস্বর আর আর্তনাদ যখন কাবিরের কানে পৌঁছাল, তখন তার অবচেতন মনের কোথাও একটা সূক্ষ্ম কম্পন অনুভূত হলো। তিথির প্রতিটি শব্দ যেন কোনো এক বিস্মৃত অতীতের স্মৃতিকে নাড়া দিচ্ছিল। তার গলার স্বর, কথা বলার ধরন—সবই কাবিরের কাছে বড্ড চেনা চেনা মনে হতে লাগল। মস্তিষ্কের কোনো এক কোণে আবছা হয়ে আসা সেই ছোট্ট মেয়েটির ছবি বারবার উঁকি দিচ্ছিল, যার সাথে তার ছোটবেলায় কোনো এক বন্ধন তৈরি হয়েছিল।
কাবির থমকে দাঁড়াল।যেন নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। সে তিথির আরও কাছে এগিয়ে গেল, তার কান্নার শব্দ যেন কাবিরের হৃদপিণ্ডের স্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
কাবির নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল,
—"কে এই মেয়ে? কেন এর কণ্ঠস্বর আমার ভেতরে এতোটা হাহাকার তৈরি করছে? কেন আমি চাইলেও একে ছেড়ে যেতে পারছি না?"
কাবির ধীর পায়ে আবার তিথির কাছে এগিয়ে গেল। তার হাত দুটো কাঁপছিল। সে তিথির কান্নারত মুখের ওপর থেকে হাত দুটো সরিয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াল।
#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট৩
#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
#চলবে