ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

১৩তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

★

সবাই যখন ডাইনিং টেবিলে বসা, তখন পরিবেশটা বেশ উৎসবমুখর ছিল। একদিকে তিথির মা-বাবা, অন্যদিকে কাবিরের মা-বাবা আর পাশে প্রমা। কাবির আর তিথি সিঁড়ি দিয়ে নামতেই প্রমা বাঁকা হেসে তিথির দিকে তাকাল। তিথি এখনো লজ্জায় কুঁকড়ে আছে, কারণ সে জানে তার অগোছালো অবস্থা দেখে সবাই বুঝে গেছে কাল রাতে কী হয়েছে।

কাবির গম্ভীর মুখে চেয়ার টেনে বসল।

প্রমা যখন কফি ঢালছিল, তখন কাবির সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

—“আব্বু,আম্মু... আর আঙ্কেল-আন্টি, আপনাদের একটা কথা জানানো দরকার। আজ সকালে আরশাদ চৌধুরী আমার ইতালির কোম্পানির ওনার আমাকে কল করেছিলেন। উনি খুব সিরিয়াসলি একটা প্রস্তাব দিয়েছেন।”

সবাই খাওয়া থামিয়ে উৎসুক হয়ে তাকাল। কাবির তিথির থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতের দিকে একবার তাকিয়ে বলতে লাগল,

—“উনি চান উনার মেয়ে রাইনা-র সাথে আমার বিয়ে দিতে। রাইনা এখন মিলানে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আরশাদ সাহেব বলেছেন, আমি যদি রাইনাকে বিয়ে করি, তবে তিনি পুরো কোম্পানির মালিকানা আমার নামে লিখে দেবেন। মানে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি আর ইতালির বিশাল সাম্রাজ্য আমার হাতের মুঠোয় থাকবে।”

কথাটা শুনেই ডাইনিং টেবিলে নীরবতা নেমে এল। তিথির মা-বাবা একে অপরের দিকে অসহায়ভাবে তাকালেন। তারা জানেন কাবির কত বড় মাপের মানুষ, আর তার সামনে তাদের ১৭ বছরের মেয়ে তিথি তো একেবারে নগণ্য।

তিথির বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। সে ভাবল,

— "তাহলে কি ওই রাইনাই জিতবে? আমি তো কেবল ওর পিচ্চি বিবি হয়েই থাকলাম।"

তিথির চোখে জল টলমল করতে লাগল, সে আর এক লোকমা খাবারও মুখে তুলতে পারল না।

ঠিক তখনই কাবির টেবিলের নিচ দিয়ে তিথির হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় বন্দি করল। সে সবার দিকে তাকিয়ে খুব দৃঢ় গলায় বলল,

—“আমি সরাসরি না করিনি। আর আমি চাই না উনি জানুক আমি বিবাহিত।”

তিথির বাবা-মা স্তব্ধ হলো।আলতাফ রহমান কিছু বলতে যাবে তার আগে কাবির বলে,

—“আমি সঠিক সময়ে উনার কাছে এই বিষয়টা এক্সপ্লেইন করবো।আপনারা চিন্তা করবেন না।"

কাবির হাসল। সে তিথির দিকে তাকিয়ে বলল,

—“কারণ সকালে যখন আমার বুকের ওপর আমার বিবি পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছিল, তখন আমার মনে হয়েছে পৃথিবীর সব সুখ আমার এই দুই বাহুর মাঝেই আছে। রাইনার সম্পত্তি দিয়ে আমি কী করব, যদি আমার ঘরে এই পাগলটা না থাকে?”

তিথি এবার লজ্জায় আর আনন্দে লাল হয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। প্রমা শব্দ করে হেসে উঠে বলল। —“যাক! শেষ পর্যন্ত আমার সিইও ভাইটাকে তো দেখি তিথি পুরোপুরি কাবু করে ফেলেছে!”

তিথির বাবা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন

— “কাবির, তুমি আমাদের মেয়েটাকে যেভাবে আগলে রাখলে, তাতে আমরা নিশ্চিন্ত হলাম।”

তিথি টেবিলের নিচ দিয়ে কাবিরের পায়ে হালকা লাথি মেরে ফিসফিস করে বলল,

—“আপনি সবার সামনে শান্তি ঘুমানোর কথা কেন বললেন? এখন আমি সবার সামনে মুখ দেখাব কীভাবে?”

কাবির এক চুমুক কফি খেয়ে তিথির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

—“ভয় পেয়ো না বিবিজান, রাইনা তো ইতালিতে, কিন্তু তোমার ওপর আমার প্র্যাকটিক্যাল দখল তো এখনই শুরু হবে!”

তখনই কাবিরের ফোনে একটা মেসেজ টুং করে উঠল। মেসেজটা দেখে কাবিরের কফিতে চুমুক দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল।

মেসেজে লেখা— ""কাবির, আই’ম নট কনভিন্সড". রাইনা আর আমি অলরেডি এয়ারপোর্টের পথে। প্রাইভেট জেটে আমরা ময়মনসিংহে আসছি। তোমার ওই ফ্যামিলি মেম্বার আর বিবির সাথে আমাদেরও একটু দেখা হওয়া দরকার।সী ইউ ইন দ্য ইভনিং."

কাবির ল্যাপটপ বন্ধ করে নিজের কপাল টিপে ধরল। সে ভাবল, "এই লোক তো দেখি আস্ত একটা গোয়েন্দা তার উপর দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে!"

কাবিরের চেহারা দেখে প্রমা জিজ্ঞেস করল,

— “কী হয়েছে রে ভাইয়া? মুখটা অমন শুকিয়ে গেল কেন?”

কাবির ঢোক গিলে বলল,

— “আরশাদ চৌধুরী আর উনার মেয়ে রাইনা বাংলাদেশে আসছেন। আজ বিকেলেই উনারা আমাদের বাড়িতে পৌঁছাবেন।”

কথাটা শোনা মাত্রই তিথির হাতের রুটির টুকরো প্লেটে পড়ে গেল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

— “তার মানে... ওই ইতালিয়ান রাইনা এখানে আসছে? আপনি তো বলেছিলেন ওকে না করে দিয়েছেন! ও কেন আসছে?”

কাবির তিথির দিকে তাকিয়ে একটু মজা পাওয়ার জন্য বলল।

— “উনি মনে হয় দেখতে আসছেন উনার হবু জামাইকে কোন বিবি জাদু করেছে। তিথি, রাইনা কিন্তু সিক্স ফিট হাইট আর ইতালির টপ ফ্যাশন ডিজাইনার। তুমি তো ওর সামনে দাঁড়ালো মনে হবে স্কুলের বাচ্চা ভুল করে বড়দের পার্টিতে চলে এসেছে!”

তিথি এবার রাগে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল। কিশোরী সত্তা এখন এক চণ্ডী রূপ ধারণ করেছে। সে কোমরে হাত দিয়ে বলল,

—“আসুক! কত বড় রাইনা আমি দেখে নেব। ও ইতালির ডিজাইনার হতে পারে, কিন্তু আপনি তো আমার! উনার সামনে সবচাইতে সুন্দর শাড়িটা পরে দাঁড়াব। দেখি উনি কীভাবে আমার বিবি ডাক কেড়ে নেন!”

তিথির এমন লেডি ডন ভাব দেখে কাবিরের বাবা-মা আর তিথির মা-বাবা হাসতে হাসতে শেষ। প্রমা বলল,

— “আরে তিথি, তুই কি রাইনার সাথে যুদ্ধ করবি নাকি?”

তিথি জেদের সাথে বলল,

— “যুদ্ধই তো! উনি আমার, ওনার ওপর অন্য কারো নজর আমি সহ্য করব না। আর আপনি (কাবিরের দিকে তাকিয়ে)—আপনি যদি একবারও ওর দিকে তাকিয়েছেন, তবে খবর আছে!”

কাবির মনে মনে হাসল। তিথিকে এভাবে অধিকার নিয়ে লড়তে দেখে তার ভেতরে এক অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে। সে ভাবল, "রাইনা আসুক না আসুক, আমার এই পিচ্চি বিবি যে আস্ত একটা বাঘিনী হয়ে উঠছে, এটাই বড় পাওনা!"

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট১৩

#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন