ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

৮ম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

❤️‍🔥

চরপাড়া মোড় থেকে হাঁটতে হাঁটতে সবাই যখন শশী লজের সামনে পৌঁছাল, তখন সবার অবস্থা প্রায় দফারফা। প্রায় ৪০-৪৫ মিনিটের এই দীর্ঘ হাঁটাপথে তিথি ডান পা খালি রেখেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটেছে।

কাবির কয়েকবার বিরক্ত হয়ে নিজের দামী চামড়ার জুতো জোড়া খুলে তিথির দিকে এগিয়ে দিয়েছিল।

সে গম্ভীর গলায় বলেছিল,

—“তিথি, তুমি জিপসিদের মতো এক পা খালি রেখে কতক্ষণ হাঁটবে? আমার জুতোটা পরে নাও।”

তিথি ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিয়েছিল,

—“আপনার এই রাক্ষুসে সাইজের জুতো পরলে তো আমি হাঁটতেই পারব না, বরং উল্টে পড়ে গিয়ে এবার দাঁত ভাঙব। দরকার নেই, আমি এভাবেই ঠিক আছি।”

কাবির এর আগেই ড্রাইভারকে কল দিয়ে গাড়িটা পার্কিংয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল, কারণ সে চেয়েছিল রাতের এই নির্জন ময়মনসিংহের রাস্তা দিয়ে একটু সময় কাটাতে। কিন্তু পরিস্থিতি যে এমন জুতো-কাণ্ডে গড়াবে তা সে ভাবেনি।

*

শশী লজের সেই বিশাল লোহার গেটের সামনে এসে দাঁড়াল সবাই। রাত এখন অনেক, গেট ভেতর থেকে তালাবদ্ধ। লজের পুরনো দালানটা চাঁদের আলোয় এক রহস্যময় রূপ নিয়েছে।

হঠাৎ প্রমা উত্তেজনায় বলে উঠল,

—“সাদ্দাম ভাইয়া, শশী লজের ভেতরের বাগানটা রাতে নাকি খুব সুন্দর লাগে। চলো না, আমরা দেয়াল টপকে ভেতরে যাই!”

তিথি তো এক পায়ে খাড়া! সে সাথে সাথে সায় দিয়ে বলল,

—“একদম ঠিক! এই গেট টপকানো কোনো ব্যাপারই না। প্রমা,চল!”

সাদ্দাম আর আহনাফও কলেজ লাইফের সেই দুষ্টুমি ফিরে পেল। সাদ্দাম প্রমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল,

—“তুমি যখন আবদার করেছ, তখন গেট কেন, আমি হিমালয় টপকাতে রাজি!”

রোনা একটু ভয় পেলেও আহনাফকে সাথে দেখে রাজি হয়ে গেল। সবাই যখন উবু হয়ে গেট বা দেয়াল টপকানোর কসরত করছে, তখন কাবির একপাশে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। সে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,

—“সবগুলো এখনো বাচ্চা রয়ে গেল!”

তিথি গেটের শিক ধরে ঝুলতে ঝুলতে বলল,

—“কাবির ভাইয়া, আপনার ইতালিয়ান বডি কি এখন জং ধরে গেছে? আসুন না!”

কাবির কোনো উত্তর দিল না। সে তার স্মার্টনেস কাজে লাগাল। সে জানে এই লজের পাহারাদাররা পাশের সিকিউরিটি পোস্টে থাকে। সে ধীরপায়ে পাশের পোস্টের দিকে এগিয়ে গেল। মিনিট দুয়েকের মধ্যে দেখা গেল লজের সিকিউরিটি গার্ড কাঁচুমাচু মুখে কাবিরের পেছনে পেছনে চাবি নিয়ে আসছে। কাবির সম্ভবত নিজের পরিচয় আর পকেটের জোর—দুটোই ব্যবহার করেছে।

খটাৎ করে গেটের তালা খুলে গেল। কাবির ভেতরে ঢুকে তিথির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,

—“তিথি, দেয়াল টপকানো চোরদের কাজ। বুদ্ধিমানরা চাবি দিয়ে ঢোকে।”

সাদ্দাম হাসতে হাসতে প্রমাকে বলল,

—“দেখলে তো প্রমা? কাবির এখনো সেই পুরনো খচ্চরই রয়ে গেল। একটু অ্যাডভেঞ্চার করতে দিল না!”

সবাই যখন লজের ভেতরের বাগানে ঘুরছিল, তখন তিথি এক কোণায় গিয়ে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। তার পা ফুলে গেছে। কাবির সেটা খেয়াল করে সিকিউরিটি গার্ডের কাছ থেকে একটা চেয়ার আনিয়ে নিল।

সে তিথির সামনে এসে দাঁড়িয়ে খুব নরম স্বরে বলল,

—“পা তো ফুলিয়ে একদম আলু বানিয়ে ফেলেছ। এবার অন্তত একটু শান্ত হয়ে বসো।”

রোনা আর আহনাফ তখন লজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরনো দিনের গল্প করছিল।

রোনা হুট করেই বলল,

—“আহনাফ, কলেজ লাইফেও তুই এমন শান্ত ছিলি, আজও আছিস। কিন্তু জানিস তো, বেশি শান্ত থাকা মানে সুযোগ হারানো।”

আহনাফ রোনার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে বুঝতে পারছে রোনা আজ তাকে বারবার কিছু একটা ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সাদ্দাম প্রমার হাত ধরে বাগানের অন্ধকার এক কোণায় গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—“প্রমা, লজের এই নির্জনতা কিন্তু খুব রোমান্টিক, তাই না?”

প্রমা লজ্জা পেয়ে সাদ্দাম ভাইয়ার বুকে হালকা একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,

—“আপনি না সাদ্দাম ভাইয়া! সবসময় সুযোগ খোঁজেন।”

সাদ্দাম যখন প্রমার হাত ধরে খুব রোমান্টিক মুডে লজের বাগানে একটা পোজ দিল, তিথি নিচু হয়ে অ্যাঙ্গেল মেলাতে মেলাতে বলল,

—“সাদ্দাম ভাইয়া, আপনি একটু মুখটা হাঁ করুন তো! প্রমা, তুই মনে কর সাদ্দাম ভাইয়া একটা ডাইনোসর আর তোকে গিলে খাচ্ছে। জাস্ট অসাম লাগবে!”

সাদ্দাম রোমান্টিক মুড ছেড়ে হা করে তাকাতেই তিথি ফোনটা উঁচিয়ে যেই না ক্লিক করতে যাবে, অমনি ফোনটা বন্ধ হয়ে গেল!

—“আহহহহ! আমার ফোনটা অফ হয়ে গেল! চার্জ নেই!” তিথি হতাশ হয়ে চেঁচিয়ে উঠল।

কাবির এক ঝলক হেসে পকেট থেকে নিজের ঝকঝকে নতুন আইফোনটা বের করে তিথির দিকে বাড়িয়ে দিল। সে ব্যঙ্গ করে বলল,

—“নাও,আমার ফোন দিয়ে তোলো।”

তিথি খুশি হয়ে কাবিরের ফোনটা কেড়ে নিয়ে আবার সাদ্দামের দিকে তাকাল। কাবিরের ফোনে ক্লিক করার পর ছবিটা এমন এল যে মনে হচ্ছে সাদ্দাম ভাইয়া হাই তুলছেন আর প্রমা ভয়ে পালাচ্ছে।

প্রমা ছবিটা দেখে মাথায় হাত দিয়ে বলল,

—“সাদ্দাম ভাইয়া, আপনাকে তো পুরো জলহস্তীর মতো লাগছে! তিথি,এটা কী করলি?”

সাদ্দাম রাগী মুখে কাবিরের দিকে তাকিয়ে বলল, —“দোস্ত, তোর বউকে থামা! ও তো আমার বিয়ের আগেই ব্রেকআপ করিয়ে ছাড়বে।”

কাবির তখন খুব আয়েশি ভঙ্গিতে পকেটে হাত দিয়ে লজের পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিথি কাবিরের ফোনটা তাক করে বলল,

—“কাবির ভাইয়া,আপনি একদম নড়বেন না। একদম স্ট্যাচুর মতো থাকুন। আমি একটা ডার্ক থিম ছবি তুলব।”

🌚

কাবির প্রায় দুই মিনিট পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। ক্লিক করার পর কাবির এসে দেখল, তিথি তার ছবির ফোকাস ঠিক করেছে পেছনে থাকা সেই সিকিউরিটি গার্ডের ওপর, আর কাবির সেখানে একটা ঘোলাটে আবছা ছায়ার মতো দেখা যাচ্ছে!

কাবির চিৎকার করে বলল,

—“তিথি! তুমি কি জানো আমার একটা ছবির দাম কত? সেখানে তুমি আমাকে ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার বানিয়ে রাখলে?”

তিথি খুব নিষ্পাপ মুখে বলল,

—“আরে কাবির ভাইয়া,লজের গাম্ভীর্য তো গার্ড চাচার মুখেই বেশি ফুটে উঠেছে। আপনি তো জাস্ট একটা প্রপস!”

তিথির পরবর্তী টার্গেট হলো আহনাফ। সে আহনাফকে বলল,

—“আহনাফ ভাইয়া, আপনি তো ড্যান্সার। মাঝ আকাশে লাফিয়ে একটা পোজ দিন তো, আমি শট নেব।”

আহনাফ বেচারা তার সর্বশক্তি দিয়ে লাফ দিল। কিন্তু তিথি ক্লিক করল ঠিক সেই মুহূর্তে যখন আহনাফ নামার সময় মুখটা বিকৃত করে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছিল।

রোনা ছবিটা দেখে হাসতে হাসতে আহনাফকে বলল, —“আহনাফ, তোকে তো দেখে মনে হচ্ছে আকাশ থেকে কোনো এলিয়েন পৃথিবীতে ল্যান্ড করছে! তিথি, এই ছবিটা আমায় দিবে কিন্তু আমি আমাদের কলেজের গ্রুপে দেব।”

আহনাফ কাঁচুমাচু হয়ে বলল,

—“রোনা, দোহাই তোর! ওটা দিস না, আমার মানসম্মান সব যাবে!”

সবশেষে তিথি একটা গ্রুপ সেলফি নিতে চাইল। সে সবাইকে ডাকল, কিন্তু কাবিরকে বলল,

—“কাবির ভাইয়া, আপনি একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ান তো। ফ্রেমে বেশি মানুষ হলে সৌন্দর্য নষ্ট হয়। আপনি বরং ওই দূর থেকে আমাদের দিকে হিংসে ভরা চোখে তাকিয়ে থাকুন,ওটাই হবে ছবির আসল সৌন্দর্য!”

কাবির রাগে গজগজ করতে করতে একদম পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তিথি কাবিরের ফোন দিয়ে সেলফিটা তুলল এমনভাবে যে সামনের সবাই হাসছে, আর একদম ব্যাকগ্রাউন্ডে কাবিরকে একটা রাগী ভুতের মতো দেখা যাচ্ছে।

তিথি হাসতে হাসতে বলল,

—“দেখুন দেখুন! কাবির ভাইয়াকে পুরো শশী লজের ভুত লাগছে! আই লাভ দিস পিকচার!”

সাদ্দাম প্রমার কানে কানে বলল,

—“প্রমা, দেখলে তো? কাবিরের ইতালিয়ান সিইও ইমেজ আজ তিথি এক নিমেষে শেষ করে দিল!”

প্রমা সাদ্দাম ভাইয়ার হাত চিমটি কেটে বলল, —“আপনি হাসছেন? আপনার ডাইনোসর পোজটা কিন্তু আমি ডিলিট করিনি!”

শশী লজের সেই রাতটা এভাবেই হাস্যরস আর তিথির আজব সব ছবির অ্যালবামে বন্দি হয়ে থাকল, আর সেই ছবির একমাত্র উৎস ছিল কাবিরের নিজস্ব ফোন।

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট৮

#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন