🌿
তিথি এতক্ষণ কাবিরের বুকের ওপর মুখ লুকিয়ে থাকলেও হুট করে মাথা তুলে তার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার চোখে তখনো কান্নার রেশ, কিন্তু গলায় একরাশ কৌতুহল আর অভিযোগ।
তিথি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল,
—“আপনি আমাকে বিবিজান বলে ডাকেন কেন? এই ডাকটা শুনলেই আমার কেমন জানি লাগে। মনে হয় আপনি আমাকে আরও বেশি পঁচানোর জন্য এটা করেন।”
কাবির ল্যাম্পশেডের আলোতে তিথির লাল হয়ে যাওয়া নাকের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। সে তিথির এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিয়ে খুব শান্ত কিন্তু গভীর গলায় বলল,
—“কেন, বিবিজান ডাকটা তোমার পছন্দ না? তুমি কি জানো এর মানে কী?”
তিথি রেগে গিয়ে বলল,
—“জানি! বিবি মানে বউ বা স্ত্রী। আপনি তো আমায় টাকা দিয়ে কিনতে চেয়েছিলেন,আমায় স্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতি দেন নি। এমন কী এতো গুলো বছরের মধ্যে একটা দিনও খোঁজখবর পর্যন্ত নেননি।"
কাবির এবার তিথিকে আরও একটু কাছে টেনে নিল। তার সেই সুঠাম দেহের উষ্ণতায় তিথি আবার
অনুভব করতে লাগল।
কাবির ফিসফিস করে বলল,
—“আসলে আব্বু এইভাবে বিয়ে দেওয়াটা আমি মেনে নিতে পারিনি, তাই তোমার সাথে কোনো রকম যোগাযোগ করে নি। আমি তোমাকে চিনতে ভুল করেছি এজন্য সরি, বিবিজান।"
তিথি না থেমে বলে,
—“বিবিজান,ডাকাটা এটা কি আপনার কোনো নতুন ফাজলামি?”
কাবির শান্ত কন্ঠে বলল,
—“সবকিছু কি ফাজলামি হয় তিথি? বিবি ডাকটা আসলে কোনো উপাধি নয়, এটা একটা অধিকার।”
তিথি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কাবির আরও বলতে লাগল,
—“তোমাকে বিবিজান বললে তোমার মুখটা রাগে যেমন টমেটোর মতো লাল হয়, সেটা দেখতে আমার যা লাগে না!”
তিথি এবার কাবিরের বুকে একটা কিল মেরে বলল, —“আপনি একটা আস্ত নাটকবাজ!এখন সরি বলছেন! আমাকে রাগিয়ে দিতে আপনার খুব ভালো লাগে, তাই না?”
কাবির মুচকি হেসে তিথির কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে বলল,
—“হ্যাঁ, খুব ভালো লাগে!”
তিথি বুঝতে পারল, এই লোকটার কাছে যুক্তি দিয়ে হারানো অসম্ভব। সে মুখ ফিরিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—“অসভ্য সিংহ একটা!”
কাবির হেসে বলল,
—“শুনলাম কিন্তু! এখন চুপচাপ ঘুমাও বিবি সাহেবা, রাত প্রায় শেষ।”
_______
সকাল ৮টা। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা সোনালি রোদ সরাসরি কাবিরের খাটে এসে পড়েছে। এসির ঠান্ডা আর রুমের নিস্তব্ধতায় পরিবেশটা একদম শান্ত।
বিছানায় কাবির তখনো আধো-জাগ্রত অবস্থায়। সে অনুভব করল তার বুকের ওপর বেশ ভারী আর উষ্ণ কিছু একটা চেপে আছে। চোখ খুলে সে দেখল, তিথি তার ওপর শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
রাতের সেই ঝগড়া, রাগ আর কান্নার কোনো চিহ্নই এখন তিথির মুখে নেই। সে একদম নিশ্চিন্তে কাবিরের চওড়া বুকের ওপর নিজের মাথা রেখে, কাবিরের শার্টের মুঠো করে ধরে ঘুমাচ্ছে। তার একটা পা কাবিরের পায়ের ওপর তুলে দেওয়া, ঠিক যেন কোনো ছোট্ট শিশু তার প্রিয় খেলনাটিকে জড়িয়ে ধরে আছে।
কাবির নড়াচড়া করল না,যদি তিথির ঘুম ভেঙে যায়। সে মুগ্ধ হয়ে তিথির শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। কাল রাত ৪টে পর্যন্ত যে মেয়েটা তাকে শয়তান আর অসভ্য বলে গালি দিচ্ছিল, সেই মেয়েটাই এখন তার হৃদস্পন্দন শুনে ঘুমাচ্ছে।
কাবির মনে মনে হাসল। সে বুঝতে পারল, তার সারারাতের সব ফাজলামি আর ফ্লার্টিং আসলে কাজে লেগেছে। সে তিথিকে এটা বোঝাতে পেরেছে যে, এই সিংহের গুহাটা আসলে তার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।আগের সব মান অভিমান ভুলে তারা এক হয়েছে। তিথির এই সমর্পণ দেখে কাবিরের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এল।
সে মনে মনে ভাবল, "তাহলে শেষ পর্যন্ত বিবিজানকে মানাতে পারলাম!"
✨
কাবির আলতো করে নিজের এক হাত তিথির কোমরের ওপর রাখল। তিথি ঘুমের ঘোরেই একটু নড়েচড়ে কাবিরের আরও গায়ের সাথে মিশে গেল। তার নিশ্বাসের তপ্ত বাতাস কাবিরের গলায় লাগছে। কাবির বুঝতে পারছে, তিথি এখন অবচেতন মনেও তাকে বিশ্বাস করে। কাবির তার মুক্ত হাতটা দিয়ে তিথির কপালের ওপর পড়ে থাকা কয়েকটা চুল সরিয়ে দিল। এই মেয়েটা তার জীবনে যে কী পরিমাণ ঝড় তুলেছে, সেটা সে আগে বুঝেনি। সে তিথির কপালে খুব আলতো করে একটা চুমু খেল।
হঠাৎ দরজার বাইরে প্রমার হাঁটাচলার শব্দ পাওয়া গেল। কাবির জানে, একটু পরেই প্রমা এসে দরজায় নক করবে। সে ভাবল, তিথি যদি এখন এই অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করে, তবে নির্ঘাত আবার চিৎকার শুরু করবে। কিন্তু কাবির চাচ্ছে না এই সুন্দর মুহূর্তটা এখনই শেষ হোক।
সে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
—“জেগে উঠলে তো আবার সেই চিল্লামিল্লি শুরু করবে। তার চেয়ে বরং এভাবেই আরও কিছুক্ষণ থাকো। স্কুলের পড়ালেখা তো অনেক করলে, এখন একটু আমার ভালোবাসাটা মুখস্থ করো।”
কাবির তিথিকে আরও একটু নিবিড়ভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল। তার সুঠাম শরীরের ওপর তিথির এই অধিকার যেন আজ পূর্ণতা পেল। কাবির এখন পুরোপুরি নিশ্চিত—এই স্কুল গার্ল এখন পুরোপুরি তার মায়ায় আটকে গেছে।
******
সকাল তখন মাত্র ন’টা। রুমের ভেতর এসির হালকা গুঞ্জন আর বাইরের পাখির কিচিরমিচির ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। কাবির খুব সাবধানে বিছানা ছাড়ল, যেন তার সামান্য নড়াচড়াতেও তিথির গভীর ঘুম ভেঙে না যায়। পা টিপে টিপে সে জানালার ধারের টেবিলটার সামনে গিয়ে বসল।
কাবিরের চেহারায় এখন কেবল কঠোরতা দেখা যাচ্ছে। ল্যাপটপের পাওয়ার বাটন টিপতেই স্ক্রিনের নীলচে আলো তার তীক্ষ্ণ চোখের ওপর এসে পড়ল।
কিবোর্ডে কয়েকটা জটিল পাসওয়ার্ড আর বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি পার হতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল অসংখ্য এনক্রিপ্টেড ফাইল আর গ্লোবাল ম্যাপ।
সে হেডফোনটা কানে লাগিয়ে একটা বিশেষ স্যাটেলাইট চ্যানেলে তার আন্ডারগ্রাউন্ড টিমের সাথে যুক্ত হলো। স্ক্রিনের এক কোণায় আরশাদ চৌধুরীর অফিসের ব্লু-প্রিন্ট ফুটে উঠছে। কাবির এক হাতে কপাল ঘষে ল্যাপটপের মাইক্রোফোনের কাছে মুখ নিয়ে এল।
তার কণ্ঠস্বর এবার সম্পূর্ণ বদলে গেছে—অত্যন্ত শীতল, নিচু আর পেশাদার।
কাবির খুবই নিচু এবং শীতল গলায়,
—“শোনো, আরশাদ চৌধুরী ভাবছে আমি ওর বিজনেস ডিল হ্যান্ডেল করছি, কিন্তু আমার মেইন টার্গেট ওই ব্ল্যাক ফাইলগুলো। অপারেশন সাকসেসফুল না হওয়া পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক যেন একদম সাইলেন্ট থাকে। কোনো ভুল হলে আরশাদ চৌধুরীর সাথে সাথে আমাদের পুরো প্ল্যানটাই ধসে পড়বে।”
সে ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা ডিজিটাল ম্যাপ ওপেন করে মাউস দিয়ে একটা নির্দিষ্ট পয়েন্ট আউট করল।
কাবির: “পয়েন্ট বি-তে আমাদের লোক সেট করা আছে তো? আরশাদের পার্সোনাল ভল্ট খুলতে গেলে আমাদের বায়োমেট্রিক ক্লোন লাগবে। আমি অলরেডি ওর গ্লাসের ছাপ থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট কালেক্ট করেছি। নেক্সট ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সার্ভার হ্যাক করে ডেটাবেস আমাদের কব্জায় নিতে হবে।”
তার কণ্ঠস্বর এবার আরও গম্ভীর আর সতর্ক হয়ে এল, যেন দেয়ালেরও কান আছে।
কাবির: “মনে রাখবে, আরশাদ চৌধুরীর নেটওয়ার্ক অনেক গভীরে। ইতালিয়ান পুলিশের ভেতরেও ওর লোক আছে। তাই এক্সিট প্ল্যানটা খুব সূক্ষ্ম হতে হবে। যদি আমি সিগন্যাল দিই, তবেই তোমরা শিপমেন্ট ইন্টারসেপ্ট করবে। তার আগে নয়। আমাদের লক্ষ্য শুধু ফাইলগুলো নয়, ওর পুরো অবৈধ সাম্রাজ্যের রুট ম্যাপটা ফাঁস করা। জাস্ট স্টে শার্প।”
কাবির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটু বাঁকা হাসল। ল্যাপটপের আলোয় তার চোখের মণি দুটো তখন যেন প্রতিহিংসায় জ্বলছে।
কাবির: “আর একটা কথা, আরশাদ যদি আমার কোনো মুভ সন্দেহ করে, তবে প্ল্যান বি এক্সিকিউট করবে। সেক্ষেত্রে ল্যাবে রাখা ওই কেমিক্যাল ট্রান্সফারটা ব্লক করে দিও। আমি চাই না এই অপারেশনে কোনো কোলাটেরাল ড্যামেজ হোক। আমার নজর ওর ওপর আছে, ও জাস্ট বুঝতে পারছে না ও কার সাথে ডিল করছে।”
কথাগুলো শেষ করেই সে কিবোর্ডে একটা কমান্ড দিয়ে দ্রুত ব্রাউজার উইন্ডো পাল্টে আরশাদ চৌধুরীর অফিসের ড্যাশবোর্ড সামনে নিয়ে এল।
ল্যাপটপের স্ক্রিনে এখন আরশাদ চৌধুরীর গম্ভীর মুখ। ব্যাকগ্রাউন্ডে মিলানের সেন্ট্রাল অফিসের ভিউ দেখা যাচ্ছে। আরশাদ চৌধুরী কেবল সাধারণ ব্যবসায়ী নন, তিনি ইতালির একজন মাফিয়া সমতুল্য প্রভাবশালী ব্যক্তি।
তিনি যখন রাইনার কথা তুললেন, তখন মিটিংয়ের পরিবেশটা শান্ত হয়ে উঠল। তিনি বলছিলেন
— “কাবির, রাইনা ল্যাম্বরগিনির নতুন ইভেন্টের জন্য তোমাকে পার্টনার হিসেবে চাইছে। আমি অলরেডি মিলানের ক্যাথেড্রাল স্কয়ারের কাছে একটা নতুন ভিলা বুক করেছি তোমাদের জন্য। আমি চাই তুমি এবার রাইনার সাথেই থাকো।”
কাবির যখন বিনয়ের সাথে উত্তর দিতে যাবে।তিথি তখনো ঘুমের ঘোরে। সে জানত না যে এই ল্যাপটপের ছোট ক্যামেরার ওপাশে ইতালির এক কোটিপতি তার হবু বরের দিকে নজর রাখছেন। সে পেছন থেকে কাবিরের কাঁধ জড়িয়ে ধরে আধো-আধো গলায় বলল,
— “আপনি এখনো বিবিকে ছেড়ে এই বাক্সের (ল্যাপটপ) সাথে কথা বলছেন? আমার পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে! চলুন না...”
আরশাদ চৌধুরীর চোখ ছোট হয়ে এল। তিনি ইতালিয়ান স্টাইলে চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে বললেন—
—“হু ইজ দিস, কাবির? আর সে তোমাকে বিবি বলছে কেন? তুমি কি বাংলাদেশে এসে আমাদের রাইনাকে ভুলে কোনো লোকাল মেয়ের পাল্লায় পড়লে?”
কাবিরের কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে দ্রুত মিউট বাটন চেপে তিথিকে এক হাত দিয়ে সরিয়ে দিল। তারপর আনমিউট করে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় প্রফেশনাল গলায় বলল
— “আরশাদ সাহেব, ইনি আমার ফ্যামিলির একজনের মেয়ে। বাংলাদেশে তো জানেনই, কাজিনরা অনেক সময় বেশিই ফ্র্যাঙ্ক হয়। আর বিবি শব্দটা আসলে আমাদের একটা কোড ল্যাঙ্গুয়েজ, যা দিয়ে ও চকোলেট বা ট্রিট বোঝায়। ও এখনো বাচ্চা আপনি কাইন্ডলি রাইনাকে বলবেন আমি ফিরলেই ওর সাথে কফি ডেটে যাব। এখন কি আমরা নেক্সট প্রজেক্টের শিপমেন্ট নিয়ে কথা বলতে পারি?”
মিটিং শেষ করে ল্যাপটপটা সজোরে বন্ধ করল কাবির। সে ঘুরে তিথির দিকে তাকাল। তিথি তখন বুঝতে পেরেছে যে সে মস্ত বড় কোনো ভুল করেছে।
কাবির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় রাগে তার শরীর কাঁপছে। সে তিথিকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে খুব নিচু গলায় বলল।
—“তুমি কি জানো তিথি, আজ তুমি আমার কয়েক বিলিয়ন ডলারের ডিল আর ক্যারিয়ার—দুটোই ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছিলে? আরশাদ চৌধুরী যদি একবার সন্দেহ করেন আমি ওনাকে মিথ্যা বলছি, তবে মিলানে আমার টিকে থাকা কঠিন হবে।”
তিথি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল— “আমি... আমি তো জানতাম না। আমি তো শুধু আপনাকে ডাকতে এসেছিলাম।”
কাবির এবার বাঁকা হাসল। সে তিথির একদম কাছে এসে তার কানের লতি কামড়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—“ক্ষতি তো করেই ফেলেছ। এখন এই ইতালিয়ান সিইও-কে এর ক্ষতিপূরণ কে দেবে? আরশাদ চৌধুরীর মেয়ে রাইনা তো আমাকে কয়েক কোটি টাকার শেয়ার দিত, তুমি কী দেবে বিবি?”
তিথি এবার অসহায়ভাবে কাবিরের সুঠাম দেহের ওপর নিজের ছোট হাত দুটো রেখে বলল,
— “আমি... আমি আপনাকে অনেক অনেক পড়াশোনা করে ভালো রেজাল্ট দেব।”
কাবির হোহো করে হেসে উঠল। সে তিথিকে জাপটে ধরে বলল
— “রেজাল্ট দিয়ে কী হবে?চলো নিচে,সবাই নিশ্চয়ই আমাদের এই ইন্টারন্যাশনাল ড্রামা শোনার জন্য ডাইনিংয়ে অপেক্ষা করছে!”
#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট১২
#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
#চলবে