ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

৪র্থ পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

*

কিন্তু মাঝপথেই থেমে গেল। তার ভেতরে এক প্রবল যুদ্ধ চলছে।

সে অস্ফুট স্বরে নিজেকেই প্রশ্ন করল।

—"কেন আমার ভেতরে এতোলপাথাল হচ্ছে? কেন এই মেয়েটির চোখের জল আমাকে এতোটা দুর্বল করে দিচ্ছে?"

তিথি তখনও ভয়ের চোটে কাঁপছিল। সে খেয়াল করল কাবিরের সেই হিংস্র চাউনিটা এখন এক গভীর বিভ্রান্তিতে রূপ নিয়েছে। কাবির যেন নিজের সাথেই লড়াই করছে। সে তিথির খুব কাছে এসে দাঁড়াল, এতোটাই কাছে যে তিথি কাবিরের তপ্ত নিশ্বাসের আঁচ পাচ্ছিল। কাবির তার চেনা চেনা লাগা সেই মুখটির দিকে অপলক তাকিয়ে রইল, যেন সে কোনো এক হারিয়ে যাওয়া সম্পদ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে।

এক অদ্ভুত অনুভূি নিয়ে কাবির তিথির সামনেই আলমারি থেকে তার পোশাক বের করল। তিথি তখনও মাথা নিচু করে নিজের কান্নায় ডুবে আছে, কাবির যে তার সামনেই ড্রেস চেঞ্জ করছে সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। তার পুরো জগতটা যেন এক নিমিষেই ওলটপালট হয়ে গেছে। কাবির নির্লিপ্তভাবে তার ভেজা তোয়ালেটা সরিয়ে পোশাক বদলে নিল। তার প্রতিটি নড়াচড়ায় এক ধরণের রাজকীয় ধরণ ছিল, যেন তিথির উপস্থিতি তার কাছে এখন কোনো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে না, অথচ তার মন বারবার তিথির দিকেই ফিরে যাচ্ছিল।

কাবির বিভ্রান্ত চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ছিল, যার পরনে সেই সাদা-কালো ফ্লোরাল গাউন আর খোলা চুলে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল এক চিরচেনা মায়া।

ঠিক তখনই দরজায় সজোরে ধাক্কা পড়ল। বাইরে

থেকে প্রমার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল:

—“ভাইয়া! দরজা খোল! তুই কি ভেতরে? দেখ তো, তিথি তোর রুমের দিকে এসেছে কি না! ওকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।”

তিথি নামটা কানে পৌঁছাতেই কাবিরের মস্তিষ্কে যেন একটা বৈদ্যুতিক ঝটকা লাগল। সে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

প্রমা আবার চিৎকার করে বলল,

—“ভাইয়া! তিথি তোর ঘরে ঢুকেছে কি না দেখ! ও অসুস্থ বোধ করছিল, হয়তো ভুল করে তোর ঘরে চলে গেছে। আর ও তো বাইরের কেউ না, ও তোর বিবাহিত স্ত্রী! ওর কিছু হলে আব্বু আমাদের কাউকেই ছাড়বে না।”

কাবিরের হাত দুটো যা একটু আগে হিংস্রতায় কাঁপছিল, তা এখন অপরাধবোধ আর প্রচণ্ড বিস্ময়ে অবশ হয়ে এল। সে ধীরে ধীরে নিজের সামনে কুঁকড়ে থাকা মেয়েটির দিকে তাকাল। যে মেয়েটিকে সে ওয়ান নাইট আর টাকার জঘন্য প্রস্তাব দিয়েছিল, সে অন্য কেউ নয়—সে তার সেই আইনিভাবে বিবাহিত স্ত্রী, যাকে সে বহু বছর দেখেনি বলে চিনতে ভুল করেছিল।

কাবির অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল,

—“তিথি? তুমি... তুমি সেই তিথি?”

কাবির মনেমনে,

—“"কেন মেয়েটা এখনো আমার ওপর এতোটা প্রভাব ফেলে? আমি তো ওকে ঘৃণা করতে চেয়েছিলাম!"

তিথি কান্নায় লাল হয়ে যাওয়া চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে এখন কেবল ভয় নয়, একরাশ ঘৃণা আর পাহাড় সমান অভিমান। সে দেয়াল ধরে কোনোমতে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। তার গলার সেই লেটার পেনডেন্টটা তখন ঝাড়বাতির আলোয় চিকচিক করে উঠল—যেখানে স্পষ্ট করে লেখা T।

কাবিরের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। সে কী করতে যাচ্ছিল? নিজের স্ত্রীর সাথেই সে এমন পশুর মতো আচরণ করল? কাবির এক পা এগিয়ে গিয়ে তিথির হাত ধরতে চাইল।

—“তিথি, শোনো... আমি বুঝতে পারিনি... আমি সত্যিই তোমাকে চিনতে পারিনি।”

তিথি ঝটকা দিয়ে তার হাত সরিয়ে দিল। তার কণ্ঠস্বর এখন ভাঙা কিন্তু তীক্ষ্ণ,

—“চিনতে পারেননি বলে আজ আমাকে পণ্য বানিয়ে ফেললেন, কাবির ভাইয়া?আপনার টাকার দম্ভ কি এতটাই বড় যে মানুষের সম্মান আপনার কাছে সস্তা হয়ে গেছে?”

কাবির কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার সমস্ত অহংকার আর পুরুষত্ব যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। বাইরের থেকে প্রমার ডাকাডাকি তখনও থামেনি। কিন্তু এই বন্ধ ঘরের ভেতরে এখন এক নতুন ঝড়ের সূচনা হয়েছে—যেখানে একদিকে আছে কাবিরের গভীর অনুশোচনা।

আর অন্যদিকে তিথির ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস। বাইরে প্রমার অস্থির পায়চারির শব্দ শোনা যাচ্ছে। কাবির স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো,পায়ের তলার মাটি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। যে মানুষটা একটু আগেও নিজের ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ ছিল, এক মুহূর্তেই সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে তুচ্ছ মানুষে পরিণত হলো। সে তার নিজের স্ত্রীর চোখে নিজের জন্য শুধু ঘৃণা দেখতে পাচ্ছে।

~অতীত~

তারিখ:১৬-১০-২০২১। দিনটি ছিল তপ্ত রোদে ঘেরা এক বিষণ্ণ দুপুর। আলতাফ রহমান সাহেবের ড্রয়িং রুমে বসে মারুফ আহমেদ আর তানিয়া মিথু গভীর আলোচনায় মগ্ন। আলতাফ সাহেবের স্ত্রী সারা ইয়াসমিনও সেখানে উপস্থিত। আলোচনার মূল বিষয় ছিল ১৯ বছরের জেদি তরুণ কাবির এবং মাত্র ১২ বছরের চঞ্চল কিশোরী তিথি।

​কাবির তখন মেধাবী ছাত্র হিসেবে ইতালিতে স্কলারশিপ পেয়েছে। এই খবরটি আলতাফ রহমানের মনে একদিকে যেমন আনন্দ দিয়েছিল,অন্যদিকে এক অজানা শঙ্কা জাগিয়েছিল। তিনি জানতেন, কাবির একবার দেশের বাইরে গেলে তাকে আর ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই বন্ধু মারুফ আহমেদের সাথে পরামর্শ করে তিনি এক চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন—যাওয়ার আগেই কাবিরকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে।

​কাবিরের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি আলতাফ রহমান। তাঁর মতে, বাবার সিদ্ধান্তই সন্তানের জন্য শিরোধার্য। মারুফ আহমেদও তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রস্তাবে অমত করেননি। ফলে দুই পরিবারের সম্মতিতে অনেকটা গোপনেই ১২ বছরের নাবালিকা তিথির সাথে ১৯ বছরের কাবিরের বিয়ে ঠিক হয়ে যায়।

​বিয়ের আসরে কাবির যখন বসল, তার চোখে ছিল পাহাড় সমান ক্ষোভ আর রাগ। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে তার বাবা তার জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত তাকে না জানিয়েই নিয়ে নিলেন। অন্যদিকে, লাল বেনারসিতে মোড়ানো ছোট্ট তিথি তখনও ঠিকমতো বুঝতেই পারছিল না তার সাথে আসলে কী ঘটছে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই কাবিরের ভেতরকার জেদ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল।

​সে রাতেই কাবির সিদ্ধান্ত নিল, সে এখানে আর এক মুহূর্তও থাকবে না। স্কলারশিপের সুযোগ আর বাবার ওপর তীব্র অভিমান নিয়ে সে কাউকে কিছু না বলেই ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করল। পেছনে ফেলে গেল ১২ বছরের এক কিশোরী বধূকে, যার জীবনে বিয়ে শব্দটা তখন কেবলই একটা অর্থহীন খেলা মাত্র।

*

ড্রয়িং রুমে থমথমে পরিবেশ। মাত্রই বিয়ে পড়ানো শেষ হয়েছে। ১২ বছরের তিথি লাল বেনারসিতে জড়োসড়ো হয়ে সোফায় বসে আছে, সে বুঝতেই পারছে না কেন সবাই এত গম্ভীর।

​সারা ইয়াসমিন কান্নাভেজা কণ্ঠে আলতাফ রহমানের উদ্দেশ্যে,

—“ছেলেটা আজ ইতালিতে চলে যাচ্ছে, আর আপনি আজই ওর গলায় এই বিয়ের জোয়ালটা ঝুলিয়ে দিলেন? একবারও কি ওর মনের কথা জানতে চেয়েছেন? এত তাড়া কিসের ছিল আপনার?”

​আলতাফ রহমান কঠিন স্বরে,

—“আমি যা করেছি কাবিরের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই করেছি। ও বাইরে গেলে ওকে বেঁধে রাখার একটা সুতো তো দরকার। এই বিয়েই ওকে একদিন শিকড়ে ফিরিয়ে আনবে।”

​সারা ইয়াসমিন আর্তনাদ করে,

—“শিকড় নয়, আপনি ওর মনে বিষ ঢুকিয়ে দিলেন। ১৯ বছরের একটা ছেলের ওপর আপনি এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে ঠিক করলেন না।”

​ঠিক সেই মূহূর্তে নিজের ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে রুমে ঢুকল কাবির। তার চোখমুখ রাগে লাল হয়ে আছে। সে সোজা তার বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

​কাবির তীক্ষ্ণ এবং বরফশীতল স্বরে,

—“আপনার জেদ তো মিটল আব্বু! আপনার দেওয়া এই পরিচয়টা (বিয়ের কাবিননামা) আজ থেকে আমার গলার ফাঁস হয়ে রইল। তবে একটা কথা শুনে রাখুন— এই বিয়ের খবর যেন এই বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাইরের কেউ যেন জানতে না পারে যে ইতালিতে পড়তে যাওয়া কাবির বিবাহিত। এই সম্পর্ককে আমি কোনোদিন স্বীকৃতি দেব না।”

​কথাটা বলেই কাবির দরজার দিকে পা বাড়াল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে সে আচমকা থমকে দাঁড়াল। সোফায় বসে থাকা ছোট্ট তিথির দিকে সে একবার তাকাল। ১২ বছরের মেয়েটা বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে, তার চোখে অবুঝ এক বিস্ময়।

​কাবির এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। কোনো কথা না বলে, এক ঝটকায় দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে সে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল সারা ইয়াসমিনের গুমরে ওঠা কান্না আর একটা নিস্পাপ মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

__________________বর্তমান____________________

তিথি নিজের হিজাবটা টেনে নিজেকে আবৃত করার চেষ্টা করল। তার কাঁপতে থাকা হাতগুলো বারবার পিন আটকাতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছিল। কান্নায় তার চোখের কাজল লেপ্টে গেছে, কিন্তু সেই অবস্থাতেও তাকে এক ভীষণ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছিল।

কাবির ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। এবার আর হিংস্রতা নয়, তার চোখে ছিল গভীর অনুতাপ।

সে নিচু স্বরে বলল,

—“তিথি, আমি... আমি সত্যিই জানতাম না তুমিই সেই। ইতালিতে এতদিন একা থেকে হয়তো আমার ভেতরের মানুষটা মরে গিয়েছিল। আমাকে মাফ করে দাও।”

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট৪

#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন