★
সকাল এগারোটা। গাড়ির হর্নের শব্দ কানে আসতেই তিথি আর প্রমা নাস্তার টেবিল ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। ধুলো উড়িয়ে একটা কালো হ্যারিয়ার এসে থামল গেটের সামনে।
সাদ্দাম গাড়ি থেকে নেমেই সানগ্লাসটা কপালে তুলে চারপাশটা একবার দেখে নিল। কাবির আসলে সকালেই ওদের ফোন করে জলদি আসতে বলেছিল।
সাদ্দামের ঠিক পেছন পেছন গাড়ি থেকে নামল আহনাফ।
(সৈয়দ আহনাফ পেশায় একজন বিজনেসম্যান।কাজের সূত্রে আহনাফ বেশিরভাগ সময় গাজীপুর থাকেন।আহনাফ তার বাবার কোম্পানি সামলায় কারণ তার বাবা রিটায়ার্ড হয়েছে। হার্ট ডিজিজে সমস্যা থাকায় আহনাফ সংসারের দায়িত্ব পালন করে। তবে ময়মনসিংহই তাদের জন্মস্থান।)
আহনাফকে নামতে দেখেই প্রমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। আর যখন গাড়ি থেকে রোনা নামল, তখন প্রমা খুশিতে চিৎকার করতে গিয়েও নিজের মুখ চেপে ধরল।
(রোনা একটি প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতা করে, শান্ত আর বুদ্ধিমতী হিসেবে পুরো ফ্রেন্ড সার্কেলে তার একটা আলাদা সম্মান আছে।রোনার,রোনার ছোট বোন তুলি,মা-বাবা এদের চারজনকে নিয়ে রোনার পরিবার। বাবার পাশে দাঁড়াতে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিয়েছে।)
আহনাফ, সাদ্দাম আর রোনা—তিনজনেই কাবিরের কলেজের বেস্ট ফ্রেন্ড। কাবিরের একটা মেসেজেই তারা সব কাজ ফেলে ময়মনসিংহে হাজির হয়েছে।
তিথি গিয়ে সাদ্দামের হাত খামচে ধরল, যেন সে কোনো বিপদের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে।
"কি তিথি! গাড়ি থেকে নামতে দিবে তো?"
“সাদ্দাম ভাইয়া, আহনাফ ভাইয়া—আপনারা কি জানেন এই ময়মনসিংহে গত রাতে কী হয়ে গেছে? আপনাদের ওই খাসি বন্ধুটি এখন একটা আস্ত ড্রাকুলা হয়ে গেছে!"
আহনাফ গম্ভীরভাবে হাসল। সে জানে তিথির অভিযোগ মানেই বিশাল কোনো নাটক। সে বলল, "কেন? কাবির আবার কী করল?"
"কী করেনি বলুন! মাঝরাতে সে আমার ঘরের দরজা আসলে প্রমার ঘর লক খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারপর আমাকে ভয় দেখিয়ে, দেয়ালে সেঁটে ধরে... উফ! ভাবলে এখনো আমার হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে! সে তো আমাকে জ্যান্ত চিবিয়ে খাওয়ার প্ল্যান করেছিল। আমি তো এখন রাতে ঘুমাতেও ভয় পাচ্ছি!"
"বলো কী! কাবির শেষমেশ রোমান্স শুরু করল? আমি তো জানতাম ও শুধু গরু-খাসির মতো ঘাস খেয়েই জীবন পার করবে।"
রোনা তিথির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে একটু মজা করে বলল,
— "তা তিথি, সে কি শুধু ভয়ই দেখিয়েছে? নাকি বোনাস হিসেবে আরও কিছু দিয়ে গেছে যার জন্য তুমি এখন লাল হয়ে আছো?"
"বোনাস... মানে... ওটা তো পকেটমারি! মানে সে আমাকে কান ধরে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে উল্টো আমার পকেট মেরে চলে গেছে। আহনাফ ভাইয়া, আপনি তো বিজনেসের ডিল বোঝেন—একটা ছোট মেয়েকে এভাবে মাঝরাতে হানা দেওয়া কি ঠিক?"
কাবির একদম তিথির পেছনে এসে দাঁড়াল। তিথি টেরই পায়নি। ও যখন সাদ্দামকে হাত-পা নেড়ে বোঝাচ্ছিল যে কাবির কতটা রাক্ষস ঠিক তখনই।
"সবই তো বললে বিবিজান, কিন্তু ওই যে বললে পকেটমারি করেছি—সেটা ঠিক কোন পকেটে হাত দিয়েছিলাম সেটা সাদ্দামকে একটু বিস্তারিত বুঝিয়ে বলো না? আর কান ধরার সময় তুমি যে আমার শার্ট খামচে ধরে আমাকেই কাছে টানছিলে, সেটাও কি নালিশের লিস্টে আছে?"
কাবিরের এই নির্লজ্জ আর সরাসরি আক্রমণে তিথির গলার স্বর আটকে গেল। ওর ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল। সে তো ভেবেছিল সবার সামনে কাবির লজ্জা পাবে, কিন্তু এ তো উল্টো তাকেই জনসমক্ষে এক্সপোজ করে দিচ্ছে!
সাদ্দাম এবার দুই আঙুলে শিস দিয়ে উঠল।
— "অ্যাই কাবির! তুই তো দেখি একদম প্রো-লেভেলের খেলোয়াড় হয়ে গেছিস। ইউনিভার্সিটির লেকচার দিতে গিয়ে আমি যা না শিখিয়েছি, তুই তো প্র্যাকটিক্যালি তার চেয়ে বেশি করে ফেলেছিস!"
"মিথ্যে... একদম মিথ্যে! আমি কখন আপনাকে কাছে টেনেছি? আপনিই তো ড্রাকুলা সেজে..."
কাবির এবার তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে এক পা এগিয়ে এল। তিথি পিছিয়ে গিয়ে সাদ্দামের পেছনে লুকানোর চেষ্টা করল।
কাবির হাসতে হাসতে বলল,
— "সাদ্দাম, নালিশ যখন শুনেছিস, বিচারটাও করিস। তবে বিচারটা যেন পক্ষপাতিত্ব না হয়। কারণ যে মেয়ে মাঝরাতে নিজে পাসওয়ার্ড টিপে আমার ঘরে ঢোকে, তাকে কি আর 'ভাজা মাছটি উল্টে খেতে পারে না' বলা সাজে?"
তিথি এবার লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। রোনা আর আহনাফও মুখ টিপে হাসছে।
রোনা বলল, "তিথি, তুমি তো দেখি বাঘের ঘরে হানা দিয়ে এখন বিড়ালের মতো মিউ মিউ করছো!"
ওদিকে প্রমা আর সাদ্দামের অবস্থা তখন দেখার মতো। সাদ্দাম আর প্রমা দুজনেই কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। সাদ্দামের চোখেমুখে একধরণের অদ্ভুত কৌতুক, আর প্রমা রাগে-লজ্জায় দাঁত কিড়মিড় করছে। প্রমা যখন দেখল সাদ্দাম ওর দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে হাসল, ও অমনি মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল।
সাদ্দাম ফিসফিস করে প্রমাকে বলল,
— "কি প্রমা! তোমার রুমের দরজা দিয়ে কাবির ঢুকল আর তুমি টেরই পেলে না? নাকি তুমিও মাঝরাতে কারও জন্য দরজা খোলা রেখেছিলে? তোমার তো আবার লেকচার শোনার খুব শখ!"
প্রমা সাদ্দামের পা মাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— "বেশি কথা বলবেন না সাদ্দাম ভাইয়া! আপনার ওই লেকচারার মার্কা চশমাটা খুলে আজ আমি ব্রহ্মপুত্রে ফেলে দেব। ভাবলাম একটু মানুষ হয়েছেন, কিন্তু আপনি তো সেই বাঁদরটাই রয়ে গেছেন!"
সাদ্দাম ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে বলল,
—"উফ! তোদের এই ময়মনসিংহী মেয়েদের হাত-পা কি লোহা দিয়ে বানানো? কাবির, তোর জন্য আমার করুণা হচ্ছে। একজনকে দিয়েছিস গালে পকেটমারি, আর আমার কপালে জুটছে পায়ের ওপর সজোরে লাথি!"
সাদ্দাম আর প্রমার এই চোখা-চোখি আর ঝগড়া দেখে আহনাফ হাততালি দিয়ে বলল,
— "বাস করো! এবার চলো। প্রিয়া আর জামাইকে আনতে যাওয়ার চেয়ে বড় মিশন এখন এই আরশাদ চৌধুরী আর রাইনাকে হ্যান্ডেল করা। গাড়ি রেডি, সবাই ওঠো।"
~~
আরশাদ চৌধুরী আর রাইনা তখন বারান্দা থেকে এই দৃশ্য দেখছিলেন। রাইনা বিরক্ত হয়ে বলল, —"ড্যাড! এরা তো দেখছি সবাই মিলে সার্কাস শুরু করেছে। আমাদের সাথে নিয়ে যাবে নাকি এখানে নাটক দেখাবে?"
আরশাদ চৌধুরী গম্ভীর মুখে বললেন, "আসুক ওরা। শ্বশুরবাড়ির এই ভিড়েই আমি দেখব কাবির আর তিথির রসায়নটা ঠিক কতটা গভীর।"
*
গাড়িতে ওঠার সময় শুরু হলো আসল কমেডি। তিথি যেই না পা টিপে টিপে কাবিরের সাদা সেডান গাড়িতে উঠতে যাবে, অমনি রাইনা কোথা থেকে
উড়ে এসে কাবিরের হাত খামচে ধরল।
রাইনা ঠোঁট ফুলিয়ে ন্যাকামি করে বলল,
— "নো কাবির! তুমি আমার উডবি হাসবেন্ড। তুমি যেখানে, আমিও সেখানে! আমি তোমার গাড়িতেই বসব।"
কাবির বিরক্তি লুকিয়ে বলল,
— "রাইনা, এখানে জায়গা হবে না। আহনাফের গাড়িতে আমার বাবা-মা যাচ্ছেন,ওটা ফুল। তুমি বরং আরশাদ সাহেবের সাথে যাও।"
কিন্তু আরশাদ চৌধুরী এবারও রাইনার পক্ষ নিয়ে বললেন,
— "কাবির, রাইনা আবদার করেছে যখন, ও তোমার সাথেই যাক। আর তিথি , তুমি বরং আমার এই বড় গাড়িটাতে আসো। আমরা একটু গল্প করতে করতে যাই।"
তিথি প্রথমে একটু দমে গেলেও, পরক্ষণেই তার মাথায় শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল। সে ভাবল, —"মিস্টার রাক্ষস রাজাকে তো জ্বালানো হলোই, এবার একটু উনার এই ভবিষ্যৎ শ্বশুরমশাইকে জ্বালানো যাক!"
★
তিথি আরশাদ চৌধুরীর দামি প্রাডোতে আয়েশ করে বসল। আরশাদ চৌধুরী ড্রাইভ করছেন, আর তিথি পাশে বসে মিটিমিটি হাসছে।
"আচ্ছা আরশাদ আঙ্কেল, ইতালিতে কি খুব একলা লাগে না আপনার? আন্টি তো নেই অনেকদিন হলো। রাইনা আপুর তো বিয়ে হয়ে যাবে, আপনি একদম একা হয়ে যাবেন!"
"হ্যাঁ, বিজনেস নিয়ে ব্যস্ত থাকি তো, সময় কেটে যায়।"
"আরে আঙ্কেল! বিজনেসে তো আর আদর পাওয়া যায় না। আমার মনে হয় আপনার এই বয়সে একজন জীবনসঙ্গী খুব দরকার। আপনি প্লিজ আর একটা বিয়ে করেন! আমি একদম রাজকীয় এক কনে খুঁজে দেব আপনাকে। আমাদের ময়মনসিংহের মেয়েরা কিন্তু খুব যত্ন করতে জানে। দ্বিতীয় বিয়ে করলে আপনার একাকিত্বও কাটবে, আর আমাদের রাইনা আপুও একটা নতুন মা পাবে! কী বলেন?"
"এসব কী বলছ ? এই বয়সে বিয়ে?"
"আরে বিয়ের আবার বয়স কী! আপনি তো এখনো মাশাআল্লাহ হ্যান্ডসাম। বিশ্বাস করেন, আপনি রাজি হলে আমি আজই প্রিয়া আপুর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে আপনার জন্য পাত্রী দেখা শুরু করব। রাজি তো?"
তিথির মুখে বিয়ের প্রস্তাব শুনে আরশাদ চৌধুরী যখন আমতা আমতা করছেন, ঠিক তখনই তিথির ফোনে বেজে উঠল ওর মায়ের কল। তিথি স্ক্রিনে আম্মু নামটা দেখেই মনে মনে একটা শয়তানি বুদ্ধি আঁটল। সে জানে, এই গম্ভীর মাফিয়াকে আরও বেশি নাজেহাল করতে হলে এখন একটু ড্রামা দরকার। আরশাদ চৌধুরী যখন গম্ভীর মুখে ড্রাইভ করছেন, তখন তিথি ফোনে ওর মায়ের সাথে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করল যেন ওপাশে ওর জানের জান বয়ফ্রেন্ড বসে আছে।
"এই মেয়ে তো দেখি মারাত্মক চিজ!একে আমি কাবিরের বউ ভাবছি, এখনও অন্য কারো সাথে প্রেম বিলোচ্ছে!"
"ওলে আমার কলিজার খাসি! এতক্ষণে আমার কথা মনে পড়ল? আমি তো ভেবেছিলাম ধোবাউড়ার পথে যেতে যেতে তুমি আমায় ভুলেই গেছ। হুমম... আমিও তোমাকে খুব মিস করছি। এই যে এখন আরশাদ আঙ্কেলের পাশের সিটে বসে আছি না, আমার বারবার মনে হচ্ছে এখানে যদি তুমি থাকতে আর আঙ্কেল ড্রাইভ করত, তবে কী দারুণ হতো!"
"কী বললে? আমি কি শাড়ি পরেছি? উঁহু... কিন্তু প্রিয়া আপুর বাড়ি গিয়ে তোমার পছন্দের ওই নীল শাড়িটাই পরব। তখন কিন্তু আমাকে সবার সামনে অনেক আদর দিতে হবে, মনে থাকে যেন! উম্মাহ... রাখি এখন, আঙ্কেল আবার হিংসে করছেন মনে হয়!"
ফোনটা রেখেই তিথি আড়চোখে দেখল আরশাদ চৌধুরীর মুখটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।
"শোনো তিথি, তুমি কার সাথে প্রেম করছ আর কাকে খাসি ডাকছ, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু একটা কথা মাথায় রেখো, আমি আরশাদ চৌধুরী—যা চাই তা ছিনিয়ে নিতে জানি। তুমি যদি সত্যি সত্যি কাবিরের বউ না হয়ে থাকো, তবে তোমার জন্য সেটাই ভালো হবে। কারণ আমার রাইনার পথে যে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে, তাকে সরিয়ে দিতে আমার এক সেকেন্ড সময় লাগবে না।"
"আরে আঙ্কেল! আপনি হুমকি দিচ্ছেন নাকি প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছেন বোঝা বড় দায়! আপনি রেগে গেলে আপনার কপালে যে ভাঁজ পড়ে না, ওটা দেখলে আমাদের বাড়ির ওই খলিফা দাদী নির্ঘাত হার্টফেল করবে! বিশ্বাস করেন আঙ্কেল, আমি যখনই আপনার দিকে তাকাই, আমার শুধু মনে হয় আপনি কেন আগে আসলেন না? তাহলে তো আপনাকে আমি আমার নতুন খালু হিসেবে বরণ করে নিতে পারতাম!"
আরশাদ চৌধুরী এবার রাগে স্টিয়ারিংয়ে একটা জোরে কিল মারলেন। তিনি চিৎকার করে বলতে চাইলেন
"চুপ করো!",
কিন্তু তিথি থামার পাত্রী নয়। সে ফোনে আবার তার আম্মুকে (যাকে সে কলিজার খাসি সাজিয়েছে) বলতে শুরু করল,
— "শোনো খাসি! আঙ্কেল কিন্তু রাজি! তুমি জলদি বড় চাচাকে ফোন করে বলো ধোবাউড়ার ওই কনেটার ছবি পাঠাতে। আঙ্কেল আজই ওনাকে দেখে পছন্দ করবেন!"
"তিথি! তুমি যদি আর একটা শব্দ উচ্চারণ করো, তবে আমি ধোবাউড়ায় না গিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা ইতালি চলে যাব!"
তিথি মুখ টিপে হেসে মনে মনে বলল,
"ইতালি যাবেন? যান না! রাইনা আপু তো কাবিরের গাড়িতে। আপনি একা ইতালি গিয়ে কী করবেন? ঘাস খাবেন?"
আরশাদ চৌধুরী হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনি হুমকি দিচ্ছেন জান শেষ করে দেওয়ার, আর এই মেয়ে তাকে নিয়ে মজা করছে!
🌿
ওদিকে পাশের গাড়িতে কাবির রাইনার ন্যাকামি শুনতে শুনতে জানালা দিয়ে তিথির হাসিমুখ দেখে মনে মনে ভাবছে,
"তিথি যে কী চাল চালছে কে জানে! আরশাদ চৌধুরীর মুখ তো দেখছি বেগুনি হয়ে যাচ্ছে!"
গাড়ি এখন ধোবাউড়ার শান্ত মেঠো পথ চিরে এগোচ্ছে। স্টিয়ারিংয়ে কাবির, আর তার ঠিক পাশে রাইনা। রাইনা বারবার আয়নায় নিজের মেকআপ চেক করছে আর ভাব দেখাচ্ছে যেন সে এই বংশের বড় ছেলের হবু বউ।
পেছনের সিটে গাদাগাদি করে বসেছে আহনাফ, রোনা, সাদ্দাম আর প্রমা। সাদ্দাম আর প্রমা মাঝখানে বসে একে অপরের সাথে ঝগড়া করলেও, রাইনাকে রোস্ট করার সময় তারা এখন একজোট।
সাদ্দাম হঠাৎ গলা পরিষ্কার করে রাইনার দিকে তাকিয়ে খুব ফ্রেন্ডলি সুরে বলল,
"রাইনা ম্যাডাম, আপনি তো আমাদের কাবিরের বসের মেয়ে। সেই হিসেবে আপনি তো আমাদের পুরো ফ্রেন্ড সার্কেলের কাছে একদম জাতির ভাবী! বল আহনাফ?"
"একদম ঠিক।আপনি আমাদের জাতির ভাবী হিসেবে ধোবাউড়ায় পা রাখছেন, এটা তো একটা ঐতিহাসিক ঘটনা!"
"ওহ থ্যাঙ্কস গাইস! তোমরা খুব সুইট।"
রোনা এবার মুখ টিপে হেসে যোগ করল,
— "আসলেই রাইনা! প্রিয়া আপুর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে আমরা সবাইকে বলব যে কাবিরের বসের মেয়ে এসেছে। সবাই তো ধন্য ধন্য করবে। বিশেষ করে আমাদের বড় চাচা শুনলে তো খুশিতে আপনাকে এই ধোবাউড়ার জমিদারই বানিয়ে দেবেন!"
প্রমা তখন সাদ্দামের পায়ে পা দিয়ে গুঁতো দিচ্ছিল, কিন্তু সাদ্দামের কথা শুনে সে আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে রাইনার দিকে তাকিয়ে আহ্লাদী সুরে বলল,
— "রাইনা,জাতির ভাবী হওয়ার একটা দারুণ সুবিধা আছে। এখন থেকে ধোবাউড়ার সব মশা আপনাকে একটু আলাদা রেস্পেক্ট দেবে। কামড়ানোর আগে অন্তত একবার পারমিশন চাইবে—ভাবীজান, একটু রক্ত খাব?'"
সাদ্দাম হো হো করে হেসে উঠল।
— "একদম! প্রমা ঠিক বলেছে। আপনি হলেন আমাদের বস-কন্যা। আর আপনার এই জাতির ভাবীগিরি দেখার জন্যই তো আমরা সব কাজ ফেলে ধোবাউড়ায় আসলাম। আহনাফ, দেখলি তো? কাবির আমাদের কত বড় সারপ্রাইজ দিল!"
কাবির সামনে থেকে সব শুনছে আর স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছে। ও জানে ওর বন্ধুরা রাইনাকে তেল দিচ্ছে না, বরং সূক্ষ্মভাবে বাঁশ দিচ্ছে। রাইনা অবশ্য প্রশংসার চোটে সেটা বুঝতেই পারছে না।
সাদ্দাম এবার প্রমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "কি প্রমা, জাতির ভাবীর জন্য তো ধোবাউড়ায় পৌঁছে একটা স্পেশাল সংবর্ধনার ব্যবস্থা করা দরকার। কী বলো?"
"সংবর্ধনা মানে? আমি তো ভাবছি রাইনা আপুকে দিয়ে ধোবাউড়ার ওই বড় পুকুরে একটা ডুব দেওয়াব। জাতির ভাবীর পবিত্রতা রক্ষার জন্য ওটা খুব দরকার, তাই না সাদ্দাম ভাইয়া?"
"তোমার বুদ্ধি তো দেখি দিনে দিনে ধারালো হচ্ছে! তবে সাবধানে থেকো, জাতির ভাবী যেন তোর ওপর রেগে না যায়!"
**********
তাদের এই শোরগোলের মধ্যেই মাঝের সিটে বসা আহনাফ আর রোনার মধ্যে এক অদ্ভুত শান্ত আলাপ চলছে। রোনা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
"আহনাফ, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? রাগ করবি না তো?"
"তোর ওপর কি রাগ করা যায় রে? বল, কী বলবি?"
"তুই কী তিথির কথা ভাবা ছেড়ে দিয়েছিস?"
তারপর খুব শান্ত আর গভীর গলায় বলল,
— "ছেড়ে দিয়েছি কি না জানি না রোনা, তবে এটা বুঝেছি যে তিথির গল্পের রাজপুত্র আমি নই। ও আমার কাছে কিছুদিনের সুন্দর অতীত ছিল ঠিকই, কিন্তু বর্তমানটা তো অন্যরকম। আর যখন আমার পাশে তোর মতো একজন শান্ত আর বুদ্ধিমতী মেয়ে ছায়ার মতো বসে থাকে, তখন অন্য কাউকে নিয়ে ভাবার সময় কোথায় বল তো?"
"বিশ্বাস কর রোনা, আমার ভাবনা জুড়ে এখন আর কোনো তিথি নেই। শুধু তুই আছিস। তুই কি আমার পাশে এভাবেই সারাটা জীবন থাকবি?"
রোনা লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিল। আহনাফের এই সরাসরি স্বীকারোক্তি ওর হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিয়েছে। সে আলতো করে মাথা নেড়ে আহনাফের প্রস্তাবে নিঃশব্দে সম্মতি জানাল। আহনাফ রোনার হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে নিজের করে নিল।
************
ঠিক সেই মুহূর্তেই সাদ্দাম আর প্রমার যুদ্ধের একটা অবশেষে তাদের ওপর এসে পড়লো। প্রমা সাদ্দামকে ধাক্কা দিতে গিয়ে আহনাফের গায়ের ওপর প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
"ওহে আহনাফ! তোরা দেখি ধোবাউড়া যাওয়ার পথে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি নামিয়ে ফেলেছিস! প্রমা, তুমিও কি ওদের মতো রোমান্টিক হওয়ার চেষ্টা করছো নাকি?"
"অসভ্য! আপনি কি একটুও শান্ত হতে পারেন না? ওদের মিষ্টি আলাপটা নষ্ট করলেন কেন?"
আহনাফ আর রোনা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। ধোবাউড়ার সেই আঁকাবাঁকা পথে প্রেমের এক নতুন সুর বাজতে শুরু করল।
গাড়িটা যখন প্রিয়া আপুর শ্বশুরবাড়ির গেটে এসে থামল, তখন দেখা গেল তিথি এরই মধ্যে অন্য গাড়ি থেকে নেমে আরশাদ চৌধুরীকে জ্বালানো শুরু করে দিয়েছে।
★
তিথি গাড়ি থেকে নেমেই চিৎকার করে বলল—
— "আঙ্কেল! এই যে দেখুন আমাদের ধোবাউড়ার ধুলোবালি। আপনার বিয়ের জন্য কিন্তু আমি অলরেডি পাত্রী নির্বাচন শুরু করে দিয়েছি। আংকেল! এই যে দেখুন, ইতালিয়ান বেয়াই সাহেব এসেছেন!"
#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট১৯
#লেখনীতে_সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
#চলবে
🔵কেমন লাগলো আজকের কিস্তি? তিথি তো আরশাদ চৌধুরীকে প্রায় হার্ট অ্যাটাক করিয়ে দিচ্ছে! কিন্তু গল্পের আসল মোড় তো এখনো বাকি। কাবির-তিথির এই টক-ঝাল-মিষ্টি সম্পর্কের মাঝে কি সত্যিই নতুন কারো এন্ট্রি হতে যাচ্ছে? আরশাদ চৌধুরী কি আদৌ দমে যাবেন, নাকি রাইনাকে নিয়ে নতুন কোনো চাল চালবেন?
সব জানতে পারবেন সামনের পর্বগুলোতে।