ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

১৮তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

(৩)

অন্ধকার করিডোরে তিথির কান্নার শব্দটা প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, আর কাবির নিজের ঘরে একা পড়ে রইল একরাশ অনুশোচনা নিয়ে।

তিথি প্রমার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বুক ফেটে কান্না আসছে ওর। প্রমা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তাই তিথি নিঃশব্দে বালিশের এক পাশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল। চোখের জলে বালিশের ওপাশটা ভিজে একাকার।

ঠিক সেই মুহূর্তে বালিশের পাশে রাখা ওর ফোনটা ভাইব্রেট হতে শুরু করল। অন্ধকার ঘরে ফোনের স্ক্রিনের আলোটা যেন বিঁধছে চোখে। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই নামটা— কলিজার খাসি (কাবির)।

তিথি প্রথমে ধরতে চাইল না, কিন্তু ভাইব্রেশন থামছেই না। বারবার ফোন বেজে চলেছে। অবশেষে কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা কানে নিল তিথি। ওপাশ থেকে কাবিরের অস্থির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ফোনের ওপাশ থেকে কাবিরের গলাটা আজ একদম অন্যরকম।

সেই দাপট নেই, কোনো নেশা নেই। বরং এক বুক হাহাকার নিয়ে সে ডাকল,

"বিবিজান? তুমি কি শুনছো? প্লিজ ফোনটা কেটো না।"

তিথি কোনো কথা বলল না। ওপাশ থেকে শুধু ওর কান্নার হেঁচকি তোলার শব্দ যাচ্ছে। তিথি ফোনের ওপর হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল যাতে শব্দ না হয়।

"আমি বুঝতে পারিনি তুমি এতটা কষ্ট পাবে। আমি স্রেফ তোমাকে একটু ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম কারণ তুমি আমাকে ওই নামে ডেকে রাগিয়ে দিয়েছিলে। বিশ্বাস করো বিবিজান, তোমাকে কাঁদানো আমার উদ্দেশ্য ছিল না। নিজের ওপর নিজেরই ঘেন্না হচ্ছে এখন। তুমি কি আমাকে একবার মাফ করবে না?"

"আপনার মাফ চাওয়ার স্টাইলটাও কি ওইরকমই মিস্টার অহঙ্কারী? আপনি কি মনে করেন কাউকে জোর করে বিছানায় চেপে ধরলে সে খুব খুশি হয়? আপনি জানেন না আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম?"

"জানি... আমি সত্যিই এক একটা জানোয়ারের মতো আচরণ করেছি। কিন্তু তুমি কি জানো কেন এমন করেছি? ওই রাইনা আর আরশাদ চৌধুরীর চাপে আমি দমবন্ধ হয়ে মরছিলাম। তোমাকে কাছে পেয়ে আমি সব ভুলে গিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম। প্লিজ বিবি... একবার অন্তত বলো যে তুমি খুব বেশি রেগে নেই।"

"রেগে নেই মানে? আমি আপনার হাড় গুঁড়ো করে দেব! কাল সকালে আমি প্রমাকে সব বলে দেব যে আপনি আমাকে কীভাবে ভয় দেখিয়েছেন!"

"বলো, সব বলো। দরকার হলে সবাইকে ডেকে বলো আমি একটা আস্ত শয়তান। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি তোমার দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। একবার কি দরজাটা খুলবে? আমি তোমাকে সামনে থেকে সরি বলতে চাই।"

"কী? আপনি প্রমার দরজার বাইরে? আপনি কি পাগল হয়েছেন? কেউ দেখে ফেললে কী হবে?"

"কিছুই হবে না। যতক্ষণ তুমি দরজা না খুলছো, আমি এখান থেকে নড়ছি না। এই শীতে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমারও না খাসির মতো অবস্থা হয়ে যাচ্ছে। দয়া করো বিবি!"

তিথি রাগ করবে না হাসবে বুঝতে পারছে না। এই লোকটা এক মুহূর্ত আগে রাক্ষস সাজে, আবার পরের মুহূর্তে বাচ্চা ছেলের মতো বায়না ধরে।

"দাঁড়ান আসছি মিস্টার ড্রামাবাজ! আপনার কপালে আজ বড় ঝাড়ু আছে!"

তিথি পা টিপে টিপে দরজার দিকে এগুলো। দরজা খুলতেই দেখল কাবির দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। তিথিকে দেখেই কাবির দুহাত দিয়ে নিজের কান ধরল।

তিথি ভাবল লোকটাকে আচ্ছা মতো দুকথা শুনিয়ে দেবে, কিন্তু দরজা খুলেই ওর সব রাগ যেন জল হয়ে গেল। করিডোরের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে, মিস্টার রাক্ষস রাজা একদম অপরাধী বালকের মতো দুই কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

"বিবি, এবার কি মাফ করা যায়? কান লাল হয়ে গেছে তো!"

তিথি মনে মনে ভীষণ খুশি হলো। যাক, অন্তত এই মিস্টার ইগোস্টিক জমিদারকে লাইনে আনা গেছে।

"কান কি এমনি এমনি লাল হয়েছে? আপনার পাপের বোঝা তো অনেক ভারী! সারারাত ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকুন। তবে যদি আমার মন গলে।"

তিথি এক হাত দিয়ে মুখ ঢেকে একটা লম্বা হাই তুলল। সারাদিন অনেক ধকল গেছে, এবার ওর দুচোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে।

"উফ! আপনার জ্বালায় আমার ঘুমটাই মাটি হয়ে গেল। যান এখন নিজের ঘরে গিয়ে ঘাস খান, আমি ঘুমাতে গেলাম।"

তিথি যেই না হাই তুলে চোখ বন্ধ করে দরজাটা লাগাতে যাবে, অমনি কাবির বিদ্যুৎবেগে সামনে এগিয়ে এল। তিথি কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাবির ওর গালের ওপর ঝুঁকে পড়ল।

✨

পরের মুহূর্তেই তিথির নরম গালে কাবিরের ঠোঁটের একটা উষ্ণ আর আলতো ছোঁয়া লাগাল। তিথি স্তম্ভিত হয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ওর চোখের ঘুম এক নিমেষে গায়েব!

কাবির এক সেকেন্ডের জন্য তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যময় হাসি দিল।

"শুভ রাত্রি বিবিজাম! কান ধরার শাস্তি আর চুমুর বোনাস দুটোই তোলা থাকল।"

বলেই কাবির উল্টো দিকে ঘুরে লম্বা কদমে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। করিডোরে ওর পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, আর ওদিকে তিথি নিজের গালে হাত দিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

"অসভ্য! মিস্টার চিটিংবাজ একটা! কান ধরে আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে আবার সুযোগ বুঝে পকেটমারি করে চলে গেল!"

তিথি ঘরে ঢুকে দরজাটা লক করে দিল। ওর হৃৎপিণ্ড এখনো লাফাচ্ছে। গালের যে জায়গাটাতে কাবির চুমু দিয়েছে, সেখানটা যেন এখনো পুড়ছে। সে বিছানায় গিয়ে প্রমার পাশে শুয়ে পড়ল ঠিকই, কিন্তু এবার আর কান্নার জন্য নয়, বরং এক অদ্ভুত ঘোরের কারণে ওর চোখে আর ঘুম এল না।

"কালকে এই মিস্টার রোমান্টিক শয়তানকে জ্যান্ত কবর না দিলে আমার নামও তিথি না!"

ওদিকে নিজের ঘরে গিয়ে কাবির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে হাসল।

_________

🌿

সকালের সোনালী রোদ ময়মনসিংহের বাড়িটার বারান্দায় এসে পড়েছে। গতরাতের সেই ভুতুড়ে আতঙ্ক আর রোমান্সের রেশ এখনো তিথির চোখে-মুখে লেগে আছে। ডাইনিং টেবিলে সবাই নাস্তা করতে বসেছে।

তিথি আড়চোখে কাবিরের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু কাবির আজ বড্ড বেশি শান্ত। যেন গতরাতে সে কিছুই করেনি, যেন গালের ওই উষ্ণ ছোঁয়াটা কেবল তিথির কল্পনা ছিল।

আরশাদ চৌধুরী আজ বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন। তিনি কফিতে চুমুক দিয়ে সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন।

"আলতাফ সাহেব, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। রাইনা বলছিল এই বাড়িতে মেজো দাদীর আত্মা নাকি ওকে ঘুমাতে দিচ্ছে না। তাই আমি ভাবলাম, আপনাদের ওপর আর চাপ বাড়াব না।"

"খুব ভালো সিদ্ধান্ত আরশাদ সাহেব। আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি আপনাদের ব্যাগ গাড়িতে তুলে দিতে।"

"আরে দাঁড়াও কাবির! আমি ময়মনসিংহে থাকার সিদ্ধান্ত বাতিল করিনি, শুধু এই বাড়ি থেকে শিফট হওয়ার কথা বলছি। আমি খবর পেলাম, আপনাদের ঠিক অপোজিট সাইডের ওই যে ডুপ্লেক্স বাড়িটা আছে, ওটার মালিক সেটা বিক্রি করে দেবে। আমি আজ সকালেই সেই বাড়িওয়ালার সাথে কথা বলেছি। আমি বাড়িটা কিনে নিচ্ছি!"

খবরটা শুনে তিথির গলার রুটি আটকে যাওয়ার দশা হলো। কাবির হাত থেকে চামচটা ফেলে দিয়ে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল।

"যতদিন তুমি ইতালির ফ্লাইটে না উঠছো, ততদিন আমি আর রাইনা ঠিক তোমার চোখের সামনে থাকব। একদম মুখোমুখি! এতে তোমার আর রাইনার বন্ডিংটাও ভালো হবে, আর আমার বিজনেসের নজরদারিও সহজ হবে। কী বলো রাইনা?"

"দ্যাটস গ্রেট ড্যাড! এবার আর মেজো দাদীর ভয় নেই। আর কাবির... এখন থেকে আমরা প্রতিদিন ছাদে দাঁড়িয়ে একে অপরের সাথে কথা বলতে পারব!"

তিথি মেমনে বলে, "ছাদ দিয়ে কথা বলবেন না ছাই! আমি মাঝখানে দেয়াল তুলে দেব। লোকটা তো দেখি আস্ত একটা জেঁকো! চুইংগামের মতো কামড়ে ধরেছে।"

কাবির বুঝতে পারছে, আরশাদ চৌধুরীকে এই শহর থেকে সরানো এখন কেবল কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব।

ওদিকে গেটে একটা গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা গেল। সাদ্দাম আর আহনাফ চলে এসেছে।

তিথি মনে মনে ভাবল, "আসুক সাদ্দাম ভাই আর আহনাফ ভাই! এবার এই অপোজিট বাড়ির বারোটা না বাজালে আমার নামও তিথি না। আরশাদ চৌধুরী, আপনি বাড়ি কিনবেন আর আমি সেখানে এমন ভূত নামাব যে আপনি বাড়ির দলিল ফেলে সোজা ইতালিতে দৌড় দেবেন!"

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট১৮(৩)

#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

#চলবে

বিঃদ্রঃ সবাই শুধু পড়ে চলে যায় রেসস্পন্স করে না। 😔😔এতে আমার খুব মন খারাপ হয়।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন