ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

১০ম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

✨

হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে রোনার বাসার মোড় এল। রোনা আহনাফের পাঞ্জাবির হাতাটা ধরে টেনে বলল,

—“আহনাফ, আর কতদূর হাঁটাবি? আমার পা তো এখনই অবশ হয়ে আসছে।”

আহনাফ হাই তুলতে তুলতে রোনার বাসার গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বলল,

—“নে, পৌঁছে গেছিস। কাল সকালে যেন আবার স্কুলে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়িস না!”

রোনা মিষ্টি করে হেসে আহনাফকে টা-টা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। আহনাফও একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল।

★

প্রমা সাদ্দামকে বিদায় দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়তেই তিথি দেখল তার পালানোর শেষ আশাটুকুও শেষ। সে তখনো এক পা খালি রেখে অন্য পায়ে স্যান্ডেল ঘষতে ঘষতে দাঁড়িয়ে। কাবির পকেট থেকে চাবি বের করে খুব আয়েশ করে গেটটা খুলে দিল।

কাবির তিথির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি হেসে বলল,

—“কি তিথি? এখন তুমি কার ভরসায় এখানে দাঁড়িয়ে আছো? বাড়ির ভেতরে চললো, রাত ৩টা বাজে।”

তিথি ভ্রু কুঁচকে বলল,

—“প্রমা তো ওর নিজের ঘরেই যাচ্ছে। আমি ওর সাথেই থাকব। আপনার অত খুশি হওয়ার কিছু নেই!”

কাবির ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে খুব শান্ত গলায় বলল, —“প্রমা তো নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেবে। আর তোমাকে তো বলেছিই—শশী লজের সেই বাদুড় কিন্তু যেকোনো জায়গায় থাকতে পারে। একা রুমে ভয় পেলে তখন কে বাঁচাবে? তার চেয়ে চলো, আমার রুমে গিয়ে শান্তিতে বসি। অনেক হিসেব বাকি আছে আমাদের।”

তিথি বড় বড় চোখ করে তাকাল।সে বুঝতে পারল—আজ রাতে কাবির সাহেবের এই সিংহগিরি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

🌷

কিছুক্ষণ পর

বিছানার এক কোণায় বসে তিথি যখন নিজের ভাগ্যকে দোষ দিচ্ছিল, ঠিক তখনই কাবির আলমারি থেকে তোয়ালে বের করে বাথরুমের দিকে হাঁটা দিল। দরজার কাছে গিয়ে সে হঠাৎ থেমে গিয়ে তিথির দিকে ঘুরে তাকাল।

কাবিরের চোখে সেই চেনা দুষ্টুমি। সে খুব গম্ভীর গলায় বলল,

—“আমি ফ্রেশ হতে যাচ্ছি। খবরদার বিবিজান, রুমের বাইরে পা বাড়াবে না। প্রমা কিন্তু ওর ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করে দিয়েছে, আর পুরো বাড়ি এখন অন্ধকার। কোনো বাদুড় যদি তোমাকে একা পেয়ে অ্যাটাক করে, আমি কিন্তু বাথরুম থেকে বাঁচানোর জন্য দৌড়ে আসতে পারব না!”

তিথি একটা বালিশ জড়িয়ে ধরে মুখ ভেঙচে বলল, —“আপনি যান তো! আমি কোথাও যাচ্ছি না।”

মুচঁকি হেসে কাবির ওয়াশরুমের ডুকে গেল। কাবিরের রুমের উজ্জ্বল আলোয় এখন সবকিছু একদম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ঝকঝকে সাদা দেয়াল আর দামী আসবাবপত্রের মাঝে রুমের কোণায় বসে তিথি তখন ঘামছে। বাইরে বৃষ্টি না থাকলেও রুমের ভেতর এসি একদম ১৮ ডিগ্রিতে চলছে, কিন্তু তিথির মনে হচ্ছে তার চারপাশ দিয়ে গরম হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। নার্ভাস হওয়ার কারণে এসির কনকনে ঠান্ডাতেও তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।

এদিকে,

কাবির সাওয়ার নিতে গিয়ে ভাবছে,

—“আজকে সব ভুল বুঝাবুঝি মিটমাট করে ফেলতে হবে। তিথিকে অনেক কষ্ট দিয়েছি আর না।"

~~~~

ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খুলে বের হলো কাবির।

তিথি জানালার দিক থেকে মুখ ফেরাতেই তার হার্টবিট কয়েক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। কাবির বাথরুম থেকে বের হয়েছে মাত্র। পরনে তার শুধু একটা কালো ট্রাউজার, ঊর্ধ্বাঙ্গ পুরোপুরি উন্মুক্ত। এসির ঠান্ডা বাতাসে তার সুঠাম দেহে ছোট ছোট কাঁপুনি দিলেও তার এতে হেলদোল নেই।

ল্যাম্পশেড আর সিলিংয়ের উজ্জ্বল আলোয় কাবিরের জিম করা নিখুঁত অ্যাবসগুলো একদম স্পষ্ট হয়ে আছে। চওড়া কাঁধ আর বুকের সুঠাম পেশিগুলো থেকে তখনো পানির কণা গড়িয়ে নামছে। চুলের অগ্রভাগ থেকে চুইয়ে পড়া পানি তার সুঠাম দেহের খাঁজ বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে।

তিথি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু এসির ঠান্ডাতেও সে এখন রীতিমতো ঘামছে। সে তোতলামি করে বলল,

—“আ-আপনি... আপনি শার্ট পরেননি কেন? অসভ্যের মতো এভাবে কেন ঘুরছেন? আর এসিটা কি একটু কমানো যায় না? আমি... আমি কেমন জানি লাগছে।”

কাবির মুচকি হাসল। সে তোয়ালেটা পাশে রেখে ধীরপায়ে তিথির দিকে এগিয়ে এল। প্রতিটা পদক্ষেপে তার শরীরের পেশিগুলো যেন কথা বলছে। সে তিথির একদম সামনে এসে ঝুঁকে দাঁড়াল। কাবিরের শরীরের সেই সতেজ ঘ্রাণ আর এসির ঠান্ডা হাওয়ায় তিথির মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

কাবির খুব নিচু স্বরে বলল,

—“নিজের ঘরে কি কেউ শার্ট পরে থাকে বিবিজান? আর তুমি ঘামছো কেন? এসি তো ১৮-তে চলছে!”

তিথি বালিশটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে চিৎকার করে বলল,

—“আপনি... আপনি খুব খারাপ! আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে লজ্জা দিচ্ছেন। যান, শার্ট পরে আসুন!”

কাবির এবার তিথির খুব কাছে গিয়ে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

—“শশী লজের সেই গম্বুজে অন্ধকারে যখন আমার ওপর পড়েছিলি, তখন তো শরীরটা বেশ শক্ত মনে হয়েছিল, তাই না? এখন এই আলোতে দেখতে সমস্যা কী? তোমার কি ভয় লাগছে বিবিজান? নাকি আমার এই সুঠাম দেহ দেখে তোমার হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে?”

তিথি এবার অসহায়ভাবে কাবিরের চোখের দিকে তাকাল। উজ্জ্বল আলোয় কাবিরের সেই পেশিবহুল শরীর আর চঞ্চল চোখের চাহনিতে তিথি যেন হারিয়ে যাচ্ছে।

সে আমতা আমতা করে বলল,

—“আপনি একদম বাজে কথা বলবেন না। আপনার হার্টবিট বেশি, আমার না!”

কাবির হোহো করে হেসে উঠল। সে তিথির একদম কাছে এসে তার চিবুকটা আঙুল দিয়ে উঁচিয়ে ধরল।

—“তাহলে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখ না, কার হার্টবিট বেশি!”

তিথি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে ভাবল, শশী লজের বাদুড়টার চেয়ে এই শার্টলেস সিংহটা অনেক বেশি বিপজ্জনক!

তিথি বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে যখন বের হলো, তার অস্বস্তি তখন চরমে। কাবিরের দেওয়া একটা বড় সাইজের টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরেছে সে—যেটা তার গায়ে রীতিমতো ঝুলছে। এসির ঠান্ডায় তার হাত-পা হিম হয়ে আসছে, কিন্তু ঘাড়ের কাছে নার্ভাসনেসের সেই ঘামটা তখনো শুকায়নি।

রুমে ঢুকেই তিথি দেখল, কাবির তখনো শার্টলেস অবস্থায় বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। কোলে তার ল্যাপটপ, আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর দ্রুত চলছে। তিথিকে ঘরে ঢুকতে দেখেও সে একবার চোখ তুলে তাকাল, তারপর আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে মন দিল।

তিথি আমতা আমতা করে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,

—“আ-আপনি... আপনি কি এখনো কাজ করছেন? আমি কি প্রমার রুমে চলে যাব?”

কাবির ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই গম্ভীর গলায় বলল,

—“বসে থাকো বিবিজান। আর খবরদার প্রমার রুমের কথা মুখে আনবে না। আমি একটা ইমেইল পাঠাচ্ছি, শেষ হলেই তোমার সাথে কথা আছে।”

💫

তিথি বিছানার একদম শেষ মাথায় কোনোমতে একটু জায়গা করে বসল। সে এতই নার্ভাস যে নিজের নখ খুঁটছে আর কিছুক্ষণ পর পর ওড়না ছাড়াই নিজের গলা মুছছে। এসির ঠান্ডা বাতাস তার গায়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে।

কিন্তু কাবিরের সেই অর্ধনগ্ন শরীরের উপস্থিতি তাকে আরও বেশি অস্থির করে তুলেছে।কাবির আড়চোখে তিথির এই অবস্থাটা দেখছে আর মনে মনে চরম মজা পাচ্ছে। তিথি যে কতটা অপ্রস্তুত, সেটা তার লাল হয়ে যাওয়া কান দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। কাবির হঠাৎ ল্যাপটপটা একপাশে রেখে তিথির দিকে একটু এগিয়ে এল।

—“কি ব্যাপার বিবিজান? তুমি কি আজ সারা রাত ওভাবেই মূর্তির মতো বসে থাকবে? এসি কি আরও কমিয়ে দেব? তুমি তো দেখছি কাঁপছ!”

তিথি ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে বলল, —“না না! ঠিক আছে। আপনি... আপনি শার্ট পরুন না প্লিজ। আপনার কি ঠান্ডা লাগে না?”

কাবির এবার ল্যাপটপ বন্ধ করে সরাসরি তিথির সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। সে তিথির একদম কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—“আমার কেন জানি ঠান্ডা লাগছে না বিবিজান। বরং তোমাকে এত নার্ভাস দেখে আমার বেশ গরম লাগছে। তুমি ঘামছ কেন বলো তো? ১৮ ডিগ্রি এসি কি তোমার টেনশন কমাতে পারছে না?”

তিথি এবার অসহায়ভাবে বিছানার চাদর খামচে ধরল। কাবিরের পেশিবহুল শরীরের উষ্ণতা সে খুব কাছ থেকে অনুভব করছে। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,

—“আপনি... আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন। আমি কেন ঘামব? আমি তো... আমি তো জাস্ট... একটু ক্লান্ত।”

কাবির মুচকি হেসে তিথির একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার হাতের স্পর্শে তিথি যেন কারেন্টের শক খেল।

—“ক্লান্ত? নাকি শশী লজের সেই গম্বুজের স্মৃতিগুলো তোমাকে শান্তি দিচ্ছে না? বলো তো বিবিজান, আমার ল্যাপটপে কাজ করার চেয়ে তোমাকে এভাবে নাজেহাল করতে আমার কেন এত ভালো লাগছে?”

তিথি দেখল কাবির তাকে নিয়ে রীতিমতো খেলছেন। তার এই নার্ভাস হওয়াটা কাবিরের জন্য বিনোদনের খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিথি মুখ নিচু করে বিড়বিড় করল,

—“আপনি একটা আস্ত শয়তান! আপনার এই বডি দেখিয়ে মানুষকে ভয় দেখানো বন্ধ করুন।”

কাবির তিথির হাতটা আরও একটু জোরে চেপে ধরে বলল,

—“ভয় দেখাচ্ছি না বিবিজান, তোমাকে শুধু এই উজ্জ্বল আলোয় একটু ভালো করে দেখছি। এখন তো আর বাদুড় নেই, এখন শুধু আমি আর তুমি। বলো তো, এখন পালিয়ে কোথায় যাবে?”

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট১০

#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন