★
প্রমা তো থ! একটু আগে যে মেয়েটা ঘরে কান্নায় ভেঙে পড়ছিল,সে এখন হাসছে?
প্রমা তিথিকে একপ্রকার টেনে নিয়ে গেল স্টেজের ওপর। সেখানে প্রিয়া আর তার বর ইমরান ক্লান্ত হয়ে বসে ছিল। তিথি স্টেজে উঠেই প্রিয়ার বরের দিকে তাকিয়ে এমন এক লুক দিল যেন সে বিশাল বড় কোনো অপরাধী।
তিথি প্রিয়ার কানে ফিসফিস করে বলল,
—“আপু, দুলাভাইকে কি ডায়েট করিয়ে এনেছ? চেহারা তো দেখি শুকিয়ে আমশি হয়ে গেছে!”
পুরো স্টেজে হাসির রোল পড়ে গেল। প্রিয়া হাসতে হাসতে বলল,
—“তুই এখনো সেই পিচ্চিটাই আছিস রে তিথি!”
সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে কাবির দেখছিল সব। সে নিচে নামতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। তিথির এই রূপ সে কল্পনাও করতে পারেনি। যে মেয়েটা দশ মিনিট আগে তার সামনে অপমানে কুঁকড়ে যাচ্ছিল,সে এখন পুরো বিয়ের আসর মাতিয়ে রাখছে!
তিথি স্টেজের ওপর থেকে আড়চোখে দেখল কাবির ওকে দেখছে। সে এবার দুষ্টুমির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল। সাদ্দাম আর আহনাফ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।
তিথি হাসতে হাসতে আহনাফের কাছে গিয়ে বলল,
—“আহনাফ ভাইয়া! আপনি না বলেছিলেন আমাকে পছন্দ করেন? দেখুন তো,এই গোলাপটা আমার খোঁপায় সুন্দর লাগবে কি না?”
আহনাফ অপ্রস্তুত হয়ে হাসল,সে কখন বলল তিথিকে পছন্দ করে তাদের তো কিছুক্ষণ আগেই একবার দেখা হলো।কিন্তু কাবিরের হাত তখন মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেছে।
তার নিজের স্ত্রী অন্য একজন ছেলের সাথে এভাবে কথা বলছে, হাজার হোক তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এটা তার সহ্যশক্তির বাইরে চলে যাচ্ছে।
প্রমা কাবিরের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে কাবিরকে বলল,
—“ভাইয়া,দেখছিস তিথিকে? ও তোকে একদম পাত্তাই দিচ্ছে না! মনে হচ্ছে ও ভুলে গেছে আজ সন্ধ্যায় তোর রুমে কী হয়েছিল।”
কাবির দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—“ও ভুলেনি প্রমা, ও আমাকে জ্বালাচ্ছে। ও জানে আমি ওকে দেখছি।”
🎤
তিথি এবার স্টেজের ওপর মাইক তুলে নিল। সাউন্ড সিস্টেমে জোরে গান বাজিয়ে সে প্রিয়াকে নিয়ে নাচতে শুরু করল। তার টানাটানা চোখ দুটো বারবার কাবিরের দিকে যাচ্ছিল।
কাবির একপর্যায়ে ভিড় ঠেলে তিথির একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তিথি নাচের মাঝেই কাবিরের সাথে ধাক্কা খেল।
এবার সে সরি বলল না, বরং ভ্রু কুঁচকে বলল:
—“ওমা! ইতালিয়ান সিইও যে! আপনি কি এখানেও কী কাউকে কত টাকা দেবেন সেই হিসাব করতে এসেছেন নাকি?”
কাবির নিচু গলায় বলল,
—“তিথি, বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। চলো আমার সাথে, কথা আছে।”
তিথি খিলখিল করে হেসে উঠল।
—“দুঃখিত স্যার! আমি ব্যস্ত। আমার মতো দামী মানুষের সময় তো বড্ড অল্প, তাই না?”
বলেই সে আহনাফের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল নাচের মাঝখানে। কাবির মাঝপথে একা দাঁড়িয়ে রইল,তার চোখে এখন তীব্র আগুন আর অনুশোচনার সংমিশ্রণ। সে বুঝতে পারছে, এই তিথিকে সামলানো এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে।
********
প্রিয়া লাল বেনারসি পরে যখন ঘর থেকে বের হলো, তার দু চোখ দিয়ে অবিরাম জল ঝরছে। আলতাফ রহমান মেয়ের মাথায় হাত রাখতেই প্রিয়া ডুকরে কেঁদে উঠে বাবার বুকে আছড়ে পড়ল। পাথর শক্ত আলতাফ রহমানের চোখ থেকেও আজ জল গড়িয়ে পড়ছে।
তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন,
—“পরের বাড়ি যাচ্ছিস মা, সবার সাথে মিলেমিশে থাকিস। কোনো কষ্ট হলে মনে করিস তোর এই বাবা বেঁচে আছে।”
সারা ইয়াসমিন মেয়ের গাল ধরে চুমু খেলেন, কিন্তু কান্নায় তার গলা দিয়ে কথা সরছে না। প্রমা প্রিয়ার হাত ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। এক রাতের ব্যবধানে যেন বোনটা পর হয়ে যাচ্ছে।
তিথি এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু প্রিয়ার কান্না দেখে তারও বুক ফেটে যাচ্ছে। সে প্রিয়ার কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরল।
প্রিয়া তিথির কানে ফিসফিস করে বলল,
—“তিথি, তুই কিন্তু আমাদের এই বাড়িটার প্রাণ হয়ে থাকবি। আমার মা-বাবাকে দেখে রাখিস। আর কাবির ভাইয়াকে বড্ড বেশি জ্বালাস না, আমার ভাইটা বাইরে থেকে কঠিন হলেও ভেতরে তোর জন্যই পাগল।”
তিথি চোখের জল মুছে একটা দুষ্টু হাসি দিল।
—“আপু, তুমি নিজের চিন্তা করো! দুলাভাই যদি তোমাকে বেশি জ্বালায়,তবে জাস্ট একটা কল দিও। আমি আর প্রমা গিয়ে দুলাভাইয়ের বাড়ির জানালার কাচ ভেঙে দিয়ে আসব!”
প্রিয়া অশ্রুসিক্ত চোখেও হেসে ফেলল।
★
প্রিয়া গাড়ির দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে গেছে। কাবির এগিয়ে এসে প্রিয়ার কাঁধে হাত রাখল। প্রিয়া মুহূর্তেই বড় ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল।
কাবির গলা ধরে আসা স্বরে,
—"কাঁদিস না প্রিয়া। তুই তো জানিস, তোর এই ভাইটা তোকে কতটা ভালোবাসে। নতুন জীবনে কোনো সমস্যা হলে, কেউ কিছু বললে তুই শুধু আমাকে একটা ফোন দিবি। আমি যতো দূরেই থাকি না কেন ঠিক চলে আসবো"
প্রিয়াকাঁদতে কাঁদতে,
—"ভাইয়া, তুমি নিজের খেয়াল রেখো। সারাদিন শুধু কাজ আর বিজনেস নিয়ে থেকো না। এবার একটু নিজের জীবনের দিকে তাকাও। আর হ্যাঁ,তিথিকে একদম হারাবে না। ও অনেক অভিমানী, ওকে আগলে রাখার দায়িত্ব তোমার।"
কাবির প্রিয়ার মাথায় চুমু খেয়ে তাকে আলতো করে সরিয়ে দিল। এবার প্রমা এগিয়ে এল। সে প্রিয়ার হাত দুটো শক্ত করে ধরে রাখল।
প্রমা: "আপু, তুই চলে গেলে আমার ঘরটা তো একদম খাঁ খাঁ করবে। আমার ড্রেসগুলো এখন কে চুরি করে পরবে? কার সাথে আমি মাঝরাতে আইসক্রিম নিয়ে
কাড়াকাড়ি করব?"
প্রিয়া ম্লান হেসে প্রমার গাল মুছে দিয়ে,
—"কেন? তিথি আছে না? এখন থেকে ওই তোর সব। আর শোন প্রমা, ভাইয়া কিন্তু অনেক জেদী। তুই মাঝখানে থেকে ভাইয়া আর তিথির মধ্যকার দূরত্বটা কমিয়ে দিস। এটা তোর ওপর আমার বড় দায়িত্ব রইল।"
প্রমা: "তুই একদম চিন্তা করিস না আপু। আমি আর তিথি মিলে ভাইয়াকে এমন নাচন নাচাবো যে ভাইয়া বিদেশে যাওয়ার কথা ভুলেই যাবে। তুই শুধু দুলাভাইয়ের সাথে সুখে থাকিস।"
ঠিক তখন প্রিয়ার বর গাড়ি থেকে নেমে এল। কাবির তার হাত ধরে গম্ভীর কিন্তু আবেগী গলায় বলল,
— "আমার কলিজার টুকরোটাকে আপনার হাতে তুলে দিলাম। কোনোদিন ওর চোখে জল আসতে দেবেন না।"
দুলাভাই হেসে মাথা নাড়লেন। প্রিয়া শেষবারের মতো কাবির আর প্রমার দিকে তাকিয়ে গাড়িতে বসল।
গাড়িটা চলতে শুরু করলে প্রমা চিৎকার করে বলতে লাগল,
— "আপু! কাল সকালেই কিন্তু ফোন দিবি!"
গাড়িটা চলে যাওয়ার পর কাবির আর প্রমা একে অপরের দিকে তাকাল। প্রমা দেখল কাবিরের চোখেও এক ফোঁটা জল চিকচিক করছে, যা সে দ্রুত আড়াল করে নিল।
বন্ধুমহলের কাবিরের উপর চোখ পরলো।
সাদ্দাম সবার আগে গিয়ে কাবিরের ঘাড়ের ওপর হাত রেখে ঝুলে পড়ল।
—“কিরে কাবির? অনেকক্ষণ তো বড় ভাইয়ের মতো সিরিয়াস মুখ করে কনে বিদায় দিলি, এখন একটু আমাদের দিকে ফিরে তাকা। আমরা কি তোর বিয়ের বাড়িতে শুধু খাওয়ার জন্য এসেছি?”
রোনা পাশে দাঁড়িয়ে হাত ভাঁজ করে বাঁকা চোখে তাকাল।
—“আসলে ও তো এখন আমাদের চিনবেই না! দেশে ফিরেই আস্ত একটা ডিনামাইট—থুড়ি, তিথির পাল্লায় পড়েছে তো, মাথাটা মনে হয় হ্যাং হয়ে গেছে।”
*
কাবির তার বন্ধুদের অতীতে বিয়ে,ইতালিতে যাওয়া,বর্তমানে ইতালির বড় কোম্পানি দ্য আরশাদ এন্টারপ্রাইজ এর সিইও জব করা। আরশাদ চৌধুরী ও তার মেয়ে রাইনার সম্পর্কে সব বলে।
কাবিরের কথা শুনে রোনা, সাদ্দাম আর আহনাফ যেন আকাশ থেকে পড়ল। গত কয়েক মিনিট ধরে তারা যে মেয়েটিকে নিয়ে ঠাট্টা করছিল, যে মেয়েটির সাথে আহনাফ ফ্লার্ট করার চেষ্টা করছিল—সে কি না কাবিরের স্ত্রী! তাও আবার ছয় বছর ধরে?
আহনাফ অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠল,
— "কী বলছিস এসব কাবির? ইয়ার্কি করার আর জায়গা পাসনি? তিথি তোর বউ হলে তুই এতদিন আমাদের বলিসনি কেন?"
কাবির চোয়াল শক্ত করে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে রইল। সেখানে তিথি তখনো হাসছে।
কাবির ধীর গলায় বলল,
— "ইয়ার্কি করছি না আহনাফ। ছয় বছর আগে আমাদের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু সেই সম্পর্কের কোনো মর্যাদা আমি কোনোদিন দিইনি, তাই হয়তো বলার প্রয়োজনও মনে করিনি।"
সাদ্দাম অবাক হয়ে বলল,
— "তার মানে আজ সন্ধ্যায় প্রমার রুমে যা হচ্ছিল...তা সত্যি?"
কাবির চুপ করে রইল। তার নীরবতাই সব উত্তর দিয়ে দিচ্ছিল।
তারা সবাই একই কলেজের বন্ধু, অথচ তাদেরই একজন এত বড় একটা সত্য ছয় বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছে!
রোনা তীব্র চোখে কাবিরের দিকে তাকিয়ে,
—"তুই আমাদের সাথে এতদিন নাটক করেছিস, কাবির? আমরা যখন তোকে বিয়ের কথা বলতাম, তুই হাসতি। অথচ তুই অলরেডি ম্যারিড? তাও আবার ছয় বছর!"
আহনাফ অবিশ্বাসের সুরে বলল,
—"রোনা ঠিকই বলেছে। তুই তো আমাদের ট্রাস্ট ভেঙেছিস। আর তিথি... ও কি তবে এই ছয় বছর তোর এই লুকোচুরির শিকার হয়েছে?"
কাবির চোয়াল শক্ত করে মাথা নিচু করে রইল। সে বুঝতে পারছে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের কাছে সে আজ ছোট হয়ে গেছে।
সাদ্দাম মাথা চুলকে সরিয়ে
— "ভাই, আমি তো ভাবতেই পারছি না। ওই যে মেয়েটা স্টেজে দাঁড়িয়ে সবার সাথে মজা করছে, সে আমাদের ভাবি? আর তুই কি না কিছুক্ষণ আগে ওর সাথে ওমন ব্যবহার করলি?"
মঞ্চ থেকে তিথি তখনো তাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। সে যেন দূর থেকেই বন্ধুদের এই অস্থিরতা উপভোগ করছে। সে গ্লাস হাতে একটু এগিয়ে এসে উচ্চস্বরে বলল,
—"কী হলো তোমরা চুপ কেন? ছয় বছর আগের পুরনো ধুলোবালি আজ হঠাৎ চোখের সামনে উড়ে এল?"
রোনার কাবিরের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
—"কাবির, তুই এখনই গিয়ে ওকে থামা। ও তোকে সবার সামনে তামাশা বানাচ্ছে!"
কাবির ঠাণ্ডা গলায়,
—"থাম রোনা। ও যা করছে, করতে দে। আমিই তো চেয়েছিলাম ও সবার সামনে না আসুক। আজ ও এসেছে, নিজের পরিচয় নিজেই দিচ্ছে। এতে আমার আর কিছু করার নেই।"
আহনাফ কাবিরের কাঁধে হাত রেখে বলল,
—"বন্ধু হিসেবে বলছি কাবির, তুই তিথির সাথে যা করেছিস সেটা ঠিক হয়নি। আমি অবাক হচ্ছি তোর ওপর—এতটা নিষ্ঠুর তুই কীভাবে হলি?"
#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট৬
#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
#চলবে