ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

৯ম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

🍂

তিথি এক পায়ে স্যান্ডেল আর অন্য পা খালি নিয়েই লজের লম্বা বারান্দায় দৌড়াদৌড়ি করছে। সে চিৎকার করে বলল,

—“প্রমা, রোনা আপু! চলো আমরা ওই ওপরের গম্বুজটার কাছে যাই। ওখান থেকে নাকি পুরো ময়মনসিংহ শহর দেখা যায়। আজ আমরা ওখানেই সূর্যোদয় দেখব!”

রোনা তার শাড়ির কুঁচি সামলে নিয়ে বলল,

—“একদম! আমার তো মোটেও ঘুম পাচ্ছে না। আহনাফ, তুই বসে আছিস কেন? চল আমাদের সাথে!”

প্রমা সাদ্দাম ভাইয়ার হাত ধরে টানতে টানতে বলল, —“সাদ্দাম ভাইয়া, উঠুন না! এই তো কেবল রাত শুরু হলো। চলুন ওই পুরনো ঝাড়বাতিগুলোর নিচে গিয়ে আর একটা রিল বানাই।”

এদিকে তিন ছেলের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তারা এইমাত্র কোনো যুদ্ধ জয় করে ফিরেছে। আহনাফ লজের একটা পিলারে মাথা ঠেকিয়ে প্রায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঘুমাচ্ছে। সে বিড়বিড় করে বলল,

—“রোনা, দয়া কর! আর কত?কাল সকালে অফিসে না গেলে আমার আব্বু আমায় মেরেই ফেলবে।”

সাদ্দাম সিঁড়ির এক ধাপে ধপাস করে বসে পড়ে হাঁপাচ্ছে। সে প্রমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, —“প্রমা, তুমি তো বলেছিলে শুধু লজটা দেখবে। এখন তো মনে হচ্ছে তুমি লজের সার্ভে করতে এসেছ। আমার কোমর আর সোজা হচ্ছে না, দয়া করে আমাকে একটু বসতে দাও!”

সবচেয়ে করুণ অবস্থা কাবির সাহেবের। ইতালিয়ান স্টাইলে ফিটফাট থাকা সিইও-র জ্যাকেট এখন তার হাতে ঝুলছে, টাই খোলা, আর কপালে ঘাম। সে কবজির দামী ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—“তিথি, তুমি কি মানুষ নাকি রোবট? রাত ১২টা বাজে! আমার কাল সকালে অফিসের মালিকের সাথে জুম মিটিং আছে। আর তুমি এখন গম্বুজে ওঠার স্বপ্ন দেখছ?”

তিথি কাবিরের কাছে গিয়ে তার নাক টিপে দিয়ে বলল,

—“কাবির সাহেব, আপনার ইতালিয়ান মিটিং চুলোয় যাক! আজ রাতে কোনো মিটিং নেই, শুধু ঘোরাঘুরি। আপনি যদি না ওঠেন, তবে আমি কিন্তু একা একাই ওই পেছনের বাগানের অন্ধকার সুড়ঙ্গটায় ঢুকে যাব!”

🪶

সুড়ঙ্গ আর অন্ধকার শব্দটা শুনেই কাবির মৃদদু হাসলো। সে জানে তিথি যা বলে তা করেই ছাড়ে। সে বিরক্ত হয়ে আবার জ্যাকেটটা গায়ে চড়াতে চড়াতে বলল,

—“উফফ! মেয়েদের এনার্জি নিয়ে কোনো সায়েন্টিফিক রিসার্চ হওয়া উচিত। সাদ্দাম, আহনাফ—ওঠ! এদেরকে আজ সামলাতে না পারলে আমাদের কপালে আর বাড়ি ফেরা নেই।”

আহনাফ চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,

—“সাদ্দাম, চল দোস্ত।”

সবশেষে মেয়েরা ছেলেদের প্রায় টেনে-হিঁচড়ে লজের পেছনের সিঁড়ি দিয়ে ছাদে নিয়ে গেল। তিথি আগে আগে দৌড়াচ্ছে, তার পেছনে প্রমা আর রোনা হাসাহাসি করছে। আর একদম পেছনে তিন ছেলে এমনভাবে পা ফেলছে যেন তারা ফাঁসির মঞ্চে যাচ্ছে।

সাদ্দাম ফিসফিস করে কাবিরকে বলল,

—“কাবির, তুই তো অনেক বড় সিইও। এমন কোনো মেশিন বানাতে পারিস না যা দিয়ে মেয়েদের এই রাতের বেলার এনার্জি একটু কমানো যায়?”

কাবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—“মেশিন তো দূরের কথা, তিথির এই জেদের সামনে তো আমার কোম্পানির এআই পর্যন্ত হ্যাং হয়ে যাবে!”

*

চাঁদের আলোয় শশী লজের ছাদ থেকে যখন পুরো শহরটা রূপোলি দেখাচ্ছিল। সবাই তখন সবচেয়ে উঁচু গম্বুজে দিকে যাচ্ছিল।

সাদ্দাম একটু পর পর ফিসফিস করে বলছে,

—“ভয় পেও না প্রমা, আমি তো আছি। জাস্ট সিঁড়িগুলো একটু সাবধানে পা ফেলো।”

তাদের ঠিক পেছনেই রোনা আর আহনাফ। রোনা সাধারণত সাহসী হলেও এই অন্ধকারে কেন জানি আহনাফের পাঞ্জাবির হাতাটা খামচে ধরে আছে।

আহনাফ হাই তুলতে তুলতে বলছে,

—“রোনা, এই অন্ধকারে যদি ভূত আসে, তবে কিন্তু আমি তোকে রেখেই দৌড় দেব!”

রোনা অন্ধকারেও আহনাফকে একটা চিমটি কেটে নিজের ভয় লুকানোর চেষ্টা করল।

সবশেষে তিথি। সে খুব ভাব নিয়ে একাই হাঁটছিল, আর তার ঠিক পেছনেই ছায়ার মতো লেগে আছে কাবির। কাবির মনে মনে বেশ বিরক্ত হলেও তিথির নিরাপত্তার কথা ভেবে হাত বাড়িয়ে তাকে আগলে রাখার চেষ্টা করছে।

🐸

হঠাৎ একটা বিকট শব্দ! গম্বুজের কার্নিশ থেকে এক ঝাক বিশাল বাদুড় ডানা ঝাপটিয়ে সজোরে তিথির মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। অন্ধকারের মাঝে এই আকস্মিকতায় তিথি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক বিকট চিৎকার দিয়ে পেছনের দিকে উল্টে পড়ল।

পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল কাবির। সে তিথিকে সামলাতে গিয়ে দু-হাতে তাকে জড়িয়ে ধরল, কিন্তু তিথির গতির ধাক্কায় দুজনেই ধপাস করে দেয়ালের সাথে চেপে গেল। অন্ধকারে ভারসাম্য সামলাতে গিয়ে অবিশ্বাস্য এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল—তিথির ঠোঁট গিয়ে লাগল কাবিরের ঠোঁটে!

কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন পুরো পৃথিবী থমকে গেল। গম্বুজের সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে শুধু দুজনের দ্রুত হৃদস্পন্দন শোনা যাচ্ছিল। কাবির স্তব্ধ হয়ে গেল, তার বুকের ভেতর যেন কোনো অদৃশ্য ড্রাম বাজছে। তিথিও বড় বড় চোখ করে অন্ধকারের মাঝে কাবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের মধ্যে তিথির সারা শরীরে একটা গরম শিহরণ বয়ে গেল।

এদিকে সামনে সাদ্দাম তখন প্রমাকে চাঁদের আলো দেখানোর জন্য এতই মগ্ন যে পেছনে কী বিস্ফোরণ ঘটে গেছে তার টেরই পায়নি।

আর রোনা আহনাফের সাথে তর্কে মেতেছে যে বাদুড়টা আসলে কত বড় ছিল।

কাবির দেয়ালের সাথে চেপে যাওয়ার সেই রেশটা কাটতে না কাটতেই তিথি কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,

— "আ..আসলে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, কাবির ভাইয়া।"

​ভাইয়া শব্দটা কানে যেতেই কাবিরের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে এক পা এগিয়ে গেল তিথির দিকে। অন্ধকার গম্বুজের মাঝেও কাবিরের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন তিথির হৃদপিণ্ড অবধি পৌঁছে যাচ্ছে। কাবির ধীরস্থিরভাবে তার শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিল। তার বাম হাতের কালো বেল্টের ঘড়িটা আবছা আলোয় চিকচিক করে উঠল। তার এই শান্ত কিন্তু গম্ভীর ভঙ্গি দেখে তিথি কিছুটা কুঁকড়ে গেল।

—​"আমি কি তোমাকে একবারও বলেছি যে তুমি আমার বোন?" কাবিরের কণ্ঠস্বর একদম নিচু কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত থমথমে ভাব।

​তিথি আমতা আমতা করে বলল,

—"না, মানে আমি তো সম্মানে..."

কাবির বরফশীতল কন্ঠে বলল,

—​"সম্মান অন্যভাবেও দেখানো যায়, তিথি। কিন্তু খবরদার! আমাকে আর কখনও ভাইয়া বলে ডাকবে না।"

কাবির এক হাত তিথির মাথার পাশে দেয়ালে ঠেকিয়ে একটু ঝুঁকে এল।

—"এই ডাকটা আমার মাথায় রক্ত চড়িয়ে দেয়। এরপর যদি ওই শব্দটা তোমার মুখ দিয়ে বের হয়, তবে তার ফল ভালো হবে না। মনে থাকবে?"

তিথি অন্ধকারেও বুঝতে পারল কাবির হাসছে। সে লজ্জা ঢাকতে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু তার পা তখনো কাঁপছে।

________

গম্বুজের সেই অদ্ভুত আর গাঢ় মুহূর্তটার পর তিথির চঞ্চলতা যেন নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। তার বুক ধড়ফড়ানি থামছেই না। সে দ্রুত কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে সাদ্দাম আর প্রমার কাছাকাছি পৌঁছাল। কিন্তু তার হাঁটার মধ্যে একটা অদ্ভুত আড়ষ্টতা।

তিথি হঠাৎ থেমে গিয়ে বেশ জোর গলায় বলল,

—“আমি আর ঘুরব না! আমার হঠাৎ খুব ক্লান্ত লাগছে। আমি এখনই বাড়ি ফিরে যাব!”

তিথির এই হুট করে মেজাজ বদলানো দেখে সাদ্দাম আর প্রমা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। রোনা আড়চোখে আহনাফকে ইশারা করে বোঝাল যে, পেছনে নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে।

পেছন থেকে কাবির ধীরপায়ে এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে এখন আর রাগ নেই, বরং এক অদ্ভুত বিজয়ী হাসি।সে তিথির একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল, গলার স্বরটা একটু নিচু কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলল,

—“বাড়ি যাবে? অবশ্যই যাবে। কিন্তু আজকের রাতটা তো আর তোমার নিজের বাড়িতে যাওয়া হচ্ছে না তিথি।”

তিথি ভ্রু কুঁচকে তাকাল,

—“মানে? আপনি কী বলতে চাইছেন?”

কাবির পকেটে হাত দিয়ে খুব আয়েশ করে লজের দেয়ালে হেলান দিল। তারপর বলল,

—“এত রাতে চরপাড়া থেকে তোমাদের ওদিকে যাওয়া সেফ নয়। ড্রাইভারকে আমি অলরেডি ইনস্ট্রাকশন দিয়ে দিয়েছি। তুমি... তুমি আমার রুমেই থাকবে। একা তো তোমাকে ছাড়ছি না, কারণ বাদুড় তো আর শুধু শশী লজেই থাকে না, যেকোনো সময় আবার অ্যাটাক করতে পারে!”

এই কথা শুনে তিথি লজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল। সে রেগে গিয়ে বলল,

—“কাবির ভাই....,(বলতেই থেমে গিয়ে হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল)"

সাদ্দাম পাশ থেকে টিপ্পনী কাটল,

—“আরে দোস্ত ,তুই তো দেখছি বউকে চোখে হারাচ্ছিস।”

প্রমা আর রোনা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে।

প্রমা বলল,

—“হুম দেখতে হবে না ভাইটা কার। তিথি তুই বরং কাবির ভাইয়ের কাছেই থাক।”

কাবির তিথির দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে ফিসফিস করে বলল,

—“কি তিথি? জিপসিদের মতো এক পা খালি রেখে এখন কি পালানোর চেষ্টা করবে? আজ রাতে কিন্তু পালানোর কোনো রাস্তা নেই। তুমি আর আমি—একই ছাদের নিচে,একই রুমে!”

তিথি বুঝতে পারল, কাবির আজ তাকে এক হাত দেখে নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ পেয়েছেন। সে অসহায়ভাবে আহনাফের দিকে তাকাল, কিন্তু আহনাফ তখন রোনার সাথে গল্প করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেছে।

তিথি নিচু স্বরে বিড়বিড় করল,

—“আপনি একটা চরম খচ্চর, কাবির ভাইয়া!”

কাবির হোহো করে হেসে উঠে বলল,

—“আর তুমি হলে সেই চরম আনাড়ি ফুটবলার, যার শট সবসময় ভুল জায়গায় লাগে!”

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট৯

#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন