তিথি এক পলক কাবিরের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো ভালোবাসা নেই, আছে কেবল একরাশ শূন্যতা।
সে শান্ত স্বরে বলল,
—“চিনতে না পারাটা আপনার অপরাধ নয় কাবির ভাইয়া, কিন্তু একটা অচেনা মেয়েকে আপনি যেভাবে অপমান করেছেন, সেটা আপনার রুচির পরিচয় দিয়েছে। আজ আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও কি আপনি তাকে এভাবেই টাকার অফার করতেন?”
কাবিরের কোনো উত্তর ছিল না। সে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রইল। তিথি কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
লক খোলার আগে সে পেছন ফিরে শুধু এটুকুই বলল,
—“ছোটবেলা থেকে যে মানুষটার জন্য অপেক্ষা করতাম, সে আপনি নন। আপনি একজন অপরিচিত মানুষ, যার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।”
তিথি দরজা খুলতেই প্রমা প্রায় আছড়ে পড়ল ভেতরে। তিথিকে ওভাবে কাঁদতে দেখে প্রমা চমকে উঠল।
—“তিথি! কী হয়েছে তোর? তুই কাঁদছিস কেন? ভাইয়া কি কিছু বলেছে?”
তিথি কোনো উত্তর দিল না। সে প্রমাকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত করিডোর দিয়ে নিচে নেমে গেল। প্রমা হতভম্ব হয়ে ঘরে ঢুকে দেখল কাবির খাটের এক কোণে বিধ্বস্ত হয়ে বসে আছে।
—“ভাইয়া, তুই কি তিথিকে কিছু বলেছিস?”
প্রমার প্রশ্নে কাবির শুধু শূন্য দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরের বসন্তের বাতাস এখন তার কাছে তপ্ত আগুনের মতো মনে হচ্ছে।
কাবির মনে মনে ভাবল, "আমি কি হারিয়ে ফেললাম তাকে, যাকে পাওয়ার আগেই পাওয়ার অধিকার হারিয়েছি?"
তিথি দ্রুত করিডোর দিয়ে নিচে নেমে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখমুখ মুছে নিল। মনের ভেতরে কালবৈশাখী ঝড় বইলেও সে চাইল না তার মা-বাবা কিছু বুঝুক। সে তার ভেতরের কষ্টটাকে এক নিমিষেই জেদে রূপান্তর করল।
মনে মনে বলল— “দাঁড়ান কাবির রহমান কায়নাত! আপনি না আমাকে পণ্য ভেবেছিলেন?এবার দেখুন এই পণ্য আপনাকে কীভাবে নাচায়!”
প্রমা তিথিকে এক কোণায় টেনে নিয়ে গেল। প্রমার চোখেমুখে এখনো বিস্ময় আর কৌতূহল।
সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস কর,
—“এই তিথি, সত্যি করে বল তো—তুই ভাইয়ার রুমে ঢুকলে কীভাবে? আমি তো ভেবেছিলাম তুই আমার রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে আছিস!”
তিথি একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল,
—“আরে, তুই-ই তো বললি ১৬৩৪ পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকে যেতে! আমি গিয়ে দেখি দরজা খুলে গেল। তারপর ভেতরে যা হলো... উফ!”
প্রমা এবার হো হো করে হেসে উঠল। সে পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
—“আরে পাগলী! ওটা তো আমার রুমের পাসওয়ার্ড না,ওটা ভাইয়ার রুমের পাসওয়ার্ড! আমি তোকে ইচ্ছা করেই ভুল পাসওয়ার্ড দিয়েছিলাম যাতে তুই সরাসরি ভাইয়ার গুহায় গিয়ে পড়িস। আমি জানতাম ওই রোবট ভাইয়াটাকে লাইনে আনতে হলে তোকেই তার সামনে পাঠাতে হবে।”
তিথি চোখ বড় বড় করে তাকাল।
—“তার মানে তুই সব জানতিস? তুই জানতিস কাবির ভাইয়া রুমে আছে?”
প্রমা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল,
—“অবশ্যই! আমি চেয়েছিলাম তোদের এই ছয় বছরের দূরত্বটা এক ঝটকায় শেষ হয়ে যাক। তো,ভেতরে গিয়ে কী দেখলি? ইতালিয়ান সিইও-র অবস্থা কেমন ছিল?”
তিথি এবার একটু লজ্জা পেলেও সেটা আড়াল করে বলল,
—“তোর ভাইয়া তো আমায় চিনতেই পারেনি! উল্টো আমাকে ধমক দিচ্ছিল। কিন্তু চিন্তা করিস না,প্রমা। তোর ভাইকে এমন নাচন নাচাবো যে সে ইতালির নাম ভুলে যাবে।”
#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট৫
#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
#চলবে