ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

৭ম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

রাত এগারোটা বাজে। বিয়ের ধকল কাটিয়ে বাড়ির সবাই যখন কিছুটা জিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই লিভিং রুমে বোমা ফাটালো তিথি।

সে সোফায় পা তুলে বসে আয়েশ করে বলছিল,

—“উফ, শরীরটা কেমন ম্যাচম্যাচ করছে! এই সময়ে যদি এক বাটি চকলেট চিপস আইসক্রিম পাওয়া যেত, তবে কলিজাটা একদম জুড়িয়ে যেত।”

প্রমা পাশে বসে ছিল, সে সুযোগ বুঝে তিথির সাথে সুর মেলালো।

—“ঠিক বলেছিস তিথি! আমারও খুব আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এই রাতে কে এনে দেবে?”

তিথি আড়চোখে পাশে বসা কাবিরের দিকে তাকাল। কাবির তখন ল্যাপটপে কী যেন দেখছিল। তিথি গলা বাড়িয়ে বলল,

—“কেন? বাড়িতে এত বড় একজন ইতালিয়ান সিইও আছেন, আর আমরা আইসক্রিম পাব না?”

সাদ্দাম, আহনাফ আর রোনা তখনো যায়নি,তারা ড্রয়িংরুমেই ছিলো।

সাদ্দাম ফোড়ন কেটে বলল,

—“দোস্ত,বোন আর বউয়ের আবদার! না করলে কিন্তু আজ রাতে তোর কপালে ঘুম নেই।”

কাবির বিরক্ত হয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করল।

—“এত রাতে আইসক্রিম দোকান খোলা নেই। কাল সকালে আনিয়ে দেব।”

তিথি এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহনাফের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আহনাফ ভাইয়া, আপনি থাকলে কি আর আমাকে কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো? আপনি তো যেমন নাচে সেরা, তেমন মনের দিক থেকেও অনেক বড়। আপনিই পারতেন এই দুঃখিনী বোনটার ইচ্ছে পূরণ করতে।”

আহনাফের নাম শুনতেই কাবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। আহনাফ বেচারা কাঁচুমাচু হয়ে বলল,

—“আরে আমি তো এখুনি গিয়ে নিয়ে আসতে পারি, কিন্তু কাবির যদি...”

কাবির ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—“কাউকে যেতে হবে না। আমি যাচ্ছি। কার কার লাগবে নাম বলো।”

তিথি খিলখিল করে হেসে উঠল।

—“শুধু আনলে হবে না! আমরা সবাই মিলে যাব। এই মাঝরাতে ফাঁকা রাস্তায় আইসক্রিম খাওয়ার মজাই আলাদা। প্রমা, সাদ্দাম ভাইয়া, আহনাফ ভাইয়া, রোনা আপু—সবাই চলো!”

গাড়িতে ওঠার সময় তিথি ইচ্ছা করেই আহনাফের পাশে বসতে চাইল।

—“আহনাফ ভাইয়া, আপনি কিন্তু আমাকে ওই নাচের স্টেপগুলো আবার শেখাবেন। আপনার ওই যে কাঁধ ঝাঁকানোর মুভমেন্টটা... জাস্ট ওয়াও!”

ড্রাইভিং সিটে বসা কাবিরের হাত স্টিয়ারিংয়ে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। সে আয়নায় তিথির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,

—“তিথি, সিটে ঠিকমতো বসো। আর আহনাফ, তুই যদি নাচতে চাস তবে গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় গিয়ে নাচ।”

পেছনের সিটে সাদ্দাম প্রমার দিকে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,

—“দেখলে প্রমা? কাবিরের ইঞ্জিনে এখন আইসক্রিমের চেয়ে বেশি আগুন জ্বলছে!”

প্রমা ওড়নাটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে লাজুক হেসে বলল,

—“সাদ্দাম ভাইয়া,আমি আপনাকে কী বলে ডাকবো।"

সাদ্দাম এবার প্রমার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নরম স্বরে বলল,

—“আমি তো বলেছি প্রমা, এখন থেকে আমাকে শুধু সাদ্দাম বলবে। আর তোমাকে আমি শুরু থেকেই তুমি ডাকার অধিকার আদায় করে নিয়েছি।”

পাশে বসা রোনা সবটা দেখছিল। সে কলেজ লাইফ থেকেই আহনাফকে পছন্দ করে, কিন্তু আহনাফ তিথির চঞ্চলতায় মুগ্ধ থাকে। রোনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহনাফকে কনুই দিয়ে খোঁচা দিল।

—“কিরে আহনাফ, তুই কি সারাজীবন তিথির ফ্যান হয়েই থাকবি? পাশে যে একজন স্কুল টিচার বসে আছে, তার দিকে তো তোর নজর নেই।”

আহনাফ একটু ঘাবড়ে গিয়ে ফিসফিস করল,

—“আরে রোনা, তুই তো আমাদের সবার প্রিয় বন্ধু। আর তিথি তো ছোট মানুষ, ও একটু প্রশংসা করল তাই...”

রোনা মনে মনে হাসল। সে জানে আহনাফ তাকে কেবল বন্ধু'ই ভাবে, অথচ রোনা আজও সেই কলেজের দিনগুলোর মতো তাকেই মনে মনে চেয়ে যাচ্ছে।

🍨

আইসক্রিমের দোকানে ঢুকে তিথি আহনাফের জন্য ফ্লেভার পছন্দ করতে করতে বলল,

—“আহনাফ ভাইয়া, আপনি এই ডার্ক চকলেটটা ট্রাই করুন, আপনাকে খুব মানাবে।”

কাবির এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আহনাফ আর তিথির মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

—“আহনাফ নিজেরটা পছন্দ করতে পারবে তিথি। তুমি তোমার কাজে মন দাও। আর আহনাফ, তুই বাবার কোম্পানি চালাস নাকি তিথির কথায় উঠবস করিস, সেটা ক্লিয়ার কর।”

সাদ্দাম হাসতে হাসতে প্রমার দিকে আইসক্রিমের চামচ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

—“তুমি খেয়ে দেখো তো প্রমা। কাবির তো আজ রাতে নির্ঘাত স্ট্রোক করবে। রোনা, তুই শুধু দেখ, আমাদের ইতালিয়ান সিইও আজ আইসক্রিম নিয়ে কীভাবে মারামারি করে!”

রোনা আহনাফের প্লেট থেকে এক চামচ আইসক্রিম জোর করে তুলে নিয়ে খেয়ে ফেলল।

আহনাফের চোখের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জিং গলায় বলল,

—“আহনাফ,আমার ডার্ক চকলেটটা কিন্তু তুই অর্ডার করবি, এটা আমার হুকুম।”

আহনাফ প্রথমবার একটু লাজুক হাসল। সে বুঝতে পারল রোনা আজ তাকে তিথির থেকে সরাতে চাইছে।

~

অন্যদিকে কাবিরের রাগী মুখ দেখে তিথি মনে মনে একটু ভয়ও পাচ্ছে, কারণটা সে নিজেও জানে না।

আইসক্রিমের দোকান থেকে বেরিয়েই তিথি যখন রাস্তার ওপাশে বিশাল মাঠটা দেখল, রাতের নিস্তব্ধতায় এক শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আকাশজুড়ে বিশাল একটা চাঁদ,যার রুপোলি আলোয় ভিজে যাচ্ছে শহরের পিচঢালা রাস্তা আর মাঠের সবুজ ঘাস।

সবাই যখন সেই ফুটবল মাঠে গিয়ে পৌঁছাল, তখন চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়ে এল। দূর থেকে দু-একটা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। মাঠের এক কোণায়, ঘাসের ওপর শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এক ভিখারি ছেলে, দিনের ক্লান্তি শেষে আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে এই নির্জন মাঠে।

তিথি তার লম্বা গাউনটা একটু উঁচিয়ে ধরে আহনাফের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আহনাফ ভাইয়া, চলুন! আজ কাবির ভাইয়াকে বুঝিয়ে দিন যে আপনি শুধু নাচে নয়, ফুটবল খেলাও সেরা!”

কাবির তখন রাগে নিজের জ্যাকেটের হাতা গোটাচ্ছে। সে আহনাফের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—“আহনাফ, তুই তিথির জন্য আজ মাঠে এসেছিস, কিন্তু ফেরার পথটা তোর জন্য খুব একটা সুখকর হবে না, মনে রাখিস!”

তারপর তিথির দিকে ফিরে শাসন করার সুরে বলল, —“তিথি, তুমি গাউন পরে ফুটবল খেলবে? পাগল হয়েছ নাকি? চলো বাসায় যাই।”

কিন্তু তিথি কার কথা শোনে! মাঠের এক কোণায় সাদ্দাম আর প্রমা। সাদ্দাম একটা পুরনো বল খুঁজে এনে প্রমার সামনে রাখল।

সাদ্দাম খুব নরম গলায় বলল,

—“প্রমা, এদিকে আসো। শুধু দেখলেই হবে না, একটু ট্রাই করো।”

প্রমা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,

—“সাদ্দাম ভাইয়া, আমি তো ফুটবল কক্ষনো খেলিনি! যদি পড়ে যাই?”

সাদ্দাম মৃদু হেসে প্রমার একদম পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। সে প্রমার কোমরের দুপাশে হাত রেখে তাকে স্থির করল,তারপর নিচু হয়ে প্রমার ডান পা-টা বলের কাছে নিয়ে এল। সাদ্দামের হাতের স্পর্শ আর ঘাড়ের কাছে তার তপ্ত নিঃশ্বাস অনুভব করে প্রমা শিউরে উঠল। লজ্জায় তার ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে গেল।

সাদ্দাম প্রমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—“পড়ে যাবে না, আমি তো আছি। শুধু আমার পায়ের সাথে পা মিলিয়ে একটা শট দাও।”

প্রমা সাদ্দামের এই ঘনিষ্ঠতায় এতটাই আড়ষ্ট হয়ে গেল যে সে বলের বদলে ঘাসে লাথি মারল। সাদ্দাম হেসে প্রমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু জোরে চেপে ধরল।

প্রমা নিচু স্বরে বলল,

—“সাদ্দাম ভাইয়া, সবাই তাকিয়ে আছে কিন্তু! ছেড়ে দিন না।”

সাদ্দাম চোখ টিপে বলল,

—“সবাই সবার মতো ব্যস্ত প্রমা। দেখো, রোনা কিন্তু ঠিকই আহনাফকে মার্ক করে ফেলেছে।”

সত্যিই, রোনা তখন আহনাফকে একরকম তাড়া করছে বল কেড়ে নেওয়ার জন্য। রোনা হাসতে হাসতে বলল,

—“ আহনাফ, দেখে নিস আমি কিন্তু এই গোলটা হতে দেব না!”

আহনাফ বল নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তিথির দিকে তাকাল। তিথি তার গাউনটা এক হাতে ধরে হাততালি দিচ্ছে আর চিৎকার করে বলছে,

—“আহনাফ ভাইয়া, গোল! আপনিই চ্যাম্পিয়ন!”

কাবির এবার আর সহ্য করতে পারল না। সে সজোরে দৌড়ে এসে আহনাফের সামনে একটা স্লাইড ট্যাকল করল। আহনাফ ছিটকে পড়ে যেতেই কাবির বলটা কেড়ে নিয়ে সজোরে এক শট মারল। বলটা গোলের জালে জড়িয়ে যেতেই কাবির তিথির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কিন্তু তীব্র গলায় বলল,

—“গোলটা কিন্তু আমি দিলাম তিথি। এবার তুমি তোমার এই চ্যাম্পিয়নকে মাঠ থেকে তুলে নিয়ে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নাও।”

⛹️‍♀️⛹️‍♀️

হঠাৎ তিথি জেদ ধরে বসল, সেও একটা শট মারবে। তার পায়ে ছিল পাতলা ফিতার সুন্দর স্যান্ডেল। সে গাউনটা দুই হাতে একটু ওপরে তুলে ধরে, কোমর বাঁকিয়ে সজোরে একটা কিক মারল বলটার দিকে। কিন্তু কপাল খারাপ, বলের বদলে তার পায়ের স্যান্ডেলের ফিতা মটাৎ করে ছিঁড়ে গেল। ডান পায়ের স্যান্ডেল সজোরে ছিটকে উড়ে গেল রাতের আঁধার চিরে।

"উফফ!" - তিথি ব্যথায় এক পায়ে লাফাতে লাগল।

কিন্তু আসল মজা হলো তখনই। ছিটকে যাওয়া স্যান্ডেলটা সরাসরি গিয়ে পড়ল মাঠের কোণায় ঘুমিয়ে থাকা সেই ভিখারি ছেলেটার মাথার ওপর! ছেলেটি ধড়ফড় করে উঠে বসল। তার চোখে তখনো ঘুমের ঘোর। সে একবার ওপরের চাঁদটার দিকে তাকায়, একবার শূন্য মাঠের দিকে, আর একবার হাতে থাকা তিথির দামি স্যান্ডেলটার দিকে!

হতভম্ব ছেলেটা কিচ্ছু না বুঝে কিছুক্ষণ স্যান্ডেলটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর চারদিকে মানুষ দেখে ভয়ে আর ব্যথায় হঠাৎই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠল!

সবাই এই কাণ্ড দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল। কাবিরের রাগ মুহূর্তের জন্য কর্পূরের মতো উবে গেল।

সে তিথির দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল, —“তিথি, তুমি গোল দেওয়ার বদলে মানুষের মাথা ফাটানো শুরু করলে? এটা কোন ধরনের পাওয়ার?”

তিথি লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল। সে ডান পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দৌড়ে গিয়ে ছেলেটির পাশ থেকে স্যান্ডেলটা কুড়িয়ে নিল।

কাঁচুমাচু মুখে বলল,

—“আরে আমি তো... ভুল হয়ে গেছে!”

সাদ্দাম হাসতে হাসতে প্রমাকে বলল,

—“দেখলে প্রমা? তিথি গোল দেওয়ার বদলে ডাইরেক্ট অ্যাটাক করা শুরু করেছে! এই জন্যেই তো বলি, মেয়েদের ফুটবল খেলা রিস্কি!”

প্রমা হাসতে হাসতে বলল,

—“সাদ্দাম ভাইয়া, আপনিও না! তিথি তো ইচ্ছা করে করেনি!”

রোনা আহনাফকে টেনে তুলতে তুলতে বলল,

—“এবার বুঝেছিস আহনাফ? তিথি শুধু তোকে নয়, গোটা দুনিয়াকে অস্থির করে রাখবে! তুই বরং আমার সাথে চল, অন্তত তোর মাথাটা সেফ থাকবে।”

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট৭

#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন